ঈদে নওরোজের ইতিহাস ও আমলসমূহ

  • Posted: 19/03/2021

নওরোজ শব্দটি হচ্ছে একটি ফার্সি শব্দ যার অর্থ হচ্ছে নতুন বছরের প্রথম দিন। ফারওয়ারদিন হল ইরানী শামসি (সৌরবর্ষ) সনের প্রথম মাস। ২১ মার্চ পালিত হয় এ বিশেষ নববর্ষ উৎসব। নওরোজের প্রবর্তন করেছিলেন প্রাচীন পারস্যের প্রভাবশালী সম্রাট জামশিদ, খ্রিস্ট পূর্ব ৮০০ সালে। তিনি জ্যোতির্বিদ্যায় প্রাজ্ঞ ছিলেন। এটি ইরানের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় উৎসব। ইরান হতে এ উৎসব মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশ এবং ভারত উপমহাদেশে প্রচলিত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা হলে ফার্সি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়। তবে ঈদে নওরোজ উদযাপনের প্রচলন প্রাক মুঘল যুগে ছিল না। মুঘল সম্রাট হুমায়ুন পারস্যের সহায়তায় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে পিতার সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করার পর থেকে উপমহাদেশে তখন হতে ইরানী জনগণের ব্যাপকভাবে আগমন ঘটে। ফলে ইরানী সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ওই সময় থেকে ভারতে উদযাপন হতে থাকে নওরোজ উৎসব। সম্রাট আকবর হতে আওরঙ্গজেবের সময় পর্যন্ত (১৫৫৬-১৭০৭) এটা অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় উৎসবে পরিণত হয়। এই দিনে আগ্রা ও দিল্লিতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় ভোজসভা অনুষ্ঠিত হত। মুঘল তাহজীব বা সংস্কৃতির স্মৃতি হল নওরোজ। সাবেক মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতে নওরোজের প্রচলন রয়েছে।

কিন্তু ইসলামের ইতিহাস এবং রেওয়ায়েতের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমরা এর গুরুত্ব সম্পর্কে আরো বেশি অবগত হতে পারবো।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর একনিষ্ঠ সাহাবী মোআল্লা বিন খানিস তিনি বলেন একদা আমি ইমাম (আ.) এর কাছে উপস্থিত ছিলাম তখন তিনি আমাকে বলেন: তুমি কি জান এই দিনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল যেমন:

  • মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের রূহের কাছে তাঁর একত্ববাদের সাক্ষী নিয়েছিলেন।
  • সূর্যের কিরণ প্রথম পৃথিবীর বুকে পড়েছিল।
  • হজরত নূহ (আ.) এর নৌকা জুদি পাহাড়ে থেমেছিল।
  • একদা ৩০ হাজার লোক যারা আল্লাহর আযাব থেকে পলায়ণের চেষ্টা করছিল। আল্লাহ তাদেরকে মৃত্যুর পরে আবার জীবিত করেন এবং পুনরায় মৃত্যু দান করেন। তারপরে সে পথ দিয়ে হারকিল নামক নবী যাচ্ছিলেন তিনি মহান আল্লাহকে নিজের ঈমানকে আরো বলিষ্ঠ করার উদ্দেশ্যে বলেন, হে আল্লাহ! আপনি আবার কিভাবে এদেরকে জীবিত করবেন? আল্লাহ তায়ালা বলেন: তুমি এদের উপরে পানি ছিটিয়ে দাও তাহলে দেখবে যে তারা জীবিত হয়ে গেছে। তখন সেই নবী তাদের উপরে পানি ছিটিয়ে দেন এবং তারা জীবিত হয়ে যায়। আর এ কারণে একে অপরের উপরে পানি ছিটানো এবং গোসল করা উত্তম। 
  • উক্ত দিনে হজরত মোহাম্মাদ (সা.) এর কাঁধে আরোহণ করে হজরত আলী (আ.) কাবা ঘরের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ছিলেন। 
  • রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ী ঈদে গাদির এ দিনেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। 
  • ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী উক্ত দিনেই হজরত উসমানের মৃত্যুর পরে হজরত আলী (আ.) খেলাফতের পদে আসীন হন। 
  • খারেজিদের বিরূদ্ধে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে হজরত আলী (আ.) জয়ী হন। 
  • রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ী এই দিনেই হজরত ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাব ঘটবে। 
  • রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ী অন্যান্য ইমাম (আ.)গণ উক্ত দিনেই আল্লাহর অনুমতিক্রমে রাজআত করবেন।

অতঃপর ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তাঁর সেই সাহাবিকে বলেন, উক্ত দিনটি আমাদের এবং আমাদের অনুসারীদের। সুতরাং উক্ত দিনে বিশেষ কিছু আমল রয়েছে যা হচ্ছে নিন্মরুপঃ

  • গোসল করা।
  • নতুন অথবা পরিষ্কার কাপড় পরিধান করা।
  • সুগন্ধি ব্যবহার করা।
  • রোজা রাখা।

যোহর ও আসরের নামাজের পরে ৪ রাকাআত নামাজ আদায় করা উত্তম। প্রথম রাকাআতে সুরা ফাতিহার পরে ১০ সুরা কদর পাঠ করতে হবে এবং দ্বিতীয় রাকাআতে সুরা ফাতিহার পরে ১০বার সুরা কাফিরুন পাঠ করতে হবে। পরবর্তী ২ রাকাআতের প্রথম রাকাআতে সুরা ফাতিহার পরে ১০ বার সুরা ইখলাস পাঠ করতে হবে এবং দ্বিতীয় রাকাআতে সুরা ফাতিহার পরে ১০ বার সুরা নাস পাঠ করতে হবে। নামাজান্তে সিজদাতে গিয়ে বলতে হবে:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ آلِ مُحَمَّدٍ الْأَوْصِيَاءِ الْمَرْضِيِّينَ وَ عَلَى جَمِيعِ أَنْبِيَائِكَ وَ رُسُلِكَ بِأَفْضَلِ صَلَوَاتِكَ وَ بَارِكْ عَلَيْهِمْ بِأَفْضَلِ بَرَكَاتِكَ وَ صَلِّ عَلَى أَرْوَاحِهِمْ وَ أَجْسَادِهِمْ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ آلِ مُحَمَّدٍ وَ بَارِكْ لَنَا فِي يَوْمِنَا هَذَا الَّذِي فَضَّلْتَهُ وَ كَرَّمْتَهُ وَ شَرَّفْتَهُ وَ عَظَّمْتَ خَطَرَهُ اللَّهُمَّ بَارِكْ لِي فِيمَا أَنْعَمْتَ بِهِ عَلَيَّ حَتَّى لا أَشْكُرَ أَحَدا غَيْرَكَ وَ وَسِّعْ عَلَيَّ فِي رِزْقِي يَا ذَا الْجَلالِ وَ الْإِكْرَامِ اللَّهُمَّ مَا غَابَ عَنِّي فَلا يَغِيبَنَّ عَنِّي عَوْنُكَ وَ حِفْظُكَ وَ مَا فَقَدْتُ مِنْ شَيْ ءٍ فَلا تُفْقِدْنِي عَوْنَكَ عَلَيْهِ حَتَّى لا أَتَكَلَّفَ مَا لا أَحْتَاجُ إِلَيْهِ يَا ذَا الْجَلالِ وَ الْإِكْرَامِ.

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তাঁকে বলেন: উক্ত নামাজটি পড়ার কারণে আল্লাহ তোমার ৫০ বছরের গুনাহকে ক্ষমা করে দিবেন।
বিভিন্ন রেওয়ায়েতে উক্ত দিনে নিম্মাক্ত দোয়াটি (ইয়া যুল জালালে ওয়াল ইকরাম) অধিক পাঠ করার জন্য গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

উক্ত দিনে বছর শুরু হওয়ার সময় নিম্মাক্ত দোয়াটি ৩৬৬ বার পাঠ করার জন্য গুরুত্বারোপ করা হয়েছে:
يَا مُحَوِّلَ الْحَوْلِ وَ الْأَحْوَالِ حَوِّلْ حَالَنَا إِلَى أَحْسَنِ الْحَالِ

অন্য এক রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ী নিম্মাক্ত দোয়াটি ৩৬৬ বার পাঠ করার জন্য গুরুত্বারোপ করা হয়েছে:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ وَ الْأَبْصَارِ يَا مُدَبِّرَ اللَّيْلِ وَ النَّهَارِ يَا مُحَوِّلَ كذا في زاد المعاد

রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে কোন ব্যক্তি যদি নিম্মাক্ত ৭টি সালামকে জাফরান দ্বারা চিনামাটির পাত্রে লিখে তা পান করে তাহলে সে সারা বছর বিভিন্ন দুঃখ কষ্ট, বিভিন্ন জীব জন্তুর বিষ থেকে সুরক্ষিত থাকবে। উক্ত সাতটি সালাম নিন্মরুপ:
سلامٌ علی نوح ٍ فی العالمین
:সুরা সাফফাত, আয়াত নং ৭৯।
سلامٌ قولاً مِن رَبّ رحیم
:সুরা ইয়াসিন, আয়াত নং ৫৮।
سلامٌ علی اِبراهیم
:সুরা সাফফাত, আয়াত নং ১০৯।
سلامُ عـَلی موُسی و هارون
:সুরা সাফফাত, আয়াত নং ১২০।
سلامُ علی اِل یاسین
:সুরা সাফফাত, আয়াত নং ১৩০।
سلامٌ عـَلیکُم بما صَبرتم فنِعم عُقبی الدّار
:সুরা রাআদ, আয়াত নং ২৪।
سلامُ هیَ حتّی مَطلَعِ الفـَجر
:সুরা কদর, আয়াত নং ৫।

রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি যদি উক্ত দিনে সুরা বনি ইসরাইল, নূর, হাদিদ, হাশর, সাফ, মাআরিজ এবং আলা-এর তেলাওয়াত করে তাহলে সে সারা বছর বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে সুরক্ষিত থাকবে। ####

Share: