বাংলায় মুসলমানদের আগমন ও উত্থান

  • Posted: 25/11/2020

লেখকঃ সাইফুল ইসলাম

বাংলার সহস্রাধিক বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলাম ধর্ম এবং মুসলিম জীবনাচার এদেশের সমাজ ও জনজীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। তবে বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব ও মুসলমানদের আগমন সর্বপ্রথম ঠিক কখন হয়েছিল সঠিকভাবে তা নির্ধারণ করা দুঃসাধ্য। তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশে বহির্জগত থেকে যেসব মুসলমান আগমন করেছিলেন, তাদেরকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এক শ্রেণীর মুসলমান ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগমন করে ইসলামের বাণী প্রচার করেন। অনুরূপভাবে আসেন কিছু ফকির ও অলী-দরবেশ। তারাও কেবলমাত্র ধর্ম প্রচারের কাজে জীবন অতিবাহিত করেন এবং এ অঞ্চলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিজ নিজ চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি অনুসারে ইসলাম প্রচারকারী এসব অলী দরবেশদের অনেকেরই মাজার রয়েছে বাংলাদেশে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ঃ শাহ সুলতান রুমী (রহঃ), বাবা শহীদ (রহঃ), শাহ আব্দুল্লাহ কিরমানী (রহঃ), বাবা ফরিদ উদ্দীন শাকরাগঞ্জ (রহঃ), আখি সিরাজ উদ্দীন (রহঃ), শেখ জালাল উদ্দীন তাবরিজী (রহঃ), সাইয়েদ জালাল উদ্দীন আহমেদ কবির ওরফে মুখদুম (রহঃ), শাহ আল্লাহ (রহঃ), মাওলানা শেখ হামিদ দানিশমান্দ (রহঃ), হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহঃ) প্রমুখ। আর এক শ্রেণীর মুসলমান এদেশে এসেছিলেন দেশ জয়ের অভিযানে। তাদের বিজয়ের ফলে বাংলা অঞ্চলে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলায় মুসলমানদের আগমন দূর অতীতের কোন এক সময় হয়ে থাকলেও তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার সূচনা হয় ১২০৩ সাল মোতাবেক ৬০০ হিজরী সাল থেকে।

মুসলিম বণিকদের আগমনঃ

মহানবী (সাঃ)-এর জন্মের বহুকাল আগে থেকেই আরব বণিকরা সুদূর চীন দেশ অবধি তাদের বাণিজ্য ব্যাপক দেশে ভারতীয় উপমহাদেশের সমুদ্র তীরবর্তী মাদ্রাসকে ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করতো। মালাবাবের পথ ধরে তারা বর্তমান বাংলা অঞ্চলের চট্টগ্রাম, সিলেট ও আসামের কামরূপ হয়ে সমুদ্রপথে চীনে যাতায়াত করতো। ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলা অঞ্চলের সাথে আরবদের সম্পর্ক ও পরিচয় অতি পুরাতন। খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে মহানবী (সাঃ) যখন ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন, তখন আরব বণিকদের মাধ্যমে তা মালাবার, চট্টগ্রাম ও সিলেট পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং এই পথ ধরে চীন পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। এক সময় মালাবারে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে কিছু আরব মুহাজির। স্থায়ীভাবে তারা ‘মোপলা’ নামে পরিচিত ছিল। নৌকার সাহায্যে মাছ ধরা এবং মালামাল ও যাত্রী পরিবহন পেশায় নিয়োজিত এই মোপলারা হিজরী সনের প্রারম্ভেই ইসলাম গ্রহণ করে এবং জীবিকার অর্জন ও অন্যান্য প্রয়োজনে ভারত সাগর পাড়ি দিয়ে এতদঞ্চল ও আরব দেশের মধ্যে যাতায়াত করতো। আর এভাবেই এ অঞ্চলের মানুষ ইসলামের সংস্পর্শে আসে। মালাবার, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কামরূপ অঞ্চলে যখন ইসলামের প্রচার চলছিল তখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মমত অনুসারীদের ওপর হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নানা রকম অত্যাচার ও নির্যাতন চলছিল। ঐ সব অত্যাচার-নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা এ অঞ্চলে কর্মরত মুসলিম সাধু পুরুষদের সান্নিধ্যে আসে এবং ইসলাম গ্রহণ করে। ঐ সময়কার একটি বড় ঘটনা হলো, খোদ মালাবারের রাজা চেরুমল পেরুমলের স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ, পবিত্র মক্কায় গমন এবং হযরত রাসুলে করীম (সাঃ)-এর খেদমতে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। বিশ্বকোষ, শেখ জয়নুদ্দিন প্রণীত তোহফাতুল মুজাহিদীন এবং সাংবাদিক সাহিত্যিক মাওলানা আকরাম খাঁ প্রণীত ‘মুসলিম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’ গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ আছে। তবে হাদীসের কোন গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ না থাকায় হাদীসবেত্তাগণ এই বক্তব্যকে ‘সন্দেহমুক্ত নয়’ বলে মনে করেন। এদিকে আরবীয় মুসলমান বণিকদের সাথে যোগাযোগের ফলে অষ্টম-নবম শতাব্দী থেকেই চট্টগ্রামের ওপর একটি সাংস্কৃতিক প্রভাব পড়ে। চট্টগ্রামের বহু পরিবার আরবীয় বংশোদ্ভুত। এর বহু এলাকাও আরবী নাম বহন করে। এমনকি বহু পন্ডিতের মতে, আরবী শব্দ শৎ (বদ্বীপ) এবং গঙ্গা (গঞ্জ) থেকেই চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি।

ঐতিহাসিক সূত্রে আরও বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ইসলামের উৎসভূমি আরবের সংস্পর্শে আসে খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে। সমুদ্র ভ্রমণকারী বা সমুদ্র নাবিক আরবরা তাদের অঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্যের ঐ সোনালী যুগে সওদাগরী জাহাজযোগে ভূমধ্যসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত প্রাচ্যের সকল সমুদ্রে চলাচল করতো। সেই সুবাদে তারা বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম পূর্ব ভারতীয় বন্দরগুলোতেও আসতো। আরবীয় ভূগোলবিদদের লেখালেখি এবং বাংলা কবিতা ও গীত গাথায় বাংলাদেশের সাথে আরবদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং মুসাফির হিসাবে আরব বণিকদের চট্টগ্রামের অবস্থানের বর্ণনা পাওয়া যায়। (ওৎধহ ধহফ ইধহমষধফবংয, চৎড়ভ. অনফঁষ কধৎরস, ২০০২, চধমব-২)

সুফী সাধকদের আগমনঃ

ত্রয়োদশ শতাব্দীর সূচনাকালে তুর্কী সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের আগেই অর্থাৎ ১১৭১-৭২ সালের দিক থেকে বাংলার মুসলামানরা ভালভাবেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। ঐ সময় সিংহলের প্রধান সেনাপতি বাংলার পান্ডুয়া আক্রমণ করলে তার কাছে উপহার সামগ্রী আনয়নকারীদের মধ্যে মুসলমানরাও ছিল। তদানীন্তন বাংলার একটি অঞ্চল বিক্রমপুরে এক সময় (১১৬০-১১৭৮) সাল পর্যাপ্ত রাজত্ব করতো রাজা বল্লাল সেন। তার অত্যাচার ও ইসলাম বিরোধিতা বন্ধ করার জন্য বিক্রমপুরের মুসলিম অধিবাসীদের আমন্ত্রণে বাবা আদম শহীদ নামের একজন সুফী সাধক সাড়ে সাত হাজার শিষ্য নিয়ে পবিত্র মক্কা নগরী থেকে সমুদ্র পথে বিক্রমপুরে আগমন করেন এবং বল্লাল সেনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধে বাবা আদম শাহাদত বরণ করেন। তাঁর শাহাদতের পরপরই অবশ্য বল্লাল সেনের মৃত্যু হয়। বাবা আদম শহীদের প্রকৃত নাম ছিল শেখ মহিউদ্দীন আবু ছালেহ আরাবী। বিক্রমপুরের রামপালে আজও তাঁর মাজার বিদ্যমান।

কোন কোন পন্ডিত ‘মাকাতুল হোসেইন’ নামক একটি গ্রন্থের লেখক সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত বাংলা কবি মোহাম্মাদ খানের বরাত দিয়ে লিখেছেন, ‘কয়েকজন মুসলিম মাহীসওয়ার দরবেশ তুর্কী বিজয়ীদের আগেই বাংলায় আগমন করেন। মাহীসওয়ারদের মধ্যে আবর থেকে চট্টগ্রাম আগমনকারী একজন ছিলেন প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) এর পরিবারের সদস্য। মাহীসওয়ারদের সঙ্গী হয়ে জনৈক পীর হাজী খলিল বিশ্ব ভ্রমণে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি একটি সিংহের চামড়া পরিধান করে একটি মাছের পিঠে সওয়ার হয়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করে চট্টগ্রাম পৌঁছেন। ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ অবশ্য মাহীসওয়ারদেরকে মৎস্য সদৃশ বিশেষ যানবাহী বলে উল্লেখ করেছেন। চট্টগ্রাম অবস্থানকালে মাহীসওয়ারদের একজন এক ব্রাহ্মণ কন্যাকে বিয়ে করেন। কিছুদিন পর তিনি ফিরে যান বটে তবে তার স্ত্রী ও পোষ্যরা চট্টগ্রামে থেকে যায়।’ (ঝড়পরধষ ঐরংঃড়ৎু ড়ভ গঁংষরসং রহ ইবহমধষ, চৎড়ভ. অনফঁষ কধৎরস, ঢ়ধমব-৩৪)

এ জাতীয় ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, আরবদের সাথে বাংলার মুসলমানদের যোগাযোগ বাংলায় মুসলামানদের রাজনৈতিক বিজয়ের বহু পূর্ব থেকে এবং তা আধ্যাত্মিক ও বাণিজ্যিক উভয় কর্মধারায়। বলা বাহুল্য, মুসলিম সুফী, সাধকদের এ অঞ্চলে পদচারণা ও কর্ম তৎপরতাই দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয়াভিযানে সাফল্যের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে। ইতিহাসে এরকম তথ্যও পাওয়া যায় যে, বাংলার সাথে আরব-ইরানের সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় একেবারে প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকে। পর্তুগীজ লেখকরা উল্লেখ করেছেন যে, এ ব্যাপারে আরব ও পারসিক বণিকদের সাথে পর্তুগীজ বণিকদের রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়।

মুসলিম রাজনৈতিক বিজয়ঃ

প্রায় সব ইতিহাসবিদই এই মর্মে একমত যে, ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়েই বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা হয় এবং প্রধানত ঐ সময় থেকেই অব্যাহত গতিতে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল, আফগানিস্তান, ইরান, আরব ও তুরস্ক থেকে অসংখ্য মুসলমান বাংলায় আগমন করতে থাকেন। এদের অধিকাংশ আসে সৈনিক হিসাবে আর অবশিষ্টাংশ আসে আগের ধারায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। অবশ্য কেউ কেউ আসে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ও ভাগ্য অনুসন্ধানে।

তুর্কিস্তানের খালজ বংশোদ্ভুত মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী দিল্লীর তদানীন্তন সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের আমলে ১১৯৮ সাল মোতাবেক ৫৯১ হিজরীতে তার সেনাবাহিনী নিয়ে বাংলায় প্রবেশ করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম মুসলিম সেনাপতি যিনি বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে ইসলামের সদর্প আবির্ভাব ঘটান। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় একে একে মুসলিম বসতি ও স্থাপনার বিস্তার হতে থাকে। ১২০৩ সালে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজী বাংলার রাঢ় ও বরেন্দ্র অঞ্চল অধিকার করেন। তিনি যখন বাংলায় অভিযান চালান, তখন এ অঞ্চলের শাসক ছিলেন রাজা রায় লক্ষণ সেন। তার রাজধানী ছিল নদিয়া। অঞ্চলটি লাখনৌটি নামেও পরিচিত ছিল। বখতিয়ার খিলজী রাজধানী নদিয়া আক্রমণ করলে রাজা লক্ষণ সেন রাজপ্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে পলায়ন করে বিক্রমপুরে আশ্রয় নেন। এতে লাখনৌটি পুরোপুরি বখতিয়ারের করতলগত হয়। পর্যায়ক্রমে তিনি বাংলার নবদ্বীপ ও গৌড় অঞ্চলও দখল করেন এবং রংপুরে বাংলাদেশের নতুন রাজধানী স্থাপন করেন। তবে বখতিয়ার খিলজী লক্ষণ সেনের পশ্চাদ্ধাবন না করায় বাংলার পূর্বাঞ্চল তার শাসনের বাইরে থেকে যায়।

এখানে একটি বিষয় স্মরণীয় যে, ‘বাংলায় যখন মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় তখন মঙ্গোলীয় সাম্রাজ্যের ব্যাপক উত্থান ঘটে। সে মোতাবেক তারা মুসলিম খেলাফতের প্রাণকেন্দ্র বাগদাদসহ সমগ্র মধ্য এশীয় অঞ্চলে দখল প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে মধ্য এশিয়া থেকে উৎখাত হওয়া বহু মুসলিম পরিবার উদ্বাস্ত হয়ে তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করে এবং বাংলা অঞ্চলের নতুন শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। প্রধানত কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবিকার্জনের উদ্দেশ্যে আগত ঐ সব মুসলিমদের মাঝে ছিলেন আলেম, পন্ডিত, শাসক, শিল্পী, স্থপতি, নির্মাণকারী, কারিগর ইত্যাদি। এটিও প্রমাণ করে যে, ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার কর্তৃক লাখনৌটি দখলের পর তার গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদের ভাগ্য গড়ার আশায় তার চারদিকে এসে ভিড় জমায়।’ (ডঃ আব্দুল করিম, প্রফেসর এ্যামিরিটাস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান এবং বাংলাদেশ, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ২০০২, পৃষ্ঠা-৩)

তুরস্কের একটি উপজাতি ‘খালজ’ সম্প্রদায়ের সদস্য বখতিয়ার খিলজী ভারতের ইতিহাসে মোহাম্মাদ ঘোরি বলে পরিচিত সুলতান মুইজ উদ্দীন মুহাম্মাদ বিন সাম-এর সেনাপতি ছিলেন। তিনি লাখনৌটিকে রাজধানী করে ১২০৪-৫ সালে বাংলায় যখন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন তখন তা ছিল গজনী ও দিল্লী কেন্দ্রিক তুর্কী সাম্রাজ্যের অংশ। মুহাম্মাদ ঘোরি নিহত হলে পরে দিল্লীর শাসক হন সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক।

বখতিয়ারের সঙ্গে এবং মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম কয়েক বছরে যারা বাংলায় আগমন করেছিলেন তাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি ছিলেন বাবা কোতওয়াল ইস্পাহানী। তদানীন্তন ইরানের প্রাচীন শহর ইস্পাহান থেকে আগত ইস্পাহানী রাজধানী শহর লাখনৌটির কোতওয়াল নিযুক্ত হন। অপর একজন ছিলেন আলী মর্দান খিলজী। বখতিয়ারের সেনাপতিদের একজন আলী মর্দান বখতিয়ারের হত্যাকারী বলে সন্দেহ হওয়ায় বাবা কোতওয়াল তাকে কারারুদ্ধ করেন। বখতিয়ারের সাথে আগত আরেক বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন কাজী রুকনুদ্দিন সমর খান্দি। বিশিষ্ট আলেম, সুফী ও হানাফী মাযহাবের ফকীহ রুকনুদ্দিন সমর খান্দি সুলতান আলাউদ্দিন আলী মর্দান খিলজীর অধীনে বাংলার রাজধানী লাখনৌটি শহরের কাজী নিযুক্ত হন। ‘কিতাবুল ইরশাদ’ নামক বহুল খ্যাত গ্রন্থটির তিনিই ছিলেন প্রণেতা। লাখনৌটিতে থাকাকালে কাজী রুকনুদ্দিন কামরুপের জনৈক যোগী ‘ভোজার ব্রাহ্মণকে ইসলামে দীক্ষিত করেন। ভোজার ব্রাহ্মণ পরে কাজীকে অমৃতকুন্ড নামে সংস্কৃত ভাষায় লিখিত একটি ছোট বই উপহার দেন। বইটি ছিল যোগী দর্শন বিষয়ক। কাজী বইটি আরবীতে অনুবাদ করে তার নাম দেন “হাউজুল হায়াত” এবং পরে ফার্সী ভাষায় বইটি অনুবাদ হয় “বাহরুল হায়াত” নামে। পরবর্তীকালে এক সময় কাজী রুকনুদ্দিন সমর খান্দি বাংলা ছেড়ে চলে যান এবং বুখারায় গিয়ে ইন্তেকাল করেন।

খিলজী বংশীয় বাংলার আরেকজন সুলতান ছিলেন গিয়াস উদ্দিন আয়াজ খিলজী। তিনি ১২২১ সালে বর্তমানে ভারতভুক্ত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূমে একটি খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ খানকাহর নির্মাতা কে ছিলেন তা অজ্ঞাত। তবে তাঁর পিতার নাম ছিল আল মারাখী বলে পরিচিত মুহাম্মাদ। আল মারাখী বাংলা এসেছিলেন আজারবাইজানের মারাখা থেকে। সমসাময়িককালের একজন অন্যতম বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মিনহাজুদ্দিন সিরাজ আল জুবজানীর মতে, বখতিয়ার খিলজী থেকে আইওয়াজ খিলজী পর্যন্ত লাখনৌটির প্রাথমিককালের শাসকগণ রাজধানীসহ নবগঠিত রাজ্যের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনের সুযোগ সৃষ্টি এবং সেই সাথে ইসলামী শিক্ষার বিস্তার ঘটানো।

এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, বাংলায় মুসলিম বিজয় অর্জনের প্রাথমিক দিনগুলোতে বহু মুসলিম আলেম, পণ্ডিত ও সুফীগণ বাংলায় আগমন করেন। তবে তাদের নামের ধরণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তাদের অধিকাংশই ছিলেন ইরানী বংশোদ্ভুত। মুসলিম আমলের গোড়ার দিকে যে সব ইরানী বাংলাদেশে আগমন করেছিলেন তাদের অনেকই ছিলেন উলামা ও মাশায়েখ শ্রেণীভূক্ত এবং তাদের উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই শান্তিপূর্ণ। আইনের ব্যাখ্যাকার হিসাবে ঐ সময়ের আলেমগণ বিরাট ভূমিকা পালন করেন। তাদের কেউ কেউ বাদশাহ-শাহজাদাহদের দরবারের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং শায়খুল ইসলাম ও কাজীর মতো কিছু সরকারী পদ গ্রহণ করেন। আর যারা সুফী শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত ছিলেন তারা খানকাহকেন্দ্রিক নীরব ও শান্ত জীবনযাপনকে অগ্রাধিকার দিতেন। বাদশাহ-শাহজাদাদের দরবারের প্রতি বিভিন্ন মত ও তরিকার সুফীগণ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করতেন। সুফীদের একটি গোষ্ঠী ছিলেন সুহরাওয়ার্দীয়া তরিকার, তাঁরা বাদশাহ-শাহজাদাদের দরবার প্রদত্ত সম্মান ও উপহার উপঢৌকন গ্রহণ করতেন। আবার সুফীদের আরেকটি গোষ্ঠী ছিলেন চিশতিয়া তরিকার, অনেকটা বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতেন। তারা রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ থেকে দূরে থাকতেন এবং শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে কোন কিছু গ্রহণ করতেন না। বাংলায় মুসলিম আমলের গোড়ার দিকে আগত ইরানী বংশোদ্ভুত সুফী সাধকদের মধ্যে তিনজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এঁরা হলেন ঃ শেখ জালাল উদ্দীন তাবরিজী, কাজী মিনহাজ উদ্দীন সিরাজ ও শেখ শরফ উদ্দীন আবু তাওয়ামা। উল্লেখ্য ইরানী সুফীরা শিয়া ছিলেন।

শাসনকর্তাগণ ছিলেনঃ

মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী (১২০৩-৬), মালিক ইজ্জুদিন মুহাম্মাদ শিরীন খিলজী (১২০৬-৮), হুসাম উদ্দীন আইয়াজ (১২০৮-১০), আলী মর্দান বা সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী (১২১০-১৩), সুলতান গিয়াস উদ্দিন আইয়াজ খিলজী (১২১৩-২৭), স্বাধীন সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৩৯-৫৮১), তদীয় পুত্র সিকান্দার শাহ (১৩৫৮-৯১), গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ (১৩৯১-৯৬), সাইফুদ্দিন হামজা শাহ (১৩৯৬-১৪০৬), শামসুদ্দিন (১৪০৬-১৪০৯), শাহাবুদ্দিন বায়েজীদ শাহ (১৪০৯-১৪), যদুসেন ওরফে জালালউদ্দীন মুহাম্মদ শাহ (১৪১৩-৩১), শামসুদ্দিন আহমদ শাহ (১৪৩১-৪২), নাসির উদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৪৪২-৫৯), রুকন উদ্দীন বাররাক শাহ (১৪৫৯-৭৪), শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-৮২), দ্বিতীয় সিকান্দার শাহ (১৪৮২), জালাল উদ্দীন ফতেহ (১৪৮২-৮৬), সুলতান শাহজাদা বাররাক শাহ (১৪৮৬-৮৭), সাইফুদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৪৮৭-৯০), নাসির উদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৪৯০-৯১), শামসুদ্দিন মুজাফফর শাহ (১৪৯১-৯৩), আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯), নাসির উদ্দীন নুসরত শাহ (১৫১৯-৩২), আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৫৩২), গিয়াস উদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৫৩২-৩৮), যুবরাজ মুহাম্মদ সুজা (১৬৩৯-৬০), মুয়াজ্জাম খান মীর জুমলা (১৬৬০-৬৩), দিল্লির খান-দাউদ খান (১৬৬৩-৬৪), শায়েস্তা খান মুমতাজ মহলে তথ্য (১৬৬৪-৭৮), ফিদা খান আজম খান কোকা (১৬৭৮), যুবরাজ মুহাম্মদ আজম (১৬৭৮-৭৯), শায়েস্তা খান (১৬৭৯-৮৮), খানে জাহান (১৬৮৮-৮৯), ইব্রাহিম খান (১৬৮৯-৯৮), যুবরাজ আজিম উদ্দীন (১৬৯৮-১৭১৭), মুর্শিদ কুলী খান (১৭১৭-২৭), সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান (১৭২৭-৩৯), সরফরাজ খান (১৭৩৯-৪০), নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০-৫৬) ও নবাব সিরাজ উদ্দৌলা (১৭৫৬-৫৭)। এর পর পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের মোকাবিলায় নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলায় পর্যায়ক্রমে পুরোপুরি বৃটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐ দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ শতাধিক বছরকাল যারা বাংলা শাসন করেন, তাদের কেউ কেউ আপন শক্তি বলে সিংহাসন লাভ করে দিল্লীর সম্রাটদের অনুমোদন লাভ করেন, কেউ কেউ ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং কেউ কেউ ছিলেন দিল্লী সম্রাটের দরবার থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্ণর, সুবাদার বা নাজিম হিসেবে শাসন কার্য পরিচালনা করেন। তবে এ সব শাসকদের কেউই দখলদারী মানসিকতা নিয়ে বাংলা শাসন করেননি। এ দেশে এসে তারা বাংলার মানুষকে মনে প্রাণে ভালবাসেন এবং বাংলাদেশকে স্থায়ী ও আপন আবাসভূমি হিসাবে গ্রহণ করেন।

বাংলায় মুসলিম শাসনের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১৩৪৫ সাল থেকে ১৪১৪ এবং ১৪৩৭ সাল থেকে ১৪৮৭ সাল পর্যন্ত দুই দফায় ইলিয়াস শাহী বংশের দুটি ধারার শাসন এই সময় বাংলায় মুসলিম শাসন ব্যবস্থা খুবই ভাল অবস্থায় ছিল। ঐ সময় বাংলা ইসলামী চিত্রকলা, বিজ্ঞান, বস্ত্র ব্যবসা ও খাদ্যশস্যে ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করে। স্বদেশী বাংলা ভাষায় সাহিত্যেরও ব্যাপক বিকাশ ঘটে। ঐ শাসকদের মধ্যে একজন গিয়াস উদ্দীন আজম শাহ (১৩৯১-৯৬) চীনের সাথে কুটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং দুরপ্রাচ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণেও প্রতিফলন হিসাবে চট্টগ্রাম বন্দর প্রতিষ্ঠা করেন।###

Share: