বিবি যায়নাব (আ.)-এর জন্মদিন ও সেবিকা দিবস

  • Posted: 02/01/2021

অনুবাদঃ সাইয়েদ কাযিম রেজা

সেবিকা শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটা এমন এক শব্দ যা বন্ধুত্ব, উদারতা, আত্মত্যাগ ও ক্ষমার সঠিক এবং যথার্থ সংজ্ঞা। একজন সেবিকা রাত ও দিনের মধ্যে তফাৎ করেন না। একজন ফেরেস্তার ন্যায় তিনি সর্বদা পীড়িতের বিছানার পাশে অবস্থান করেন। তিনিও তার রুগির যন্ত্রনায় কাতর হন, সমান বেদনা অনুভব করেন। একজন সেবিকা কিছু বিশেষ মুহুর্তে যে বদান্যতামূলক আচরণ দেখান তা অনেক সময় রুগির খুব নিকট আত্মিয় সেই সেবা প্রদানে প্রস্তুত থাকেন না। সেবিকার পেশা মোটেও সাধারণ পেশা নয়। বরং এটা একটি মহৎ ও মূল্যবান পেশা। একজন সেবিকা টাকা পয়সা বা কোন পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য কাজ করেন না কারণ, তিনি তার এই নিঃস্বার্থ পরিশ্রমের বিনিময়ে যা পারিশ্রমিক পান তা সেই তুলনায় অনেক নগণ্য। যখন তিনি তার রুগিকে ব্যথায় কাতর হতে দেখেন তখন তিনি সব ভুলে গিয়ে নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে তার রুগির সেবায় মনোনিবেশ করেন। বিবি যয়নাব (আ.)-এর জন্মদিনে ইরানে ‘সেবিকা/ ধাত্রী দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।

হিজরি ৬১ সনের মুহাররাম মাসে আশুরার সেই ভয়ানক রাত্রিতে যখন পাপিষ্ঠ শত্রুরা আহলুল বাইত (আ.)-এর তাবুতে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ছোট শিশুরা ভয়ে কারবালার মরুভুমিতে দৌড়ে পালিয়ে যায় তখন সাইয়্যেদা যয়নাব (আ.) একটি অগ্নিদগ্ধ তাবুতে মহিলাদেরকে ও শিশুদেরকে সান্তনা দেন, ধৈর্যের সাথে তাদের দুঃখ ও যন্ত্রণা ভাগাভাগি করে নেন এবং কারবালায় জ্বরে আক্রান্ত হযরত সাজ্জাদ (আ.) কে সেবা করেন।

সম্ভবতঃ অসুস্থদের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে একজন সেবিকা যে সহিষ্ণুতা, ভালবাসা, আত্মত্যাগ প্রদর্শন করেন তা মূলতঃ সাইয়্যেদা যয়নাব (আ.)-এর ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং সীমাহীন আত্মত্যাগের-ই প্রদর্শন। অতএব, সাইয়েদা যয়নাব (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগ ও কষ্টকে সম্মানার্থে সুধি সমাজ দ্বারা ইসলামের এই মহিয়সি নারীর শুভ জন্মদিনকে “সেবিকা দিবস” হিসেবে নামকরণ করা অত্যন্ত সঠিক ও যথার্থ।

সাইয়্যেদা যয়নাব (আ.) ছিলেন শহীদদের অর্জন এবং সংগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি সেই ব্যক্তি যিনি শুধু মুয়াবিয়া পুত্র ইয়াযিদ ও তার অনুসারীদের অন্তসারশুন্য ও মিথ্যা ইচ্ছেকে ধূলিস্যাৎ করেননি বরং ইসলামকেও রক্ষা করেছেন।

বিবি যয়নাব (আ.) শুধু ইসলামকেই রক্ষা করেননি বরং আমাদের মহানবী (সা.) ও ইমাম হোসেন (আ.)-এর পবিত্র রক্ত বিসর্জনের স্মৃতি রক্ষা করেছেন। তাছাড়া বিবি তার পরবর্তী বংশধরদের জন্য নিয়ে এসেছেন মানবাধিকার রক্ষায় সাহসিকতা, সহ্যশক্তি ও সংগ্রাম এর হাজারো বার্তা। আশুরার এই সংকটময় অবস্থায় ইয়াজিদ এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ক্ষেত্রে কারবালায় বিবি যয়নাব (আ.) একজন আত্মবিসর্জন, সহ্যশক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন। তিনি আহতদেরকে তার সাধ্যমত খুব যত্নের সাথে সেবা শ্রুশুষা করেন যা ছিল সেবা প্রদানের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

যখন একজন সেবিকা তার ভিতরে সেবিকাসূলভ সকল গুণাবলি ধারণ করে উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরিণত হন তখন তিনি হয়ে উঠেন নৈতিক মূল্যবোধ, আইন-কানুন মান্যকরণ, অর্পিত দায়িত্ব পালন, সহানুভূতি, দয়া, সচেতনতা, দায়িত্ববোধ, কঠর ও নিরলস পরিশ্রমের ধারক, বাহক ও প্রতীক।

বিবি যয়নাব (আ.) শুধু মহিলা ও শিশুদের জন্য সেবিকারূপে ভূমিকা পালন করেননি বরং তিনি তাদের সেবা শুশ্রূষা করেন যারা আশুরার সেই সন্ধায় তাবুতে অবস্থানকালে যাদের কাপড় ও শরীর ভয়ানকভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল। তিনি তাদের সান্ত্বনা দেন যারা মানসিকভাবে পিড়ীত ও কষ্ট পেয়েছিলেন সে সকল শত্রুদের আনন্দ দেখে যারা নবী পরিবারকে কষ্ট দিয়ে আনন্দে আত্মহারা ছিল।

আশুরার সন্ধ্যা হতে সেবা প্রদানের কাজ শুরু করে তিনি কুফা, কারবালা ও মদিনা পর্যন্ত তার এই মহান দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। বিবির এই বিভিন্ন উত্থান-পতনে পুনঃজীবন থেকে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই যে কোন বাধাই বিবিকে তার নিজ দায়িত্ব পালনে আটকাতে পারেনি। এমনকি তার সবচেয়ে প্রিয় আত্মীয়-স্বজন এর মৃত্যু বা তার নিজের শারীরিক ও মানসিক পীড়াও তাকে তার নিজ দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি।

সূত্রঃ (আলীর মেয়ে যায়নাব (আঃ), খন্ড -১, পাতা ৭৭)

Share: