পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ঘটনার আলোকে অন্তর্দৃষ্টি

  • Posted: 27/07/2021

মাওলানা মোঃ শহিদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা

আয়াতসমূহঃ

  • অন্তর্দৃষ্টির গুরুত্বঃ “বলে দিন এই আমার পথ! আমি আল্লাহর দিকে জেনে- বুঝে দাওয়াত দেই -আমি এবং আমার অনুসারীরা। আল্লাহ পবিত্র। আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরা ইউসুফঃ ১০৮)
  • অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়ঃ “আপনি বলুন, আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে। তাছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয় অবগতও নই। আমি এমনও বলি না যে, আমি ফেরেশতা। আমি তো শুধু ঐ ওহীর অনুসরণ করি, যা আমার কাছে আসে। আপনি বলে দিন, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? তোমরা কি চিন্তা কর না?” (সূরা আল-আনআমঃ ৫০)
  • কিয়ামতে অন্ধ হওয়ার কারণঃ “এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। সে বলবে হে আমার পালনকর্তা, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ বলবেন, যেমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।” (সূরা ত্বোয়া-হাঃ ১২৪-১২৬)
  • অন্তর্দৃষ্টিকারীদের জন্য শিক্ষাঃ “আল্লাহ দিন ও রাত্রির পরিবর্তন ঘটান। এতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নগণের জন্য চিন্তার উপকরণ রয়েছে।” (সূরা আন্-নূরঃ ৪৪)
  • অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কে প্রশ্নঃ “যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তার পিছনে পড় না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।” (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ৩৬)

হাদীসসমূহঃ

  • অন্তর্দৃষ্টির গুরুত্বঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “ অন্তর্দৃষ্টি নষ্ট হওয়ার থেকে চক্ষু অন্ধ হয়ে যাওয়া সহজ।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ১৬৪)
  • অন্তর্দৃষ্টি শুন্যঃ মাওলা আলী (আ.) বলেছেনঃ “যার চিন্তা শক্তি নেই সে অন্তর্দৃষ্টি থেকে শুন্য।” (গুরারুল হেকাম, খন্ড ১, পৃ. ১৬৫)
  • অন্তর্দৃষ্টিতে দেখাঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “চক্ষু দ্বারা দেখায় কোন উপকারিতা নেই যদি অন্তর্দৃষ্টি না থাকে।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ১৬৫)
  • গোপন রহস্যঃ ইমাম আলী (আ.) বলেছেনঃ “নিঃসন্দেহে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য অসংখ্য গোপন রহস্য খুলে যায়।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ১৬৪)
  • অন্তর্দৃষ্টি উত্তম না চক্ষুঃ আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) বলেছেনঃ “দৃষ্টিশক্তি চলে যাওয়া অন্তর্দৃষ্টির সমাপ্তি ঘটার থেকে উত্তম।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ১৬৩)

বিশ্লেষণঃ প্রকাশ্য দেখার নাম ‘বেসারত’ (দৃষ্টি) আর অন্তর দিয়ে দেখার নাম ‘বাসিরাত’ (অন্তর্দৃষ্টি)। দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হল, ‘বেসারত’ হল প্রকাশ্যভাবে দেখা আর ‘বাসিরাত’ হল অভ্যন্তরীণভাবে দেখা। মাওলায়ে কায়েনাত আলী (আ.) এরশাদ করেন যে, উত্তম অর্ন্তদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি হল সেই যে নিজের ক্রুটি দেখে গোনাহ থেকে দূরে থাকে। ‘বাসিরাতের’ উত্তম বহিঃপ্রকাশ হল মানুষ বাহ্যিক অবস্থা অনুযায়ী কাজ না করে বরং বিবেকের পরামর্শানুযায়ী আমল করে। এ কারণে আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর এরশাদ অনুযায়ী চক্ষু ধোঁকা দিতে পারে কিন্তু আকল (বিবেক) কোন মানুষকে ধোঁকা দেয় না। তাই সকলকে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হওয়ার চেষ্টা করতে হবে যাতে আমাদের জন্য গোপনীয় বিষয় স্পষ্ট হয়।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি তিনি যেন চৌদ্দ মাসুম (আ.)-এর অসিলায় আমাদেরকে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি হওয়ার তৌফিক দান করেন। (আমিন)

১- অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন গোলামঃ নবী করীম (স.)-এর যুগে এক ইথিওপিয়ার নাগরিক বাস করত। সে মুসলমানদের সাথে উঠাবসা করত। এভাবে আস্তে আস্তে সে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে অবগত হল। যখন সে নিশ্চিত হল মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস সঠিক তখন সে আল্লাহর রাসূল (স.) এর খেদমতে উপস্থিত হল এবং শাহাদাতের দুটি কলেমা পাঠ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল। এরপর সে মুসলমানদের থেকে ধর্মীয় মাসআলা-মাসায়েল অর্জন করতে লাগল। একদিন সে রাসূল কারীম (স.) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল (স.)! বিশ্বস্রষ্টা কি জ্ঞানী ও বিজ্ঞ?
রাসূল করীম (স.) বললেন অবশ্যই, আল্লাহ তায়ালা সকল প্রকাশ্য ও গোপনীয় সম্পর্কে অবগত। তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ঘটনাবলী সম্পর্কেও ওয়াকিফহাল। আল্লাহ প্রত্যেক কথা, কর্ম এবং ধুলার মধ্যে থেকে সৃষ্টির পরিকল্পনা সম্পর্কেও অবগত।
এ কথা শুনে গোলাম কিছু সময় চিন্তা করে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল (স.)! এর অর্থ হল যে আল্লাহ আমার সকল গোনাহ সম্পর্কে অবগত ও সর্বদা আমাকে দেখেন এবং আমার প্রত্যেক নড়াচড়া ও নীরবতা তার সামনে হয়?
নবী করীম (স.) বলেনঃ নিঃসন্দেহে এটাই। আল্লাহ তোমার জীবনের প্রত্যেক মুহুর্ত সম্পর্কে অবগত।
একথা শুনে সে চিৎকার করে বেহুঁশ হয়ে জমিনে পড়ে গেল আর এই বেহুঁশ অবস্থায় তার আত্মা বিদায় নিল। (কাশফুলে দাস্তগেইব খন্ড ১, পৃ. ৫১)

২- আবু হারুন মাকফুফ (র.)-এর অন্তর্দৃষ্টিঃ কুতুবে রাওয়ান্দী (র.) আবু বাসির (র.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন হযরত ইমাম মোহাম্মাদ বাকের (আ.)-এর সাথে আমি মসজিদে প্রবেশ করেছিলাম এবং কিছু লোকজনও মসজিদে প্রবেশ করছিল। হযরত বাকের (আ.) আমাকে বললেনঃ কিছু কিছু লোকজনকে জিজ্ঞেস কর, তারা কি আমাকে দেখেছে? এরপর আমি যাকে দেখলাম তার কাছে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি আবু জাফর (আ.)কে দেখেছ? উত্তরে সে বলল, না। অথচ তখন হযরত আবু জাফর বাকের (আ.) ঐ স্থানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঐ সময় আবু হারুন মাকফুফ (যিনি অন্ধ ছিলেন) মসজিদে প্রবেশ করলেন। হযরত বাকের (আ.) বললেনঃ তাকে জিজ্ঞেস কর, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি আবু জাফর (আ.)কে দেখেছো? তখন তিনি বললেন, কি বল হযরত আবু জাফর (আ.) কি এখানে দাঁড়িয়ে নেই?। আমি বললাম, তুমি কিভাবে বুঝলে? তিনি বললেন, কেন বুঝবো না? তিনি তো জ্যোতির্ময় আলো, ইমামতের সৌন্দর্য দেখার জন্য প্রকাশ্য চক্ষু যথেষ্ট নয় অন্তরের চক্ষুর প্রয়োজন। (ইমামকে দেখার জন্য ‘বেসারাত’ নয় বরং ‘বাসিরাত’ দরকার)। (আহসানুল মাকল, খন্ড ১, পৃ. ৬৭৫)###

Share: