ইমাম মাহদি (আ.)-এর জন্মের অলৌকিক ঘটনা

  • Posted: 29/03/2021

শেষ ইমাম এবং রাসূল (সা.)-এর বারতম উত্তরাধিকারী ১৫ই শাবান শুক্রবার প্রভাতে ইরাকের সামেরা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। একাদশ ইমাম হযরত হাসান আসকারী (আ.) তাঁর মহান পিতা। মাতা হযরত নারজিস খাতুন। নারজিস খাতুনের পিতা হলেন রোমের যুবরাজ, আর মাতা আশ্ শামউন সাফার বংশধর হযরত ঈসা (আ.)-এর ওয়াসি এবং নবীগণের বন্ধু হিসাবে পরিচিত। নারজিস খাতুন স্বপ্নের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী যুদ্ধের ময়দানে যান এবং সেখানে অন্যান্য মুসলমানদের সাথে বন্দি হন। ইমাম হাদী আন্ নাকী (আ.) একজনকে প্রেরণ করেন এবং সে নারজিস খাতুনকে কিনে সামেরায় ইমামের বাড়িতে নিয়ে আসে। (কামালুদ্ দ্বীন খন্ড- ২, বাব ৪১, হাদীস ১, পৃষ্ঠা ১৩২)।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হতে বহুসংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে তাঁর বংশ হতে মাহ্দী নামক একজন ব্যক্তি অভ্যুত্থান করবেন এবং তিনি অত্যাচারের ভিতকে সমূলে উৎপাটন করবেন। অত্যাচারী আববাসীয় শাসকরা এঘটনা জানতে পেরে ইমাম মাহদী (আ.)-কে তাঁর জন্মলগ্নেই হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সুতরাং ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর সময় থেকে মাসুম ইমামগণের জীবন-যাপন কড়া সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলে আসে এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর সময়ে এ পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌছায়। এমনকি ইমাম (আ.)-এর গৃহের অতি সামান্য আসা যাওয়ার বিষয়ও শাসকবর্গের নখদর্পনে থাকত। অতএব এমতাবস্থায় শেষ ইমাম তথা ঐশী নবজাতকের জন্ম গোপনে বা লোকচক্ষুর আড়ালে হওয়াটাই বাঞ্চনীয়। ঠিক একারণেই ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর অতি নিকট আত্মীয়রাও ইমাম মাহদী (আ.)-এর জন্মের ঘটনা সম্পর্কে জানতেন না। এমনকি জন্মের কয়েক ঘন্টা পূর্বেও হযরত নারজিস খাতুনের গর্ভবতী অবস্থা পরিদৃষ্ট ছিল না।

হযরত ইমাম মুহাম্মদ তকী আল জাওয়াদ (আ.)-এর কন্যা হাকিমাহ বলেন যে, ইমাম হাসান আসকারী (আ.) তাকে বললেন: "ফুপি আম্মা আজকে ১৫ই শাবান, আমাদের সাথে ইফতার করুন। কেননা, আজ রাতে (রাতের শেষ ভাগে) আল্লাহ তার বরকতময় হুজ্জাতকে দুনিয়াতে প্রেরণ করবেন।"
আমি বললাম: "এই বরকতময় নবজাতকের জননী কে?"
ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: "নারজিস।"
আমি বললাম: "কিন্তু আমি তো তার কোন আলামত দেখছি না!"
ইমাম (আ.) বললেন: "কল্যাণ এর মধ্যেই নিহিত, আমি যা বলেছি তা ঘটবেই ইনশা আল্লাহ।"
আমি নারজিস খাতুনের ঘরে প্রবেশ করে সালাম করে বসলাম, সে আমার পায়ের থেকে জুতা খুলে বলল: শুভ রাত্র হে আমার, নেত্রী।
আমি বললাম: "তুমি আমার এবং আমাদের পরিবারের মহারাণী।"
নারজিস খাতুন বললেন: "না! আমি কোথায় আর এ মর্যাদা কোথায়।"
আমি বললাম: "হে আমার কন্যা! আল্লাহপাক তোমাকে আজ রাত্রে এমন একটি সন্তান দান করবেন যে দুনিয়া ও আখেরাতের নেতা।"
একথা শোনার পর সে বিনয় ও লাজুকতার সাথে বসে পড়ল। আমি নামায-কালাম পড়ে ইফতার করে শুয়ে পড়লাম।
মধ্যরাত্রে উঠে তাহাজ্জতের নামায পড়লাম। নারজিস ঘুমাচিছল কিন্তু বাচচা হওয়ার কোন আলামত দেখতে পেলাম না। নামায শেষে পুনরায় শুয়ে পড়লাম।
কিছুক্ষণ পর ঘুম ভেঙ্গে গেল দেখলাম নারজিস নামায পড়ছে কিন্তু বাচচা হওয়ার কোন আলামত দেখতে পেলাম না। তখন আমার মনে হল ইমাম হয়ত ঠিক বুঝতে পারে নি।
এমন সময় ইমাম হাসান আসকারী (আ.) তাঁর শোয়ার ঘর থেকে উচচস্বরে বললেন,
لا تعجلي يا عمه فانّ الامر قد قرب
"ফুপি আম্মা ব্যস্ত হবেন না বাচচা হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।"
একথা শোনার পর আমি সুরা সাজদা এবং সুরা ইয়াছিন পড়তে লাগলাম। এর মধ্যে হটাৎ নারজিস লাফিয়ে উঠলে আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার ব্যথা অনুভব হচেছ? বলল, "হ্যাঁ ফুপি।"
আমি বললাম: চিন্তার কোন কারণ নেই ধৈর্য ধর, তোমাকে যে সুসংবাদ দিয়েছিলাম এটা তারই পূর্বাভাস।
অতঃপর আমি ও নারজিস সামান্য ঘুমালাম, জেগে দেখি সেই চোখের মণি জন্মগ্রহণ করেছে এবং সেজদা করছে। তাকে কোলে নিয়ে দেখলাম সম্পুর্ণ পাক ও পবিত্র কোন ময়লা তার গায়ে নেই। এমন সময় ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন, "ফুপি আম্মা আমার সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে আসুন।"
আমি নবজাতককে তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম তিনি শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং নিজের জিহবাকে তার মুখে দিলেন এবং চোখে ও কানে হাত বুলালেন এবং বললেন:
تكلم يا بنيّ
"আমার সাথে কথা বল হে আমার পুত্র।"
পবিত্র শিশুটি বলল:
اشهد ان لا اله الا الله وحده لا شريك له و اشهد ان محمد رسول الله
“আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহ ওয়া আশাহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ”
অতঃপর ইমাম আলী (আ.)সহ সকল ইমাম (আ.)গণের উপর দরুদ পাঠ করলেন।

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: "ফুপি! তাকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে যান সে মাকে সালাম করবে, তারপর আমার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন।"
তাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম, সে মাকে সালাম করল নারজিস সালামের উত্তর দিল এবং আবার তাকে তাঁর পিতার কাছে নিয়ে গেলাম।
হাকিমা খাতুন বলেন, 'পরের দিন আমি ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর কাছে গিয়ে সালাম করলাম এবং ঘরে ঢুকে নবজাতককে দেখতে পেলাম না। ইমামের কাছে জানতে চাইলাম, ‘ইমাম মাহ্দী কোথায়, তাঁকে দেখছিনা কেন, তাঁর কি হয়েছে? ইমাম বললেন: “ফুপি, তাকে তাঁর কাছে শপে দিয়েছি যার কাছে হযরত মুসার মাতা মুসা (আ.)-কে শপে দিয়েছিলেন।”

হাকিমা খাতুন বলেন, 'সপ্তম দিনে আবার ইমামের বাসায় গেলাম এবং ইমাম আমাকে বললেন: "ফুপি, আমার সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে আসুন! আমি তাঁকে ইমামের কাছে নিয়ে আসলাম। ইমাম বললেন: "হে আমার সন্তান! কথা বল! শিশুটি মুখ খুললেন এবং কালিমা শাহাদত পাঠ করলেন। অতঃপর মহানবী ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠ করলেন। অতঃপর এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:

بِسْمِ اللّهِ الرّحْمَنِ الرّحيمِ * وَ نُريدُ أَنْ نَمُنّ عَلَي الّذينَ اسْتُضْعِفوا فِي الْأَرْضِ وَ نَجْعَلَهُمْ أَئِمّةً وَ نَجْعَلَهُمُ الْوَرِثينَ وَ نُمَكنَ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَ نُرِيَ فِرْعَوْنَ وَ هَمَنَ وَ جُنوذَهُما مِنْهُمْ ما كانوا يَحْذَرونَ

"আমি ইচছা করলাম পৃথিবীতে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে এবং উত্তরাধিকারী করতে।' এবং তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে, আর ফিরাউন হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে যা তাদের নিকট তারা আশঙ্কা করত" (সূরা কাসাস আয়াত নং ৫,৬/ কামালুদ্দিন, খন্ড-২, বাবে ৪২, হাদীস নং-১, পৃ.-১৪৩)।

আর এভাবেই মহান আল্লাহ তায়ালা ইমাম মাহদি (আ.) কে বনি আব্বাস খেলাফতের শত চেষ্টাকে বৃথা করে দুনিয়ার বুকে জন্মদান করেন এবং সারা বিশ্বকে রাসুল (সা.) এর শেষ স্থলাভিষিক্ত দ্বারা সুশোভিত করেন।###

Share: