আশুরার শোক পালন এবং শিয়াদের ভাবমূর্তি

  • Posted: 05/09/2021

লেখকঃ মোঃ শাফিউর রহমান

প্রতি বছরই মহান আশুরার পরে দেখা যায় যে অনেকে মিডিয়ায় অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু ছবি, ভিডিও কিংবা অন্য কোন বিষয়বস্তু শেয়ার করে বলে, “দেখুন শিয়া কাফেরদের কান্ড দেখুন।”

এছাড়াও কেউ কেউ কিছু বিচ্ছিন্ন উদাহরণ ব্যবহার করে ঢালাওভাবে রাসুলে পাক (সাঃ) এবং তাঁর একান্ত রক্তজ পরিবারের অনুসারীদের কটাক্ষ করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় একশ’টিরও বেশি দেশ মিলে মোট মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ প্রায় ৩২ কোটি মানুষ, এই বিশ্বাস রাখেন যে রাসুলে পাক (সাঃ) এর প্রচারিত ইসলামের মূল জ্ঞানের শাখার প্রচার ও প্রসার হয়েছে তাঁর একান্ত রক্তজ বংশধরদের মাধ্যমে।

এই জনগোষ্ঠীটাকেই অনেকে শীয়ানে আহলে বাইত অথবা শীয়ানে আলী হিসেবে আখ্যায়িত করে, যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় যে, “একান্ত রক্তজ বংশের অনুসারী অথবা আলীর অনুসারী। আরেকটু সংক্ষেপে অনেকে তাদেরকে “শিয়া” অর্থাৎ “অনুসারী”ও বলে থাকে। বাংলাদেশেও শিয়া জনগোষ্ঠী অন্যান্য সবার সাথে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে বসবাস করে।

শুধুমাত্র আশুরার সময়, আল্লাহ হতে প্রেরিত রাসুল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) এর আদরের নাতি ও মুসলমানদের বেহেশতের সর্দার, ইমাম হুসাইন (আঃ) এর মহান শাহাদাত দিবসের শোক পালনের সময় এই শিয়াগোষ্ঠী বেশি প্রকাশিত হয় তাদের নানাবিধ ধর্মীয় আয়োজন এর মাধ্যমে।

আরবি সাল ৬১ হিজরির পবিত্র আশুরার এই দিনে, ততকালীন জালিম শাসক ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া, যিনি পরবর্তীতে কাবাঘরে আগুন দেয়া ও মদিনায় ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য আরো বেশি কুখ্যাত হয়েছিলেন, তার ইসলামবিরোধী কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করার দায়ে ইমাম হুসাইন (আঃ) কে তাঁর পরিবার ও অনুসারীগণসহ কারবালার ময়দানে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করে।

ইতিহাসের সেই নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ হিসেবে বিশ্বের সকলস্থানে বসবাসকারী শিয়ারা পবিত্র আশুরার ওই দিনটিতে রাস্তায় নেমে পড়েন শোক পালন করতে। এখানে স্পষ্ট উল্লেখ্য যে, আল্লাহ হতে মনোনীত সর্দার, পয়গম্বর, নবী, রাসুলগণের বিয়োগের শোকে ক্রন্দন করা, হায় আফসোস আহাজারি করা পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত অত্যন্ত সুন্দর একটি বিধান।

তাই তো মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের সুরা ইউসুফ এ দেখিয়েছেন, পয়গম্বর পুত্র ইউসুফ (আঃ) এর অনুপস্থিতিতে পয়গম্বর পিতা ইয়াকুব (আঃ) কিভাবে আহাজারি ও হায় আফসোস করেছেন।

”এবং তাদের দিক থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেনঃ হায় আফসোস ইউসুফের জন্যে। এবং দুঃখে তাঁর চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গেল। এবং অসহনীয় মনস্তাপে তিনি ছিলেন ক্লিষ্ট।” [সুরা ইউসুফ - ১২:৮৪]

তারা বলতে লাগলঃ আল্লাহর কসম! আপনি তো ইউসুফের স্মরণ থেকে নিবৃত হবেন না, যে পর্যন্ত মরণাপন্ন না হয়ে যান কিংবা মৃত্যুবরণ না করেন [সুরা ইউসুফ - ১২:৮৫] 

এই আয়াতদ্বয়ে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, আল্লাহ হতে মনোনিত নেতা, সর্দার, পয়গম্বর, নবী রাসুলগণের বিয়োগ অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং এর শোক পালন কুরআনের উদাহরণ অথচ বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়ম, বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির লোক পুরো শোকপালন প্রক্রিয়াটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়।

তারা মূল ধারার বাইরে থাকা নগন্য কিছু ভ্রান্ত কর্মকান্ডের উদাহরণ দিয়ে পুরো জাতিকেই কাফের উপাধি দিয়ে থাকে, যদিও তারা এই জাতির প্রাতিষ্ঠানিক পরিমন্ডলে কোন প্রকার অনৈসলামিক কর্মকান্ডের একটি উদাহরণও দিতে পারবে না। আর থাকলো মিডিয়া এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কথা।মিডিয়া অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো চায় তাদের দর্শক ও পাঠকের কাছে সেইসব বিষয়গুলো তুলে ধরতে, যা তাদের কাছে নতুন, আকর্ষণীয় এবং চমকপ্রদ।

এই জন্যে আমি মিডিয়াকে দোষ দেই না যে তারা আশুরার দিনে করা নগণ্যসংখ্যক কিছু লোকের উদ্ভট কর্মকান্ডকে অধিক গুরুত্বের সাথে প্রচার করে। তবে এটা যে কোন গণমাধ্যমের দায়ীত্বের মধ্যেই পড়ে যে, কোন দল বা গোষ্ঠীর যে কোন কর্মকান্ডের ব্যাখ্যা, সেই নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর নীতি নির্ধারক এবং আলেমদের কাছেই চাওয়া উচিত।

অন্য কোন দল বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের মতামত পরবর্তীতে নেয়া যেতে পারে, তবে আপনি যাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন, তাকে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়াটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এ ব্যাপারে নবী করিম (সাঃ) এবং তাঁর পবিত্র পরিবারের অনুসারীদেরও আরো অনেক সচেতন হওয়া উচিত, যেন তাদের কিছু মনগড়া কর্মকান্ডের জন্যে পুরো ধর্মকেই কেউ প্রশ্নবিদ্ধ না করতে পারে।

এই দলের নেতা ও নীতিনির্ধারকদেরও উচিত, ধর্মের, রাসুলে পাক (সাঃ) এর অনুসারীদের এবং তাঁর পবিত্র পরিবারের অনুসারীদের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে পুরো প্রক্রিয়াটাকে আরো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।###

Share: