জান্নাতুল বাক্বীঃ অব্যাহত অত্যাচারের শিকার

  • Posted: 07/07/2019

অনুবাদঃ মোহাম্মাদ ইকবাল

জান্নাতুল বাক্বী সৌদি আরবের পবিত্র মদীনা নগরীতে অবস্থিত একটি অত্যন্ত মর্যাদাবান সমাধিক্ষেত্র। মহানবী (সা.) এর মহান সাহাবী ও তাঁর বংশধারার পবিত্র সদস্যবৃন্দসহ তাঁর বেশ কয়েকজন উত্তরসূরী এ সমাধিক্ষেত্রে শায়িত আছেন। এঁদের
মধ্যেঃ
(১) হযরত ইমাম হাসান ইবনে আলী আল-মুজতাবা (আ.)
(২) হযরত ইমাম আলী ইবনে হোসাইন জয়নুল আবেদীন (আ.)
(৩) হযরত ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী আল বাক্বের (আ.) এবং
(৪) হযরত ইমাম জাফর ইবনে মুহাম্মদ আল সাদিক (আ.)
মহানবী (সা.) এর উত্তরাধিকারী ইমামগণ (আ.) ছাড়াও তাঁর (সা.) প্রসিদ্ধ সাহাবী ও নিকটাত্মীয়গণও এখানে সমাধিস্থ আছেন। যেমনঃ
(১) হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (নবী করিম (সা.) এর পিতৃব্য)
(২) হযরত সাফিয়া বিনতে আব্দুল মুত্তালিব এবং আতিকা বিনতে আব্দুল মুত্তালিব (নবী করিম (সা.) এর ফুফু)
(৩) হযরত ইব্রাহীম ইবনে মুহাম্মাদ (সা.) (নবী করিম (সা.) এর পুত্র)
(৪) হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ (নবী করিম (সা.) এর চাচি ও হযরত আলী (আ.) এর মহিয়ষী মাতা)
(৫) হযরত আক্বীল ইবনে আবু তালিব (নবী করিম (সা.) এর চাচাতো ভাই ও হযরত আলী (আ.) এর ভাই)
(৬) হযরত মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আবু তালিব যিনি মুহাম্মাদে হানাফিয়া নামে সমধিক পরিচিত (তাঁর মাতার নাম হানাফিয়া ছিল)
(৭) হযরত উম্মুল বানীন (হযরত আব্বাস ইবনে আলী বিন আবু তালিব (আ.))
(৮) হযরত ইসমাইল ইবনে ইমাম সাদিক (আ.)
(৯) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর-এ-তাইয়্যার (আ.)
উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন বর্ণনানুসারে এ জান্নাতুল বাক্বীতে হুজুর পাক (সা.) এর কলিজার টুকরা, প্রিয় কন্যা নারীকুল শিরোমনি খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)ও সমাধিস্থ আছেন। (অনুবাদক)
জান্নাতুল বাক্বীতে এ সকল বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের কবরের উপর গম্বুজ বিশিষ্ট জমকালো সমাধিস্তম্ভ ছিল। এমনকি আজও ইন্টারনেট ওয়েবসাইটসহ বিশ্বের মুসলমানদের কাছে জান্নাতুল বাক্বীর ছবি সংরক্ষিত আছে। গম্বুজ বিশিষ্ট এ সমাধি স্তম্ভগুলো হিজরী
১৩৪৪ সনের ৮ই শাওয়াল পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় ছিল। উপরোল্লিখিত মহান ব্যক্তিবর্গের সমাধি ছাড়াও আনুমানিক সাত সহস্রাধিক প্রসিদ্ধ সাহাবা কেরামের কবর এ জান্নাতুল বাক্বীতে অবস্থিত। তদ্রুপ ইসলামের প্রাথমিক যুগের অনেক মনিষী পন্ডিত
ব্যক্তি এখানে সমাধিস্থ আছেন যেমন সুন্নি মাযহাবের চার ইমামের অন্যতম ইমাম মালিকও এখানে শায়িত আছেন। অন্যান্য কবরের মত তাঁর কবরও গম্বুজ বিশিষ্ট ছিল।
জান্নাতুল বাক্বীর উপর প্রথম আক্রমণ হিজরী ১১২০ সনঃ ধর্মান্ধ ওহাবীদের দ্বারা ১২২০ হিজরী সনে প্রথম আক্রমণ পরিচালিত হয় যখন প্রথম সৌদি সরকার ওসমানী সরকার কর্তৃক উৎখাত হয়। ১২২০ হিজরী সালে ওহাবীরা মদীনায় প্রবেশ করে
জান্নাতুল বাক্বী ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এবং এ অযুহাতে অনেক মসজিদ ধ্বংসেরও প্রচেষ্টা চালায়। তারা মসজিদে নববীতে অবস্থিত রাসুল করিম (সা.) এর পবিত্র রওজার গম্বুজ ধ্বংস করার উদ্যোগ নেয় কিন্তু বিশ্বের মুসলমানদের রোষানলে পড়ার
আশংকায় তারা পিছিয়ে আসে। ওসমানী সরকার এ সকল ধ্বংসপ্রাপ্ত সমাধিগুলো পূনঃনিমার্ণের ব্যবস্থা করে এবং বিশ্বের শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা পূনঃনির্মাণ কাজে তহবিল গঠন করেন। এভাবে মাজারগুলোর উপর সুদৃশ্য স্থাপনা নির্মিত হয় এবং
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হজ্জ্ব, ওমরাহ, যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে আসা মুসলমানরা জান্নাতুল বাক্বী সমাধিক্ষেত্রে তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতে থাকেন। কিন্তু ইসলামী বিশ্বের জন্য এটি ছিল দুঃস্বপ্নের সূচনা।
ধ্বংসযজ্ঞের দিনঃ এ দিনটি পরবর্তীতে জান্নাতুল বাক্বীতে অবস্থিত সকল মাজার ও সমাধি ধ্বংসের দিন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
১৩৪৪ হিজরী সনে যখন আলে সৌদ মক্কা, মদীনা এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের উপর তাদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তখনই তারা পবিত্র স্থানসমূহ, জান্নাতুল বাক্বী এবং মহানবী (সা.) এর সাহাবা ও তাঁর নিষ্পাপ বংশধরদের
সাথে সম্পৃক্ত নিদর্শনসমূহ ইসলামের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। এ অপকর্ম পরিচালনা এবং সহজ করার লক্ষ্যে তারা মদীনার মুফতিদের ফতোয়া আদায় করে যাতে জনগণও তাদের প্রতি সমর্থন জানায় যারা পূর্বে তাদের এহেন কাজের
জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং বিরোধিতা করেছিল।
জান্নাতুলবাক্বী ধ্বংসের পক্ষে ফতোয়াঃ আলে সৌদ এ কাজের জন্য প্রধান কাজী সুলাইমান বিন বুলাইহারকে মদীনা প্রেরণ করে যাতে সে মদীনার আলেম সমাজের কাছ থেকে তাদের মর্জি মোতাবেক ফতোয়া আদায় করতে সমর্থ হয়। এ লক্ষ্যে সে
মদীনার আলেমদের কাছে এমন কিছু প্রশ্ন বিকৃত করে উপস্থাপন করে যার উত্তরও ওহাবীদের দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী উক্ত প্রশ্নে নিহিত ছিল। এভাবে মুফতিদের বুঝানো হলো যে, এ প্রশ্নগুলোর তেমনি জবাব দিন যা প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত আছে অন্যথায়
তাদেরকেও মুশরিক আখ্যায়িত করা হবে আর তওবা না করলে হত্যা করা হবে। এ প্রশ্নোত্তর মক্কা থেকে প্রকাশিত “উম্মুল ক্বোরা” শীর্ষক পত্রিকার শাওয়াল, ১৩৪৪ হিজরী সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। সুলাইমান বিন বুলাইহার এর প্রশ্ন ছিল এমন ঃ
(১) মদীনা মুনাওয়ারার বিজ্ঞ আলেমগণ কি বলেন, আল্লাহ আপনাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বৃদ্ধি করুন, কবরের উপরে স্থাপনা নির্মাণ এবং সেখানে মসজিদ নির্মাণ কি বৈধ না অবৈধ?
(২) যদি বৈধ না হয় আর ইসলাম কঠোরভাবে নিন্দা জানায় তাহলে কি এসকল স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়া আর সেখানে মুসলমানদের নামাজ আদায় করা থেকে বিরত রাখা জরুরী আর ওয়াজিব কি না?
(৩) বাক্বীর মত ওয়াফকৃত জমির উপর নির্মিত কবর স্থাপন ও গম্বুজসমূহ যার কারণে জমির অন্যান্য অংশের সাথে উপকার প্রাপ্তি সম্ভব নয় তাহলে ঐ অংশসমূহ কি জবর দখলের সমতুল্য নয়? যতদ্রুত সম্ভব এগুলোকে ধ্বংস করা কি উচিত
নয় যাতে নিঃস্ব ও গরীবদের উপর যে জুলুম করা হয়েছে তা দূর হয়?
মদীনার আলেমগণ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে সুলাইমান বিন বুলাইহারকে উত্তর দিলেন-
কবরের উপর ইমারত নির্মাণ করা ইজমার ভিত্তিতে হাদিসে নিষিদ্ধ। এ কারণে অনেক ওলামা ধ্বংস করা ওয়াজিব বলে ফতোয়া দিয়েছেন এবং তারা এর স্বপক্ষে আবুল হাইয়াজ থেকে বর্ণিত হযরত আলী (আ.) এর একটি হাদিসের সাহায্য নেন।
যেখানে হযরত আলী (আ.) আবুল হাইয়াজের উদ্দেশ্যে ইরশাদ করেন, আমি তোমাকে এমন কর্ম সম্পাদন করার নির্দেশ প্রদান করছি যা করার নির্দেশ আমাকে আল্লাহর রাসুল (সা.) করেছিলেন, আর তাহলো যে ছবি তোমার দৃষ্টিগোচর হয় তা
ধ্বংস করো আর যে কবর তুমি দেখ তা মাটির সমান্তরাল করে দাও।
এ প্রবন্ধে উক্ত হাদিস সম্পর্কে বিচার বিশ্লেষণ করার ইচ্ছে নেই কেবল এতটুকু বলবো যে, পবিত্র কোরআন কবরের উপর স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে। (সূরা কাহাফঃ ২১)
মুসলিম উম্মাহ এর মান-মর্যাদা সম্পর্কে ঐকমত্য পোষণ করেন। যুগে যুগে মুসলমানগণ সমাধি সৌধ নির্মাণ করে আসছেন। এমনকি সাহাবা কেরামও এর বিরোধিতা করেননি। আর সর্বশেষ কথাটি হচ্ছে, আবুল হাইয়াজ বর্ণিত হাদিসের যে অর্থ
ওহাবীরা বর্ণনা করেছে তা মিথ্যা।
ধ্বংস ও লুণ্ঠনঃ ওহাবীরা হিজরী ১২০৫ থেকে ১২১৭ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার হেজাজ দখল করার প্রচেষ্টা চালায় কিন্তু তারা সফল হয়নি। অবশেষে ১২১৭ হিজরীতে তারা তায়েফ দখলে সমর্থ হয়। অবশ্য এ অভিযানে তারা অনেক মুসলমানকে হত্যা
করে। হিজরী ১২১৮ সনে মক্কা আক্রমণ করে এবং মক্কায় অবস্থিত সকল পবিত্র স্থানসমূহ ধ্বংস করে দেয় এমনকি যমযম কুপের উপর নির্মিত স্থাপনাকেও ধ্বংস করে দেয়।
১২১৬ হিজরী সনের জিলক্বদ মাসে ওহাবীরা কারবালা আক্রমণ করে এবং কারবালা শহর চতুর্দিক থেকে ঘিরে রাখে। অলি-গলি এবং বাজারে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং ব্যাপক লুণ্ঠন করে এবং যোহর পর্যন্ত লুণ্ঠনকৃত অর্থ সম্পদ নিয়ে শহর ত্যাগ করে।
লুণ্ঠনকৃত ধন সম্পদের এক পঞ্চমাংশ স্বয়ং আলে সৌদরা নেয় এবং অবশিষ্ট সম্পদের একটি অংশ পদাতিক বাহিনী ও ঘোড়সওয়ারদের মধ্যে বন্টন করে দেয়। কারণ তাদের দৃষ্টিতে এ যুদ্ধ ছিল কাফেরদের বিরুদ্ধে।
পবিত্র মক্কা নগরী আক্রমণঃ হিজরী ১৩৪৪ অর্থাৎ ১৯২৫ ইং সালে জান্নাতুল বাক্বী আক্রমণের পূর্বে তারা মক্কায় অবস্থিত জান্নাতুল মাওলা সমাধিক্ষেত্র আক্রমণ করে। জান্নাতুল বাক্বীর পর জান্নাতুল মাওলা কবরস্থানটি সবচেয়ে মর্যাদাবান কবরস্থান
হিসেবে গণ্য। এ সমাধিক্ষেত্রে নবী পাক (সা.) এর পূর্বপূরুষ আব্দুল মানাফ, পিতামহ আব্দুল মুত্তালিব, চাচা আবু তালিব এবং স্ত্রী হযরত খাদিজা (সা.আ.) চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। এ সকল সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের কবরের উপর গম্বুজ ও স্থাপনা
নির্মিত ছিল। ওহাবীরা এ সকল স্থাপনা ধ্বংস করে মদীনার উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করে। এ বিষয়টি স্মরণে রাখা জরুরী যে ধর্মান্ধ ওহাবীদের এ ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড খুব সহজে সম্পাদন হয়নি বরং অসংখ্য মুসলমান শাহাদাৎ বরণ করেন এবং
রওজার অভ্যন্তরে রক্ষিত মূল্যবান বস্তুসমূহ লুণ্ঠন করা হয়।
জান্নাতুলবাক্বী ধ্বংস ও অসম্মান প্রদর্শনঃ দিনটি ছিল বুধবার, ৮ই শাওয়াল ১৩৪৪ হিজরী সন মোতাবেক ২১ এপ্রিল ১৯২৫ ইং। আব্দুল আজিজ বিন সৌদের নেতৃত্বে মদীনা অবরুদ্ধ হয় এবং বাধা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
ওসমানী শাসকের আমলাদের মদীনা থেকে বহিস্কার করে। সর্বপ্রথম নবী পরিবারের পবিত্র ইমামগণের অর্থাৎ ইমাম হাসান (আ.), ইমাম মোহাম্মদ বাক্বের (আ.), ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.), ইমাম জাফর সাদেক্ব (আ.) এর পবিত্র
মাজারগুলোকে গুড়িয়ে দেয় এবং ধীরে ধীরে অন্যান্য কবরের গম্বুজগুলোকেও ধ্বংস করে।
ওহাবীদের হিংসাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ইসলামের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের কবরও রক্ষা পায়নি। যেগুলোর মধ্যে হযরত আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব, হযরত সাফিয়া বিনতে আব্দুল মুত্তালিব, হযরত আতিকা বিনতে আব্দুল মুত্তালিব, নবী পাক
(সা.) এর পুত্র হযরত ইব্রাহীম, হযরত উম্মুল বানীন, হযরত ইসমাঈল বিন ইমাম সাদিক (আ.), হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাফর-এ-তাইয়্যাব, নবী পাক (সা.) এর ধাত্রীমাতা হযরত হালিমা এবং আনুমানিক সাত সহস্রাধিক সাহাবার কবরও
অন্তর্ভুক্ত। সুন্নি মাযহাবের চার ইমামের অন্যতম ইমাম মালিক (র.) এর কবরও গুড়িয়ে দেয়া হয়।
ওহাবীদের দ্বারা পরিচালিত লুণ্ঠন ও হত্যাকান্ডঃ যতবার ওহাবীরা পবিত্র স্থানসমূহ আক্রমণ করেছে ততবারই তারা না শুধু মুসলমান নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশুদের হত্যা করেছে বরং তারা রাস্তা ঘাট, বাজার আক্রমণ করে অঢেল ধনসম্পদ লুট করেছে।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন যে, ওহাবীরা হীরা, জহরতসহ বিভিন্ন ধরনের অলংকার ও মুল্যবান পাথরে পরিপূর্ণ চল্লিশটি বাক্স লুট করে নিয়ে যায়।
ওহাবীদের নির্দয়তাঃ ঐতিহাসিক জলিল সিদ্দিকী জাযাভী তায়েফে ওহাবী আক্রমণের দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মায়ের বুকে দুগ্ধপানরত শিশুর মাথা তারা কর্তন করে, রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা পবিত্র কোরআন একত্রিত করতে যারা ব্যস্ত ছিল
তাদেরকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে। বাসগৃহে হত্যা করার মত কাউকে না পেয়ে তারা মসজিদে প্রবেশ করে এবং নামাজরত অবস্থায় মুসলমানদের হত্যা করে, বাজারের বিভিন্ন দোকানে লুট করে এবং হত্যাযজ্ঞ চালায়। বিভিন্ন পুস্তকসমূহ যার মধ্যে
অধিকাংশ পবিত্র কোরআন ও ফেকাহ শাস্ত্রের বই, বুখারী ও মুসলিম শরীফের বিভিন্ন খন্ড ছিল তা বাজারের অলি গলিতে ছুড়ে ফেলে এবং পদদলিত করে।
মোহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহাবের অনুসারীদের দ্বারা এ ধরনের নির্মম হত্যাকান্ড ও লুটপাট আশ্চার্যজনক ছিল না কেননা তারা অন্য মুসলমানদেরকে কাফের ও মুশরিক মনে করতো এবং মক্কা ও মদীনা তাদের দখলে আসার পূর্বে এ শহরকে যুদ্ধ ও
কাফিরদের গৃহ বলে বিবেচনা করতো।
আয়াতুল্লাহ উযমা লুৎফুল্লাহ সাফি গুলপায়গানীর মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গীঃ বর্তমান শিয়া বিশ্বের বিখ্যাত ও স্বনামধন্য মারজা-এ-তাক্বলীদ, বিভিন্ন গ্রন্থের লেখক, ইমামত ও বেলায়েতের একনিষ্ঠ সমর্থক ও প্রতিরক্ষাকারী ও প্রচারক, বিখ্যাত গ্রন্থ
“মানতাখাব আল আছার ফি ইমাম সানি আশার” এর প্রণেতা বেশ কয়েক বছর পূর্বে ৮ই শাওয়াল রবিবার বিশ্বের মুসলমানদের জন্য একটি বিষম দুর্বৈব ও দুর্ভাগ্যের দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন যে, এই দুর্যোগ ও দুর্ভাগ্যজনক
ঘটনা শুধুমাত্র শিয়া এবং আহলে বাইতের (আ.) জন্য নয় বরং সমগ্র মুসলিম জাতির উপর আঘাত হেনেছে। এমন আঘাত যা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
ইসলামের ইতিহাসে পবিত্র রওজাসমূহঃ আয়াতুল্লাহ আল উযমা সাফি গুলপায়গানী পবিত্র রওজা ও ইমাগণের (আ.) সাথে সম্পৃক্ত স্থানসমূহকে ইসলামের পরিপূর্ণ ইতিহাস ও মুজাস্্সিম বা শরীর বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,“ওহাবীরা ইসলামের ইতিহাস নির্দয়ভাবে ধ্বংস করেছে। ন্যাক্কারজনক ঘটনা হচ্ছে যে, বিগত আশি বছর ধরে ওহাবীরা এমন আচরণ থেকে নিজেদেরকে যেমন বিরত রাখেনি তেমনি আজও যেখানে আহলে বাইত (আ.) এর সাথে সম্পর্কযুক্ত নিদর্শন দেখতে পেয়েছে তা ধ্বংস করেছে। এ নিদর্শনগুলো ইসলামের চিহ্নসারক, ও বরকতময় ইতিহাস হিসেবে গণ্য। যেগুলো ছাড়া ইসলাম পরিপূর্ণ নয়। এ প্রখ্যাত মনিষী উল্লেখ করেন যে, সকল ধর্ম ও মাযহাব নিজ নিজ ধর্মের নিদর্শনগুলোকে সংরক্ষণ ও সংস্কার করে আসছে। এ ঘটনা মুসলমানদেরকে তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার বিশ্বাস সৃষ্টি করে। যেহেতু অন্যান্য ধর্মের নিদর্শনগুলো সংরক্ষিত হচ্ছে তাই ইসলামের নিদর্শন ও স্মৃতি চিহ্নগুলোও সংরক্ষিত করা উচিৎ
যাতে মক্কা ও মদীনা যিয়ারতকারীরা ইসলামের প্রাচীন কীর্তি ও নিদর্শনসমূহ নিকট থেকে পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ লাভ করতে পারে। আয়াতুল্লাহ উযমা সাফি গুলপায়গানী এ ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনার নেপথ্যে ইসলামের দুশমন ও সালাফীদের নিজস্ব মতবাদ প্রসূত চিন্তা ভাবনাকে দায়ী করে বলেন, “ইসলামের দুশমন ও সালাফীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামকে ধ্বংস করা এবং যেহেতু একাজটি তাদের জন্য অসম্মান ও বদনামের কারণ হয়ে দাঁড়াবে তাই তারা এ ন্যাক্কারজনক অপরাধকর্ম সংঘটিত করতে একটি দলকে ব্যবহার করে।
এ দিনটিকে শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করুনঃ আয়াতুল্লাহ উযমা সাফি গুলপায়গানী মুসলমানদের, বিশেষ করে শিয়া মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেন, “এ দিন শিয়া ও অন্যান্য সকল মুসলমানদেরকে শোকার্ত হওয়া ও দিবসটিকে শোকদিবস হিসেবে পালন করা উচিৎ এবং ঘটনার তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানানো উচিৎ। নিশ্চিতভাবে, আল্লাহর হুজ্জাত যুগের ইমাম (আ.) এ ঘটনায় শোকার্ত ও ব্যথিত। বাক্বীর এ বেহাল অবস্থা দেখে বিশেষ করে তাঁর পূর্বপুরুষদের নিশ্চিত পবিত্র মাজারগুলো দেখে তিনি শোকার্ত ও ব্যথিত হন।
আমাদের উচিত আহলে বাইত (আ.) এর শোকে শোকার্ত হওয়া এবং ওহাবীদের এ অপকর্মের প্রতি ক্ষোভ ও নিন্দা জানানো এবং পাশাপাশি যুগের ইমামের (আ.) আগমন ত্বরান্বিত হোক মহান আল্লাহর কাছে এ প্রার্থনা করা।
পবিত্র কুরআন কবরের উপর স্থাপনা নির্মাণের প্রতি সমর্থন দেয়ঃ পবিত্র কুরআন সুরা কাহাফের ২১নং আয়াতে কবরের উপর মসজিদ নির্মাণের পক্ষে স্পষ্ট সমর্থন জানায়। ইরশাদ হচ্ছে, অর্থাৎ, “.....তারা বললো, তাদের উপর সৌধ
নির্মাণ কর। তাদের পালনকর্তা তাদের বিষয়ে ভাল জানেন। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হলো, তারা বললো ঃ আমরা অবশ্যই তাদের স্থানে (গুহার অভ্যন্তরে কবর) মসজিদ নির্মাণ করব এবং এভাবে আল্লাহর নেয়ামত প্রার্থনা কর।”
আসহাবে কাহাফের এ ঘটনার প্রতি লক্ষ্য করে আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারি যে, কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা ঐশী দ্বীনে অনুমোদিত এবং একটি মুসতাহাব কর্ম এবং পবিত্র কুরআন কোন প্রকার সমালোচনা না করে তা বর্ণনা করেছে আর বিশ্বস্ত তাফসীরেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
আল্লাহর বন্ধু বা প্রিয়ভাজনদের কবরের উপর বা নিকটে মসজিদ নির্মাণ যদি অংশীবাদী আচরণই হতো তাহলে সে যুগের একেশ্বরবাদী দল বা ব্যক্তি কেন এ ধরনের প্রস্তাব করেছিলেন এবং পবিত্র কুরআন কটুক্তি না করে কেন তা বর্ণনা করলো?
এটা কি যুক্তিযুক্ত যে, আল্লাহ কোন প্রকার কটুক্তি না করে কোন দলের অংশীবাদি কোন কর্মকে বর্ণনা করবেন? কিন্তু এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট আয়াত থাকলেও বিরুদ্ধবাদীদের তা প্রত্যাখ্যান করার তাদের নিজস্ব যুক্তি আছে।
এ বিষয়টিকে সন্দেহমুক্ত রাখার জন্য আহলে সুন্নাতের বিখ্যাত ও বিশ্বস্ত আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছি যা সুরা কাহাফ’র ২১নং আয়াতের উপর আলোচনা করতে গিয়ে না কেবল কবরের উপর মসজিদ নির্মাণের সমর্থন দিয়েছেন বরং মসজিদ নির্মাণের তাগিদও দিয়েছেন।
নিম্মে তালিকায় মাত্র কয়েকজন আলেমের কথা এখানে উল্লেখ করা হলোঃ
১। ইবনে তায়মিয়্যার ছাত্র ইবনে কাছির বলেনঃ আসহাবে কাহাফ যখন গুহায় প্রবেশ করলেন তখন কিছু লোক বললো, গুহার প্রবেশ মুখে একটি মসজিদ নির্মাণ করো যাতে আমরা এখানে ইবাদত করতে পারি। যারা একথাগুলো বলেছিলেন তারা ছিলেন মুসলমান। (তাফসির ইবনে কাসির, সুরা কাহাফ, আয়াত নং ২১ এর পাদটীকা)
২। ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী বলেনঃ ইহুদী নাসারা স্বীয় নবীদের কবরকে সম্মানপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ক্বিবলা হিসেবে বিবেচনা করতো এবং উপাসনার সময় এ কবরসমূহের প্রতি নিবিষ্ট থাকত। সুতরাং এ কবরসমূহ মুর্তির স্থান দখল করে। এ কারণে মুসলমানদেরকে এ ধরনের কাজে বাধা দেয়া হয়। কিন্তু যদি কেউ আল্লাহর ওলীর কবরের উপর কিম্বা এর নিকটবর্তী স্থানে কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মাণ করে এবং নামাজ পড়ার সময় ওই কবরের প্রতি মনযোগি না হয় তাহলে এ কর্মটি হারামের আওতায় আসবে না। (ফাতহুল বারী, খঃ ৩, পৃঃ ২০৮, সূরা কাহাফের ২১নং আয়াতের পাদটীকা)
৩। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী বলেন, কিছু সংখ্যক মানুষ বলাবলি করছিল যে, গুহার প্রবেশ পথে মসজিদ নির্মাণ করা উত্তম। এ উক্তি প্রমাণ করে যে, এ লোকগুলো আল্লাহ প্রেমিক ছিলেন যারা আল্লাহর ইবাদতে বিশ্বাস করতেন। (তাফসির আল কাবীর, খঃ ৫, পৃঃ ৪৭৫)
৪। ইমাম জালাল উদ্দিন সূয়ুতী এবং আল মুহাল্লী “......যারা নিজেদের ব্যাপারে অর্থাৎ যুবকদের ব্যাপারে শক্ত ছিলেন তারা মুমিন ছিলেন যারা বলেছিলেন, নিশ্চয়ই আমরা এর উপরে অর্থাৎ এর আশেপাশে মসজিদ নির্মাণ করব যেখানে নামাজ আদায় করব আর তারা এ লক্ষ্যে গুহার প্রবেশ মুখে তা নির্মাণ করল। (তাফসিরে জালালাইন, খ ঃ ১, পৃঃ ৩৮৯)
৫। কাজী ছানাউল্লাহ পানিপতিঃ এ আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহর ওলীগণের কবরের নিকটে মসজিদ নির্মাণ করা যেতে পারে যাতে তাদের প্রতি সালাম প্রেরণ ও বরকত লাভ করা যায়। (তাফসিরে মাযহারী, খঃ ৭, পৃঃ ১২৩-১২৪)
৬। ইমাম বায়জাভীঃ সূরা কাহাফের আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, বিশেষ ব্যক্তিবর্গ যেমন, ওলামা ও ওলী আল্লাহর জন্য মাজার নির্মাণ জায়েয। (তাফসিরে বায়জাভী, সুরা কাহাফ এর পদটীকা)
৭। ইমাম ইসমাঈল বরোসাভী নক্শবন্দীঃ ওলামা, আউলিয়া ও সালেহীনগণের শান ও মর্যাদা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে তাদের কবরের উপর সৌধ নির্মাণ একটি জায়েয আমল হিসেবে গণ্য যাতে মানুষ তাঁদের কবরকে সাধারণ কিছু না ভাবে।
(তাফসিরে রূহুল বায়ান, খঃ ৩, সূরা কাহাফের পাদটীকা)
৮। ইমাম হাকিমঃ “যারা নিজেদের ব্যাপারে শক্ত ও সামর্থবান” বলতে তিনি সে যুগের মুমিনদেরকে বুঝিয়েছেন। (তাফসিরে ওয়াহেদী, সূরা কাহাফের পাদটীকা)
৯। ইমাম নাসাফীঃ “যারা নিজেদের ব্যাপারে শক্ত সমর্থ” বলতে তিনি মুসলমানদের বুঝিয়েছেন এবং তারা এর উপর স্থাপনা নির্মাণের মত দেন অর্থাৎ, গুহার প্রবেশ পথে মসজিদ নির্মাণের কথা বলেন যাতে মুসলমানরা এখানে ইবাদত বন্দেগী করতে পারে এবং কল্যাণ লাভ করতে পারে। (তাফসির আল নাসাফী, খঃ ৩, পৃঃ ১৮)
১০। ইমাম আবু হাইয়্যান আন্দালুসিঃ যে ব্যক্তি এর উপর স্থাপনা নির্মাণ করতে বলেছিল সে ছিল একজন কাফের মহিলা, সে গীর্জা নির্মাণের পরামর্শ দেয় এজন্য যে সেখানে কুফরী আমলসমূহ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু মুমিনগণ তাকে এমন কর্ম থেকে বিরত রাখেন এবং সেখানে মসজিদ নির্মাণ করেন। (তাফসির আল বাহর আল মুহিত, খঃ ৭, পৃঃ ১৫৮)
১১। আল্লামা ইবনে যাওজী স্বীয় তাফসির গ্রন্থে সূরা কাহাফ এর ২১নং আয়াতের পাদটীকায় উল্লেখ করেনঃ ইবনে ক্বোতায়বা বলেন যে কোরআনের মুফাসসিরগণ লিখেছেন, যে সকল লোকেরা মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন তিনি ছিলেন বাদশা ও তার সঙ্গী-সাথি। (তাফসিরে যাদ আল মাসীর, খঃ ৫, পৃঃ ১২৪)###

Share: