আশুরা এবং কারবালার শিক্ষা

  • Posted: 17/11/2017

ডাঃ মোঃ আজিজুল হক (আব্দুল্লাহ)
শুরুতেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মহররম কবিতার কিয়দংশ উদ্ধৃত করা হলো।

নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া,-
“আম্মা! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।”
কাঁদে কোন্ ক্রন্দশী কারবালা ফোরাতে,
সে কাঁদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে!
গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,
“আম্মা গো, পানি দাও, ফেটে গেলা ছাতি মা।
নিয়ে তৃষা সাহারার দুনিয়ার হাহাকার
কারবালা প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার
দুই হাত কাটা তবু শের নর আব্বাস
পানি আনে মুখে, হাঁকে দুশমনও সাব্বাস
দ্রিম দ্রিম বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা
হাঁকে বীর, শির দেগা, নেহি দেগা আমামা
পুত্রহীনার আর বিধবার কাঁদনে
ছিঁড়ে আনে মর্মের বত্রিশ বাঁধনে।
তাম্বুতে শয্যায় কাঁদে একা জয়নাল
“দাদা! তেরি ঘর কিয়া বরবাদ পয়মাল”
হায়দারী হাঁক হাঁকি দুল দুল আসওয়ার
শম্শের চমকায় দুশমনে ত্রাসবার
খসে পড়ে হাত হতে শত্রুর তরবার
ভাসে চোখে কেয়ামতে আল্লাহর দরবার।
নিঃশেষ দুশমন, ও কে রণশ্রান্ত
ফোরাতের নীরে নেমে মোছে আঁখি প্রান্ত?
কোথা বাবা আজগার? শোকে বুক ঝাঁঝরা
পানি দেখে হোসেনের ফেটে যায় পাঁজরা
ধুকে মলো আহা তবু পানি এক কাৎরা
দেয়নি রে বাছাদের মুখে কম জাতরা।
অঞ্জলি হতে পানি পড়ে গেল ঝরঝর
লুটে ভুমে মহাবাহু খঞ্জর জর্জর
হলকুমে হানে তেগ, ও কে বসে ছাতিতে?
আফতাব ছেয়ে নিল আঁধিয়ারা রাতিতে
আসমান ভরে গেল গোধুলিতে দুপুরে
লাল নীল খুন ঝরে কুফরের উপরে
জাগো ওঠো মুসলিম, হাঁকো হায়দারী হাঁক
শহীদের দিনে সব লালে লাল হয়ে যাক।
হাসানের মত পি’ব পিয়ালা সে জহরের
হোসেনের মত নিব বুকে ছুরি কহরের
আসগর সম দিব বাচ্চারে কোরবান
জালিমের দাদ নেবো দেবো আজ গোর জান
সকীনার শ্বেতবাস দেবো মাতা-কন্যায়
কাসিমের মত দেব জান রুধি অন্যায়
মোহাররম কারবালা কাঁদে হায় হোসেনা
দেখো মরু - সূর্য এ খুন যেন চোষেনা।

আশুরা কি?
দিবসের মর্যাদা বা স্মরণ কি ঘটনার কারণে হয়ে থাকে?
কোনটি বেশি স্মরণের? আনন্দের ঘটনা না কি হৃদয়বিদারক মর্মন্তুদ ঘটনা? কোনটি মানুষের মনে বেশি দাগ কাটে? সুখ স্মৃতি না দুঃখ স্মৃতি।
ইসলামী খেলাফতে দ্বিধা বিভক্তি।
কারবালার পটভূমি।
রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র বনাম নির্ভেজাল ইসলামী খেলাফত।
কারবালার শহীদানের পর মুসলিম সমাজের অবস্থা।
শোকদিবস ও স্মৃতিদিবস পালন।
১০ই মহররম দিবসটি নবীজির (সাঃ) সময় থেকে আশুরা দিবস হিসেবে পালন করা হতো। এখানে আশুরা শব্দের অর্থ দশ। ঐদিন হযরত মুসা (আঃ) কে আল্লাহপাক ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। এবং সেইদিন মুসা (আঃ) আল্লাহর উদ্দেশ্যে রোজা পালন করেছিলেন। সেই কারণে ইহুদী ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায় এই দিনে রোজা পালন করে। এই রোজা পালন করা একটা উত্তম সুন্নত। রোজা ফরজ হওয়ার আগে এই রোজা করাটা ওয়াজিব ছিল কিন্তু একমাস রোজা ফরজের পর থেকে এটি সুন্নত হয়ে যায়।

এই একটিমাত্র ঘটনা ছাড়া বাকী ২৭টি ঘটনা সম্পর্কে যেমন এইদিন পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে এবং এইদিন ধ্বঃস হবে, এইদিন জিবরাঈল ফেরেশতার জন্ম ইত্যাদি বর্ণনাগুলো সম্পুর্ণ বানোয়াট ও কল্পনাপ্রসুত এবং ষড়যন্ত্রমুলকও হতে পারে। (ড. খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর “হাদীসের নামে জালিয়াতি- প্রচলিত মিথ্যা হাদীস ও জালিয়াতি কথা গবেষণা গ্রন্থ দ্রষ্টব্য)।

দ্বিতীয় যে ঘটনার জন্য আশুরা দিবসটি সকল শ্রেণীর মুসলমানদের জন্য তাৎপর্যপুর্ণ তা হলো নবীজির (সাঃ) দৌহিত্র ইসলামী আদর্শ ও বৈশিষ্টের প্রতীক হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদত।

মুসা (আঃ) এর ঘটনাাটি দ্বিতীয় ঘটনাটির পর অনেকটা বিস্মৃতির তলে চলে গিয়েছে। এখন আশুরা ও কারবালার ঘটনা সমার্থক হয়ে গেছে এমনকি মহররম একটা মাসের নাম হলেও আমরা সবাই বলে থাকি মহররমের শিক্ষা। কেউ বলিনা ১০ই মহররমের শিক্ষা। কাজেই দেখা যাচ্ছে আশুরা, কারবালা ও মহররমের শিক্ষা এই তিনটি জিনিস মুসলিম সমাজে একই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কারবালার পটভূমি

সিফফিনের যুদ্ধের পর ইসলামী খেলাফত রাষ্ট্র মূলত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। মক্কা মদিনা ইয়েমনসহ কিছু অংশ নিয়ে হযরত আলী (রাঃ) এবং সিরিয়া, বসরা (ইরাক) সহ কিছু অংশ নিয়ে মুয়াবিয়ার শাসন চলতে থাকে। মুয়াবিয়া কে ? মুয়াবিয়া হচ্ছে ইসলাম বিরোধিতাকারী কাফেরদের অন্যতম নেতা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবু সুফিয়ানের পুত্র। মক্কা বিজয়ের পর যখন নিজ ইচ্ছায় হোক আর কৃতকর্মের জন্য হোক বা উভয় কারণে হোক দলে দলে লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছিলো সেই সময় অন্যদের সাথে আবু সুফিয়ান ও তার পুত্র মুয়াবিয়া ইসলাম ধর্ম কবুল করে মুসলিম সমাজে শামিল হন। আবু সুফিয়ান অতি বৃদ্ধ থাকায় কিছুদিন পর ইন্তেকাল করেন। মুয়াবিয়া তখন যুবক। তিনি তাঁর পিতার ন্যায় শিক্ষিত ও ধনাঢ্য ছিলেন এবং তার হাতের লেখা বেশ সুন্দর ছিলো। নবীজি সেইসময় কিছু কিছু ওহী তাকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন। তিনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে সহজেই নবীজীর নজরে ও সান্নিধ্যে আসেন। তিনি একজন চৌকস, বুদ্ধিদীপ্ত, দ্বীনদার, সম্ভ্রান্ত মুসলিম হিসেবে তদানিন্তন সমাজে পরিচিতি লাভ করেন। হযরত উসমান (রাঃ) এর শাসনামলে তিনি সিরিয়ার শাসনকর্তা হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। কিন্তু হযরত ওসমান (রাঃ) এর ওফাতের পর যখন হযরত আলী (রাঃ) মুসলিম জাহানের খলিফা নির্বাচিত হোন তখন তিনি তা মানতে নারাজ হন এবং অচিরেই নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন সম্পুর্ণ একক সিদ্ধান্তে। এবং হযরত আলীকে (রাঃ) মানতে অস্বীকৃতি জানান। অধিকন্তু হযরত আলীকেই তাকে মেনে নিতে আহ্বান জানান। এই অবৈধ সিদ্ধান্তের ফলে মুসলিম বিশ্বে একটি উত্তেজনা দেখা যায় এবং মুসলিম সাম্রাজ্য একটি অনিবার্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেটাই সিফ্ফিনের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে বহু দ্বীনদার ও কুরআনের হাফেজ নিহত হন। এই যুদ্ধে কুটকৌশলের মাধ্যমে মুয়াবিয়া জয়লাভ করে এবং হযরত আলী (রা) একজন একনিষ্ঠ ইসলামী দার্শনিক হিসেবে এই শর্তে মেনে নেন যে, মুয়াবিয়া পরবর্তীতে খলিফা নির্বাচনে ইসলামী নীতিমালা মেনে চলবেন। কিন্তু রাজী হয়েও মুয়াবিয়া পরবর্তীতে কথার বরখেলাপ করে নিজ পুত্র ইয়াজিদকে খলিফার পদের উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান এবং এই ঘটনার সাথে সাথে কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার বীজবপন হয়ে যায় ।

হযরত আলী (রাঃ) ও ইমাম হোসেন (রাঃ)

সুফী সাধক শিরোমনি ইসলামী দার্শনিক হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন নবীজীর চাচা আবু তালেবের পুত্র। শিশুকাল থেকে তিনি শান্তশিষ্ট, ভদ্র-ন¤্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তিনি একজন বীরপুরুষও ছিলেন। তিনি জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার জন্য তার সমাজে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এরকম কথা বলতেন যে, আমি হলাম ছায়া এবং আলী তার কায়া। তিনি নবীজীর জামাতাও ছিলেন। তার ঔরসে নবীজীর দুই নাতি হাসান ও হুসাইনের জন্ম হয়। বিবি ফাতেমা ছিলেন তাদের মা। নবীজীর পুত্রসন্তান না থাকায় নাতিদের তিনি খুব আদর ¯েœহ করতেন। তারা বিশুদ্ধ ইসলামী পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। ইসলামী শিক্ষা দীক্ষায় পারিবারিক ও সামাাজিক জীবনে তারা বড় হতে থাকেন। পরবর্তীতে তারা উভয়ে ইসলামী আদর্শের সঠিক ধ্যান ধারণার বাহক হিসেবে মুসলিম জাহানের যোগ্য নেতৃত্বের গুণে গুণান্বিত হোন।

এরকম একজন মহান পুরুষ হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) যখন দেখতে পেলেন যে মুসলিম খেলাফত ক্রমে কাইজার, কেসরা, রোমক স¤্রাট হেরাকিøয়াস তথা স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের দিকে মোড় নিচ্ছে তখন তিনি আদর্শিক কারণে এর বিরোধিতা শুরু করেন। ইয়াজিদের বায়াত বা বশ্যতা গ্রহণের আমন্ত্রণ তিনি প্রত্যাখান করেন এবং এর চেয়ে মৃত্যুকে তিনি শ্রেয় বলে মনে করেন। তিনি ক্ষমতালোভী, বিলাসী খানদানের অভিলাষী ছিলেন না, সেইরকম কোনো প্রমাণ তার জীবনে পাওয়া যায়নি। তিনি নবীজীর দৌহিত্র এই আত্মসম্মান নিয়েও মুসলিম জাহানে একজন নাম করা ব্যক্তি হিসেবে থাকতে পারতেন। ক্ষমতালিপ্সুু হয়ে কুটকৌশল খাটিয়ে ইয়াজীদের সাথে কোনো না কোনভাবে আঁতাত করে পরবর্তীকাল ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কৌশল নিতে পারতেন। কিন্তু দ্বীনের এই ঝান্ডাবাহী সিপাহীসালার কখনও তা করবেন না এটাই স্বাভাবিক। তাই জেনেশুনে তিনি মৃত্যুফাঁদে পা দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন যে, খেলাফতের সুষ্ঠু নির্মল ধারাবাহিকতা হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু আমার আত্মবলিদানের মাধ্যমে পৃথিবীতে একটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হবে যে, নির্মম নৃশংস হত্যার মধ্যে দিয়েও নবীজির নাতি ইসলামী আদর্শ জয়ী করে গেছেন। কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।

ঐদিন থেকে খেলাফতের সুষ্ঠু ধারার পতন হলেও আজও মানুষ ঐদিনের কথা, ঐ আদর্শের কথা স্মরণ করতে থাকে। এবং একদল তাঁকে সাহায্য করতে না পারার বেদনার আতিশয্যে বুক পিঠ চাপড়িয়ে শোক প্রকাশ করে।

কারবালার ঘটনার পর মুসলিম সমাজের অবস্থা

কারবালার যুদ্ধের পর শিয়া সুন্নীর বিভাজন যেটা প্রচ্ছন্ন ছিল তা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আধ্যাত্মবাদী দার্শনিক হযরত আলী (রা) কে ঘিরে কিছু মুসলমান তাঁর বেশি ভক্ত ছিল। তারা নবীজির পরবর্তীতে আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে হযরত আলীকে অগ্রাধিকার দিতো। কারবালার যুদ্ধে মুসলমানদেরই একদল যারা আল্লাহ ও নবীকে বিশ্বাস করতো (অন্ততপক্ষে মুখে ও বাহ্যিক চলাফেরা ও ইবাদতে) তারাই নবী পরিবারের সকল পুরুষদের (শিশুপুত্র জয়নাল আবেদীন তাঁবুতে অসুস্থ্য থাকার কারণে প্রাণে বেঁচে যান) নির্মমভাবে হত্যা করে এবং ইমাম হুসাইনের মাথা কেটে তোহফা হিসেবে এজিদের দরবারে হাজির করে। এই ঘটনার আকস্মিকতায় তখনকার মুসলিম সমাজ হতচকিত হয়ে পড়ে। এবং বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিশোধ গ্রহণ করে কিন্তু খলিফাকে উৎখাত করতে পারেনি। বরং এজিদের বিশাল বাহিনী মক্কা মদীনা আক্রমণ করে দখলে নিয়ে নেয় এবং নিষ্ঠাবান মুসলমানদের চরম অত্যাচার, নির্যাতন করে এবং হত্যা করে। এসময় তারা ব্যাপক প্রচার প্রোপাগান্ডা মুসলিম সমাজে ছড়ায় যে ঈমানরক্ষার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে মানলেই চলবে এবং ইসলামী চরিত্র গুণাগুণ থাকলেই পরকালীন মুক্তির জন্য যথেষ্ট । নবী পরিবারের কারো প্রতি ভালোবাসা থাকা বা না থাকাটা কোনো ঈমান আকীদা বা মুক্তি পাওয়ার শর্ত নয়। হাজার হাজার মুসলমান এতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এবং তদানীন্তন খলিফাকে মেনে নেয় কেউবা স্বেচ্ছায় কেউবা দুর্বলতার কারণে অনিচ্ছাসত্ত্বেও। সেসময় এর বিরোধিতাকারীদের হত্যা করা হয়।

মুসলমানগণ মনে করেন রসুলের (সা) ইন্তেকালের পরে মুসলিম সমাজের অভিভাবক হবেন খলিফা বা ইমাম যারা নবীজির অনুসৃত পদ্ধতিতে দিকনির্দেশনা ও সমাজ পরিচালনা করতে থাকবেন। এক্ষেত্রে রসুলের (সা) বংশের কেউ অন্যদের চেয়ে বেশি ভালো নেতৃত্ব দিতে পারবেন। কারণ বংশের প্রভাব অস্বীকার করা যায়না। তবে বংশে বে-দ্বীনদারও হতে পারে। তবে দ্বীনদার হলে বংশের বাইরের যে কারো চাইতে তিনি ভালো কামেল দ্বীনদার হবেন এবং সে কারণে মুসলিম সমাজে ইমাম বা খলীফা হওয়ার যোগ্য হবেন তিনিই। এই ধারণা পোষন করে শিয়ারা।

অন্যদিকে ইসলামের আলোকে যে কোনো শ্রেষ্ঠ দ্বীনদার ব্যক্তি ইমাম বা খলীফা হতে পারে। এ দাবীদার সুন্নিরা। সুন্নিরা ইয়াজিদকে পথভ্রষ্ট মনে করলেও মোয়াবিয়াকে সঠিক মনে করে। যার ব্যখ্যা তারা নিজেরাও জানেনা। মোয়াবিয়ার চাতুর্য, রাজনীতিক কুটকৌশল ও নীতিভ্রষ্টতার সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক দলিল ও ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ সত্বেও তাঁরা এগুলো বিশ্বাস করে না। সুন্নিরা ইমামের বংশীয় উৎসারিত ধারনার বিরোধী। এমনকি তাঁরা আলেম সমাজের মধ্যে একজনকে সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ধর্মীয় নেতা মানতে চাননা। মুসলিম সমাজে বহুনেতা কেন্দ্রিক ও নেতৃত্ব কেন্দ্রিক বিভক্তি দল ও কোন্দল তাঁরা সহজেই মেনে নেন।

চারিত্রিক বিকাশে বংশগতি (Gene) এর প্রভাব

ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের স্বার্থে জেনেটিকস বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যেতে পারে। একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে কিছু জন্মগত (এবহবঃরপ) প্রবণতা নিয়ে অর্থাৎ কিছু দোষ-গুণের প্রবণতা নিয়ে। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সেটা লালিত পালিত প্রকাশিত ও বিকশিত হয়। এখন ধরা যাক একজন ব্যক্তি ৫০% good gene এবং ৫০% bad gene নিয়ে জন্মালো। অপরদিকে অন্যজন ৮০% good gene এবং ২০% bad gene নিয়ে জন্মালো। তাহলে দেখা যাবে, একই পরিবেশে লালিত পালিত হলে ১ম জনের জীবনে অকর্ম কুকর্ম পরিবেশ অনুকুল পেলে অধিক পরিমানে ঘটতে থাকবে। অন্যদিকে ২য় জনের বেলায় অনুরূপ পরিবেশে অথবা খারাপ পরিবেশেও ততখানি অকর্ম কুকর্ম করতে পারবেনা। বরং চরিত্র উৎকর্ষ ঘটানোর মত পরিবেশে সে একজন অসাধারণ মানুষে পরিণত হবে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। পৃথিবীতে এর ব্যতিক্রমও হতে পারবেনা এমন নয়। কাজেই জেনেটিকস এর ব্যাপারটাকে কোনভাবেই গৌণ করে দেখা উচিত হবেনা। নবীজি এমন কথা বলেছেন যে, কোন হাবসী কৃতদাস ইসলামের পথে চললে তাঁকেও তোমরা মান্য করবে। কিন্তু নবীজি হাদিসে একথা কখনও বলেননি যে রাষ্ট্রের তথা মুসলিম উম্মাহর খলীফা, ইমাম বা আধ্যাত্মিক নেতা ঐ ব্যক্তি হবেন। উপরন্তু নবী করীম (সাঃ) বারংবার তাঁর আহেল বা বংশধরগণকে ভালবাসতে বলেছেন যদি কেউ রসূলের ভালবাসা পেতে চান।

নবীর আহেল ও বংশধরদের প্রতি ভালবাসাঃ

এই ভালবাসা বলতে কি বোঝায়?
নবীর আহেলগণ দ্বীনদার ছিলেন, তাঁরা বেহেশতবাসী হোক এই কামনা করা বা এই কথামালা যপ করার মধ্যেই কি এই ভালবাসা সীমিত? যদি তাই হয় তবে নবীর প্রতি ভালবাসার অর্থও তো একই দাঁড়াবে। কাজেই ভালবাসার অর্থ এত সংকীর্ণ হতেই পারেনা। কোরআন শরীফে দুই জায়গায় বলা আছে “যদি কেউ আল্লাহর ভালবাসা পেতে চায় তবে তাঁর নবীকে ভালবাসতে হবে”। অন্য আয়াতে আছে “নবীর জীবনের মধ্যে নিহীত আছে তোমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠতম আদর্শ”। এই দুই আয়াতের অর্থ এই দাঁড়ায় যে, আল্লাহর নির্দেশিত ও নবী প্রদর্শিত পথই মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ এবং সেটা পেতে হলে নবীকে অনুসরণ ও অনুকরণ করতে হবে সন্তুষ্টচিত্তে ভালবাসার সাথে, কোনরূপ বিরক্তিভরে বা বাধ্য হয়ে নয়। সেরূপ নবীর অনুপস্থিতিতে নবীজীর দ্বীনদার আহেলগণই হবেন মুসলিম জাহানের দিক নির্দেশক বা পরিচালক এবং তাঁদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেওয়ার অর্থই এই ভালবাসা। নিয়মিতভাবে নামাযের দরূদে আমরা প্রতিনিয়ত এই দোয়া করে থাকি (মুহাম্মাদ সাঃ ও তাঁর বংশধরদের উপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক)। কাজেই মুসলিম সমাজে নবী বংশীয় কোন দ্বীনদার ব্যক্তি থাকলে তিনিই মুসলিম জাহানের নেতা হওয়ার জন্য হকদার হবেন। তাঁর ইংগিতই নবী করিম (সাঃ) দিয়ে গেছেন।

কারবালার শিক্ষা ও শোক দিবস পালনঃ

শোক দিবস বা স্মৃতিচারণ দিবস যেভাবেই ব্যাখ্যা দেওয়া হোকনা কেন কারবালার আত্মত্যাগ নীতি আদর্শের জন্য একটি বিরল ঘটনা। এটা মুসলমানদের শৌর্য্য বীর্যেরও একটি প্রতীক। পশুশক্তিকে আত্মিকভাবে কিভাবে পরাভুত করতে হয় এটা তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আজও মুসলমানগণ বুঝতে পারে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ ও বে-ইনসাফের পার্থক্য। ইমাম হোসেন (রাঃ) সেদিন ছল চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে পিছপা হলে মানুষ বলতো নবীজির দৌহিত্রই যখন অন্যায় মেনে নিতে পারেন তাহলে আমরা আর কি। আমাদের তো অন্যায় করা ও মেনে নেওয়ার অভ্যাস তখন থেকেই অব্যাহত আছে এবং সেখান থেকেই তো শিখেছি। তিনি এটা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই ভবিষ্যত প্রজন্মের শিক্ষার জন্যই এই আত্মাহুতি দিয়েছিলেন এবং স্মরণীয় হয়ে আছেন এবং থাকবেন। এই দিনকে কোনভাবেই মূল্যহীন মনে করা বা খাটো করা কিংবা শাহাদাতের চাইতে অন্যান্য ঘটনাপঞ্জিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রকারান্তরে এই আত্মবলিদানকে খাটো করার নামান্তর এবং এটা হবে মুসলমানদের জন্য একটি আত্মঘাতি কাজ। এই দিবসের বহু অনুষ্ঠান বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায় এই অযুহাতে দিবসটিকে অবহেলা করা, তাৎপর্যহীন মনে করা উচিত নয়। এই শাহাদতের তাৎপর্য অনুধাবন করা থেকে যুব মুসলিম সমাজের চক্ষুকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়াটা বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়। বরং দিনটিকে সকল স্তরের মুসলমানদের, শিয়া ও সুন্নি নির্বিশেষে যথাযথভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা উচিত। লাঠিখেলা, আলোচনা সভা, শোক মিছিল ইত্যাদি করলেও সমাজের কোন ক্ষতি হবেনা বরং সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং মুসলিম সমাজে স্থবিরতা দূর হবে এবং ইসলামী জোশ বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ মুসলিম ইতিহাসে এই মহা শোকদিবস শুধুমাত্র আহাজারী করে অথবা শোকে বিহ্বল হয়ে বসে থাকলে চলবেনা। বরং শোককে শক্তিতে রুপান্তরিত করে দূর্বল ঈমানকে আরও জোরদার করতে হবে। তাই বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর-এর ভাষায় “ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালাকি বাদ” অর্থাৎ ইসলাম তাজা হয়েছে কারবালার ঘটনার পর।

শেষ করছি কবি নজরুল ইসলামের মোর্হারম কবিতার কিছু অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে।

ওরে বাংলার মুসলিম, তোরা কাঁদ
এনেছে এজিদী বিদ্বেষ পুন মোহাররম এর চাঁদ
এক ধর্ম ও এক জাতি তবু খুদিত সর্বনেশে
তখতের লোভে এসেছে এজিদ কমবখতের বেশে।
ঐ ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন,
“আলীর’ সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান!
এই এজিদের সেনাদল শয়তানের প্ররোচনায়
হাসন হোসেনে গালি দিতে যেত মক্কা ও মদীনায়।
এরাই আত্ম প্রতিষ্ঠা লোভে মসজিদে মসজিদে
বক্তৃতা দিয়ে জাগাতো ঈর্ষা হায় স্বজাতির হৃদে।
খলিফা হইয়া মুসলিম দুনিয়ার বাদশাহী করে,
ভৃত্যে চড়ায়ে উটের পৃষ্ঠে নিজে চলে রশি ধরে!
খোদার সৃষ্ট মানুষেরে ভালবাসিতে পারে না যারা,
জানিনা কেমনে জন-গন-নেতা হায় তাঁরা !
ত্যাগ করে নাক ক্ষুধিতের তরে সঞ্চিত সম্পদ
নওয়াব বাদশা জমিদার হয়ে চায় প্রতিষ্ঠা মদ।
ভোগের নবাব আমীর ইহারা, ত্যাগের আমীর কই?
মহররমের বিষাদ মলিন চাঁদ পানে চেয়ে রই!
মা ফাতিমা! কোন জান্নাতে আছ? দুনিয়ার পানে চাহ
প্রার্থনা কর, দূর হোক ভায়ে ভায়ে বিদ্বেষ দাহ!
আমাদের মাঝে যার লোভ আছে তাহা দূর হয়ে যাক
যাহারা ভ্রান্ত, আসুক তাদের সত্য পথের ডাক।
অখন্ড এক চাঁদ বুঝি আজ দুখন্ড হয়ে যায়
শরীকি আসিল হায় যারা মানে লা-শরীক-আল্লায়!
শান্তি শান্তি, আল্লাহ শান্তি দাও
সর্বদ্বন্দ্বাতীত তুমি, নাও তবে প্রেমপথে নাও।

কারবালার শিক্ষাঃ
১. বিশুদ্ধ আদর্শের জন্য একটি জীবন দান অন্যান্য হাজার মৃত্যুর চাইতে শ্রেষ্ঠ।
২. সত্যকে যথাস্থানে স্থাপনের জন্য আত্মবলীদানের অর্থ শহীদ হওয়া।
৩. এইদিনের চেতনা - পশুশক্তি, মিথ্যা-অসত্য ও অসুন্দরকে আত্মিকভাবে পরাভূত করার চেতনা।
৪. এইদিবস মুসলিম সমাজে নিশ্চুপভাবে অতিবাহিত করাটা এক প্রাণহীন দেহের সাথে তুলনীয়।

সূত্রঃ
১. হাদীসের নামে জালিয়াতি - প্রচলিত মিথ্যা হাদীস - গবেষণাগ্রন্থ - ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর।
২. History of the Saraceens – Justice Amir Ali|
৩. আরব জাতির ইতিহাস - মোঃ লুৎফর রহমান।
৪. History of the Arabs – P. K Hitti|
৫. কবিতা সংগ্রহ - কাজী নজরুল ইসলাম।

(লেখক : চিন্তাবিদ, লেখক ও বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ)######

Share: