তাফসিরে কুরআন পবিত্র কুরআনের সহজ ব্যাখ্যা (পর্ব - ১)

  • Posted: 02/04/2018

মূল: হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন শেখ মুহসিন ক্বারাআতী, অনুবাদ: মোঃ মাঈনউদ্দিন
[হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন শেখ মুহসিন ক্বারাআতী একজন স্বনামধন্য মুফাসসিরে কুরআন যাঁর সুখ্যাতি সারা বিশ্বজুড়ে। ইরানে জন্মগ্রহণকারী পবিত্র কুরআনের এ প্রখ্যাত মোয়াল্লেম ও মুফাসসির জনাব মুহসিন ক্বারআতীকর্তৃক কুরআনের ব্যাখ্যা সম্বলিত গ্রন্থ “তাফসীরে নূর” যা ইতোমধ্যে পাঠক সমাজে সমাদৃত ও প্রশংশিত হয়েছে। ফার্সী ভাষায় লিখিত “তাফসীরে নূর” এর বাংলা ভাষায় অনুবাদ করার কঠিন দায়িত্ব পালন করেছেন হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ মাঈনউদ্দীন যা এখন থেকে ধারাবাহিকভাবে “পাক্ষিক ফজর” এ “পবিত্র কুরআনের সহজ ব্যাখ্যা শিরোনামে” প্রকাশিত হতে থাকবে ইনশাল্লাহ।-প্রকাশক]
সূরা হামদ : খন্ড: ১ : সূরা: ১ : আয়াত সাংখ্যা:৭
بسم الله الرحمن الرحیم
সূরা হামদ (حمد) -এর আকার:
সূরা হামদ (حمد), যার অপর নাম হলো ফাতিহাতুল কিতাব (فاتحة الکتاب)। এ সূরায় ৭টি আয়াত আছে। (সাত সংখ্যাটি আকাশের সংখ্যা, তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার মধ্যে সাঈ করা, শয়তানকে (হজ্জের সময়) পাথর মারার সংখ্যা প্রকাশ করে।) এটিই একমাত্র সূরা যা প্রত্যেক মুসলমানকেই নামাযে দৈনিক ন্যূনতম দশবার পাঠ করতে হয়; নতূবা তার নামায বাতিল হয়ে যায়। لاصلاة الا بفا تحة الکتاب ফাতিহাতুল কিতাব (সূরা হামদ) ব্যতীত কোন নামায হয় না। (মুস্তাদরাক খন্ড : ৪, হাদীস নং ৪৩৬৫)
যাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী কর্তৃক রাসূল (সাঃ) থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েত অনুসারে, এ সূরাটি হলো কোরআনের সর্বোৎকৃষ্ট সূরা এবং ইবনে আব্বাসের বর্ণনা মতে, সূরা হামদ হলো কোরআনের ভিত্তি বা মূল। অপর এক হাদীসে এসেছে যে, যদি এ সূরাটি সত্তর বার মৃত ব্যক্তির উপর পাঠ করা হয় এবং সে জীবিত হয়ে যায়, তবে আবাক হয়ো না। (বিহার খন্ড : ৯২, পৃ:২৫৭ )
এ সূরার নামকরণ ‘ফাতিহাতুল কিতাব’ থেকে বুঝা যায় যে, কোরআনের সমস্ত আয়াত রাসূল (সা:)-এর সময়ই সমবেত করা হয়েছে এবং কিতাব বা পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছে। আর তাঁর (সা:) নির্দেশেই এ সূরাটিকে কিতাবের (কোরআন) শূরুতেই স্থান দেয়া হয়েছে।
অনুরূপ, আমরা হাদীসে সাক্বালাইনে পড়ি যে, মহানবী (সা.) বলেন: انی تارک فیکم الثقلین کتاب الله وعترتی আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি মূল্যবান বস্তু রেখে যাচ্ছি আল্লাহর কিতাব (কোরআন) এবং আমার বংশধর। (বিহার খন্ড : ২, পৃ:১০০)
এ হাদীসটি থেকেও বুঝা যায় যে, এলাহী আয়াতসমূহ মহানবীর (সা:) সময়ই (অর্থাৎ তিনি জীবিত থাকা কালীন) কিতাবুল্লাহ (کتاب الله) বা আল্লাহর কিতাব রূপে সমষ্টিবদ্ধ হয়েছে এবং এ নামেই মুসলমামানদের মধ্যে পরিচিতি ও খ্যাতি লাভ করেছিল। বরকতময় সূরা ফাতিহা মহান আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলী, কিয়ামতের বিষয়, হাক্ক বা সত্যের পথ পরিচিতি ও সে পথে চলতে পারার জন্যে আবেদন এবং মহান আল্লাহর প্রভুত্ব (ربو بیت) ও কর্তৃত্ব মেনে নেয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে। অনুরূপ, আল্লাহর ওয়ালীগণের পথে অব্যাহত থাকার প্রতি আগ্রহ এবং গোমরাহ, পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের পথের প্রতি অসন্তুষ্টি ও ঘৃণা প্রকাশিত হয়েছে।
সূরা হামদ (স্বয়ং কোরআনের মতই ) শারীরিক ব্যাথা বেদনা থেকে যেমন মুক্তির কারণ, সেরূপ মানসিক রোগসমূহ থেকেও মুক্তির কারণ। (আল্লামা আমীনী (রহ.) ‘ফাতিহাতুল কিতাবের’ তাফসীরে এ প্রসঙ্গে অনেক রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন।)
সূরা ‘হামদ’-এর প্রশিক্ষণমূলক পাঠসমূহ:
সূরা ‘হামদ’-এর তাফসীরের পূর্বে এ সূরা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলোর উপর আলোকপাত করবো এবং পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে বিস্তৃতরূপে আলোচনা করবো।
১. মানুষ সূরা হামদ পাঠের ক্ষেত্রে بسم الله (শুরু করছি আল্লাহর নামে) বলার মাধ্যমে আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে নিজ প্রত্যাশার বিচ্ছেদ ঘটায়।
২. رب العالمین (বিশ্বের প্রভু),یوم الدین مالک (বিচার দিবসের মালিক) বলার মাধ্যমে সে অনুভব করে যে, সে প্রভুর দাস ও কর্তৃত্বাধীন। ফলে সে সেচ্ছাচারিতা ও অহংকার বর্জন করে।
৩. عالمینশব্দের মাধ্যমে নিজের সাথে সমস্ত অস্তিত্বশীলের সম্পর্ক স্থাপন করে।
৪. الرحمن الرحیم বলার মাধ্যমে নিজেকে মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ছায়াতলে বলে মনে করে।
৫. یوم الدین مالک বলার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজের উদাসীনতা ও অসচেতনতার পরিসমাপ্তি ঘটায়।
৬. ایاک نعبدবলার মাধ্যমে খ্যাতির লোভ ও লোক দেখানো কাজ পরিহার করে।
৭.ایاک نستعین দ্বারা প্রকাশ করে যে, পরাশক্তিকে ভয় করে না।
৮.انعمت থেকে বুঝে যে, নেয়ামতসমূহ তাঁর (আল্লাহর ) হাতেই।
৯. اهدنا বলার মাধ্যমে সত্যের পথে পাড়ি দেয়া এবং সরল পথের (সিরাতুল মুস্তাকিম) জন্যে দরখাস্ত করে।
১০. صراط الذین انعمت علیهم দ্বারা সত্যের অনুসারীদের সাথে নিজ সংহতির ঘোষণা দেয়।
১১. غیرالمغضوبও لا الضالین বলার মাধ্যমে বাতিল ও বাতিল পন্থীদের প্রতি নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে ও দূরত্ব কামনা করে।
بسم الله الرحمن الرحیم
১. পরম দাতা দয়ালু আল্লাহর নামেঃ
স্মরণীয় বিষয়সমূহঃ
* বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের মধ্যে এ রীতি প্রচলিত আছে যে, গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান কাজগুলোকে নিজেদের সম্মানিত ও প্রিয় পূর্বপুরুষদের মাহাত্বের স্মরণে শুরু করা হয়, যাতে করে ঐ কাজটি কল্যাণ ও বরকতময় হয় এবং সম্পাদিত হয়। তবে তারা তাদের সঠিক বিশ্বাস কিংবা অপবিশ্বাসের ভিত্তিতে কাজ করে। কখনো কখনো মূর্তিদের ও তাগুত বা অত্যাচারী স্বেচ্ছাচারীদের নামে, আবার কখনো কখনো আল্লাহর নামে ও আল্লাহর ওলীদের হাতে কাজ শুরু করে। যেমন: খন্দকের যুদ্ধে মাটি খননের কাজ শুরু হয় আল্লাহর রাসূল (সা:)-এর হাতে প্রথম কোদাল চালানোর মাধ্যমে। (বিহার, খন্ড : ২০ পৃ:২১৮)
بسم الله الر حمن الر حیم ( বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম) দিয়ে আল্লাহর কিতাবের সূচনা হয়। بسم الله (বিসমিল্লাহি) কেবলমাত্র কোরআনের শুরুতেই নয়, বরং সমস্ত আসমানী কিতাবেরই সূচনা হয়েছে এ বিসমিল্লাহ দিয়ে। সব নবীদের কাজের শিরোনামে ছিল بسم الله (বিসমিল্লাহ)। উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে নূহ (আ.) তাঁর যাত্রা শুরু করার পূর্বে, তাঁর সাথীদেরকে বললেন: আরোহণ কর যে, بسم الله مجریها و مرسیها অর্থাৎ ‘এ নৌকার গতি ও স্থিরতা (চলা ও থামা) আল্লাহর নামে।’ (হূদ-৪১) হযরত ছোলায়মান (আ.)ও যখন সাবার রানীকে ঈমান অনার জন্যে আহবান জানিয়েছিলেন, নিজের চিঠি بسم الله الر حمن الر حیم দিয়ে শুরু করেছিলেন। (সূরা নামল-৩০)
* হযরত আলী (আ:) বলেন: بسم الله ’ (বিসমিল্লাহ) সব কাজের কল্যাণ বা বরকতের কারণ এবং তা ত্যাগ করা বিফলতার কারণ। অনুরূপ ‘ بسم الله’ লিখতে থাকা এক ব্যক্তিকে বলেন: (جوّدها) অর্থাৎ তা সুন্দর করে লিখ। (কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-২৯৫৫৮)
* প্রত্যেক কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ (بسم الله) বলার ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে। খাওয়া, ঘুমানো, লিখা, বাহনে উঠা, সফর ইত্যাদি কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পাঠ করার কথা বলা হয়েছে। এমনকি যদি কোন প্রাণি আল্লাহর নাম ব্যতীত জবাই করা হয়, তবে তা খাওয়া হারাম হয়ে যায়। আর এর নিগুঢ় রহস্য হলো এই যে, একত্ববাদী ও লক্ষ্যযুক্ত মানুষের পানাহারের ক্ষেত্রেও এলাহী বা ঐশ্বী দিক থাকবে। হাদীসে আমরা পড়ে থাকি যে, বিসমিল্লাহ بسم الله ভুলে যেও না, এমনকি এক পংক্তি কবিতা লিখার ক্ষেত্রেও । আবার, বাচ্চাকে প্রথমবার যিনি বিসমিল্লাহ (بسم الله) শিখান তার পুরস্কার সম্পর্কেও একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। (তাফসীরে বোরহান, খন্ড : ১, পৃ:৪৩)
* প্রশ্ন : কেন সব কাজের শুরুতে بسم الله (বিসমিল্লাহ) পড়তে বলা হয়েছে?
*উত্তর : বিসমিল্লাহ (بسم الله) হলো মুসলমানদের কুলচিহ্ণ‎ (গধৎশ ) ও প্রতীক। সুতরাং তার প্রতিটি কাজেই এলাহী রং বা চিহ্ন থাকতে হবে । যেমনভাবে কোন কারখানার উৎপাদিত সামগ্রীতে ঐ কারখানার গধৎশ বা চিহ্ন লাগানো থাকে, এখন সেটা হোক আংশিক কিংবা সামগ্রিক। যেমন সিরামিকের তৈজসপাত্র তৈরীর কারখানায় নিজ কারখানার প্রতীক সমস্ত পাত্রগুলোতে লাগানো হয়। সেটা পাত্র ছোট হলেও কিংবা বড় হলেও। ‘অথবা ’ ধরা যাক প্রত্যেক দেশের পতাকাই ঐ দেশের অফিস, বিদ্যালয় ও সামরিক ঘাটিসমূহে উত্তোলিত থাকে। অনুরূপ সমুদ্রে ভাসমান জাহাজসমূহ কিংবা অফিসে কমকর্তাদের টেবিলেও নিজ দেশের পতাকা থাকে।##########

Share: