সাকিফা থেকে কারবালা এবং তারপর

  • Posted: 10/01/2021

কে. এম. দেলাওয়ার হোসেন

একটি গল্প দিয়ে লেখাটি শুরু করতে চাচ্ছি আর তা হল: লায়লী একবার জানতে পারে যে, মজনু অসুখ হয়ে দুর্বল ও কাহিল হয়ে পড়েছে। এখন তাকে কি করে সুস্থ ও সবল করা যায় লায়লী তা নিয়ে ভাবতে লাগল। সে স্থির করল যে, বিনা পয়সায় দুধ খাওয়ার কেন্দ্র খুলে দিবে যাতে অন্যান্য লোকের সঙ্গে মজনুও যেন দুধ পান করে সুস্থ ও সবল হতে পারে। কথামত লায়লী বিনা পয়সার দুধ কেন্দ্র খুলে দেয়। লোকেরা লাইন ধরে দুধ পান করতে লাগল। লায়লীর সইরা লায়লীকে জিজ্ঞাসা করল: যারা লাইনে দাঁড়িয়ে দুধ পান করছে তারা কি সবাই তোমার মজনু? লায়লী বলল: না। তখন সইরা জিজ্ঞাসা করল: এখানে তোমার মজনু কোন লোকটি? লায়লী বলল: আজকে নয় অন্যদিন দেখাবো। আরেকদিন যখন লোকেরা লাইন ধরে দুধ পান করে যাচ্ছে, সইরা লায়লীকে জিজ্ঞাসা করে- এখানে তোমার মজনু কোন লোকটি? লায়লী সইকে একটি বাটি ও একটি ছুরি দিয়ে বলল-লাইনে দাঁড়িয়ে যারা দুধ পান করছে তাদেরকে গিয়ে বল, লায়লী কিছু রক্ত চেয়েছে, যে লোকটি রক্ত দেবে সে-ই আমার মজনু। সইরা বাটি ও ছুরি নিয়ে লাইনে যারা দাঁড়িয়ে দুধ পান করছিল তাদের মধ্য হতে প্রথমজনকে জিজ্ঞাসা করল: তুমি কি মজনু? সে বলল: হাঁ, আমি মজনু, কি ব্যাপার বলুন? সইরা বলল: লায়লী কিছু রক্ত চেয়েছে। সে বলল: হ্যাঁ, আমি মজনু কিন্তু শুধু বিনা পয়সার দুধ খাওয়ার মজনু, রক্ত দেওয়ার মজনু নই। সইরা দ্বিতীয় জনের কাছে গিয়ে বলল: তুমি কি মজনু? সে বলল: হ্যা, আমি মজনু, কিন্তু বিষয়টা কি? সইরা বলল: লায়লী কিছু রক্ত চেয়েছে। সে বলল: হ্যাঁ, আমি মজনু কিন্তু দুধ খাওয়ার মজনু, রক্ত দেওয়ার মজনু নই। সইরা তৃতীয়জনের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে-তুমি কি মজনু? সে বলে: হ্যাঁ, আমি মজনু, কি ব্যাপার? সই বলল: লায়লী কিছু রক্ত চেয়েছে। সে বলল, হ্যাঁ, আমি মজনু কিন্তু দুধ খাওয়ার মজনু, রক্ত দেওয়ার মজনু নই। এভাবে সবাই একই কথা বলল। লাইনে আর কেউ-ই বাকি থাকল না। তখন সইরা দেখল দূরে একজন লোক একাকী বসে আছে। সইরা ভাবল, দেখি তাকে জিজ্ঞাসা করি। সইরা তার নিকটে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে-তুমি কি মজনু? সে বলল: হ্যাঁ, আমি মজনু, কি ব্যাপার বলুন তো? সইরা বলল: লায়লী কিছু রক্ত চেয়েছে। সেই লোকটি সইদের কাছ থেকে বাটি ও ছুরি চেয়ে নিল এবং বলল, লায়লী কোথাকার রক্ত চেয়েছে? সইরা বলল, আমরা জানিনা কোথাকার রক্ত চেয়েছে। দাঁড়াও, আমরা জিজ্ঞাসা করে আসছি। মজনু বলল, দাঁড়াও, তোমরা গেলে দেরী হয়ে যাবে। আমি শরীরের সব জায়গার রক্ত দিয়ে দিচ্ছি। লায়লীকে বলবে তার যে জায়গার রক্ত প্রয়োজন সেটাকে রেখে বাকিগুলো ফেলে দিতে।

ইসলামেও তেমনি নবীর ইন্তেকালের পর দুধ খাওয়ার মজনুর কোন অভাব ছিল না। রক্ত দেওয়ার ও ত্যাগী লোকের অভাব ছিল। ইসলামে যখন অশনিসংকেত, বিপদের ঘনঘটা এজিদ, মারওয়ান চক্রান্তে আক্রান্ত, মারওয়ান কর্তৃক মদীনায় হত্যার ষড়যন্ত্রকে নৎসাত করে ইমাম হোসেন (আ.) মদীনাকে নিরাপদ ও রক্তপাতহীন রেখে বেরিয়ে এলেন, নানা রাসুলুল্লাহ (সা.), মা ফাতেমা (আ.)-এর জন্মস্থান মক্কা ও বাবা আলী (আ.)-এর জন্মস্থান আল্লাহর ঘর কাবার দিকে ২৮ শে রজব যাত্রা করলেন তখন ঐ ধরণের বিনা পয়সার দুধ খাওয়ার মজনুদের কোন খবর ছিল না।

কে এই মারওয়ান? -মারওয়ান ও তার পিতা হাকামকে নবী (সা.) মদিনা থেকে ১৬ মাইল দূরে বহিষ্কার করে দিয়েছিলেন। নবী (সা.) যতদিন বেঁচে ছিলেন মারওয়ান ও হাকাম মদীনার দিকে চাওয়ার সাহস পায়নি। নবী (সা.) ইন্তেকালের পর খেলাফত শাসন শুরু হয়, বনী উমাইয়ার লোকজন খলিফাকে মারওয়ান ও তার পিতাকে মদীনায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার অনুরোধ জানায়। তৎকালীন খলিফা তাদের ফিরিয়ে না এনে সেখান থেকে আরও ১৬ মাইল দূরে পাঠিয়ে দেন। প্রথম খলিফার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় খলিফা ক্ষমতায় আসেন। তারা দ্বিতীয় খলিফাকেও মারওয়ান ও তার পিতাকে মদীনায় ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করে। তিনিও তাদের ফিরিয়ে না এনে সেখান থেকে আরও ১৬ মাইল দূরে পাঠিয়ে দেন এবং তিনি যতদিন ক্ষমতায় ছিলেন মারওয়ান ও তার পিতা সেখানেই অবস্থান করছিল। দ্বিতীয় খলিফা মারা যাওয়ার পর হযরত উসমান তৃতীয় খলিফার আসন গ্রহণ করেন। তিনি ক্ষমতায় এসেই চাচা হাকামকে ও চাচাতো ভাই মারওয়ানকে মদীনায় ফিরিয়ে এনে মারওয়ানকে মালে গানিমাত হতে দুই লক্ষ দিরহাম দিয়ে নিজের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তার প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করেন।

ইমাম হোসেন (আ.) মক্কা পৌঁছে ইসলামের ও আহলে বায়েতের প্রধান ও চিরশত্রু এজিদ, মারওয়ান চক্রের চক্রান্তের আগামী রূপরেখা কি তা দেখার অপেক্ষায় রইলেন। এমতাবস্থায় হজ¦ সমাগত চারদিক থেকে মুসলমানরা মক্কার দিকে ছুটে আসছেন। তিনি সংবাদ পেলেন যে, শত্রুরা মক্কায় কিছু ঘাতক পাঠিয়েছে যে ইমাম হোসেন (আ.) হজে¦র সময় যখন আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করতে থাকবেন সেই সময় তাকে হত্যা করে। মদিনায় ইমাম হোসেনকে (আ.) হত্যার চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পর মক্কায় ইমাম হোসেনকে (আ.) হত্যার চেষ্টায় মেতে উঠল এজিদ, মারওয়ান চক্র। ইমাম হোসেন (আ.) এই সংবাদ পাওয়ার পর হজ¦ বাদ দিয়ে শুধু ওমরা করে মক্কাকে নিরাপদ ও রক্তপাতহীন রেখে মুসলিম উম্মাহ ও মক্কাবাসীকে এই চিন্তার বার্তা দিয়ে গেলেন যে, ইমাম হোসেন (আ.) জীবনে ২৯ বার পায়ে হেঁটে হজ¦ করেছেন আর তিনি হজে¦র মাত্র দুই দিন বাকি থাকতে কেন মক্কা ছেড়ে চলে গেলেন?

২রা মুহররম ইমাম হোসেন (আ.) কারবালায় পৌঁছেন, সেখানকার বাসিন্দা বনী আসাদের লোকদেরকে ডেকে পাঠান এবং তাদের কাছ থেকে কারবালার জমি কিনে নিতে চাইলেন। বনী আসাদের লোকজন বিনা পয়সায় দিতে চাইলে ইমাম হোসেন (আ.) তা নিতে অস্বীকার করেন। পরে আলোচনার মাধ্যমে ষাট হাজার দিরহামের বিনিময়ে কারবালার জমি কিনে নিলেন। কারবালার সীমানা পূর্ব-পশ্চিম চার মাইল, উত্তর-দক্ষিণ চার মাইল। কারবালার জমি কেনার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে, প্রথমতঃ তিনি নিজের কেনা জমিতে অবস্থান করছিলেন। যদি কেউ এই জমিতে প্রবেশ করে সে অবৈধ ও আগ্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হবে। দ্বিতীয়তঃ ইমাম হোসেন (আ.) চান তিনি ও তার সঙ্গী-সাথীরা নিজের কেনা জমিতে সমাহিত হতে। ভবিষ্যতে যেন কোন কুলাঙ্গার, অপদার্থ, জালিম সরকার দান করা জমির আজুহাতে কবরগুলোকে উচ্ছেদ করে দিতে না পারে। তৃতীয়তঃ তারা শহীদ হওয়ার পর বিশ্ব থেকে হাজার হাজার জিয়ারতকারী (তীর্থযাত্রী) এই কারবালায় আসবে, তাদের কেউ যেন বাধা দিতে না পারে।

৩রা মুহররম থেকে এজিদী সেনারা কারবালায় আসতে আরম্ভ করল। ইমাম হোসেন (আ.) সহজেই বুঝতে পারলেন তাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য কি? প্রথমে মদীনায় আমাকে হত্যার চেষ্টা বিফল হওয়ার পর দ্বিতীয়বার মক্কায় হজের সময় যখন বিফল হল এরপর এখন তারা কারবালাকে বেছে নিয়েছে।

ইমাম হোসেন (আ.) শৈশব থেকে তাদের কার্যকলাপ দেখে আসছিলেন। নবীর (সা.) ইন্তেকালের তিন দিনের পর থেকে নবীর বংশ নিধনের ষড়যন্ত্রের সূচনা। প্রথমে মা ফাতেমার (সা. আ.) ঘরকে আগুন দিয়ে জালিয়ে ভস্মিভুত করার হুমকি, পরে মা ফাতেমার (সা. আ.) উপর ঘরের দরজাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে তাকে গুরুতর আহত করা ও গর্ভের সন্তানকে হত্যা করা, বাবা আলীকে (আ.) গলায় রশি দিয়ে টেনে মসজিদে নববীতে ব্যর্থ বাইয়াত আদায়ের চেষ্টা, মা ফাতেমার (সা. আ.) জমি জালিয়াতি করে বাজেয়াপ্ত করাসহ সকল তান্ডব চলছিল সমান তালে। সাকীফা থেকে ফিরে আসার পর যখন সাকীফাবাসীরা গত হয়ে গেছে তখন সেই আক্রোশ ও ষড়যন্ত্র হাটিহাটি পা পা করে কারবালায় এসে উপস্থিত হয়েছে। আজকে ইমাম হোসেন (আ.) যে ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন তা সাকীফার নির্বাচনের ফসলস্বরূপ।

৭ই মুহাররম হতে নবী বংশের উপরে পানি বন্ধ করে দেওয়া হল। ৯ই মুহাররম কারবালায় এজিদী সেনার সংখ্যা ২০,০০০ (বিশ হাজার)-এ এসে দাঁড়ায়, কোন কোন ইতিহাসে ১,২০,০০০ (একলক্ষ বিশ হাজার) উল্লেখ করা হয়েছে।

৯ই মুহররম ইমাম হোসেন (আ.) নাকিসীন, কাসিতীন ও মুনাফিকিনমুক্ত একটি বীর মুজাহিদ বাহিনী গঠন করলেন। তারা এমনই বীর যোদ্ধা ছিলেন (যেমন সীসা ঢালা প্রাচীর) তাদের নিয়ে ইমাম হোসেন (আ.) গর্ব করে বলতেন, এমন বীর যোদ্ধা না নানা রাসুলুল্লাহ পেয়েছেন, না বাবা আলী পেয়েছেন আর না ভাই ইমাম হাসান পেয়েছেন।
১০ই মুহররম (আশুরার দিন) ফজর নামাজের পর যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। ইসলাম ও সত্যের বীর যোদ্ধারা একে একে রণাঙ্গনে গিয়ে তুমুলভাবে যুদ্ধ করে ইসলাম ও সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে লাগলেন। ছেলে, ভাতিজা, ভাগ্নে, ভাইসহ বিশ্বস্ত সঙ্গী-সাথীদের শাহাদাতের পর নবীর সন্তান একাকী রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে ডাক দিলেন- "হাল মিন নাসিরিন ইয়ান সুরুনা?", আছো কি কেউ আমার ডাকে সাড়া দিবে, সাহায্য করবে, সহযোগিতা করবে? যখন কোন সাড়া পাননি তখন তিনি নিজেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন, যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এমনভাবে অসি চালালেন যে, শত্রুদের যুদ্ধের স্বাদ মিটিয়ে দিলেন। জামাল, সিফফিন, নাহরাওয়ান যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। আসরের সময় রবের পক্ষ থেকে ডাক আসে, “হে প্রশান্ত আত্মা (নফস), আল্লাহ তোমা থেকে রাজী তুমিও আল্লাহ থেকে রাজী, তুমি আমার খাস বান্দাদের সঙ্গে আমার বেহেশতে প্রবেশ কর।” নবীর সন্তান অসিকে যথাস্থানে রাখলেন। ঘোড়ার পিঠে শেষ সিজদা করলেন।

৪ঠা হিজরী ৩রা শাবান, মদীনায় পূর্ব দিগন্তে ইমামতের যে সূর্য উদয় হয়েছিল ৬১ হিজরী ১০ই মুহররম (আশুরার দিন) চেহারায় আসগরের রক্ত মাখিয়ে ইমামতের সেই সূর্য পশ্চিম দিগন্তে অস্ত চলে যায়।

আজও মুহররম মাস আসলে পশ্চিম থেকে পূর্ব, উত্তর থেকে দক্ষিণ চারদিকে ইয়া হোসেন, শাহ হোসেনের ধ্বনি শোনা যায় যা কিয়ামত পর্যন্ত বাকী থাকবে ইনশাল্লাহ।####

Share: