শিয়াদের সম্পর্কে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের নিরপেক্ষ আলেমদের অভিমত

  • Posted: 21/01/2020

মূল: আহমাদ খমেইয়ার, অনুবাদ: মো: রফিকুল ইসলাম

সারাংশ: সমসাময়িক প্রসিদ্ধ মিশরীয় আলেম মুহাম্মাদ গাজ্জালী বলেছেন, ‘কোন কোন মিথ্যাবাদি শিয়াদের সাথে নুসাইরীদের (গালী ও অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণকারী) সাথে এক করে দেখেছে। তারা গুজব ছড়িয়েছে যে শিয়ারা আলী (আ.)-এর অনুসারী এবং সুন্নীরা রাসূল (সা.)-এর অনুসারী। শিয়ারা নবুয়্যতের জন্য আলী (আ.)-কে রাসূল (সা.) এর থেকে অধিকতর যোগ্য মনে করে এবং ভুল করে তা রাসূল (সা.) কে দেয়া হয়েছে। এটি নিকৃষ্ট এক মিথ্যা অপবাদ।
মূল প্রবন্ধ: অনেক নিরপেক্ষ সুন্নী আলেমের দৃষ্টিতে ওয়াহহাবী এবং শিয়া বিদ্বেষীরা, শিয়া এবং নুসাইরীদের (গালী ও অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণকারী) মধ্যে পার্থক্যকে জানে না; এ কারণে তারা শিয়া মতাদর্শ এবং তাদের মৌলিক বিশ্বাস সম্পর্কে পরিচিতির ক্ষেত্রে ভুল করে থাকে। এর ফলে তারা শিয়াদেরকে মিথ্যা অপবাদ দেয়। এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ কিছু সুন্নী লেখক ও চিন্তাবিদের মতের ইশারা করবো:
১. মিশরের সুন্নী চিন্তাবিদ আনওয়ার জুনদী এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সত্য এই যে একজন গবেষকের উচিত অনেক সতর্কতার সাথে মন্তব্য করা এবং শিয়া ও নুসাইরী (গালী ও অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণকারী) সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য করা। শিয়া ইমামরা এদের প্রতি কঠিন ভাষায় আক্রমণ করেছেন এবং তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। (এ দুই শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে)। (ইসলাম ওয়া হারকাতুত-তারিখ, আনওয়ারুল জানদী, পৃ. ৪২১।)
২. অন্য আরেক মিশরীয় লেখক, আলী আব্দুল ওয়াহেদ ওয়াফী এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আমাদের অনেক লেখকরা জাফরীয়া শিয়া (বার ইমাম পন্থী শিয়া) এবং অন্য ফেরকার শিয়াদের সাথে সংমিশ্রণ করেছেন।’ (বাইনা শিয়া ওয়া আহলে সুন্নাহ, আলী আব্দুল ওয়াহেদ ওয়াফী, পৃ. ১১।)
৩. সমসাময়িক প্রসিদ্ধ মিশরীয় আলেমদের একজন হলেন মুহাম্মাদ গাজ্জালী। তিনি শিয়াদের অন্ধ বিরোধিদের প্রতি সঠিক পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন এবং এক্ষেত্রে প্রচলিত পদ্ধতির সংশোধনের জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। তিনি শক্ত হাতে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের মধ্যে যারা শিয়াদের সাথে নুসাইরীদের পার্থক্য করেননি; তাদের ভুল ভঙ্গানোর চেষ্টা করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘কোন কোন মিথ্যাবাদি শিয়াদেরকে নুসাইরীদের (গালী ও অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণকারী) সাথে এক করে দেখেছে। তারা গুজব ছড়িয়েছে যে শিয়ারা আলী (আঃ)-এর অনুসারী এবং সুন্নীরা রাসূল (সাঃ)-এর অনুসারী। শিয়ারা নবুয়্যতের জন্য আলী (আঃ)-কে রাসূল (সাঃ) এর থেকে অধিকতর যোগ্য মনে করে এবং ভুল করে তা রাসূল (সাঃ) কে দেয়া হয়েছে। এটি নিকৃষ্ট এক মিথ্যা অপবাদ।
অন্য আরেক জায়গায় মুহাম্মাদ গাজ্জালী বলেছেন, ‘কোন কোন ব্যক্তি শিয়াদের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বলেছেন কোরআনের আয়াতে ঘাটতি রয়েছে।’ (রিসালাতুত-তাকরীব, ৩য় সংখ্যা, প্রথম বছর, শাবান ১৪১৪হিজরী, পৃ. ২৫০।)
৪. সুন্নী মনীষী আব্দুল হালিম জুনদি লিখেছেন, ‘নুসাইরীদের (গালী ও অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণকারী) কর্মকে শিয়াদের ওপর আরোপ করা হয়েছে। এ কারণে শিয়াদের সম্পর্কে অন্যদের মনে খারাপ ধারণার সৃষ্টি ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাদেরকে ঐ সকল মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে যেগুলো থেকে তারা নিজেদেরকে দূরে রাখে। এ সকল মিথ্যা অপবাদের একটি হল আল্লাহ ইমামদের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছেন অথবা ইমাম স্বয়ং আল্লাহ; অথচ তা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের বাতিল এক বিশ্বাস, যা কাফের পর্যায়ে পৌঁছায়। (লাইসা মিনাল ইসলাম, মুহাম্মাদ গাজ্জালী, পৃ. ৪৮।)
৫. ড. ত্বাহা হুসাইন এ বিষয়ে বলেছেন, ‘শিয়াদের দুশমনরা শিয়াদের সম্পর্কে যা কিছু জানে এবং যা কিছু জানে না সবকিছুর সাথে সম্পর্কিত করে। শিয়াদের দুশমনরা তাদের সম্পর্কে যা কিছু শুনে এবং যা কিছু দেখে তা যথেষ্ট মনে করে না; বরং তারা শিয়াদের সম্পর্কে যা কিছু বলা এবং শুনা হয়, তার চেয়েও অধিক বলে। তারা এ পর্যন্তই থেমে থাকে না...বরং এগুলোর সবকিছুই আহলে বাইতের অনুসারীদের ঘাড়ে চাপায়। তারা (শিয়াদের দুশমনরা) আড়ি পেতে বসে থাকে যে শিয়ারা কি বলে এবং কি করে। অতঃপর শিয়ারা যা কিছু বলে ও করে এর মধ্যে তারা সংযোজন করে এবং আজগুবি ও আশ্চর্যজনক কথা ও কর্ম দ্বারা তাদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। (আল-ইমাম জাফর সাদিক (আ.), আব্দুল হালীম আল জুনিদী, কায়রো, আল-মাজলিসুল আ‘লা লিশশুয়ুনুল ইসলামীয়া, ১৯৭৭খ্রি. পৃ. ২৩৫।)
৬. শিয়াদের নিকট প্রচলিত কোরআনের বাইরে আলাদা কোরআন থাকার অভিযোগের জবাবে সালিম বেহনাসাবী বলেন, ‘সুন্নীদের মাঝে যে কোরআন প্রচলিত রয়েছে; শিয়াদের ঘরে এবং মসজিদে একই কোরআন রয়েছে।’ (আলী ওয়া বানুহু, ত্বাহা হুসাইন, পৃ. ২৫।)
৭. মিশরের ইসলামী আন্দলোনের প্রসিদ্ধ নেতা এবং মনীষী হাসান আল-বান্না শিয়াদের বিষয়ে ওয়াহাবীদের ভুল ও বিভ্রান্তকর পরিচিতির সংশোধন করার অনেক চেষ্টা করেছেন। তিনি যারা শিয়াদেরকে নুসাইরীদের গোত্রে ফেলেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। তিনি দুনিয়ার গ্রন্থাগারগুলোতে শিয়া মনীষীদের বইতে ভরা থাকার পরও, শিয়াদের সাথে নুসাইরীদের গুলিয়ে ফেলার বিষয়টিতে আশ্চর্য হয়েছেন। (আল-সুন্নাতুল মুফতারা আলাইহা, সালিম বেহনাসাবী, পৃ. ৬।)
৮. মিশরের বিখ্যাত লেখক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদের মত ব্যক্তিরা এ ধরনের বিচ্যুতির বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন। এ কারণে মিশরের বিখ্যাত লেখক আনিস মানসুর তার থেকে বর্ণনা করেন, ‘আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ মৃত্যুর পুর্বে শিয়া মাহযাব সম্পর্কে যুক্তিযুক্ত গবেষণা করে গ্রন্থ রচনা করতে চেয়েছিলেন; কারণ শিয়াদের ওপর বিভিন্ন সময়ে যে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছিল তার ফলে মানুষের মাঝে শিয়াদের সম্পর্কে খারাপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের গ্রন্থ রচনা করার সুযোগ তার হয় নাই। (জাকারিয়াত লা মুজাক্কেরাত, ওমার তেলেমসনী, পৃ. ২৫০।)
৯. যারা শিয়া এবং নুসাইরীদের (গালী ও অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণকারী) মধ্যে কোন পার্থক্য করে না তাদের কঠিন সমালোচনা করে সুন্নী ইতিহাসবিদ মুহাম্মাদ কুরদ আলী বলেছেন, ‘কোন কোন লেখক যারা মনে করেন শিয়া মাযহাব আব্দুল্লাহ বিন সাবার বেদয়াতের মাধ্যমে উৎপত্তি ঘটেছে, তারা বাতিল কল্পনা করেছে এবং তা তাদের স্বল্প গবেষণা ও পর্যালোচনার ফসল। যে কেউ এই ব্যক্তি (আব্দুল্লাহ বিন সাবা) সম্পর্কে শিয়ারা কিরূপ ধারণা পোষণ করে তা জানে অর্থাৎ তার কথা ও আচরণ শিয়া সমাজ ও আলেমদের নিকট অত্যন্ত মন্দ ও ঘৃন্য হওয়া এবং তার সাথে তাদের সম্পর্কহীনতার ঘোষণার বিষয়টি জানে, তাহলে সে অনুধাবন করতে পারবে যে নুসাইরীদের সাথে শিয়াদেরকে সম্পর্কিত করা বড় ধরনের ভুল। (লায়াল্লাকা তাদ্বহাকা, আনিস মানসুর, পৃ. ২০১।)
১০. ইখওয়ানুল মুসলিমীনের অন্যতম নেতা উমর তালামসানী, শিয়া ও নুসাইরীদের (গালী ও অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণকারী) এক মনে করায় আশ্চর্যবোধ করে বলেছেন, ‘শিয়াদের ফিকাহশাস্ত্রের উন্নত চিন্তা ও গভীরতার দিকটি ইসলামী জগতকে (আইনশাস্ত্রকে) অভাবহীন করেছে।’ (খুতাতুশ-শাম, মুহাম্মাদ করদ আলী, ৬ষ্ঠ খ-, পৃ. ২৫১।)
১১. যে সকল ওহাবী শিয়া এবং নুসাইরীদের (গালী ও অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণকারী) একই মনে করে, তাদের জবাবে শেইখ মুহাম্মাদ আবু যুহরা বলেন, ‘ইমামীয়ারা তাদের ইমামদের মর্যাদাকে রাসূল (সাঃ)-এর মর্যাদার পর্যায়ে নিয়ে যায় না। (মাজাল্লাতুল আলামুল ইসলামী, ৯১তম সংখ্যা।)
একইভাবে তিনি লিখেছেন, ‘শিয়ারা ইসলামী মাযহাবের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কোন সন্দেহ নাই...। তারা যা কিছু বলে কোরআন এবং রাসূল (সাঃ)-এর হাদিসের সূত্রেই বলে। তারা তাদের সুন্নী প্রতিবেশিদের বন্ধু এবং একে অপরের প্রতি ঘৃনা পোষণ করে না।’ (আল ইমাম আস-সাদিক, মুহাম্মাদ আবু যুহরা, পৃ. ১৫১।)
১২. শেইখ শালতুত এবং মুহাম্মাদ আবু যুহরার শিক্ষক আহমাদ বেক এ সম্পর্কে বলেন, ‘ইমামীয়া শিয়ারা সকলেই মুসলমান এবং কোরআন, রাসূল (সাঃ) ও যা কিছু রাসূল (সাঃ) এনেছেন, তার প্রতি ঈমান রাখে। তাদের মধ্য হতে ইসলামের প্রথমের দিকে এবং বর্তমান সময়ে বড় ফকিহ এবং অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞানী ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়; যারা ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে গভীর ও ব্যাপক জ্ঞানী ছিলেন। তাদের রচিত গ্রন্থ সংখ্যার দিকে থেকে কয়েক লক্ষে পৌঁছাবে। (তারিখুল মাযাহেবিল ইসলামীয়া, মুহাম্মাদ আবু যুহরা, পৃ. ৩৯।)
১৩. জর্ডানের মুফতি উস্তাদ মাহমুদ সারত্বাবী বলেন, ‘আমার সৎকর্মশীল পূর্বপুরুষরা শিয়াদের সম্পর্কে যা কিছু বলেছে আমিও তাই বলতে চাই। তারা বলেছেন ইমামীয়া শিয়ারা আমাদের দ্বীনি ভাই। তারা আমাদের ওপর ভ্রাতৃত্বের অধিকার রাখে। আমরাও তাদের ওপর ভ্রাতৃত্বের অধিকার রাখি।’ (তারিখুল তাশরীউল ইসলামী।)
১৪. উস্তাদ আব্দুল ফাত্তাহ আব্দুল মাকসুদ বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে শিয়া মাযহাবই ইসলামের সঠিক রূপের সম্মুখিন হয়েছে এবং ইসলামের পরিষ্কার আয়না। যে ব্যক্তি ইসলামকে দেখতে চায় সে যেন প্রকৃত শিয়াদের বিশ্বাস এবং আমলের দিকে তাকায়। ইসলামী বিশ্বাস রক্ষা করার জন্য প্রতিরোধের ময়দানে শিয়ারা যে পরিমাণ অবদান রেখেছে, তার জন্য ইতিহাসই উত্তম সাক্ষী। (মাজাল্লাতু রেসালাতাছ-ছাকালাইন, ২য় সংখ্যা, প্রথম বছর, ১৪১৩ হিজরী, পৃ. ২৫২।)
১৫. মিশরের রাজধানী কায়রোর ভাষা অনুষদের শিক্ষক ড. হামিদ হানাফী দাউদের মতে, "এখান থেকে চিন্তাশীল পর্যালোচকের জন্য এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারবো। আর তা হল বক্র চিন্তার অধিকারী ও মূর্খরা যেরূপ ধারণা করে যে শিয়া মাযহাব যুক্তিহীন দলিল, কুসংস্কার ও অমূলক কল্পনা ও জাল হাদিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত অথবা শিয়া মাযহাব আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা বা অন্য কোন ঐতিহাসিক কাল্পনিক ব্যক্তির সৃষ্টি। কিন্তু এ মাযহাব এ ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা যেভাবে শিয়াদের সম্পর্কে চিন্তা করেছে আমরা এর বিপরীত মনে করি। আধুনিক জ্ঞানগত পদ্ধতির ক্ষেত্রে শিয়ারা বর্ণনামূলক (কোরআন ও সুন্নাহ) এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে থাকে এবং তারাই ইসলামী মাযহাবসমূহের মধ্যে প্রথম এ পথকে নির্বাচন করেছে। এভাবে তারা এমন এক ময়দানে পৌছেছে যার সীমা অনেক প্রসারিত। যদি শিয়ারা জ্ঞানের এ দুটি ধারার অর্থাৎ বর্ণনা ও বুদ্ধিবৃত্তির মধ্যে সমন্বয় করার ক্ষমতা অর্জন না করতো তাহলে তারা কখনই গভীর গবেষণাধর্মী ইজতেহাদে পৌঁছাতে পারতো না এবং ইসলামী শরিয়তের মূলকে অপরিবর্তিত রেখে, যুগ এবং স্থানের সাথে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে পারতো না। (ফী সাবিলিল ওহদাতিল ইসলামীয়া, সাইয়্যেদ মুরতাজা রাজাভী, পৃ. ২০০।) (নাজারত ফীল কুতুবিল খাদিতাতি, হামিদ হানাফী দাউদ, কাহেরা, মাকতাবুন নাজাহ, পৃ. ৩৩।)
তিনি একইভাবে সাইয়্যেদ মুরতাজা আসকারীর গ্রন্থ ‘আব্দুল্লাহ বিন সাবা’-র প্রশংসা করে বলেছেন, ‘ইসলামের ইতিহাসের তেরশত শতাব্দি পেরিয়ে গেল। আমরা শিয়া বিরোধী আলেমদের পক্ষ থেকে দেওয়া ফতোয়া লক্ষ্য করছি; যে ফতোয়াগুলো আবেগ ও কামনা-বাসনা দ্বারা মিশ্রিত। এ অপছন্দনীয় পদ্ধতিটি ইসলামী মাযহাবগুলোর মাঝে ব্যাপক ফাটলের কারণ হয়েছে। এর ফলে এ মাযহাবের মনীষীদের জ্ঞান থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। প্রকৃতপক্ষে আমাদের এ ধরনের কুসংস্কারের কারণে শিয়া মাযহাবের যে পরিমান ক্ষতি না হয়েছে; আমরা তাদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন না করার কারণে এর চেয়ে অনেক বেশি পরিমানে ক্ষতির সম্মুখীন আমরা হয়েছি। বাস্তবে এ সকল কুসংস্কার থেকে শিয়ারা মুক্ত।
যদি এ শ্রেণীর আলেমরা নিজেদেরকে কুসংস্কার থেকে দূরে রাখতো এবং তাদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করতো। তাদের কাছ থেকে সঠিক জ্ঞানগত পদ্ধতি গ্রহণ করতো এবং তাদের মনের কামনা-বাসনার চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিকে অগ্রাধিকার দিত, তাহলে শিয়াদের নিকট থেকে অনেক জ্ঞান উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের কাছে পৌঁছাতো। আমরা এ থেকে অনেক উপকৃত হতে পারতাম। যেভাবে জ্ঞানের ক্ষেত্রে একজন নিরপেক্ষ গবেষক শিয়া মাযহাব থেকে উপকৃত হয় যেভাবে অন্যান্য মাহযাবের আলেমদের থেকে তারা উপকৃত হয়। যদি নিরপেক্ষ গবেষক হতে হয় তবে সুন্নী চার মাযহাবের সম্পর্কে জানার পাশাপাশি শিয়া ফিকাহশাস্ত্র থেকেও জ্ঞান অর্জন করাও জরুরী।
তাদের সঠিকতার বিষয়টি প্রমাণের ক্ষেত্রে আমাদের জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে শিয়া মাযহাবের পতাকাবাহক ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) আহলে সুন্নাতের দুইজন ইমামের শিক্ষক। এদের মধ্যে একজন হলেন আবু হানিফা নুমান বিন ছাবিত (মৃত্যু ১৫০হিজরী) এবং অপরজন আবু আব্দুল্লাহ মালিক বিন আনাস (মৃত্যু ১৭৯ হিজরী)। এ কারণেই আবু হানিফা বলতেন যদি ঐ (ইমাম জাফর সাদিকের সান্নিধ্যের) দুই বছর না থাকত, তাহলে নুমান ধ্বংস হয়ে যেত। যেই দুই বছর আবু হানিফা ইমাম জাফর বিন মুহাম্মাদ (আঃ) থেকে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছেন। আনাস বিন মালিক বলেছেন, ‘জাফর বিন মুহাম্মাদের মত জ্ঞানী ফকিহ আমি দেখি নাই’।” (আব্দুল্লা বিন সাবা, সাইয়্যেদ মুরতাজা আসকারী, ১ম খ-, পৃ. ১৩।)
১৬. আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী দর্শনের প্রফেসর আবুল ওফা গানীমী তাফতাযানী বলেন, ‘পশ্চিমা ও প্রাচ্যের ইসলামী চিন্তাবিদরা ইসলামের শুরুতে এবং বর্তমান সময়ে শিয়াদের বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। যে সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে কোন দলিল ও বর্ণনামূলক সাক্ষ্য নাই। সাধারণ মানুষরাও এ ভুল মতগুলোর সত্যতা যাচাই-বাছাই না করেই একে অপরের নিকট পৌছে দিয়েছে এবং তার ভিত্তিতে শিয়াদেরকে এসকল ভুল মতে বিশ্বাসী বলে অভিযুক্ত করেছে। শিয়াদের মূল গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা এর অন্যতম কারণ। এ সকল অভিযোগের ক্ষেত্রে তারা শিয়াদের দুশমনদের গ্রন্থগুলোকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।’ (মাআ রিজালুর কুফর ফীল কাহিরা, সাইয়্যেদ মুরতাজা রাজাভী, পৃ. ৪০।)
১৭. যখন ড. তিজানী শিয়াদের সম্পর্কে জানতে শুরু করেছিলেন। একদল চরমপন্থী তাকে বলেছিল, ‘শিয়ারা আলীর ইবাদত করে, তারা বিশ্বাস করে জিব্রাইল ওহী পৌছাতে ভুল করেছে। শিয়ারা তাদের মতবাদের মাধ্যমে ইসলামকে ধ্বংসের চেষ্টা করছে। আমাদের কোরআনের ব্যতিক্রম আরেকটি কোরআন তাদের রয়েছে। তারা ইসলাম সম্পর্কে বিদ্বেষ পোষণ করে। তাদের বিবাহ জিনার অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া আরো অনেক সংশয় উপস্থাপন করে থাকেন; বরং এমন অনেক অপবাদ রয়েছে যেগুলোতে তাদের সত্যতার সম্পর্কে সুন্নী যুবকদের সন্দেহকে আরো বৃদ্ধি করে। কিন্তু যখন সুন্নী যুবকরা সত্যকে আবিষ্কার করে তখন তাদের মাযহাবের গবেষক এবং আলেমদের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। এ সকল যুবকদের মধ্যে চিন্তাগত পরিবর্তন এবং সকল সুন্নী মাযহাবের জ্ঞানের শাখাসমূহে সন্দেহ ও সংশয় ছাড়া আর কিছু আশা করতে পারি না।...
ড. তিজানীর শিয়া মাযহাব সম্পর্কে জানার আগ্রহের আরেকটি কারণ হল একদল ব্যক্তির মধ্যে সাহাবাদের ইজতেহাদের দাবির ক্ষেত্রে চরম বাড়াবাড়ি; কারণ আমরা দেখতে পাই কিভাবে মুয়াবিয়া ইজতিহাদের বিষয়কে ঠাট্টা-মশ্করা করেছে। সে আলী (আঃ)-র সাথে মুয়াবিয়ার যুদ্ধে রাসূল (সাঃ)-এর সাহাবী হুজার বিন আদীকে হত্যা করেছে এবং আলী (আঃ)-কে মিম্বরে বসে লানত দেওয়ার প্রথা চালু করেছে এবং যিয়াদ বিন আবিকে রাসূল (সাঃ)-এর হাদিসের বিরোধিতা করে নিজের সন্তান হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং এগুলোকে তার নিজস্ব ইজতেহাদ হিসেবে এ সব কাজের বৈধতা দান করেছে। ওহাবীদের পক্ষ থেকে বলা হয় ইয়াযিদ ইমাম হুসাইন (আঃ)-কে হত্যা করতে এবং এর পর মদিনার বিদ্রোহ দমনের ক্ষেত্রে যে হত্যাযজ্ঞ চালানো ক্ষেত্রে বাধ্য ছিল এবং এর কারণে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। (মুয়াবিয়া, যিয়াদ বিন আবীকে নিজের পক্ষে আনার জন্য তাকে ভাই হিসেবে সম্মোধন করেছেন কারণ তার মা সুমাইয়ার সাথে আবু সুফিয়ানের অবৈধ সম্পর্কের মাধ্যে সে জন্ম লাভ করেছে। এ দাবির মাধ্যমে সে রাসূল (সা.)-এর হাদিসের বিরোধিতা করেছে। হদিসে এসেছে যে, সন্তান শরিয়তের বৈধ সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়; জিনা ও ব্যভিচারের মাধ্যমে কেবল শরিয়তের হাদ (শাস্তি) কপালে জোটে।)
বাস্তবে বিষয়টি এই যে, এ ধরনের চিন্তা আহলে সুন্নাহর মত নয় বরং এগুলো শিয়া বিদ্বেষী নাসেবীদের মত অথবা তারা ঐ শ্রেণীভুক্ত যারা অতিরঞ্জিত বিশ্বাস পোষণকারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। (কারায়াতু ফীত তাহাব্বুলাতুস সুন্নীয়াতি লিশ-শিয়াতি, হাসান বিন ফারাহানে মালেকী।)###

Share: