রমজানের প্রশিক্ষণের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা

  • Posted: 21/05/2019

আমরা জানি মাহে রমজান একটি গুনাহ মাফের ও সওয়াব অর্জনের পবিত্র মাস। এই পবিত্র মাসে মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল-কোরআন আল্লাহ’তায়ালার কুদরতে নাজিল হয়। আল্লাহ’তায়ালার ঘোষণা মতে এই মাস মুমীনদের জন্য তাকওয়া অর্জনের মাস । “হে বিশ্বাস স্থাপনকরীগণ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ন্যায় তোমাদের উপরও রোযাকে অপরিহার্য কর্তব্যরূপে নির্ধারিত করা হলো যেন তোমরা আল্লাহভীতি অর্জন করতে পারে।” (সূরা বাকারা; আয়াত ১৮৩)।
আমরা যদি সত্যিকার মুমীন বান্দা হয়ে থাকি আল্লাহ ও তাঁর বার্তাবাহক রাসূল (সাঃ), জীবনের শেষ পরিণতি মৃত্যু ও পরকালে বিশ্বাসী হই তবে এই মাসের আগমনের পূর্ব থেকেই এই মাসের যাবতীয় করণীয় ব্যাপারে আগাম পরিকল্পনা আমাদের থাকা উচিত।
যে কোন কাজের পূর্বেই তো একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কিছু পরিকল্পনা নিছক ব্যক্তিগত ও কিছু পরিকল্পনা পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ও হতে পারে। তবে পরিকল্পনাবিহীন বিক্ষিপ্ত কাজের ফলাফল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খারাপ হয়। খারাপ বলতে এখানে ঈপ্সিত ফল লাভ না হওয়াকে বুঝানো হয়েছে।

রোজার মাস রহমত, মাগফেরাত ও নাযাতের মাস বলে আল্লাহর রাসূল ঘোষণা দিয়েছেন। কাজেই মুমীন মুসলিমকে এই মাসকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবে নিজের আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য কাজে লাগাতে হবে। এই মাসে আমি কি কি করব তা মাস আগমনের পূর্বেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। রোজার শিক্ষা নিয়ে যত রকম আলোচনা ও জ্ঞানলাভ এই মাস আসার পূর্বেই সেরে ফেলতে হবে, রোজার মাসের মধ্যে নয়। যেমন ধরুন, আমি অন্য মাসে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামায়াতের সহিত পড়তে পারিনি সেটা এই মাসে জামায়াতের সহিত পড়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবো। কোরআন শরীফ তেলাওয়াত ও অধ্যয়নের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি যা অন্য কোন মাসে করতে পারিনি তা এ মাসে করব। ব্যক্তিগত ইবাদত তাসবীহ-তাহলীলে মশগুল থাকব। কথা কম বলব যেন পরনিন্দা পরচর্চা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখব। সকল প্রকার লোভ-লালসা ও আমিত্বকে পরিহার করে সর্বদা আল্লাহর স্মরণে দিন কাটাবো। ব্যবসাতে কম সময় দিব, যতদূর সম্ভব অন্য কাজ যেমন দেখা সাক্ষাৎ, মিটিং মিছিল, পার্টি পরিহার করে চলবো। একান্ত আমল ও ইবাদতে মাসটি অতিবাহিত করবো।

সামাজিক জীবনে শতভাগ এরূপ সম্ভব হবে না। বিভিন্নরকম সামাজিক ক্রিয়া কর্ম আমার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাধার সৃষ্টি করবে বটে কিন্তু আমার পরিকল্পনামাফিক কাজের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলে সেক্ষেত্রে এই প্রচেষ্টার ফলাফল শূন্য হবে না। শতভাগের স্থলে হয়তো ৬০/৫০ ভাগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু পরিকল্পনাবিহীন কাজ হলে সেটার কোন হিসাব থাকবে না।

রোজার মাসে আল্লাহ’তায়ালা যেমন তাঁর রহমতের দ্বার উন্মোচন করেন তেমনি সে রহমত লাভের জন্য আমাদের সকল প্রকার পাপাচার ও ষড়রিপু দমন এবং নিজের মধ্যের আমিত্বকে দমন করে স্রষ্টার উদ্দেশ্যে নিবেদনের শক্ত পরিকল্পনা না করলে মোত্তাকী হওয়ার চেষ্টা ব্যহত হবে। এই মাস আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির মাস। এই মাসকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর মাধ্যমে আমরা যেন মোত্তাকী হওয়ার পথে অগ্রসর হতে পারি সেই চেষ্টা চালাতে হবে।

রমজানের প্রশিক্ষণের বিষয়সমূহ: রমজানের ১৫ দিন বা একমাস পূর্ব থেকে এই প্রশিক্ষণের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। প্রস্তুতি সবার ক্ষেত্রে একই রকম হবে না অর্থাৎ প্রশিক্ষণের কর্মধারার মূল লক্ষ্য এক হলেও কর্মধারা একইরকম হবে না। বিভিন্ন পেশা, কর্ম ও মানুষভেদে ভিন্নরকম হবে, তবে সবকিছুর লক্ষ্য থাকবে একটাই আর তা হচ্ছে আল্লাহ’তায়ালার খাঁটি বান্দাহ তথা তাকওয়াবান হওয়া। তাকওয়াবান হতে হলে নিজের আত্মিক শক্তি দিয়ে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ পশুশক্তি বা নফসের উপর বিজয়ী হতে হবে। রমজানের সব প্রোগ্রাম এই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে প্রণীত বা আবর্তিত হতে হবে। সঠিকভাবে রোজা পালনের পাশাপাশি নি¤œরূপ কাজগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।

প্রোগ্রামের ১ম লক্ষ্য: আল কোরআনকে সঠিকভাবে তেলাওয়াত ও অধ্যয়ন করে তার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝার চেষ্টা করা এবং সেই সাথে সংকল্প করা যে তার সকল নির্দেশসমূহ জীবনে মেনে চলব এবং বাস্তবায়ন করব। আমরা জানি রমজানের এই মর্যাদা এই আল কোরআনের জন্যই। যেহেতু আল্লাহ মানুষের হেদায়েতের জন্য এই গ্রন্থটি রমজান মাসে নাজিল করেছেন এবং এই আল কোরআন পৃথিবীতে আলোকবর্তিকা ও পথনির্দেশ স্বরূপ প্রেরিত হয়েছে যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। আল্লাহ বলেন (সূরা বাকারা; আয়াত ১৮৫) -
“রমজান মাস, যার মধ্যে বিশ্বমানবের জন্য পথ প্রদর্শক এবং সু-পথের উজ্জ্বল নিদর্শন ও (হক ও বাতিলের) প্রভেদকারী কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে।
কাজেই এই মাসে আমার সিলেবাস হবে অন্য মাসে যদি কোরআন অধ্যয়ন কম করে থাকি বা না করে থাকি তবে এই মাসে আমার ব্রত হবে আল কোরআন অধ্যয়ন। এর সাথে আল কোরআনের ব্যাখ্যা সম্বলিত তফসীর ও ইসলামী সাহিত্য অনুশীলন করা। নবীজীর জীবনচরিত ও তার হাদীস থেকেও বেশী বেশী পড়াশুনা করা যাতে ইসলামকে সঠিকভাবে জানা ও আমল করা যায়। কারণ জ্ঞান ছাড়া কোন আমল হয় না।

প্রোগ্রামের ২য় লক্ষ্য: প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের ২য় লক্ষ্য হচ্ছে সুষ্ঠুভাবে খুঁটিনাটি ফরজ, সুন্নত ইবাদত যথাসাধ্য নিখুঁতভাবে, তড়িঘড়ি না করে পালন করা। এছাড়াও নিজ গৃহে একাকী ও কখনও মসজিদে সময় কাটানো বা এতেকাফ করে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা।

প্রোগ্রামের ৩য় লক্ষ্য: নিজের আত্মসংযম শিক্ষা গ্রহণের শুরুতে নিজের রসনার পরিতৃপ্তি পরিহার করতে হবে। লোভ সংবরণ করতে হবে। লোভের খাবার খাওয়া যাবে না। মনে লোভ সৃষ্টি হলে সেটা দমন করতে হবে। ব্যক্তিগত খানা-পিনার নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ভোগ-বিলাস নিয়ন্ত্রণ জীবনের অন্যান্যক্ষেত্রেও পরিব্যাপ্ত করতে হবে। শরীরে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সবকটির উপর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাতে হবে যেমন - চোখের সংযম, শ্রবণের সংযম, কথাবলার সংযম, স্পর্শ বা অনুভূতির সংযম (লেখকের রোজার মাধ্যমে মুত্তাকী হওয়ার উপায় প্রবন্ধটি দ্রষ্টব্য)।

প্রোগ্রামের ৪র্থ লক্ষ্য: বেশী বেশী দানের হস্ত প্রসারিত করা। সকল প্রকার কার্পণ্য পরিত্যাগ করে যথা নিয়মে জাকাত-ফেতরা, দান-খয়রাত করা। নবীকরীম (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ রোজার মাসেই সবচেয়ে বেশী দান-খয়রাত করতেন। এই সবগুলোই আল্লাহর রাস্তায় বিনিয়োগ। এক্ষেত্রে কোনরূপ প্রদর্শনেচ্ছা, গ্রহীতার উপর চাপ সৃষ্টি এই বিনিয়োগ নষ্ট করে ফেলে এবং সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ লিখিত হয়ে যায়। কাজেই খুব সাবধানে খালেস নিয়তে একজন মুত্তাকী হওয়ার শিক্ষানবিশকে সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রোগ্রামের ৫ম লক্ষ্য: হালাল রুজির সন্ধান। কোনরূপ অনৈতিক কাজ, অবৈধ লেনদেন, অবৈধ পন্থায় মুনাফা অর্জন এই প্রশিক্ষণকে নষ্ট করে ফেলবে অর্থাৎ প্রশিক্ষণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
বাস্তবে আমরা কি দেখি?: আমরা দেখতে পাই রমজানের জন্য আমাদের কোনপ্রকার মানসিক প্রস্তুতি নেই, নেই কোন পরিকল্পনা, নেই কোন ইমাম বা আলেম যে আমাকে আমার নিজস্ব সিলেবাস তৈরীর ঘাটতি পূরণ করে দিতে পারে। আগেই বলেছি রোজার প্রশিক্ষণ একান্ত নিজস্ব আত্মিক প্রশিক্ষণ। নামাজ, হজ্জ ও জাকাত একাধারে ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রশিক্ষণ বা ইবাদত। রোজা তদ্রুপ নয়। কাজেই ব্যক্তিবিশেষ অর্থাৎ মুমিন ব্যক্তিকে নিজেকেই সচেতনভাবে এই রাস্তায় একাকী বা অন্য মুমিন প্রশিক্ষকের সাহায্য নিয়ে মাসব্যাপী পূর্বে বর্ণিত সিয়াম সাধনা সফল করতে হবে। তবেই ‘রাইয়ান’ নামক বেহেশতের বিশেষ দরজা পাওয়া যাবে। নচেৎ এই রোজা পালন থেকে কিছু সওয়াব হাসিল হলেও ইস্পিত তাকওয়া অর্জন সম্ভব হবে না। অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ক্ষুৎ পিপাসা নিবারণ ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ছাড়া আর কোন লাভই হবে না।

মাহে রমজানের বস্তুবাদী প্রয়োগ: এখন দেখা যায় ইফতার মাহফিলের নামে নিজের নাম জাহির করে সমাজে প্রতিপত্তি বৃদ্ধিকরণ, রাজনৈতিক দলগুলো জনসমর্থনের সুযোগ সৃষ্টি ও ভোট চাওয়া, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানসমূহ ব্যবসায়ের প্রসার লাভের কাজে এই ইফতার মাহফিলকে ব্যবহার করে থাকে। এগুলো আল্লাহর পথে বিনিয়োগ নয় বরং নিজ উন্নতির স্বার্থের জন্য বিনিয়োগ। কাজেই সেটা রমজানের সিয়াম সাধনার স্পিরিটের বিরোধী এবং তা সঠিক হতে পারে না।

বড়জোর এইসব ব্যক্তি, দল ও প্রতিষ্ঠানসমূহ শুধু মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অন্যকে ইফতার করানোর মত বড় সওয়াবের আশায় নিজেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রেখে ফি সাবিলিল্লাহ এই কাজটি করতে পারেন।এক্ষেত্রে মানুষজন জেনে গেলে ক্ষতি নেই। কিন্তু ইচ্ছা করে জানানো হলে তা বিনিয়োগের পর্যায়ে পড়ে যাবে এবং সেটা হবে অনৈতিক।

কাজেই আমাদের উচিত রমজানের আগমনের পূর্বেই মুমিন মুসলিমদের রমজানের ফায়দা হাসিলের জন্য এক, একাধিক, ততোধিক প্রোগ্রাম করা এবং তা প্রকাশ্য ও প্রচারমূলকও হতে পারে। তাতে কোন ক্ষতি নাই। কিন্তু রমজান শুরুর সাথে সাথে যে যার ব্যক্তিগত আত্মিক প্রশিক্ষণে ব্যাপৃত হবে। তখন তাকে ইফতার মাহফিলের নামে ডেকে নিয়ে প্রশিক্ষণ চলা অবস্থায় প্রশিক্ষণের উপকারিতা, হাকীকত বুঝানো যাবে না।
সাধারণ জ্ঞানেও তো আমরা সহজেই বুঝতে পারি কোন প্রশিক্ষণ কি এমন হয় যে প্রশিক্ষন চলা অবস্থায় বা প্রশিক্ষণের মাঝখানে ঐ প্রশিক্ষণের লক্ষ্য উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়? বরং যা করা হয় প্রশিক্ষণের শুরুতে, প্রশিক্ষণের মাঝে নয়। রমজানের ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য।
তাই আসুন, আমরা সিয়াম সাধনার মাসকে যথার্থভাবে কাজে লাগিয়ে শুধু মাত্র আল্লাহর দিকে মনকে পরিচালিত করে তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করি। সামাজিকতা যতটুকু না করলেই নয়, ব্যবসা যতটুকু না করলেই নয় ততটুকুতে সীমাবদ্ধ রেখে আমরা সবাই জীবনকে পরিচালিত করি। আমীন।।

লেখক -
ডাঃ মোঃ আজিজুল হক (আব্দুল্লাহ)
বিভাগীয় প্রধান (এক্স), মেডিসিন বিভাগ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল #####

Share: