নবী বংশের মহিয়সী নারী হযরত ফাতেমা মাসূমা (সা. আ.)

  • Posted: 23/06/2020

পহেলা জিলক্বদ ১৭৩ হিজরি পবিত্র মদীনা নগরীতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধরের গৃহে এক নতুন মুখের আগমন ঘটে। আহলে বাইতের ধারায় সপ্তম ইমাম হযরত মূসা ইবনে জাফর আল-কাযিম (আ.)-এর স্ত্রী নাজমা খাতুনের প্রথম সন্তান অষ্টম ইমাম আলী ইবনে মূসা আর-রেযা (আ.)-এর জন্মের দীর্ঘ ২৫ বছর পর কোলে আসে এক নূরানী কন্যা।

ইমাম আলী আর-রেযা (আ.) হযরত ফাতেমাকে তাঁর ইন্তেকালের পর উপাধি প্রদান করেছিলেন ‘মাসূমা।’ অতঃপর তিনি সকলের নিকট পরিচিত হলেন ‘ফাতেমা মাসূমা’ নামে।
ফাতেমা মাসূমার পিতা ইমাম মূসা ইবনে জাফর (আ.) ‘আল-কাযিম’ (ক্রোধ দমনকারী) নামে পরিচিত। তিনি ১২৮ হিজরিতে মদীনার নিকটবর্তী আবওয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। আব্বাসী খলিফা হারুন-অর-রশিদের সময়ে দীর্ঘদিন জেল-যুলুম ও নির্যাতন ভোগ করেন। হারুন-অর-রশিদ এ ভয়ে অত্যন্ত ভীত ছিল যে, মহানবী (সা.)-এর এই উত্তরসূরির জন্য মুসলমানরা হয়তো তাকে পরিত্যাগ করবে। অবশেষে হারুন ১৮৩ হিজরিতে ইমাম মূসা আল-কাযিমকে বিষ প্রয়োগ করায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। বাগদাদের কাযিমিয়ার তাঁর মাযার রয়েছে যা বিশ্ব মুসলিমের একটি প্রসিদ্ধ যিয়ারতগাহ।

হযরত মাসূমার দাদী হযরত হামিদা বর্ণনা করেন, এক রাতে স্বপ্নে নবী করীম (সা.) তাঁকে বললেন : ‘নাজমাকে তোমার পুত্র মূসা ইবনে জাফরের বধূ বানাও যাতে শীঘ্রই ধরণীর শ্রেষ্ঠ মানুষ তার থেকে জন্ম নেয়।’ হযরত হামিদা স্বপ্নাদেশ পালন করলেন এবং পরবর্তীকালে নাজমা খাতুন দুই সন্তানের জননী হলেন। আর তাঁদের একজন ইমাম আলী ইবনে মূসা আর-রেযা (আ.) অপরজন হযরত ফাতেমা মাসূমা।

হযরত ফাতেমা মাসূমা শ্রেষ্ঠ পিতা-মাতা, পরিবার ও ঐতিহ্য পেয়েছিলেন। জীবনের প্রথম ৬ বছর তিনি তাঁর মহান পিতা ইমাম মূসা আল-কাযিমের কাছ থেকে সার্বিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তাঁর মতো শিশুর জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক সচেতনতা ছিল খুবই উন্নত মানের। একবার তাঁর পিতার অনুপস্থিতিতে মদীনায় আগত ইমামের কিছুসংখ্যক অনুসারীর প্রশ্নের উত্তর তিনি লিখিত আকারে দেন। ফেরার পথে অনুসারিগণ ইমাম মূসা আল-কাযিমের সাক্ষাৎ পেয়ে তাঁদের আগমন ও প্রশ্নোত্তর প্রাপ্তির বর্ণনা দেন। হযরত ফাতেমা মাসূমা কর্তৃক দেয়া উত্তরপত্রটি তিনি দেখতে চান। সঠিক ও সুন্দর বাচনভঙ্গিতে দেয়া সব প্রশ্নের উত্তর পাঠের পর ইমাম মন্তব্য করেন : ‘আমার পিতা তার জন্য উৎসর্গীত হোক।’ ইমাম এ কথা তিনবার বলেন। একই কথা মহানবী (সা.) হযরত ফাতেমা যাহরা (আ.)-এর ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন। এ ঘটনা শিশু ফাতেমা মাসূমার বিশেষ প্রতিভার প্রকাশ।

ইমাম মূসা আল-কাযিম (আ.) আব্বাসী খলিফা কর্তৃক কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর থেকে হযরত ফাতেমা মাসূমা ২১ বছর তাঁর ভাই ইমাম আলী আর রেযা (সালামুল্লাহ আলাইহি)-এর সরাসরি অভিভাবকত্বে লালিত-পালিত ও প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন।

ফাতেমা মাসূমা ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী, বিদুষী, বিশুদ্ধ ধারায় প্রসিদ্ধ হাদীস বর্ণনাকারী ও ইসলাম প্রচারক বিশেষজ্ঞ নারীদের অন্যতম। তিনি ছিলেন দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত ও মহানুভবতার অধিকারিণী; অত্যধিক ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল। তিনি অল্পবয়স্কা হয়েও আহলে বাইতের কাছে বিশেষ মর্যাদা, উচ্চ সম্মান ও গুরুত্বের অধিকারিণী ছিলেন।

আব্বাসী খলিফা মামুন ইমাম আলী আর-রেযা (আ.)-কে ২০০ হিজরিতে মদীনা থেকে মারভে (বৃহত্তর খোরাসানের একটি শহর) নিয়ে আসে। হযরত ফাতেমা মাসূমা (সা. আ.) ২০১ হিজরিতে তাঁর ভাই ইমাম রেযার সাথে সাক্ষাতের জন্য মদীনা থেকে ইরানের দিকে যাত্রা করেন। মারভগামী কাফেলা পথিমধ্যে ইরানের মারকাজী প্রদেশের সভে শহরে পৌঁছলে রাসূল (সা.)-এর পরিবারের শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। এতে কাফেলার ২৩ জন পুরুষ সদস্য নিহত হন এবং হযরত মাসূমার খাদ্যে বিষ প্রয়োগ করায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি জিজ্ঞাসা করেন : ‘আমার ও কোমের মাঝে কতখানি দূরত্ব আছে?’ তখন তাঁকে বলা হয় : ‘দশ ফারসাখ’ (১ ফারসাখ = ৬.২৮ কি. মি.)। এ খবর কোম শহরে বসবাসকারী সাদের সন্তানদের (মালিক আশতারের পুত্র) কাছে পৌঁছলে তাঁরা সভে চলে যান এবং তাঁকে কোমে এসে বসবাস করার জন্য অনুরোধ করেন। হযরত ফাতেমা কোমে আসেন এবং খাযরাজের পুত্র মূসা তাঁকে নিজ গৃহে স্থান দেন। হযরত ফাতেমা মাসূমা কোমে ১৬ বা ১৭ দিন অবস্থান করার পর পূর্ব অসুস্থতার কারণে ২০১ হিজরির ১০ বা ১২ রবিউস সানী মাত্র ২৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। মূসা তাঁর নিজের জমিতে হযরত মাসূমাকে দাফন করেন।

পবিত্র কোম নগরী হচ্ছে আহলে বাইতের ইমামগণের হারাম। ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী আল-বাকের (আ.) কর্তৃক ৭৩ হিজরিতে কোম নগরীর গোড়াপত্তন হয়েছিল। এরপর থেকেই এই নগরী ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে। বিশিষ্ট ধার্মিক ব্যক্তিগণ এখানে চলে আসতে শুরু করেন।

পবিত্র কোম নগরী ও হযরত ফাতেমা মাসূমার বিশেষ মর্যাদা পবিত্র ইমামগণের কয়েকটি বর্ণনায় পাওয়া যায়। ইমাম জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আস-সাদিক (আ.) বলেন : ‘মহান আল্লাহর একটি হারাম আছে, আর তা হলো পবিত্র মক্কা মুকাররামা; মহানবী (সা.)-এর একটি হারাম আছে, আর তা হলো মদীনা মুনাওওয়ারা; আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর একটি হারাম আছে যা হচ্ছে কুফা; আর আমাদেরও একটি হারাম আছে তা হচ্ছে কোম নগরী। অতি সত্বর ফাতেমা নাম্নী আমার বংশোদ্ভূত এক নারী এ নগরীতে চির নিদ্রায় শায়িত হবে।’

আহলে বাইতের ইমামগণ তাঁদের প্রপিতামহ রাসূলে খোদা (সা.)-এর নিকট থেকে যে জ্ঞান লাভ করেছিলেন তা দ্বারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ভবিষ্যতে পবিত্র কোম নগরী এক বিরাট মর্যাদার অধিকারী হবে এবং এর অধিবাসীরা আহলে বাইত ধারায় দ্বাদশ ও শেষ ইমাম মাহদী (আ.)-এর বিশ্বস্ত সাথিদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।

হযরত ফাতেমা মাসূমার কোমে আগমন ও ইন্তেকাল এবং তাঁকে কোমে সমাহিত করার পর থেকে এ নগরীর মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়। পবিত্র কোম বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ধর্মীয় ও জ্ঞান নগরী। বিংশ শতাব্দীর অবিসংবাদিত আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতা হযরত ইমাম খোমেইনী (রহ.) ছিলেন কোমের ছাত্র ও শিক্ষক। এখান থেকেই তিনি ১৯৬৩ সনে ইরানের সফল ইসলামী বিপ্লবের সূচনা করেন।

হযরত ফাতেমা মাসূমাকে খাযরাজের পুত্র মূসা যেখানে দাফন করেছিলেন আজও তাঁর কবর সেখানেই বিদ্যমান। প্রথমে মাদুর ও চাটাইনির্মিত ছাউনি তাঁর কবরের ওপর স্থাপন করা হয়েছিল। এরপর ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর মেয়ে হযরত যায়নব কর্তৃক হযরত ফাতেমা মাসূমার কবরের ওপর একটি গম্বুজ এবং তৎসংলগ্ন একটি হলঘর নির্মাণ করা হয়। কালের পরিক্রমায় অনেক সংস্কার ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ হয়েছে। বর্তমানে ফাতেমা মাসূমার মাযার ১৩,০০০ বর্গমিটারেরও বেশি এলাকা নিয়ে একটি বিশাল স্থাপনা। সারা বিশ্বের লাখো মানুষের যিয়ারতগাহ। ইমাম আলী ইবনে মূসা আর-রেযা (আ.) বলেন: ‘যে ব্যক্তি কোমে মাসূমার কবর যিয়ারত করল সে যেন আমাকেই যিয়ারত করল।’ মানুষ এখানে আসে মহান আহলে বাইতের উসিলায় আধ্যাত্মিক কল্যাণ, উদ্দীপনা ও উন্নতি লাভ, মনোবাসনা পূরণ, রোগমুক্তি ইত্যাদির মানসে। এখানে অনেক অসাধারণ ঘটনা ঘটে যা মাযারের একটি রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করা হয়।

সংকলন : মুহাম্মাদ হুমায়ুন কবির।###

Share: