‘উলিল আমর’-এর আয়াতের তাফসীর

  • Posted: 09/08/2021

“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর তাঁর রাসূলের এবং উলিল আমর-এর...”। (সূরা নিসা: ৫৯)

আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যকে অপরিহার্য ঘোষণা করার পাশাপাশি ‘উলিল আমর’ এর আনুগত্যের বিষয়টি উল্লেখের মাধ্যমে এটিকে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের সমপর্যায়ে গণ্য করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ সকল বিষয় ও নির্দেশের অধিকর্তা হিসেবে তাঁর আনুগত্য আবশ্যক। আর তাঁর আনুগত্যের অর্থ হলো পবিত্র কোরআনের বর্ণিত নির্দেশ পালন এবং এর শিক্ষাকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা। যে সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল (সা.) কোরআনের আয়াতের তাফসীর করেছেন এবং বিধানসমূহের খুঁটিনাটি বর্ণনা করেছেন সেগুলোর ক্ষেত্রে রাসূলের (সা.) আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের শামিল।

সুতরাং রাসূলের আনুগত্য বলতে কোরআনের আয়াতের তাফসীর এবং বিধানসমূহের খুঁটিনাটি বর্ণনার বাইরের বিষয় অর্থাৎ রাষ্ট্রের শাসক ও নেতা, জনগণের প্রশিক্ষক ও তাদের মধ্যে বিচার মীমাংসাকারী হিসেবে যে ফয়সালা দেন এবং যে বিষয়গুলোতে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বিধান প্রণয়নের অনুমতি দিয়েছেন তাতে রাসূল (সাঃ)-এর আনুগত্য বুঝানো হয়েছে। [যেমন পবিত্র কোরআনে কেবল আঙ্গুর থেকে প্রস্তুত মদ (শরাব) নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাঁর অনুমতিক্রমে সকল প্রকার নেশাকর দ্রব্যকে হারাম ঘোষণা করেছেন- এখন তা যে কোন উপাদান থেকেই প্রস্তুত হয়ে থাকুক।]

এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, যখন রাসূল (সাঃ) আমাদের মাঝে প্রকাশ্যে নেই তখন তাঁর আনুগত্যের অর্থ তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ। তবে যে সুন্নাতের অনুসরণ করা হবে তা তাঁর সুন্নাত বলে প্রমাণিত হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে তাঁর আনুগত্যের বিষয়টি বুঝাতে স্বতন্ত্রভাবে ‘আতিউল্লাহ’ ক্রিয়া ব্যবহার করেছেন। অতঃপর রাসূল ও উলিল আমর এর আনুগত্য নির্দেশ করতে একবার শুধু ‘আতিয়ু’ ব্যবহার করেছেন (‘উলিল আমর’ এর ক্ষেত্রে তার পুনরাবৃত্তি করেন নি) এবং সম্বন্ধবাচক অব্যয় ‘ওয়া’ (এবং) ব্যবহার করেছেন।


সুতরাং এ থেকে রাসূল (সাঃ) ও ‘উলিল আমর’ এর আনুগত্যের ধরনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই বুঝা যায়। পবিত্র কোরআনে ১২টি স্থানে মহান আল্লাহর পাশাপাশি নবী (সাঃ)-এর আনুগত্যের নির্দেশ এসেছে। তন্মধ্যে ১১ বার সার্বিকভাবে সকল মুমিনের উদ্দেশে এবং একবার তাঁর স্ত্রীদের উদ্দেশে। সবগুলো ক্ষেত্রেই আল্লাহর আনুগত্যের ন্যায় তা নিঃশর্তভাবে এসেছে।

এছাড়াও স্বতন্ত্রভাবে অনেক স্থানে তাঁর আনুগত্যের আবশ্যকতা, তার সুফল ও অবাধ্যতার কুফল বর্ণিত হয়েছে। কোরআনে নবী (সাঃ)-এর আনুগত্যের প্রকৃতি নিয়ে আমরা পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করলে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করি:

১. আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের শামিল। যেমন বর্ণিত হয়েছে :“যে (এই) রাসূলের আনুগত্য করল সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।” (সূরা নিসা: ৮০)

২. নবীদের প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো তাঁদের আনুগত্য করা হবে। কোরআন এ বিষয়ে বলেছে :“আমরা প্রত্যেক রাসূলকে কেবল এই জন্যই প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদের আনুগত্য করা হবে।” (সূরা নিসা: ৬৪)

৩. আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য সব সময় শর্তহীন। কখনই তা অন্যদের আনুগত্যের মতো বিশেষ অবস্থা ও শর্তের অধীন নয়। কোরআনে যেখানেই আল্লাহর রাসূলের আনুগত্যের কথা এসেছে সেখানেই নিঃশর্তভাবে তাঁর আনুগত্য করতে বলা হয়েছে। এমনকি আল্লাহ শুধু বাহ্যিকভাবে তাঁর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করাকে যথেষ্ট গণ্য করেন নি; বরং আন্তরিকভাবেও তাঁর নির্দেশের প্রতি অকুন্ঠ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কেউ তাঁর আনুগত্যের ক্ষেত্রে এরূপ না হলে তার ঈমানের বিষয়কে অস্বীকার করা হয়েছে বলে গণ্য করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন : ‘...তোমার প্রভুর শপথ, তারা ঈমান আনেনি যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমাকে তাদের দ্বন্দ্ব ও বিবাদের জন্য বিচারক সাব্যস্ত করবে; অতঃপর তুমি যা বিচার ফয়সালা করবে সে বিষয়ে তাদের মনে কোন দ্বিধা-সংশয় থাকবে না এবং তারা পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করবে।’ (সূরা নিসা: ৬৫)

অন্যত্র আল্লাহর বিচারের ন্যায় তাঁর বিচারকে চূড়ান্ত ও তাঁর অবাধ্যতাকে স্পষ্ট পথভ্রষ্টতা ঘোষণা করে বলা হয়েছে: ‘কোন মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারীর এ অধিকার নেই যে, যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ে ফায়সালা দান করেন তখন তারা তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে; এবং যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করবে নিঃসন্দেহে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় রয়েছে।’ (আহযাব: ৩৬)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাঁর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য ব্যতীত অন্যদের আনুগত্যকে শর্তাধীন করেছেন। যেমন পিতা-মাতার আনুগত্যের বিষয়ে শিরকের দিকে আহ্বান না করার শর্ত যুক্ত করেছেন। (সূরা আনকাবুত: ৮)

সুতরাং আল্লাহ মুমিনদেরকে তাঁর ও তাঁর রাসূলের নিঃশর্ত আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর এরূপ আনুগত্যকে ঈমানের নিদর্শন বলেছেন এবং কেবল তাঁদের যথার্থ আনুগত্যকারীকেই সফল ও বিজয়ী গণ্য করা হয়েছে। (সূরা নুর: ৫১) তাঁদের আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। (সূরা আনফাল: ২০; সূরা মুহাম্মাদ: ৩৩) তাঁদের আনুগত্যের উত্তম পুরস্কারের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। (সূরা নিসা: ১৩) একে ‘বেহেশতে প্রবেশ’ (সূরা ফাত্হ: ১৬), ‘মহাসাফল্য লাভ’ (সূরা আহযাব: ৭১), ‘আল্লাহর রহমত’ (সূরা নূর: ৫৬) প্রাপ্তি ও ‘আনুগত্যভাজন হওয়ার উপায়’ বলা হয়েছে।

আলোচ্য আয়াতে ‘উলিল আমর’ এর আনুগত্যের বিষয়টি আল্লাহর রাসূলের আনুগত্যের সমপর্যায়ে স্থান পেয়েছে এবং তাঁর আনুগত্যের ন্যায় শর্তহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, রাসূলের আনুগত্যের সুফল ও তাঁর আনুগত্যের বিরোধিতার কুফল ‘উলিল আমর’ এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ উলিল আমরের আনুগত্যও আল্লাহর আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত, উলিল আমরের আনুগত্য করা হলে নবুওয়াতের মিশন বাস্তবায়িত হবে। মুমিনদের কর্তব্য হলো এ আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয়া যাতে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের কল্যাণ ও প্রভাব তারা লাভ করতে পারে। নিঃসন্দেহে এ ধরনের আনুগত্যের সঙ্গে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের কোন পার্থক্য নেই। যেহেতু আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য নির্ভুল ও নিষ্পাপ সত্তার আনুগত্য সেহেতু ‘উলিল আমর’ এর আনুগত্য সেই পর্যায়ে হতে হলে তাঁদেরকে নির্ভুল ও নিষ্পাপ হতে হবে।

যদি ‘উলিল আমর’ মাসুম (নিষ্পাপ) না হন তবে তাঁদের আনুগত্য নিঃশর্ত হতে পারে না এবং আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের অনুরূপ কল্যাণ তাঁর থেকে অর্জন করা যাবে না। আর বিশেষ ব্যক্তিরা ছাড়া কেউ এর শামিল হবে না। এ কারণেই উলিল আমর এর আনুগত্য আল্লাহর রাসূলের জীবদ্দশায় তাঁর আনুগত্যের ন্যায়। আর যখন রাসূল থাকবেন না তখন যেমন তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ অপরিহার্য তেমনি যখন মাসুম উলিল আমর আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে থাকবেন না (মৃত্যুবরণ করবেন অথবা অন্তর্ধানে থাকবেন) তখন তাঁদের হাদীস ও সুন্নাতের অনুসরণ আবশ্যক একই বিষয়। কিন্তু যখন রাসূল অথবা মাসুম উলিল আমর কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেবেন বা কোন পদে অধিষ্ঠিত করবেন তখন সেই ব্যক্তির অনুসরণ বড় ভুল না করা ও বিচ্যুত না হওয়ার শর্তাধীন। মাসুম উলিল আমর সরাসরি বা প্রত্যক্ষভাবে কাউকে নিয়োগ দিলে [যেমনটি হযরত আলী (আঃ) হযরত মালিক আশতারকে নিয়োগ দিয়েছিলেন] অথবা সার্বিকভাবে এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তির (যথার্থ যোগ্যতার অধিকারী ফকিহগণ) আনুগত্যের নির্দেশ দিলে তাঁদের আনুগত্য করাও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেননা, তাকওয়ার অধিকারী হওয়ার শর্তে তাঁদের আনুগত্য মাসুম উলিল আমর এর আনুগত্যের শামিল। তবে তাঁরা ভুল-ত্রুটির সম্মুখীন হওয়ার কারণে অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত। ফলে যখনই তাঁরা ইসলামের বিধানের পরিপন্থি কোন আচরণ করবেন অথবা নির্দেশ দেবেন তখনই পদচ্যুত হবেন। তাই কখনই তাঁরা উক্ত আয়াতের নিঃশর্ত আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত নন।

আহলে বাইতের চিন্তাধারায় উলিল আমর এর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের বিষয়টি তাঁদের ধর্মীয় নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাঁরা ধর্ম শিক্ষা এবং কোরআন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যেমন নির্ভুল তেমনি রাজনৈতিক ও বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও নির্ভুল। কেননা, তাঁরা ঐশী দিকনির্দেশনার (কোরআন ও প্রকৃত সুন্নাহর) শতভাগ অনুসারী। তাই তাঁদের আনুগত্য শর্তহীন। যদি আলোচ্য আয়াতে বর্ণিত উলিল আমর ভুলবশতঃ এমন কথা বলতেন যা আল্লাহর হালাল করা বস্তুকে হারাম অথবা তাঁর কোন হারামকে হালাল করে তবে সেক্ষেত্রে মুমিনরা (মুসলমান সমাজ) আল্লাহর আনুগত্যের বিষয়ে শিরক ও অংশীবাদে পতিত হলো। তাঁরা যেহেতু কখনও এরূপ ভুল করতে পারেন না সে কারণেই পবিত্র কোরআনে তাঁদের আনুগত্যকে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের মতো নিঃশর্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

আয়াতের বহির্ভূত দলিল:

আহলে বাইতের অনুসারীদের দৃষ্টিতে ‘উলিল আমর’ কারা তা চিহ্নিত করার দ্বিতীয় পথ হলো মাসুম ইমামদের বর্ণিত হাদীস। তারা বিশ্বাস করে, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ওহির ব্যাখ্যাদানকারী ও শিক্ষক হিসেবে আলোচ্য আয়াতে যাঁদের আনুগত্যকে অপরিহার্য করা হয়েছে তাঁদেরকে উম্মতের নিকট পরিচিত করিয়েছেন। কারণ, আয়াতে ‘উলিল আমর’ কারা তা উল্লেখ করা হয়নি, কেবল তাঁদের কথাই বলা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দেয়, আল্লাহ ও তাঁর নবী (সাঃ) কি উলিল আমর কারা তা চিহ্নিত না করেই ও তাঁদের দায়িত্বের পরিধি ও বাস্তবায়নের সীমা উম্মতকে বলে না দিয়েই তাঁদেরকে আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন?

মহানবী (সাঃ) কি স্পষ্ট করেন নি যে, এই উলিল আমর এর কর্তৃত্ব বিশেষ এক ভূখন্ড, জনগোষ্টী ও জাতির জন্য সীমাবদ্ধ নাকি আয়াতে যে মুমিনদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে তা কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুমিনকে অন্তর্ভুক্ত করে?

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বাণী অনুযায়ী কি প্রত্যেক ভূখন্ডের জন্য স্বতন্ত্র আনুগত্যের অধিকারী ব্যক্তি রয়েছে যাদের সমষ্টিকে ‘উলিল আমর’ বলে অভিহিত করা হয়েছে?

এখানে কি এ প্রশ্ন থেকে যায় না যে, সাহাবীরা কি এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীরব ছিলেন, নাকি তাঁরা প্রশ্ন করেছেন, কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী চক্র এ বিষয়ে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর উত্তরকে গোপন করেছে। এটা কি করে সম্ভব, যে ব্যক্তিরা নতুন চাঁদ (সূরা বাকারা: ১৮৯), গণিমতের মাল (সূরা বাকারা: ২১৫), দানের বস্তু (সূরা আনফাল: ১), এমনকি নারীদের ঋতু স্রাবের (সূরা বাকারা: ২২২) মতো বিষয়ে নবীর কাছে প্রশ্ন করেছেন, অথচ এরূপ (উম্মতের) ভাগ্যনির্ধারক বিষয়ে কোন প্রশ্ন করেন নি?

তবে আজ মুসলিম উম্মাহর শতধাবিভক্ত হওয়া এবং ধর্মের বিষয়ে পরস্পর বিরোধী লক্ষ মতের উৎপত্তির পেছনে একক নির্ভুল ব্যাখ্যাকারী কর্তৃপক্ষ ও সঠিক দিকনির্দেশক নেতার অনুপস্থিতিই কি প্রধান কারণ নয়?

নিঃসন্দেহে বলা যায়, আল্লাহ তাঁর বিধানকে পূর্ণরূপে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর রাসূল পবিত্র কোরআনের কোন আয়াতকেই ব্যাখ্যাহীন অবস্থায় ছেড়ে যান নি। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে যে সঠিক বিধান বর্ণনা করেছেন তার খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা প্রদানের দায়িত্ব তাঁর নবীর ওপর অর্পণ করেছেন।

উলিল আমর এর বিষয়টি এমনই একটি বিষয় যা নবী (সাঃ) তাঁর বাণীতে ব্যাখ্যা করেছেন।
এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে ইমাম বাকির (আঃ) বলেছেন: মহামহিম আল্লাহ তাঁর রাসূলকে (সাঃ) আলী (আঃ)-এর বেলায়াত (নেতৃত্ব ও অভিভাবকত্ব) এর ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দিয়ে অবতীর্ণ করেন: ‘নিশ্চয় তোমাদের অভিভাবক হলেন আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং যারা ঈমান এনেছে, নামায কায়েম করে ও রুকু অবস্থায় যাকাত দেয়।’

তিনি উলিল আমর এর বেলায়াতকে ফরজ করেছেন, কিন্তু তা কী (তাঁরা কারা) কোরআনে বলেন নি; বরং আল্লাহ মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে নির্দেশ দিয়েছেন তাদের (মুমিন) জন্য বেলায়াতকে ব্যাখ্যা করার যেমনভাবে তিনি তাদের কাছে নামায, যাকাত, রোযা, হজ্জ ইত্যাদির খুঁটিনাটি ব্যাখ্যা করেছেন। (হামাভী, ফারায়িদুস সিমতাইন, ১ম খন্ড, পৃ. ৩১৩, হা. ২৫০, বাব ৫৮; ইবনে উকদা, কিতাবুল বিলায়াহ, পৃ. ১৯৮, হাদীস ৩১)

উলিল আমর কারা তাঁদের বিবরণ আহলে বাইতের নিকট থেকে বহুল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এ বর্ণনাগুলোর কয়েকটি সহীহ সনদযুক্ত। এ বর্ণনাগুলোর টেক্সট (মূল ভাষ্য) ও ভাবার্থ বুদ্ধিবৃত্তির সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। কারণ, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন সত্তা যার নির্ভুলতার কোন নিশ্চয়তা ও প্রমাণ নেই, তিনি তাদেরকে নিঃশর্ত আনুগত্যের নির্দেশ দিতে পারেন না।

এ বিষয়টি আলোচ্য আয়াতের বাহ্য অর্থ দ্বারাও প্রমাণিত হয়। (এ থেকে উলিল আমর এর নির্ভুলতা ও তাঁদের আনুগত্যের বৈধতাও প্রমাণিত হয়।)
পবিত্র কোরআনের অন্যান্য আয়াতের অর্থ দ্বারাও এ বিষয়টি সমর্থিত হয় যে, আল্লাহ নিষ্পাপ ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তির নিঃশর্ত আনুগত্যের নির্দেশ দিতে পারেন না। আমরা এখানে এ সম্পর্কিত কিছু আয়াতের উল্লেখ করছি:

ক . ‘এমন ব্যক্তির আনুগত্য কর না যার মনকে আমি আমার স্মরণ থেকে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কাজ হলো বাড়াবাড়ি ও সীমা লঙ্ঘন করা।’ (সূরা কাহ্ফ: ২৮)

এ আয়াতটিতে আল্লাহ যে বিষয়গুলো একজন মানুষকে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত করে তা উল্লেখ করেছেন এজন্য যে, মুমিনরা যেন এমন বৈশিষ্ট্যের কোন ব্যক্তির আনুগত্য না করে। কোন মানুষের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটিও যদি থাকে তবে তার অনুসরণ অবৈধ বলে গণ্য হবে।

খ . ‘আমরাই তোমার ওপর কোরআন অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং তোমার প্রতিপালকের নির্দেশের ব্যাপারে ধৈর্যশীল হও (তার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক) এবং তাদের মধ্য থেকে কোন পাপী অথবা অতিশয় অকৃতজ্ঞ ব্যক্তির (কাফের) আনুগত্য কর না।’ (সূরা দাহর: ২৩ ও ২৪)

এ আয়াতটিতেও আল্লাহ আনুগত্যের বিষয়টিকে পবিত্র কোরআনের বিধানের ওপর অটল থাকা এবং অকৃতজ্ঞ ও পাপী না হওয়ার শর্তাধীন করেছেন। কোরআনের বিধানের ওপর অটল থাকার পূর্বশর্ত হলো এর সকল ও খুঁটিনাটি বিধানের ওপর পূর্ণ জ্ঞান থাকা ও এ বিষয়ে নির্ভুল হওয়া এবং পাপী না হওয়ার জন্য আবশ্যক শর্ত হলো শয়তান ও প্রবৃত্তির তাড়নায় প্ররোচিত না হওয়া। সুতরাং যে ব্যক্তি পাপী অথবা কাফের ছিল আল্লাহ তার আনুগত্যকে স্বীয় আনুগত্যের সমপর্যায়ে স্থান দিতে পারেন না।

‘উলিল আমর’ কেবল বিশেষ ব্যক্তিগণ

আহলে বাইতের রেওয়ায়াতে ‘উলিল আমর’ বলতে কেবল মাসুম ইমামদের বোঝানো হয়েছে।
‘আল-কাফি’ এবং ‘তাফসীরে আয়াশী’তে উলিল আমরের ব্যাখ্যায় হযরত বাকির (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে: ‘এর দ্বারা নির্দিষ্টভাবে আমাদের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক মুমিনের জন্য আমাদের আনুগত্যকে অপরিহার্য করা হয়েছে।’ (কুলাইনী, আল-কাফী, ১ম খণ্ড, পৃ.২৭৬, হা. ১; তাফসীরে আয়াশী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪০৪, হা. ১৫৪ ও ১৬৯) উলিল আমর এর এ অর্থটি ছাড়া অন্য কোন অর্থ আহলে বাইতের নিকট থেকে বর্ণিত হয়নি। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ও পবিত্র ইমামদের অসংখ্য রেওয়ায়াতে কখনো উলিল আমর এর নাম, আবার কখনো তাঁদের বৈশিষ্ট্য সার্বিকভাবে উল্লিখিত হয়েছে যার সবগুলোই বিশেষভাবে আহলে বাইতের মাসুম ইমামদের ওপর আরোপিত হয়েছে।

শেখ সাদুক স্বীয় সনদে সাহাবী জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী থেকে বর্ণনা করেছেন: “যখন‘ইয়া আইয়্যুহাল লাজিনা আ’মানু আতিউল্লাহা ওয়া আতিউর রাসূল ওয়া উলিল আমরি মিনকুম...’- আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন আমি রাসূল (সাঃ)-কে বললাম: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে চিনি। কিন্তু উলিল আমর কারা যাঁদের আনুগত্যকে আল্লাহ তাঁর আনুগত্যের সাথে সংযুক্ত করেছেন।’ রাসূল (সাঃ) বললেন: ‘হে জাবির! তারা আমার খলিফা ও স্থলাভিষিক্ত যারা আমার পর মুসলমানদের ইমাম ও নেতা হবে। যাদের প্রথম হলো আলী ইবনে আবি তালিব, অতঃপর হাসান, অতঃপর হুসাইন, অতঃপর আলী ইবনে হুসাইন, অতঃপর মুহাম্মাদ ইবনে আলী যে তওরাতে ‘বাকির’ নামে প্রসিদ্ধ, যার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে এবং তুমি তাকে আমার সালাম পৌঁছে দেবে। অতঃপর জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আস সাদিক, অতঃপর মূসা ইবনে জাফর, অতঃপর আলী ইবনে মূসা, অতঃপর মুহাম্মাদ ইবনে আলী, অতঃপর আলী ইবনে মুহাম্মাদ, অতঃপর হাসান ইবনে আলী, অতঃপর মুহাম্মাদ যার কুনিয়া আমার নামে (আবুল কাসেম), যে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর প্রামাণ্য দলিল হবে। সে হলো আল্লাহর বান্দা হাসান ইবনে আলী ইবনে মুহাম্মাদের সন্তান, ‘মাহদী’ বা ‘বাকিয়াতুল্লাহ’ নামে প্রসিদ্ধ, যার মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিমে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে।” (কামালুদ্দীন, শেখ সাদুক, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫৩, হা. ৩; তূসি, ইলামুল ওয়ারা, পৃ. ৩৭৫)

অপর এক হাদীসে ইমাম বাকির (আঃ) ‘উলির আমর’ এর আয়াতটির তাফসীরে উলিল আমর যে কেবল আহলে বাইতের ইমামগণ তার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: ‘তাঁরা হলেন ঐ নিষ্পাপ ও পবিত্র ব্যক্তিগণ যাঁরা গুনাহ করেন না ও পাপ থেকে মুক্ত..., যাঁরা কখনও কোরআন থেকে বিচ্ছিন্ন হন নি ও কোরআনও তাঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয় নি।’ (সাদুক, ইলালুশ শারায়ে, ১ম খণ্ড, বাব ১০৩, পৃ. ১২৩-১২৪, হা. ১)

আহলে বাইতের ইমামগণ থেকে বর্ণিত বিভিন্ন দোয়ায়ও ‘উলির আমর’ কারা তা চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন প্রসিদ্ধ দোয়ায়ে ফারাজে বলা হয়েছে: “হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ও তাঁর আলের (বংশের মনোনীত ব্যক্তিদের) ওপর দরুদ প্রেরণ কর, সেই উলিল আমর যাদের আনুগত্যকে আপনি আমাদের ওপর ফরজ করেছেন এবং এর মাধ্যমে তাঁদের মহান মর্যাদার সাথে আমাদের পরিচিত করিয়েছেন।’

এ দোয়ায় ‘উলিল আমর’ যে কেবল নবীর আহলে বাইত থেকে এবং এ মর্যাদা যে বিশেষ একটি বিষয় ও সাধারণ্যের এমনকি ফকিহ আলেমদের জন্যও তা কল্পনীয় নয় তা বোঝা যায়। এ কারণেই ইমাম হাদী (আঃ) থেকে বর্ণিত ‘যিয়ারতে জামেআ কাবিরা’য় সূরা নিসার উলিল আমরের আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: ‘মহান আল্লাহ (পবিত্র কোরআনে) আপনাদের আনুগত্যকে তাঁর আনুগত্যের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন (ও তাঁর আনুগত্যের পাশে স্থান দিয়েছেন)। ...আর তাই যারা আপনাদের অনুগত্য করল তারা আল্লাহরই আনুগত্য করল, আর যারা আপনাদের অবাধ্যতা করল তারা আল্লাহরই অবাধ্যতা করল।’

সুতরাং কোনভাবেই এ মহান ও বিশেষ পদটিকে সাধারণ গণ্য করে অন্যদের ওপর তা আরোপের অবকাশ নেই।
শাফেয়ী মাযহাবের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস জুয়াইনী [জুয়াইনী হাফিজ শামসুদ্দীন যাহাবীর হাদীস শিক্ষক। যাহাবী তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: জুয়াইনী হাদীসের জ্ঞানে অতুলনীয় ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিলেন। ইসলামের গর্ব সাদরুদ্দীন জুয়াইনী রেওয়ায়েতের প্রতি তীক্ষè দৃষ্টি রাখতেন। দ্রষ্টব্য: তাযরিকাতুল হুফ্ফাজ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৫০৫, মাবহাস ‘শুউখুস সাহিবুত তাযকিরা’, সংখ্যা (রাকাম) ২৪] স্বীয় সনদে খলিফা উসমানের সময়ে হযরত আলী (আঃ) কিছুসংখ্যক সাহাবীর সামনে নিজের অধিকার প্রমাণে যে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন তা একটি দীর্ঘ বর্ণনায় এনেছেন, তাতে উল্লেখ করেছেন: “আমি আপনাদের আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আপনারা কি এ বিষয়টি জানেন না: যখন ‘হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, আর আনুগত্য কর রাসূলের ও উলিল আমরের’ (সূরা নিসা: ৫৯) এবং ‘তোমাদের অভিভাবক কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং যারা ঈমান এনেছে, নামায কায়েম করে এবং রুকু অবস্থায় যাকাত দেয়।’ (সূরা মায়েদা: ৫৫) এবং ‘তোমরা কি মনে কর যে, তোমাদেরকে এমনি ছেড়ে দেয়া হবে যতক্ষণ না আল্লাহ প্রকাশ করেন তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ করেছে এবং কারা আল্লাহ, রাসূল ও মুমিনদের ব্যতীত অন্য কাউকে বিশ্বস্তজন (ও গোপন বিষয়ে আমানতদার) হিসেবে গ্রহণ করেনি?’ (সূরা তওবা: ১৬) আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় তখন লোকেরা আল্লাহর রাসূলকে প্রশ্ন করেছিল: হে আল্লাহর নবী! ‘উলিল আমর’, ‘রুকু অবস্থায় যাকাত দানকারী’ এবং ‘মুমিনদের মধ্যে যাকে ব্যতীত বিশ্বস্তজন গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে তারা কারা?’

তখন আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিলেন উলিল আমর ও উক্ত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তিদের পরিচয় করিয়ে দিতে। তাই আল্লাহর রাসূল ঠিক যেমনভাবে নামায, যাকাত ও হজ্জকে (বিধিবিধান) ব্যাখ্যা করেছেন, তেমনিভাবেই তিনি উলিল আমরের বিষয়টি বেলায়াতের (কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব) আয়াতের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর রাসূল আমাকে গাদীরে খুমে সকলের সামনে মনোনীত করেন (যাতে মানুষের কাছে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, আমিই এ আয়াতগুলোর দৃষ্টান্ত) এবং বলেন: ‘তোমরা কি অবগত নও যে, আল্লাহ আমার অভিভাবক এবং আমি মুমিনদের অভিভাবক? আর “আমি (নবী হিসেবে) মুমিনদের নিজেদের থেকে তাদের ওপর বেশি অধিকার রাখি? (তাঁরা বলেন: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!), তখন তিনি (রাসূল) আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন: ‘হে আলী, ওঠ।’ আমি উঠে দাঁড়ালে তিনি বললেন: ‘আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা...।’ [হামাভী, ফারায়িদুস সিমতাইন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩১৩, অধ্যায় ৫৮, হা. ২৫০; হামাভী এ হাদিসটি আবান ইবনে আবি আয়াশ সূত্রে সুলাইম ইবনে কাইস থেকে বর্ণনা করেছেন। আবান ইবনে আবি আয়াশ থেকে আবু দাউদ তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থে কিছুসংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁকে কেউ কেউ দুর্বল রাবি বললেও অনেকেই তাঁকে বিশ্বস্ত বলেছেন। (দ্রষ্টব্য : তাহযিবুল কামাল, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৯-২৪, নং ১৪২)]

হাকিম হাসকানী বিশিষ্ট তাবেয়ী মুজাহিদ ইবনে জাফর থেকে আলোচ্য আয়াতের শানে নুযূলের আলোচনায় বলেন : ‘আতিউর রাসূল ওয়া উলিল আমর’ আয়াতটি আমীরুল মুমিনীন আলীর শানে অবতীর্ণ হয়েছে যখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাবুকের যুদ্ধে যাওয়ার সময় তাঁকে মদীনায় প্রতিনিধি হিসেবে রেখে যান। আলী তাঁকে বলেন: (হে আল্লাহর রাসূল!) ‘আপনি কি আমাকে নারী ও শিশুদের ওপর আমাকে প্রতিনিধি রেখে যাচ্ছেন?’

রাসূল (সাঃ) বললেন: ‘তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, আমার নিকট তোমার অবস্থান মূসার নিকট হারুনের অবস্থানের ন্যায়...।’ [হাসকানী, শাওয়াহেদুত তানযিল, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯২, হাদীস ২০৫; কাজী নুরুল্লাহ শুসতারী (তুসতারী) ও তাঁর ‘ইহকাকুল হাক’ গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে আয়াতটি সম্পর্কে অনুরূপ শানে নুযূল বর্ণনা করেছেন; ইহকাকুল হাক, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪২৫ (আবু বাকর ইবনে মুমিন শিরাজীর ‘রিসালাতুল ইতিকাদ’ প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত। ইবনে শাহরে অশুবও ‘তাফসীরে মুজাহিদ’ থেকে উল্লিখিত শানে নুযূলটি বর্ণনা করেছেন। (দ্রষ্টব্য : ইবনে শাহরে অশুব, আল-মানাকিব, ২য় খণ্ড, পৃ. ২১৯।)]

(মানযিলাতের হাদিস) যদিও এই শানে নুযূলটি একজন তাবেয়ী (মুজাহিদ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু এ বর্ণনাটি সত্য হওয়ার সপক্ষে অনেকগুলো সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে:
১. এই শানে নুযূলটি আয়াতে বর্ণিত নিঃশর্ত আনুগত্যের নির্দেশের সাথে সামঞ্জস্যশীল। কেননা, হযরত মূসা (আঃ) ও হারুন (আঃ) উভয়েই আল্লাহর নবী হিসেবে নিষ্পাপ ও নির্ভুল ছিলেন যাঁরা কখনই সত্যের পরিপন্থী নির্দেশ দিতে পারেন না। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) হযরত আলীকে হযরত হারুন (আঃ)-এর সঙ্গে তুলনা করার মাধ্যমে আলীর নির্ভুলতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অর্থাৎ আলীর আনুগত্য আল্লাহর রাসূলের আনুগত্যের ন্যায় নিরঙ্কুশ ও নিঃশর্ত এজন্য যে, তিনিও তাঁর মতো নিষ্পাপ।

২. এই শানে নুযূলটি মুহাদ্দিস জুয়াইনী বর্ণিত হাদীসের সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল।

৩. মহানবী (সাঃ)-এর আহলে বাইতের নিকট থেকে বর্ণিত অসংখ্য হাদীস এ মতটিকে সমর্থন করে।

৪. এই শানে নুযূলটি মদীনায় হযরত আলীর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটের সাথে সংগতিশীল। কারণ, তাবুকের যুদ্ধের প্রাক্কালে যখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাঁকে মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করেন তখন মুনাফিকরা এ অপপ্রচার চালায় যে, মহানবী (সাঃ) হযরত আলীর ওপর অসন্তুষ্ট হওয়ায় এ যুদ্ধে তাঁকে নিজের সঙ্গে নেননি। (ইবনে আবি আছিম, কিতাবুস সুন্নাহ, পৃ. ৫৮৭, হা. ১৩৪২ ও ১৩৪৩; মুসনাদে আবু ইয়ালা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৬, হা. ৭৩৮ (মুসনাদের গবেষক গ্রন্থের পাদটীকায় হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; নাসায়ী, আল-খাসায়িস, পৃ. ৭৬, হাদীস ৪৪)

আর এভাবে তারা চেয়েছিল তাঁকেও মদীনা থেকে রাসূলের (সাঃ) সহগামী হতে বাধ্য করতে যাতে তারা মদীনায় অবস্থান করে ষড়যন্ত্র করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটেই উলিল আমরের আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং এতে নিঃশর্তভাবে আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয়। এর ফলে মুনাফিকদের পক্ষে হযরত আলীর অবাধ্য হওয়ার আর কোন অজুহাত থাকেনি।

৫. আলোচ্য আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে আহলে সুন্নাতের সূত্রে বর্ণিত পরস্পর বিপরীত বর্ণনাগুলোর মধ্যে কেবল উল্লিখিত শানে নুযূলটি আয়াতের বাহ্যিক অর্থের সাথে সামঞ্জস্যশীল। কেননা, স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আয়াতটির দৃষ্টান্ত হিসেবে আলীর নাম উল্লেখ করেছেন এবং আলীর নির্দেশাবলি শতভাগ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের অনুবর্তী হওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ‘মানযিলাত’র হাদীস ছাড়াও অন্যান্য হাদীসে এর সপক্ষে দলিল রয়েছে।

যেমন যখন রাসূল (সাঃ) হযরত আলীকে ইয়েমেনে প্রেরণ করেন তখন কেউ কেউ তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে মহানবী (সাঃ)-এর নিকট তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তিনি (সাঃ) ক্রোধান্বিত হয়ে বলেন: ‘তোমরা আলীর থেকে কি চাও? নিশ্চয় আলী আমার থেকে এবং আমি আলীর থেকে। সে আমার পর সকল মুমিনের নেতা ও অভিভাবক।’ (সুনানে তিরমিযি, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৬৩৩, হা. ৩৭১২; ইবনে আবি আছিম, কিতাবুস সুন্নাহ, পৃ. ৫৫০, হা. ১১৮৭ (গবেষক মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী এ হাদীসটি সম্পর্কে বলেছেন: এ হাদীসটির সনদ সহীহ। হাকিম নিশাবুরী ও হাফিজ যাহাবী এর সহীহ হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে একমত)। নাসয়ী, খাসায়ীস, পৃ. ৮৮-৮৯ এবং ১২৯-১৩১। এ হাদীসটি আহলে সুন্নাতের গ্রন্থসমূহে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। খাসায়িস গ্রন্থের গবেষক কয়েকটি গ্রন্থসূত্রে হাদীসটি উক্ত স্থানে উল্লেখ করেছেন)

এ হাদীসে মহানবী (সাঃ) হযরত আলীকে নিজের সাথে তুলনা করে তাঁর পরে মুমিনদের ওপর তাঁকে নিজের স্থলাভিষিক্ত নেতা হিসেবে অভিহিত করেছেন যা হযরত আলীর কর্ম ও আচরণ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে ও শরীয়তের সম্পূর্ণ অনুবর্তী হওয়ার বিষয়টিকে প্রমাণ করে।

৬. এই শানে নুযূলটি হাদীসে সাকালাইনের [হাদীসে সাকালাইনের টেক্সট হলো: মহানবী (সাঃ) বলেছেন: ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের মাঝে দু’টি ভারী ও মূল্যবান বস্তু রেখে যাচ্ছি যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনও বিচ্যুত হবে না: আল্লাহর কিতাব এবং আমার বংশধর আহলে বাইত। এ দু’টি আমার সাথে (কিয়ামতে) হাউজে মিলিত হওয়া পর্যন্ত পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না।’ সুনানে তিরমিযি, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৬২২, হা. ৩৭৮৬ এবং পৃ.৬৬৩, হা. ৩৭৮৮; মুসতাদরাকে হাকিম নিশাবুরী, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১০৯ ও ১১০; ইবনে আবি আছিম, কিতাবুস সুন্নাহ, পৃ. ৬২৯, হা. ১৫৫৩ এবং পৃ. ৬৩০, হাদীস ১৫৫৮; মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বাল, ১৭তম খণ্ড, পৃ. ১৬১, হা. ১১১০৪; তাবরানী, আল মোজামুল কাবীর, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৬৫-৬৬, হা, ২৬৭৮, ২৬৮০, ২৬৮১ এবং ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৬৬, হা. ৪৯৭১; ইবনে হামিদ, মুসনাদ, পৃ. ১০৭-১০৮, হা. ২৪০ ও অন্যান্য সূত্র দ্রষ্টব্য] বিষয়বস্তুর অনুরূপ। কারণ, হাদীসে সাকালাইনেও নিঃশর্তভাবে কোরআন ও আহলে বাইতকে আঁকড়ে ধরতে বলা হয়েছে এবং এই দুই ভারী ও মূল্যবান বস্তু বিচ্যুতি থেকে মুক্তির নিশ্চয়তাদানকারী হিসেবে উত্থাপিত হয়েছে।

উল্লিখিত আয়াতে ‘আনুগত্যের অধিকারী’ ও আনুগত্যকারী’ এই দুই দল ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা এসেছে। প্রথম দল হলো যারা আনুগত্য করার নির্দেশপ্রাপ্ত এবং দ্বিতীয় দল যারা আনুগত্য লাভ করবে বা যাদের আনুগত্য অপরিহার্য করা হয়েছে। শরীয়তের পরিভাষায় ‘আনুগত্যের অধিকারী’ ‘مطاع’ ও ‘আনুগত্যকারী’ ‘مطيع’।

আয়াতে আল্লাহ, রাসূল ও উলিল আমর হলেন আনুগত্যের অধিকারী আর ‘হে ঈমানদার’ সম্বোধনে যাদেরকে আল্লাহ, রাসূল ও উলিল আমরের আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তারা হলো আনুগত্যের নির্দেশপ্রাপ্ত।

এ দৃষ্টিতে এ দু’দল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্বোধিতরা হলো রাসূলের আবির্ভাব থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুমিন। তাই কখনই উলিল আমরকে মুমিনদের সাথে মিশ্রিত করা যায় না।

আয়াতে যে বলা হয়েছে: ‘তোমাদের মধ্য থেকে উলিল আমর’, অংশটির অর্থ সূরা জুমুআর ‘তোমাদের মধ্য থেকে একজন উম্মী রাসূল’ এর ন্যায় অর্থাৎ উলিল আমর এ উম্মতের মধ্য থেকেই যেমনভাবে রাসূল (সাঃ) এ উম্মতের মধ্য থেকে মনোনীত হয়েছেন। সুতরাং উলিল আমরকে রাসূলের মতোই আনুগত্য করতে হবে। কখনই রাসূল ও উলিল আমর, এ আয়াতের (হে ঈমানদার) সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত নন; বরং মহান আল্লাহর পাশাপাশি তাঁরা ‘আনুগত্যের অধিকারী’দের স্থান লাভ করেছেন। পবিত্র কোরআনের কোথাও ভুল-ত্রুটির শিকার হতে পারে এমন কোন ব্যক্তিকে নিঃশর্ত ‘আনুগত্যের অধিকারী’দের কাতারে স্থান দেয়া হয়নি।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে সঠিক উলিল আমর-এর আনুগত্য করার তৌফিক দান করুন।###

Share: