জেনারেল কাশেম সুলাইমানীর শাহাদাতে কেন বিশ্বের মানুষ শোকাহত?

  • Posted: 19/01/2021

শহীদ জেনারেল কাসেম সুলাইমানী মুসলিম বিশ্বের গর্ব, বর্তমান সময়ে বিশ্বের সেরা সমরবিদ। যিনি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের ইহুদীবাদ ও আমেরিকার পরিকল্পনা ব্যর্থ করতে গত চার দশকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। গত ৩ জানুয়ারি’২১ ইরাকের বাগদাদে আমেরিকার কাপুরুষোচিত হামলায় তিনি শহীদ হলে শুধু ইরান নয় বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে। ইরাক ও ইরানে তার চির বিদায় অনুষ্ঠানে নেমেছে কোটি কোটি মানুষের ঢল।

২০০৬ সালের ১২ জুলাই ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননের হামলা করে বসে। লেবাননে তাদের হামলা করার মূল উদ্দেশ্য ছিল লেবানন দখল করা এবং ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি ধ্বংস করার মাধ্যমে বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। সেসময় আমেরিকা ও ইসরাইল আরব দেশগুলোর সঙ্গে গোপন সমঝোতা করেই মাঠে নামে কিন্তু ইরান, সিরিয়ার সমর্থনের কারণে টানা ৩৩ দিন যুদ্ধ করেও ইসরাইল হিজবুল্লাহকে কাবু করতে পারেনি বরং শেষদিকে প্রচন্ড মার খেয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এঘটনার পরে জেনারেল কাসেম সুলাইমানী কুদস ব্রিগেডের দায়িত্ব পাওয়ার বিশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরে প্রথমবারের মতো ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ব্যক্তিগত ওয়েব সাইটকে সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, লেবাননে ইসরাইলের হামলার কয়েকদিন পরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সাইয়্যেদ আলী খামেনায়ীর সভাপতিত্বে তেহরানে মিটিং হয়। সেখানে আমি যে রিপোর্ট উপস্থাপন করি সেটা শুনে তিনি বলেন, “আমার মনে হচ্ছে খন্দকের যুদ্ধের মতোই এই যুদ্ধে হিজবুল্লাহ বিজয়ী হবে।” তারপরে লেবাননে ফিরে গিয়ে হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করি এবং সাইয়্যেদ আলী খামেনায়ীর দিক-নির্দেশনা ও পরামর্শ জানিয়ে দেই। তাঁর বার্তায় হিযবুল্লাহর মুজাহিদরা দারুণভাবে উজ্জীবিত হয় এবং ইসরাইলের সাথে চলমান জিহাদে তারাই বিজয়ী হতে যাচ্ছে তাদের মধ্যে এমন আত্মবিশ্বাস জন্মে। হিজবুল্লাহর মুজাহিদরা স্থল হামলা প্রতিহত করার পাশাপাশি ভূমধ্যসাগরে ইসরাইলি যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ফলে ইসরাইল দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়। ৩৩ দিন যুদ্ধ চলার পরে ইসরাইল প্রচন্ড মার খেয়ে জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় লেবানন ছেড়ে চলে যায় এবং হিজবুল্লাহ একটি বিশাল বিজয় অর্জন করে।

২০১৪ সালের ৮ জুলাই ইসরাইল ফিলিস্তিনের গাজায় হামলা করে যা দীর্ঘ ৭ সপ্তাহ দীর্ঘায়িত হয়। সেসময় ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামী জিহাদের পাল্টা জবাবের কারণে ইসরাইল যুদ্ধ বিরতি চুক্তি করতে বাধ্য হয়। হামাস-ইসলামী জিহাদ যত বারই ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ করেছে ততবারই যুদ্ধ শেষে বিবৃতি দিয়ে ইরান-সিরিয়ার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। যে ইসরাইল ১৯৬৭ সালে মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে সম্মিলিত আরব বাহিনীকে চরমভাবে পরাজিত করেছিল সেই ইসরাইল বারবার লেবানন ও ফিলিস্তিনীদের কাছে হেরে যাওয়ার পেছনে যে মানুষটি ইরান-সিরিয়ার সরকারের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে গিয়ে এবং মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ-সমরবিদ্যা দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন তিনিই শহীদ জেনারেল কাশেম সুলাইমানী। অবরুদ্ধ গাজাবাসীকে টানেল খুঁড়ে মিসর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আসার কৌশল তিনিই শিখিয়েছিলেন। যার কারণে তাঁর শাহাদাতে প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ। ফিলিস্তিন থেকে হামাস ও ইসলামী জিহাদের মুজাহিদরা তাঁর পরিবারকে সমবেদনা জানাতে এবং জানাজায় শরীক হতে ইরানে ছুটে এসেছিলেন। হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া জানাজাপূর্ব বক্তব্যে শহীদ কাসেম সুলাইমানীকে সারাজীবন ফিলিস্তিনীদের পাশে পাওয়ায় তাঁকে ফিলিস্তিনের শহীদ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

২০১১ সালে আরব জাগরণের সুযোগ নিয়ে আমেরিকা-ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনীদের অকৃত্রিম বন্ধু সিরিয়ার সরকারকে ধ্বংসের জন্য সিরিয়ায় ও ইরাকে জিহাদ ও খেলাফতের নামে বিশ্বের ৮০টি দেশ থেকে যুবকদের নিয়ে গিয়ে আই এসসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠন তৈরী করা হয়। প্রথমদিকে দেশ দু’টির কিছু জনগণ খেলাফতের কথা শুনে বিনা প্রতিরোধে সন্ত্রাসীদের হাতে তাদের শহরগুলো ছেড়ে দেয়। আর সিরিয়ার আল-ফুয়া ও কাফারইয়ার মতো এলাকাগুলো, যেখানকার জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো তাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। দিনের পর দিন আইএস কর্তৃক অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকে একসময় তারা খাদ্য সংকটে পড়ে গাছের পাতা পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়। শুধু আল-ফুয়া ও কাফারইয়ার ২ হাজার ৪৩৫ জন মানুষ সন্ত্রাসীদের হামলা ও বোমার কারণে বাতাস দূষিত হয়ে যাওয়ায় রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যান।

আই এসসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শুরু হয় তাদের তান্ডব। সন্ত্রাসীদের সাথে ঐসব এলাকার মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য করা হয়। ‘জিহাদুন নিকাহ’ নামে এক মহিলার সাথে চলে একাধিক সন্ত্রাসী সদস্যের শারিরীক সম্পর্ক। ইরাকের ইজাদী সম্প্রদায়ের মেয়েদের ধরে এনে পণ্যের মতো করে কেনা-বেচা। তাদের আচরণে জনগণ নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। কেউ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা ছেড়ে চলে যায় আর যারা চলে যেতে চেয়েও তাদের বাঁধার কারণে এলাকা ত্যাগ করতে পারে নি তাদের উপর চলে অত্যাচার-হত্যার স্ট্রীম রোলার। আই এস ছুরি দিয়ে মানুষ হত্যার ভিডিও নিজেরাই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। ভাইরাল হয় ইরাকী সেনা আবু বকর আল-সামারাইয়ের ছবি। যিনি শিরচ্ছেদের ঠিক আগ মুহূর্তে ছিলেন নির্বাক-ভয়ডরহীন।

আই এসের উত্থানের পরে ইহুদী-আমেরিকার মিডিয়ার মিথ্যা সংবাদে অনেকে তাদের সমর্থন করেছিল কিন্তু দিন দিন সত্য বিশ্বের মানুষের সামনে তাদের চেহারা স্পষ্ট হয়ে যায়। আইএসের কার্যক্রমে সারাবিশ্বের মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করে। আইএস কোন ইসলামী সংগঠন নয়, এই মর্মে ২০১৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বের প্রখ্যাত ১২৬ জন ইসলামিক স্কলার স্বাক্ষরিত ফতোয়া আসে। কিন্তু ততক্ষণে আইএস সিরিয়া-ইরাকে শক্তিশালী অবস্থানে চলে গিয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৪টি ইসলামী সংগঠন আবু বকর আল-বাগদাদীকে খলিফা হিসেবে মেনে নিয়ে আনুগত্যের ঘোষণা দেয়। সিরিয়া-ইরাকের খেলাফতের সমর্থক বনে যায়। এই অতি উৎসুক যুবকরাই মুসলিম-অমুসলিম বিভিন্ন রাষ্ট্রে বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়।

আইএসের উত্থানের সময়ই ইরান বুঝতে পারে, কারা তাদের পরিচালিত করছে আর তাদের উদ্দেশ্যই বা কী। সিরিয়ার অনুরোধে ইরান সামরিক পরামর্শদাতা পাঠায়। লেবানন থেকে ছুটে আসে হিজবুল্লাহ। আমেরিকা সন্ত্রাসী দমনের নামে সিরিয়ায় আইএসের সহযোগিতা শুরু করে। সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে তাদের তথ্য আইএসের কাছে ফাঁস করে দেয় এবং বহুবার সিরিয়ার সেনাবাহিনীর উপর বিমান হামলা করে বলে আমরা ভুল করেছি। মাঝে মাঝে চলে ইসরাইলের বিমান-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। আইএসের আহত সদস্যদের ইসরাইলের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। জেনারেল কাশেম সুলাইমানী আমেরিকা-ইসরাইলের ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে ছুটে যান রাশিয়ায়। প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে বৈঠক করে তাকে এয়ার ফোর্স দিয়ে গ্রাউন্ডে সন্ত্রাসীদের সাথে যুদ্ধরত সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে সাপোর্ট দেয়ার অনুরোধ করেন। জেনারেল সুলাইমানীর অনুরোধে সিরিয়া তারত্সু বন্দরে যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়ে সেখান থেকে এয়ার ফোর্স দিয়ে সিরিয়ার সেনাবাহিনীসহ গ্রাউন্ডে সন্ত্রাসীদের সাথে লড়াইরত সেচ্ছাসেবক বাহিনীকে সাপোর্ট দেয়। অল্প দিনে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। আইএসসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো লাশ ফেলে পালাতে থাকে। একে একে সন্ত্রাসী মুক্ত হয় সিরিয়ার বিভিন্ন শহর। ইসরাইল-আমেরিকা-সৌদি সিরিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে মিডিয়ার মাধ্যমে অপপ্রচার শুরু করে। সৌদি আরব এক্ষেত্রে বহু টাকা খরচ করে সালাফী আলেমদের দিয়ে সিরিয়া সম্পর্কিত হাদীস এবং হাদীসে উল্লেখিত "গোতা" শহর ও ইমাম মাহদীর বাহিনীর বর্ণনার অপব্যাখ্যা-অপপ্রচার করে বিশ্বের মুসলিম যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করে। কিন্তু জেনারেল কাশেম সুলাইমানীর মতো দূরদর্শী কমান্ডারের পরামর্শে সিরিয়ার সেনাবাহিনী সন্ত্রাসীদের পরাজিত করতে সামর্থ হয়।

অন্যদিকে ২০১৪ সালে একের পর এক ইরাকের বিভিন্ন এলাকা দখল করে যখন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস রাজধানী বাগদাদের নিকটে চলে এসেছিলো তখন ইরাকের গ্রান্ড আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী হোসাইনী সিস্তানী আইএসের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া প্রদান করেন। তাঁর ফতোয়ায় ও জেনারেল কাসেম সুলাইমারীর সামরিক পরামর্শে ইরাকীরা সেচ্ছাসেবক বাহিনী হাশদ আশ-শাবিতে যোগ দিয়ে সেদেশের সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে আইএস দমন করে।

জেনারেল কাশেম সুলাইমানী লেবানন-ফিলিস্তিনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছেন আর ইরাক-সিরিয়ায় তার নির্দেশনায় সন্ত্রাসী আইএস দমন এই শতাব্দীতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক সফলতা। ব্যক্তিগত জীবনে খুবই সাধাসিধে মানুষ ছিলেন তিনি। ইরানের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হওয়ার পরও তাঁর মাঝে কোন অহংকার ছিল না। তিনি অধিকাংশ সময়ে নরমাল পোষাক পড়তেন। কোথাও কখনো গাড়ি বহর নিয়ে চলাফেরা করতেন না। ছোটদের স্নেহ আর বড়দের সম্মান করতেন। তিনি বিশেষকরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সাইয়্যেদ আলী খামেনায়ীকে অনেক সম্মান করতেন। কোনদিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কোন নির্দেশের কোন ব্যাখ্যা চাননি। আজ তাঁর শাহাদাতে খুনি আমেরিকা-ইসরাইল ও তার মিত্ররা ছাড়া বিশ্বের সকল স্বাধীনচেতা মানুষরা শোকাহত। আইএস দমন ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি যে অবদান রেখেছেন তার জন্য শুধু মুসলমান নয় বরং সমগ্র বিশ্বের মানুষদের তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত।

লেখকঃ আবু সালেহ, ৭ জানুয়ারি, ২০২০ ###

Share: