সুরা আলক্বাদর-এর পরিচিতি ও ব্যাখ্যা

  • Posted: 17/02/2020

সুরা ক্বাদর পবিত্র কুরআনের ৯৭ তম সুরা। মক্কায় নাজিল-হওয়া এ সুরায় রয়েছে ৫ আয়াত। ক্বাদর শব্দের অর্থ মহিমান্বিত বা পরিমাপ।
এই সুরার প্রথম বাক্যেই রয়েছে এ শব্দটি। লাইলাতুল ক্বাদর বা মহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে এ সুরায়। এতে বলা হয়েছে এই রাতেই নাজিল হয়েছিল পবিত্র কুরআন। মহিমান্বিত রাতের গুরুত্ব, বরকত ও প্রভাব সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে সুরা আল ক্বাদরে।
এই সুরার প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন নাজিল করার কথা জানিয়ে বলেছেন, (১) আমি অবশ্যই এটা অর্থাৎ পবিত্র কুরআনকে মহিমান্বিত রাতে নাজিল করেছি। সুরা আলক্বাদরের অন্য আয়াতগুলোর অর্থ হচ্ছে: (২) কি তোমাকে মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে অবহিত করল? (৩) মহিমান্বিত রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। (৪) এ রাতে ফেরেশতারা ও রুহুল কুদ্স্ বা জিবরাইল ফেরেশতা তাদের প্রতিপালকের নির্দেশে প্রত্যেক বিষয়ের আদেশসহ নাজিল হন, (৫) এরাতে ঊষার আবির্ভাব অবধি শান্তি অবতীর্ণ হয়।
লাইলাতুল ক্বাদর পবিত্র রমজানের বিশেষ বরকতময় রাত। এ রাতেই পবিত্র কুরআন নাজিল করেছেন ও এ রাত হাজার রাতের চেয়েও উত্তম বলেও আল্লাহ ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কুরআনের বক্তব্যের আলোকে এ মহাগ্রন্থ দুইভাবে নাজিল হয়েছে: প্রথমতঃ গোটা কুরআনের বাণী সামগ্রিকভাবে বা মোটা দাগে একবারে মহানবীর (সা) ওপর নাজিল হয় ক্বাদরের রাতে এবং দ্বিতীয়তঃ নানা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পর্যায়ক্রমে শব্দ ও বাক্যসহ বিস্তারিতভাবে মহানবীর (সা) ওপর। দ্বিতীয় ধরনের নাজিল সম্পন্ন হতে সময় লেগেছে ২৩ বছর।
সুরা ক্বাদরে মহান আল্লাহ আমাদের রাসূল (সা)কে সম্বোধন করলেও মূলত: তাঁর মাধ্যমে গোটা মানব জাতিকে প্রশ্ন করেছেন, মানুষ শবে ক্বাদর সম্পর্কে কী জানে? এ রাতটি কেন শ্রেষ্ঠ ও কেন এ রাতে ইবাদতের মূল্য এতো বেশি?
আমরা নামাজে বলি: আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি ও কেবল তোমারই কাছে সাহায্য চাই। অর্থাৎ সংঘবদ্ধ ইবাদতের মর্যাদা বেশি। সংঘবদ্ধ অবস্থায় মানুষের আত্মা একে অপরের উপর প্রভাব ফেলে। যখন অন্যদের উন্নত আত্মাগুলো ইবাদতে মশগুল তখন তার প্রভাব নিজ আত্মার ওপরও পড়ে। ফজরের আজানের আগের ইবাদতে রয়েছে অনন্য স্বাদ। এ সময়ের ইবাদত অতি উত্তম। কারণ তখন মানুষের আত্মা ইবাদতের জন্য বেশি প্রস্তুত, বেশি পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকে। তাই তখনকার ইবাদতে হৃদ্যতা ও আন্তরিকতা বেড়ে যায়। পবিত্র আত্মার অধিকারীরা এ সময়ই বেশি ইবাদত করেন। এ সময় একটা ঐশী ঢেউ পৃথিবীতে দোলা খায় ও জাগ্রতরা তা বুঝতে পারে। আর যাঁরা উন্নত আধ্যাত্মিক অবস্থায় পৌঁছেছেন তাঁদের আনন্দের বিপুলতা বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। শবে ক্বাদরে যখন যুগের ইমাম ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যস্ত ও আসমান-জমিনে খোদায়ি রহমতের দরজাগুলোও খোলা, যদি তখন আমরাও ইবাদতে আগ্রহী ও মগ্ন হই তাহলে আমরাও সে রাতের বরকত ও রহমত পাব, আর তা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।
ক্বাদরের রাতে কুরআন নাজিল হয়েছিল বলে এ রাতের যেমন বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে তেমনি এটাও বোঝা যায় যে কুরআনই মানুষকে দিতে পারে চূড়ান্ত মুক্তি ও সর্বোচ্চ সৌভাগ্য এবং সব সমস্যার সমাধান। ক্বাদরের রাতে আগামী এক বছরের জন্য মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। ক্বাদরের এ রাতসহ গত এক বছরের কর্মতৎপরতা, ইবাদত ও দোয়ার আলোকে আগামী এক বছরে মানুষ কতটা আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক সম্পদে সমৃদ্ধ বা অসমৃদ্ধ হবে এবং আয়ু কতটা বাড়বে বা কমবে কিংবা কতজন কতটা বিপদ, দুঃখ বা মৃত্যুর শিকার হবে-এর সবই নির্ধারণ করা হয় ক্বাদরের রাতে।
ক্বাদরের রাতের গুরুত্ব বোঝার জন্য এটাই যথেষ্ট যে সাধারণ এক হাজার মাসের রাত ও দিনগুলোর তথা প্রায় ৮৪ বছরের ইবাদত-বন্দেগির চেয়েও কেবল এই বিশেষ রাতের ইবাদত ও সৎকর্ম শ্রেয়। এই বিশেষ সুবিধা কেবল মহানবীর (সা) উম্মতের জন্যই নির্ধারিত।
অশেষ রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রমজানের প্রাণ হলো শবে ক্বাদর। মানুষ যতটা সৌভাগ্য ও বরকত চায় এ রাতে ঠিক ততটাই সৌভাগ্য ও বরকত বরাদ্দ করা হয় এ রাতে। কারণ, এই রাতে যিনি দান করেন তিনি হলেন অফুরন্ত কল্যাণ ও বরকতের মালিক অসীম দয়ালু ও দাতা মহান আল্লাহ। কেউ কম চাইলে তো কেউই তাকে বেশি দেয় না। আল্লাহর কাছে কম চাওয়াটা তাঁর প্রতি অবমাননা! রাসূলে খোদা ( সা ) বলেছেন, যারা শবে ক্বাদরে ঈমান ও আক্বীদা সহকারে পুরস্কারের আশায় নামায পড়বে, আল্লাহ তাদের পেছনের সব পাপ মাফ করেন এবং এ রাতে যারা না ঘুমিয়ে ইবাদত করে পরবর্তী বছর পর্যন্ত তাদের শাস্তি মওকুফ হয়। রমজানের উনিশতম বা একুশতম অথবা তেইশতম কিংবা পঁচিশতম বা সাতাশতম রাতও শবে ক্বাদর হতে পারে। বলা হয় যে ১৯ রমজানের রাতে কিছু বিশেষ ইবাদত নির্ধারিত রয়েছে যা পালন করার পর ২১ রমজানের রাতে তা সত্যায়ন এবং ২৩ রমজানের রাতে তা পরিপূর্ণ করা হয়।
শবে ক্বাদরে ফেরেশতারা ও রুহ্ তথা জিব্রাঈল (আঃ) আল্লাহর আদেশে পৃথিবীতে নেমে সালাম করেন প্রত্যেক মুমিনকে। এ রাতে ফেরেশতারা অবশ্যই যোগ্য মানুষের আত্মায় নামেন। শবেক্বাদর নির্দিষ্ট না করার সম্ভাব্য কারণ হল, প্রতি বছরের শবেক্বাদর সে যুগের ইমামের ওপর নির্ভর করে, হয়তো সেই যুগের ইমাম ১৯ বা ২১ কিংবা ২৩ রমজানের রাতে নিজস্ব ধ্যানের পূর্ণতা ঘটান। আর সে রাতেই নেমে আসে ফেরেশতা। আদর্শ বা পূর্ণ-মানব আল্লাহর সান্নিধ্য পান বলে বিশ্ব ও মানব সমাজে কর্তৃত্ব করেন। তাই পূর্ণ মানবের আত্মাই হল ঐশী তকদিরের স্থান এবং সেখানে এর পরিমাণ নির্ধারিত হয় ও সে অনুপাতে ফেরেশতা নাযিল হয়। তাই তাদের দৃষ্টিতে শবে ক্বাদর মূলত পূর্ণ মানবের বা ওলি-আওলিয়ার রাত।
শবে ক্বাদরে আসমান ও জমিন এবং মানুষ, স্রষ্টা ও ফেরেশতার মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। ফেরেশতারা এ রাতে বর্ষণ করেন আধ্যাত্মিক আলো বা নূর। যার আত্মা যত বেশি প্রশস্ত খোদায়ি নেয়ামত ধারণের জন্য সে তত বেশি নুর পায় এ রাতে এবং এ রাতের মহত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক নেয়ামত উপলব্ধির ক্ষমতাও তাদের ততই বেশি। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: সে রাতে আসমানের তথা খোদায়ি রহমতের দরজাগুলো পৃথিবীর সবার দিকেই খোলা হয়। তবে সে রাতে জমিন ও উর্ধ্বলোকের যোগসাজশ হল যুগের নেতা বা ইমামের অস্তিত্ব, যেমন, বর্তমান যুগের ক্ষেত্রে ইমাম মাহদি (আ)। কারণ, নবী-রাসুলদের পর ইমামেরই রয়েছে বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব। ক্বাদরের রাতে সকাল পর্যন্ত শান্তি, রহমত ও সুসম্ভাষণ নাজিল হয়- এ কথার অর্থ সে রাতে দোয়া ও ইবাদতে মগ্ন সব দাসই পায় আল্লাহর রহমত।###

Share: