সুরা দোহার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও ব্যাখ্যা

  • Posted: 22/12/2019

সুরা দোহা পবিত্র কুরআনের ৯৩ তম সুরা। মক্কায় নাজিল-হওয়া এ সুরায় রয়েছে ১১ আয়াত।
কিছুদিন ওহি নাজিল বন্ধ থাকা, ইহকাল ও পরকালে মহানবীর (সা) প্রতি মহান আল্লাহর নানা অনুগ্রহের বর্ণনা এবং কয়েকটি সামাজিক ও নৈতিক উপদেশ বা নির্দেশ এই সুরার আলোচ্য বিষয়। এ সুরার প্রথমে দোহা শব্দটি এসেছে বলে সুরাটির নাম হয়েছে দোহা যার অর্থ ভোর বা উজ্জ্বল দিন। মহান আল্লাহ দোহা তথা ভোর বা পূর্বাহ্নের শপথ নিয়েছেন এবং এরপর এ সুরায় নিঝুম বা গভীর রাতের শপথ নিয়েছেন। সুরা দোহার প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস বলেছেন, একবার একটানা ১৫ দিন মহানবী (সা)'র কাছে ওহি নাজিল হয়নি। এ সময় মক্কার কাফের মুশরিকরা বলছিল, মুহাম্মাদের প্রতিপালক তাঁকে ত্যাগ করেছেন ও তাঁকে শত্রু মনে করেন। মুহাম্মাদ যদি নবী হতেন তাহলে অবশ্যই তাঁর কাছে নিয়মিত ওহি তথা খোদায়ি প্রত্যাদেশ নাজিল হত! এ অবস্থায় সুরা দোহা নাজিল হয় এবং মহান আল্লাহ মহানবীকে (সা) জানিয়ে দেন যে তিনি তাঁকে ত্যাগ করেননি, বরং তাঁকে বিশ্রাম দেয়ার জন্যই ওহি নাজেলে কিছুটা বিরতি দেয়া হয়েছে। তাই শত্রুদের এমন দাবির কোনো ভিত্তি নেই যে মহান আল্লাহ মহানবীর (সা) ওপর বিরক্ত বা রাগান্বিত হয়েছেন বা তাঁকে ত্যাগ করেছেন!
এ ছাড়াও মহানবী যে সব সময়ই মহান আল্লাহ'র অনেক বিশেষ অনুগ্রহ ও দয়া পেয়ে আসছেন সেটাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে সুরা দোহায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, মহানবীকে (সা) এত বেশি খোদায়ি নেয়ামত দেয়া হবে যে তিনি তাতে সন্তুষ্ট হবেন। এ ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে মহানবী (সা) দুনিয়াতে তাঁর শত্রুদের ওপর বিজয়ী হয়েছেন এবং তাঁর নেতৃত্বে আল্লাহর মনোনীত শ্রেষ্ঠ ও একমাত্র ধর্ম ইসলাম গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। আর আখেরাত বা পরকালে তো আরও অনেক বিশাল অনুগ্রহ এবং সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্মান ও করুণাগুলো পাবেন তিনি। সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ রাসুল ও নবী হিসেবে মহানবী (সা) মানবজাতির প্রধান নেতা এবং উম্মতের মুক্তির ব্যাপারে তাঁর সুপারিশ বা শাফায়াত গ্রহণ করা হবে। ফলে তিনি চরম খুশি হবেন।
দোহা মানে উজ্জ্বল দিন বা দিনের প্রথম ভাগ। সূর্য এ সময় আকাশে দৃশ্যমান হয় ও সর্বত্র আলোকিত হয়। তাই দোহা দিনের সবচেয়ে ভালো সময়। এ সুরায় মহান আল্লাহ রাতের বিশেষ সময়ের শপথও নিয়েছেন। এতে ব্যবহৃত 'সাজা' শব্দটির মূল অর্থ হল প্রশান্তি যা রাতের বেলায় অনুভূত হয়। রাতের প্রশান্তির কারণেই মানুষ দিনে আবারও কাজ করার প্রেরণা ও শক্তি পায়। তাই গভীর রাত মহান আল্লাহর খুবই বড় অনুগ্রহ।
মহানবী (সা)'র প্রতি খোদায়ি অনুগ্রহ সম্পর্কে সুরা দোহার ছয় থেকে অষ্টম আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, (৬) তিনি কি তোমাকে পিতৃহীন তথা ইয়াতিম বা অনুপম রূপে পেয়ে তোমাকে আশ্রয় দান করেননি? (৭) তিনি তোমাকে মানুষের মধ্যে বিস্মৃত পেলেন অতঃপর তাদের তোমার প্রতি পথনির্দেশ করলেন, (৮) তিনি তোমাকে নিঃস্ব অবস্থায় পেলেন অতঃপর অভাবমুক্ত করলেন। -
ইয়াতিম শব্দটি পিতৃহীন ছাড়াও একক ও অনুপম অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যে মূল্যবান মুক্তার (দুররাতুন) অনুরূপ কোন মুক্তা নেই তাকে ‘ইয়াতিমা' বলা হয়। তাই আয়াতটির অর্থ এও হতে পারে যে, তিনি মহানবীকে অনুপম রূপে পেয়েছেন তাই তাঁকে নিজ তত্ত্বাবধানে গ্রহণ করেছেন। তেমনি পরের আয়াতে ‘দ্বাল্লা’ শব্দের অর্থ অপরিচিত ও বিস্মৃত বা পথহারাও হতে পারে। মহানবীর আহলে বাইতের সদস্য ইমাম রেজা (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা.) শৈশবে একবার পথ হারিয়ে মক্কার বাইরে চলে গিয়েছিলেন ও আবু লাহাব তাঁকে পেয়ে নিয়ে আসে।
মহানবীর (সা) বয়স যখন মাতৃগর্ভে ছয় মাস তখনই তাঁর বাবা মারা যান। ছয় বছর বয়সে তিনি মা আমেনাকেও হারান। এরপর ৮ বছর বয়সে অভিভাবক ও তত্ত্বাবধানকারী প্রিয় দাদা আবদুল মোত্তালেবকেও হারান তিনি। এরপর চাচা আবু তালিব হন মহানবীর তত্ত্বাবধায়ক ও অভিভাবক।
মুহাম্মাদ (সা) আনুষ্ঠানিকভাবে নবী ও রাসুল হওয়ার আগে আরব দেশে ছিল খোদাদ্রোহিতা, শির্ক, জুলুম, অনাচার, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের প্রবল জোয়ার। কিন্তু এসব পাপ ও দূষণের বিন্দুমাত্র কালিমাও স্পর্শ করেনি মহানবীকে (সা)। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম নবী ও রাসুলকে তাঁর ইবাদতের পথেই এগিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে বিশ্বনবীও মানবজাতির মুক্তি কামনা করতেন মহান আল্লাহর কাছে। রাতের পর রাত হেরা পর্বতের গুহায় গিয়ে মানুষের মুক্তি ও বিশ্বের সব জটিল সংকটের সমাধান নিয়ে ভাবতেন তিনি। এ অবস্থায় তিনি ওহি বা খোদায়ি প্রত্যাদেশ পান এবং আল্লাহর পথে পরিচালিত হন। অর্থ সম্পদের দিক থেকে মহানবী (সা) পৈতৃক সূত্রে কেবল একটি মাদি উট ও এক কন্যা-দাসী পেয়েছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁকে হযরত খাদিজা সালামুল্লাহ আলাইহার বাণিজ্যের মুনাফা ও বিপুল সম্পদ এবং যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদ দিয়ে স্বচ্ছল করেন।
সুরা দোহার শেষ বাক্যে মহানবীকে (সা) বলা হচ্ছে যে, তুমি ইয়াতিম ছিলে। তাই ইয়াতিমের বেদনা বুঝতে পেরেছ বলে ইয়াতিমের প্রতি কখনও কঠোর হয়ো না, বরং তাদের সহায় হও। তুমি নিজে নিঃস্ব ছিলে ও দারিদ্রের বেদনা টের পেয়ছ, তাই কোনো সাহায্য-প্রার্থী ও দরিদ্রকে ফিরিয়ে দেবে না। নিঃস্বতা আর দারিদ্রের পর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ভোগ করেছ বলে খোদায়ী অনুগ্রহ, করুণা ও দয়ার গুরুত্বও বুঝতে পারছ। তাই আল্লাহর সব নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং সর্বত্র আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দাও। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম রাসুলের মাধ্যমে আসলে এ নির্দেশ সব মুসলমানকেই দিচ্ছেন।####

 
Share: