পরকাল ও মৃত্যু সম্পর্কীয় কিছু আয়াত, হাদিস ও ঘটনাসমূহ

  • Posted: 10/01/2021

অনুবাদ: মাওলানা শহিদুল হক

আয়াতসমূহ:
اِنَّکَ مَیِّتٌ وَّ اِنَّهُمۡ مَّیِّتُوۡنَ
১- সকলেই মৃত্যুবরণ করবেঃ “হে পয়গাম্বর! নিশ্চয়ই তোমারও মৃত্যু হবে এবং তাদেরও মৃত্যু হবে।” (সূরা আল-যুমারঃ ৩০)
الَّذِیۡ خَلَقَ الۡمَوۡتَ وَ الۡحَیٰوۃَ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا
২- মৃত্যু আল্লাহর সৃষ্টিঃ “যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন- কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ?” (সূরা আল-মূলকঃ ২)
قُل اِنۡ کَانَتۡ لَکُمُ الدَّارُ الۡاٰخِرَۃُ عِنۡدَ اللّٰہِ خَالِصلةً مِّنۡ دُوۡنِ النَّاسِ فَتَمَنَّوُا الۡمَوۡتَ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ . وَ لَنۡ یَّتَمَنَّوۡہُ اَبَدًۢا بِمَا قَدَّمَتۡ اَیۡدِیۡهِمۡ
৩- মৃত্যুকে ভয় করার কারণঃ “বলে দিন, যদি আখেরাতের বাসস্থান আল্লাহর কাছে একমাত্র তোমাদের জন্যই বরাদ্ধ হয়ে থাকে- অন্য লোকদের বাদ দিয়ে, তবে মৃত্যু কামনা কর, যদি সত্যবাদী হয়ে থাক। কস্মিনকালেও তারা মৃত্যু কামনা করবে না ঐসব গোনাহ’র কারণে, যা তারা নিজ হাতে পাঠিয়েছে।” (সূরা আল-বাকারাঃ ৯৪-৯৫)
فَان ظُرۡ اِلٰۤی اٰثٰرِ رَحۡمَتِ اللّٰہِ کَیۡفَ یُحۡیِ الۡاَرۡضَ بَعۡدَ مَوۡتِهَا ؕ اِنَّ ذٰلِکَ لَمُحۡیِ الۡمَوۡتٰی وَ هُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ.
৪- মৃত্যুর পর জীবনঃ “অতএব, আল্লাহর রহমতের ফল দেখে নাও, কিভাবে তিনি মৃত্তিকার মৃত্যুর পর তাকে জীবিত করেন। নিশ্চয়ই তিনি মৃতদেরকে জীবিত করবেন এবং তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।” (সূরা আর-রূমঃ ৫০)
وَالۡاٰخِرَۃُ خَیۡرٌ وَّ اَبۡقٰی
৫- পরকাল উৎকৃষ্টঃ “অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী।” (সূরা আ’লাঃ ১৭)

হাদিসসমূহ:
১- পরকালের জন্য আমল করঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “নিঃসন্দেহে তোমাকে পরকালের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য আমল কর।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড. ১, পৃ. ১৭)
২- পরকাল ভাল লোকদের জন্যঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “পরকাল ভাল লোকদের জন্য সফলতা।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড. ১, পৃ. ১৬)
৩- পৃথিবীর অলঙ্কারঃ হযরত আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.) বলেছেনঃ “সম্পদ ও সন্তান পৃথিবীর অলঙ্কার, আর উত্তম কাজ পরকালের শস্যস্বরূপ।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড. ১, পৃ. ১৬)
৪- পরকালের প্রতি বিশ্বাসঃ মাওলা আলী (আ.) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে পৃথিবীতে লোভ করে না।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড. ১, পৃ. ১৯)
৫- পরকাল চিরস্থায়ীঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “পরকালের উদ্দেশ্য হল চিরস্থায়ী হওয়া।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড. ১, পৃ. ১৮)
বিশ্লেষণঃ এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে এ পৃথিবী ধ্বংসশীল ও অস্থায়ী। কুরআন ও রেওয়ায়েত এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করে বলে যে, মানুষ এ পৃথিবীতে চিরকাল থাকার জন্য আসেনি, এ পৃথিবী শুধুমাত্র একটি অতিক্রমের জায়গা। মানুষের সর্বদা পরকালের চিন্তা করা উচিৎ, আজ কর্মের দিন ও কাল হিসাবের। পুরস্কার ও শাস্তি কর্মের ওপর নির্ভরশীল। যেমন কর্ম তেমন পুরস্কার ও শাস্তি। উল্লেখিত আয়াত এবং রেওয়ায়েত থেকেও স্পষ্ট হয় যে পৃথিবী থেকে উত্তম হচ্ছে পরকাল।
আল্লাহর কাছে দোয়া করি হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইত (আ.)-এর অসিলায় আমাদেরকে পরকালে সর্বোত্তম পুরস্কার ও প্রতিদান দান করুন এবং পরকালকে স্মরণ করার তৌফিক দান করুন।

ঘটনাবলীঃ
১- মূর্খ ইবাদতকারীঃ বনি ইসরাইলের এক পরহেযগার ও খোদাভীরু ইবাদতকারী দুইশত বছর আল্লাহর ইবাদত করে জীবন অতিবাহিত করেছিল। সে আল্লাহর কাছে দোয়ার মাধ্যমে বলল: হে আল্লাহ, তুমি ইবলিসকে দেখাও, অকস্মাৎ তার নিকট এক বৃদ্ধ ব্যক্তি উপস্থিত হল।
ইবাদতকারী জিজ্ঞেস করলঃ তুমি কে?
বৃদ্ধ বললঃ আমি ইবলিস।
ইবাদতকারীঃ তুমি আমার নিকট এর আগে কেন আসনি, আমাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য?
ইবলিস বললঃ কয়েক বার এসেছি কিন্তু তুমি আমার জালে আটকা পড়নি।
ইবাদতকারীঃ কেন?
ইবলিসঃ কারণ, তুমি সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতে এবং সর্বক্ষণ এ চিন্তা করতে যে, হায়! আজরাইল (আ.) না এসে পড়ে আর আমি গোনাহের কাজে লিপ্ত থাকি, এ কারণে আমি তোমার উপর কর্তৃত্ব করতে পারতাম না, এ জন্য আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দুইশত বছর বয়স দিয়েছে এবং আরো দুইশত বছর বয়স বৃদ্ধি করেছে (বলা যায় তোমার বয়স এখন চারশত বছর) এ কথা বলে ইবলিস অদৃশ্য হয়ে গেল।
ইবাদতকারী চিন্তা করে মনে মনে বলল, আমার এখনও দুইশত বছর বয়স রয়েছে, কেন আমি নিজেকে দুনিয়ার আরাম-আয়েশ থেকে বিরত রাখব? (বলা যায় ইবাদতকারী পরকালের কথা ভুলে গেল) একশত বছর আরাম-আয়েশ করে অতিবাহিত করব আর একশত বছর ইবাদত-বন্দেগী করে। এই ভুল চিন্তা ইবাদতকারীকে ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দিল ও দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট করল। ধীরে ধীরে গোনাহের প্রতি ঝুকে পড়ল। একবার হঠাৎ সে অনুভব করল মৃত্যুর ফেরেশতা আজরাইল (আ.) তার নিকট এসেছে।
ইবাদতকারী আজরাইল (আ.)কে বললঃ আমার এখনও দুইশত বছর বয়স আছে।
আজরাইল (আ.) বললেনঃ নিঃসন্দেহে তোমার বয়স দুইশত বছর ছিল কিন্তু ইবাদত থেকে দূরে থাকা ও গোনাহ কাজে লিপ্ত হওয়ায় তোমার বয়স কমে গেছে। (তুমি পরকালকে ভুলে গিয়ে দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছ) এভাবে মূর্খ ইবাদতকারীর পরকাল ও পুরস্কার ধ্বংস হয়ে গেল।
اللهم اجعل عواقب امورنا خیرا
“হে আল্লাহ আমার ভবিষ্যৎ সফলতায় পরিণত কর। (অকেবাত ওয়া কেইফারে গোনাহকর, পৃ. ১৫)
২- সত্যকে জানাঃ এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে (সা.) প্রবেশ করে পয়গাম্বর (সা.)কে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আমাকে কুরআন শিক্ষা দিন।
পয়গাম্বর (সা.) তাঁর সাহাবীদের মধ্যে থেকে এক সাহাবীর কাছে তাকে সোপর্দ করলেন। সাহাবী তার হাত ধরে মসজিদের এক পাশে নিয়ে গেলেন এবং তার সামনে পবিত্র সূরা যিলযাল পাঠ করলেন, যখন এই আয়াতের নিকট পৌঁছলেনঃ “অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকমর্ করলে তাও দেখতে পাবে”
তখন ঐ ব্যক্তি কিছু সময় চিন্তা করে বললঃ এই বাক্যটি কি আল্লাহর ওহী? সাহাবী ঐ ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে বললেনঃ নিশ্চয়ই।
ঐ ব্যক্তি বললঃ আমি এই আয়াত থেকে শিক্ষা নিয়েছি, অর্থাৎ এই আয়াত আমাকে সঠিক পথ চলার ও পরকালের স্মরণ করার জন্য যথেষ্ট। একথা বলে ঐ ব্যক্তি চলে গেল।
সাহাবী পয়গম্বার (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে সব ঘটনা বর্ণনা করলেন। পয়গম্বার (স.) বললেনঃ তাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দাও সে সত্যপথ পেয়েছে। (তাফসীরে নামুনাহ, খন্ড. ২৭, পৃ. ২৩১)

 
Share: