সংস্কৃতি ও সভ্যতা

  • Posted: 25/11/2020

লেঃ কঃ (অবঃ) ডঃ শেখ আকরাম আলী

এ যুগের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব হলো সংস্কৃতি ও সভ্যতার দ্বন্দ্ব। সংস্কৃতি কি আর সভ্যতা কি এ বিষয়ে আমাদের পরিষ্কার ধারণা নেই। আমরা সভ্যতাকে সভ্যতা বলে চালিয়ে দিচ্ছি। সংস্কৃতির মধ্যে সভ্যতার উপাদান আছে। আবার সভ্যতার মধ্যেও সংস্কৃতির উপাদান আছে। তাই বলে দুটো এক জিনিস নয়, দুটি আলাদা প্রত্যয় ও আলাদা বিষয়। সংস্কৃতির ইংরেজী Culture শব্দ ব্যুৎপত্তিগতভাবে Cult (ল্যাটিন Cultus) শব্দটির সাথে সম্পর্কিত। অপরদিকে সভ্যতা বা Civilization সম্পর্কিত Civis শব্দটির সাথে। যার অর্থ নাগরিক। গ্রাম যদি সংস্কৃতি হয় তাহলে শহর হলো সভ্যতা। সভ্যতার পরিবর্তন হয়, সংস্কৃতিরও পরিবর্তন হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনে সংস্কৃতির ঈঁষঃ-ই রয়ে যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে সভ্যতা হারিয়ে যায় কিন্তু সংস্কৃতি হারায় না। কারণ সভ্যতা পার্থিব এবং সংস্কৃতি পারমার্থিক।

সংস্কৃতির উৎস সৃষ্টি থেকে, সভ্যতার উৎস মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বস্তুগত আদান-প্রদান থেকে। মানুষের সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার সম্পর্ক এবং মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক-সংস্কৃতির সূত্রপাত এখানেই। আর সভ্যতার সূত্রপাত হলো মানুষের প্রয়োজনে পৃথিবীকে বা প্রকৃতিকে পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের সূচনা থেকে। সংস্কৃতি হলো মানুষের উপর ধর্মের কিংবা মানুষের উপর মানুষের প্রভাবের ক্রিয়া। আর সভ্যতা হলো পৃথিবীর উপর মানুষের বুদ্ধিমত্তার ফলশ্রুতি, পৃথিবীকে নিজের প্রয়োজনে পরিবর্তন করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। সংস্কৃতির আবেগ, উদ্বেগ ও উচাটন সৃষ্টিলোকের স্রষ্টার সন্ধানে। সভ্যতার উচাটন নভোমন্ডলে চন্দ্রের আবিষ্কারের পর মঙ্গলগ্রহের আবিষ্কারে। সংস্কৃতির প্রেম সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়া, সভ্যতার প্রেম সৃষ্টিকে পাওয়া। সংস্কৃতি ‘বিশ্বসুন্দরী’র সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়ার আবেগে উদ্বেল আর সভ্যতা বিশ্বসুন্দরীকে পাওয়ার আবেগে চঞ্চল। সংস্কৃতির স্বরূপ বেহেশতে, সভ্যতার স্বরূপ পৃথিবীতে। সংস্কৃতি হলো অনবরত নিজেকে সৃষ্টি করা আর সভ্যতা হলো আরাম আয়েশ ও Comfort-এর উপকরণ সংগ্রহ করা। সংস্কৃতি মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে আর সভ্যতা মানুষকে সাহেব-বিবি-গোলামের পার্থক্য নির্ণয়ে ব্যস্ত রাখে। সংস্কৃতির মাইলস্টোন হলো প্রকৃত মানুষ হওয়া, সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধি হওয়া। সভ্যতার মাইলস্টোন হলো আরামদায়ক পৃথিবী গড়ে তোলা। সভ্যতার আর্তি সুখকে কেন্দ্র করে আর সংস্কৃতির আর্তি প্রেমকে কেন্দ্র করে।

সভ্যতা বিরহকে সহ্য করতে পারে না আর সংস্কৃতির ব্যঞ্জনাই বিরহ ও পৃথিবীর যন্ত্রণাকেন্দ্রিক। সভ্যতা পেতে চায় হারাতে চায় না, সংস্কৃতি ফিরে পেতে চায় এ কারণে হারাতে সে ব্যাকুল। এ হারানো তার জন্য ত্যাগ, এ ত্যাগের আনন্দেই সে জীবনকে শান্তিময় করে তোলে। নতুন করে পাওয়া আর ফিরে পাওয়ার মধ্যে যে তফাৎ সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে তফাৎও ততটুকু। আমি যেখানে ছিলাম সেখানে ফিরে যাব। সংস্কৃতি এই নস্টালজিয়ায় ভোগে। সভ্যতা নতুন নতুন পাওয়ার আনন্দে পুরনো পাওয়াকে উপেক্ষা করে। সংস্কৃতির প্রেম এক রৈখিক, সভ্যতার প্রেম বহুমাত্রিক। সে শুধু পেতে চায়, ভোগ করতে চায়, আনন্দ চায়। সুখ চায়, শান্তি চায়। আর সংস্কৃতি শুধু চাহিদাকে হ্রাস করতে চায়। প্রয়োজনকে সংযত করতে চায় কারণ সে প্রেমিক, সে বিরহী এবং সে মুসাফির। সুতরাং ন্যূনতম সামগ্রী যতটুকু না হলে নয় ততটুকু সে বহন করে। অযাচিত বোঝা বাড়িয়ে নিজের জীবনকে সে দুঃসহ, দুর্বহ ও যন্ত্রণাকাতর করতে চায় না, বিপরীত দিকে নতুন নতুন সুখের সন্ধানে সভ্যতা নতুন নতুন সামগ্রী তৈরি করছে। জীবনকে বহুব্যঞ্জনায় বহুমাত্রায় উপভোগের জন্য। কারণ সে প্রেমিক, বিরহী বা মুসাফির নয়।

সংস্কৃতি মানুষকে উন্নত করতে চায়, মানুষের অন্তরদৃষ্টি খুলে দিতে চায়, মানুষের অন্তরনিষ্ঠ সুরকে ধরতে চায়, মানুষের আশা ও আকাংখাকে পারমার্থিক দিকনির্দেশনায় প্রবাহিত করতে চায়, পশুর সাথে মানুষের ব্যবধানকে সুস্পষ্ট করতে চায়। মানুষের মধ্যে মানুষের জন্য, পারিপার্শ্বিকতার জন্য, প্রকৃতির জন্য, জীব-জন্তুর জন্য, প্রেম-মমতা ও ভালবাসার নতুন নতুন তোরণ উদ্বোধন করতে চায়। মানুষকে তার স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর জন্য ইনসানে কামেল বানাতে চায় আর সভ্যতা সমাজকে উন্নত করতে চায়, সমাজের উৎকর্ষ চায়, সমাজের সমৃদ্ধি, বিকাশ ও প্রগতি চায়। সমাজে বাহ্যিক আড়ম্বর, অহংকার, আভিজাত্যবোধ, অহংবোধ সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে সভ্যতা একসাথে সকল সমাজের উন্নতি ও সমৃদ্ধি চায় না, চাইলে পার্থক্য বুঝা যাবে না। সভ্যতার মাত্রাও নির্ণয় করা যাবে না। সুতরাং সভ্যতা সমাজের প্রগতি চাইলেও সব সমাজের প্রগতি একসাথে চায় না। এক্ষেত্রে সভ্যতা বিভেদ সৃষ্টি করে। ‘উন্নত’, ‘অনুন্নত’, ‘উন্নয়নশীল’, ‘তৃতীয়বিশ্ব’, সৃষ্টি করে, সৃষ্টি করে জাতিভেদ ও জাতীয়তাবাদ। এক্ষেত্রে সংস্কৃতি দুনিয়ার সকল মানুষকে একচোখে দেখে, দুনিয়ার সকল মানুষকে আত্মশক্তি অর্জনের কথা বলে। মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে না। মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদা, আত্মসম্মানবোধ, বিবেক, বুদ্ধি ও জ্ঞানের মাধ্যমে কল্যাণমুখী বিবেচনার আকাংখা সৃষ্টি করে। সংস্কৃতি বিশ্বাস করে প্রতিটি মানুষ উন্নত হলে সমাজ উন্নত হবে। সংস্কৃতির প্রগতির ধারণা এখানেই নিবিষ্ট। সুতরাং সংস্কৃতির বাহক মানুষ, সভ্যতার বাহক সমাজ।

সংস্কৃতি মানুষকে আলোকিত করে, উজ্জ্বল করে। সভ্যতা শিক্ষিত করে, জ্ঞানী করে। সভ্যতা জ্ঞানাহরণে ব্যস্ত থাকে, সংস্কৃতি ব্যস্ত থাকে ধ্যানে। জ্ঞানার্জন পৃথিবীকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আর ধ্যান নিজেকে জানার জন্য। জ্ঞান নিজেকে বিস্তার করে, ধ্যান নিজেকে নিজের মধ্যে নিমজ্জিত করে। জ্ঞানের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক ওতপ্রোত। বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ করে, বিশ্লেষণ করে, নতুন নতুন আবিষ্কারে উদ্বুদ্ধ করে। এই উদ্বুদ্ধ আকাংখা অর্থাৎ সুখ লাভের উপলব্ধি নিহিত। ধ্যানও পর্যবেক্ষণ করে, বিশ্লেষণ করে, একই সাথে পার্থিব ও পারমার্থিক করার মধ্যে ইচ্ছা সম্পর্ক নিয়ে। ধ্যানের পথ শিল্পীর পথ, বৈজ্ঞানিকের পথ নয়। বৈজ্ঞানিকের পথ গবেষণায়, গবেষণা ও ধ্যান এক নয়। শিল্পী ধ্যান করেন বৈজ্ঞানিক করেন গবেষণা। ধ্যান নিজের উপর আধিপত্য করে, বিজ্ঞান বা গবেষণা প্রকৃতির উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট আলীয়া আলী ইজেতবেগোভিচ ঠিকই বলেছেন, “আমাদের স্কুল কলেজের শিক্ষা আমাদের সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়, সংস্কৃতিকে নয়।’

শিক্ষা মানুষকে ভাল, স্বাধীন বা মানবিক করে না বরং শিক্ষা মানুষকে দক্ষ, সমর্থ ও উপযোগী করে তোলে। শিক্ষা মানুষকে অধিকতর প্রজ্ঞার সাথে সমাজকে শোষণ-শাসন করতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী হতে শিখিয়েছে আধিপত্যবাদী হতে, শিখিয়েছে আগ্রাসী হতে। ট্যাসিটাস বলেছেন, ‘রোমানদের চেয়ে বার্বাররা তাদের দাসদের সাথে অনেক ভাল ব্যবহার করতো।’

প্রসঙ্গক্রমে গণসংস্কৃতির কথা আসে। আগেই বলেছি, সংস্কৃতি ব্যক্তি মানুষের জন্য, সভ্যতা গণমানুষের জন্য। সুতরাং গণসংস্কৃতি সভ্যতার বিষয়, সংস্কৃতির বিষয় নয়। এখানে ব্যক্তিকে নয়, গধংং-কে উজ্জীবিত করার প্রয়াস থাকে। এভাবে উন্মুক্ত নাটক, সিনেমা, টেলিভিশন, ওপেন এয়ার কনসার্ট, নাইট ক্লাব, ব্যালে নৃত্য সভ্যতার অনুষঙ্গ। অপরদিকে নাটক, কবিতা, লোকগাঁথা, লোককথা, পুরাণগাঁথা, থিয়েটার, গ্যালারি, জাদুঘর, গ্রন্থাগার, শিল্পকলা, কারুকলা, ভাস্কর্য, চারুকলা সব ধরনের সাহিত্যকর্ম সবই সংস্কৃতির বিষয়বস্তু। লোকসংস্কৃতি ও সংস্কৃতির বিষয় সভ্যতার বিষয় নয়।

সভ্যতা ও সংস্কৃতির এই বিভাজন থেকে সংস্কৃতি কর্মীদের অনুধাবন করতে হবে আসলে তারা কোন প্রত্যয়ের প্রতিনিধি। তারা কি সভ্যতার প্রতিনিধি নাকি সংস্কৃতির প্রতিনিধি। যারা সভ্যতার উন্নতি, বিকাশ ও সমৃদ্ধি চান, তারা সভ্যতার অগ্রযাত্রায় অবদান রাখুন, এ কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর যারা সংস্কৃতির স্থিতি, সমৃদ্ধি ও বিকাশ চান, তারা সেইভাবে প্রস্তুতি নিন, নিজেকে সেই প্রত্যয়ে তৈরী করুন। ধ্যানী হোন, নিজস্ব ঐতিহ্য, ইতিহাস ও লোক-সংস্কৃতির আবাহ নতুন নতুন সৃষ্টি-মুখরতায় নিমগ্ন হোন। সংস্কৃতির কাজই মগ্ন বা নিমগ্ন হওয়া।###

Share: