অসুস্থ রোগী ও ইসলামী চিন্তাধারা

  • Posted: 02/01/2021

ইসলাম যেমন স্বাস্থ্য সুরক্ষার নীতিমালার ওপর জোর দেয় তেমনি রোগীদের ব্যাপারেও মানবিক ও দয়ার্দ্র দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। ইসলাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ বলে ঘোষণা করেছে। যারা নিয়মিত নামাজ পড়েন তাদেরকে অজু-গোসল করতে হয় বলে সংক্রামক রোগ-ব্যাধি তাদের হয় না বা কম হয়ে থাকে। সম্ভবতঃ এ কারণেই মুসলিম দেশগুলোতে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখনও অমুসলিম বা পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। সংক্রামক রোগ দেখা দিলে রোগীদের শহর ও ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ বা কোয়ারেন্টাইনে থাকার বিধান মহানবীর (সা.) হাদিসে রয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে রোগীদের ব্যাপারে দয়ার্দ্র দৃষ্টি দিয়েছেন। পবিত্র রমজান মাসের একটি বহুল প্রচলিত দোয়ায় কেবল মুসলমান রোগী নয় বরং সব রোগীদের আরোগ্য কামনা করা হয়েছে। এ ছাড়াও হাদিসে দুর্ঘটনায় বা কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের শহীদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম রোগীদের ক্ষেত্রে ইসলামী অনেক দায়িত্ব পালনে ছাড় দিয়েছে। যেমন: ফরজ রোজার বিধানের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, কেউ সফরে থাকলে বা অসুস্থ থাকলে সে যেন অন্য কোনো সময় তথা স্বাভাবিক অবস্থায় ওই রোজা রাখে। গোসল বা ওযুর কারণে অসুস্থতার আশঙ্কা থাকলে বা সফরে থাকলে (পানি পাওয়া না গেলে) পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করার বিধান দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম ধর্ম অক্ষম বা শক্তিহীন, দরিদ্র ও অসুস্থদেরকে হজব্রত পালন ও জিহাদের দায়িত্ব পালন থেকেও অব্যাহতি দিয়েছে।

রোগীদের সঙ্গে আচরণের ব্যাপারে ইসলামী প্রথা বা সুন্নাত ও উপদেশ: মহানবী (সা.) অসুস্থদের দেখতে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি নিজে অমুসলিম রোগী ও শত্রু রোগীকেও দেখতে যেতেন বলে ইতিহাসে বর্ণনা রয়েছে। আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন, রাসুলে খোদা (সা.) রোগীদের দেখতে যেতে আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। মহানবীর আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: তোমরা রোগীদের দেখতে যাবে এবং তাদের কাছ থেকে দোয়া চাইবে। কারণ তাদের দোয়া ফেরেশতাদের দোয়ার সমতুল্য। তিনি আরও বলেছেন: মু’মিনের ওপর মু’মিনের যে সাতটি অধিকার রয়েছে সেসব পালন করা না হলে তা হবে মহান আল্লাহর আনুগত্য ও কর্তৃত্বকে অস্বীকার বা অমান্য করার শামিল। আর ওই সাতটি অধিকারের অন্যতম হল কোনো মুমিন অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া। কোনো এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির সঙ্গে হজে¦র সফরে থাকার সময় তাদের একজন অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় অন্য ব্যক্তি তথা সুস্থ ব্যক্তি অসুস্থ ব্যক্তিকে ছেড়ে মদিনার মসজিদে যেত।

এ ঘটনাটি শুনে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ওই সুস্থ ব্যক্তিকে বলেন, তুমি যদি মসজিদে না গিয়ে ঘরে থেকে অসুস্থ সঙ্গীর সেবা-যত্ন করতে তাহলে মসজিদে ইবাদত করার চেয়েও বেশি সাওয়াব পেতে।

এ পর্যায়ে রোগীদের দেখতে যাওয়ার আদব-কায়দা সম্পর্কে ইসলামের বিধান বা পরামর্শগুলো জানার চেষ্টা করব।
রোগীদের দেখতে যাওয়ার বিধান: কেউ চক্ষু রোগে আক্রান্ত হলে ও যে কোনো রোগী তিন দিনের কম সময় পর্যন্ত অসুস্থ থাকলে তাকে দেখতে যাওয়া জরুরি নয় বলে জানিয়েছেন ইমাম জাফর সাদিক (আ.)। যদি রোগী দেখতে যাওয়াটা জরুরি হয়ে পড়ে তাহলে এক দিন পর পর দেখতে যেতে বলেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, রোগীকে যদি শুইয়ে দেয়া হয় তাহলে তাকে তার পরিবারের ওপর সোপর্দ করবে -যাতে তারা সব অবস্থায় তার সর্বোত্তম যত্ন নিতে পারে।

রোগী দেখতে দ‚রে যেতে মহানবীর (সা.) নির্দেশ: রাসুলে খোদা (সা.) বলেছেন: হে আলী! .... রোগী দেখতে এক মাইল বা প্রায় দুই কিলোমিটার সফর কর।
রোগী দেখতে যাওয়ার পুরস্কার: মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রোগী দেখতে ঘর থেকে বের হয় তার নিজ ঘরে ফিরে আসা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য সাত কোটি (রূপক অর্থে, বাস্তবে অনেক বেশি সংখ্যা বোঝাতে) সাওয়াব লেখা হয় এবং একই পরিমাণে তার গোনাহও মাফ করা হয় ও মর্যাদার মাত্রাও সেভাবেই বাড়ে। আর একই সংখ্যক ফেরেশতা তার কবরে থাকবে এই নেক কাজের জন্য এবং তারা কিয়ামত পর্যন্ত এই ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে।

ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন: যখনই কোনো মুমিন অন্য কোনো মুমিন রোগীকে দেখতে যান তখন আল্লাহর রহমতের মধ্যে অবগাহন করেন তিনি। যখন তিনি বসেন তখন আল্লাহর রহমত তাঁকে ঘিরে রাখে। তিনি যখন রোগী দেখে ফিরতে থাকেন তখন মহান আল্লাহ তার জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতাকে নিয়োগ করেন যাতে তারা এই ব্যক্তির জন্য ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করতে পারে। তারা তাকে বলে: আগামীকাল এই সময় পর্যন্ত আনন্দিত ও পবিত্র থাক এবং বেহেশত তোমার জন্য মধুর বা তৃপ্তিদায়ক হোক।
রোগীর দোয়া কবুল হয়: ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন, কেউ যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো রোগী দেখতে যায় তখন রোগী তার জন্য যে দোয়াই করেন সে দোয়াই মহান আল্লাহ কবুল করেন।

হযরত মুসা বিন জাফর আল কাযিম (আ.) তাঁর বাবার (আ.) বরাত দিয়ে মহানবীর (সা.) এ হাদিসটি বলেছেন: কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ বান্দাহদের একজনকে এভাবে তিরস্কার করে বলবেন: হে আমার বান্দাহ বা দাস! আমি যখন অসুস্থ ছিলাম তখন কেন আমাকে দেখতে আসনি? ওই বান্দাহ বলবে: হে প্রতিপালক! আপনি তো রোগ-বেদনা-এসব থেকে পবিত্র এবং আপনি তো হচ্ছেন সৃষ্টিকুলের প্রভু ও কখনও রোগ ও বেদনাগ্রস্ত হন না! মহান আল্লাহ তখন বলবেন: যখন তোমার মুমিন ভাই অসুস্থ ছিল তখন তুমি তাকে কেন দেখতে যাওনি? আমার ইজ্জত ও শান-শওকত বা জালালের কসম! যদি তুমি তাকে দেখতে যেতে তাহলে আমাকে তাঁর পাশেই বা কাছেই পেতে! এরপর আমি তোমার চাহিদাগুলো প‚রণের দায়িত্ব নিতাম ও সেগুলো প‚রণ করতাম। আর এটা আমার মুমিন বান্দাহ’র সম্মানের জন্যই করতাম। আমি রাহমান ও রাহিম।
রোগী দেখতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করার পুরস্কার: হযরত আলী (আ.) বলেছেন, ছয়টি গ্রুপের জন্য বেহেশতের গ্যারান্টি দিচ্ছি। এই গ্রুপপগুলোর অন্যতম গ্রুপ হচ্ছে তারা যারা রোগী দেখতে গিয়ে মারা যায়।

রোগীর যত্ন নেয়ার পুরস্কার: মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পুরো এক দিন ও এক রাত রোগীর যত্ন করবে মহান আল্লাহ তাকে ইব্রাহীম খলিল (আ.) নবীর সঙ্গে ওঠাবেন এবং ওই ব্যক্তি তীব্র ধাবমান বিদ্যুতের মত পুলসিরাত পার হয়ে যাবেন।
রোগীদের ঘৃণা করতে নেই। একটি বর্ণনায় এসেছে একবার মহানবী (সা.) যখন খাচ্ছিলেন এমন সময় গুটি বসন্তে আক্রান্ত এক ব্যক্তি প্রবেশ করল সেখানে। ওই রোগী যখনই কারো পাশে বসতে চাচ্ছিল তখনই উঠে যাচ্ছিল বসে থাকা ব্যক্তিরা। এ অবস্থায় মহানবী (সা.) ওই রোগীকে নিজের পাশে বসালেন।

রোগীর চাহিদা মেটানোর পুরস্কার সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রোগীর চাহিদা প‚রণের জন্য চেষ্টা করবে ও রোগীর চাহিদা প‚রণ করবে তার সব গোনাহ এমনভাবে মাফ হয়ে যাবে যেন মায়ের পেট থেকে সদ্য-ভ‚মিষ্ঠ। আনসারদের একজন মহানবীকে (সা.) প্রশ্ন করলেন: হে রাসুলে খোদা (সা.)! যদি রোগী আত্মীয় হয় তাহলেও কি? মহানবী (সা.) বললেন: সবচেয়ে বড় পুরস্কারগুলোর অধিকারী তারাই যারা নিজ পরিবারের রোগীর চাহিদা প‚রণের জন্য সচেষ্ট হয়। আর যে নিজ পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট করে এবং পরিবারের সঙ্গে নিজের বন্ধনকে ছিন্ন করে আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন তথা বিচার-দিবসে সৎকর্মশীলদের জন্য নির্ধারিত পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করবেন ও তাকে ধ্বংস করবেন।...

মহানবী (সা.) আরো বলেছেন, যে কোনো রোগীর চাহিদা পূরণের জন্য সচেষ্ট হবে এবং তার এ চেষ্টা সফল হোক বা না হোক সেও সদ্য-ভ‚মিষ্ঠ নবজাতকের মত সব পাপ থেকে মুক্ত হবে।
রোগীকে খাবার দেয়া: মহানবী (সা.) বলেছেন, যে কোনো রোগীকে খাবার দেয় ও এ জন্য আগ্রহী থাকে আল্লাহ তাকে বেহেশতী ফল খাওয়াবেন।
মহানবী (সা.) আরো বলেছেন, রোগীদেরকে ইচ্ছার প্রতিক‚লে বা অরুচি থাকা সত্তে¡ও জোর করে কিছু খাইয়ে দিও না। কারণ, আল্লাহ নিজেই তাদেরকে খাবার ও পানীয় দেন।
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন, রোগ ও বিপদগ্রস্তদের প্রতি বিস্ময়ের দৃষ্টি দেবে না, কারণ তা তাদের বেদনার কারণ হয়।

রোগীদের দেখতে যাওয়া হলে তা রোগীকে মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং এতে তার মানসিক বেদনা ও ক্লান্তি-বোধ অনেক কমে যায়। রোগীদের দেখতে গেলে খালি হাতে যাওয়ার চেয়ে কিছু হাদিয়া নিয়ে যাওয়াটা বেশি প্রত্যাশিত। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) একবার কোনো এক রোগী দেখতে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়া কয়েক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, তোমাদের কারো কাছে কি আপেল বা লেবু বা আতর কিংবা সুগন্ধি বাষ্প করার জন্য অউদ নামক সুগন্ধি গাছের কাণ্ডের টুকরো নেই? তারা বলল যে সেসব তাদের কাছে নেই। তখন ইমাম বললেন: তোমরা কি জানো না রোগী হাদিয়া পেলে প্রশান্ত হয়?

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন রোগীর কাছে যাবে তখন তার মাথায় হাত রেখে বলবে: রাত ও দিন কিভাবে কাটিয়েছ? এটা রোগী দেখার আদব।’ আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন: সবচেয়ে বেশি সাওয়াব পান সেইসব দর্শনকারী যখন তারা রোগী দেখতে গিয়ে রোগীর কাছে কম সময় থাকেন। অবশ্য যদি রোগী নিজে বেশি সময় ধরে দর্শনার্থীদের কাছে থাকাটা পছন্দ করেন ও তাদের থাকতে বলেন তাহলে বেশি সময় ধরে রোগীর কাছে থাকা যায়। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন, রোগী দেখতে গিয়ে তার কাছে বড় জোর সেই সময় পর্যন্ত থাকা যায় যে সময়ে একটি উটের দুধ একবার দোহন করা হয়।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) আরো বলেছেন, যখনই কোনো রোগী দেখতে যাবে তখন তার কাছ থেকে দোয়া চাবে। কারণ রোগীর দোয়া ফেরেশতাদের দোয়ার মতই কবুল হয়ে থাকে।####

 
Share: