সকল সাহাবাগণ কি সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন?

  • Posted: 29/12/2021

সংকলনেঃ মল্লিক শিহাব ইকবাল

শিয়াগণ নবী (সঃ) এর ঐ সাহাবীগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন যাঁরা তাদের জীবদ্দশায় মহানবী (সাঃ) এর শিক্ষাকে অনুসরন করতেন এবং তাঁর ইন্তেকালের পরও তা অনুসরন করতেন। সুন্নী মুসলমানগণ মনে করেন যাঁরা নবী (সাঃ) কে কয়েক সেকেন্ডের জন্যও দেখেছে তাঁরাও সাহাবী এবং তাঁরা সমালোচনার উর্ধ্বে। এ ধারনা কোরআন বা ঐতিহাসিক সত্য দ্বারা সমর্থিত নয়। ফলে ঐ দুই চিন্তাধারা ব্যাপক পার্থক্যের সৃষ্টি করেছে।

সাহাবীর সংজ্ঞাঃ বিখ্যাত সুন্নি পন্ডিত ইবনে হাজার আল আসকালানী সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, যিনি নবী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করেছেন, ইসলাম গ্রহণের পর এবং মৃত্যু পর্যন্ত ইসলামের উপর দৃঢ় ছিলেন। তিনি তাঁর সংজ্ঞায় নিুলিখিত বিষয়াদি সামিল করেছেন।

  • সকল ব্যক্তি যাঁরাই নবী (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করেছেন এই বিষয় নির্বিশেষে যে, তাঁরা দীর্ঘ সময় বা স্বল্প সময় এর জন্য সাক্ষাত করেছিলেন।
  • কে কে নবী (সঃ) এর নিকটে থেকে কৃষ্টি, সংস্কৃতি বহণ করেছেন কে কে করেননি।
  • কে কে নবী (সঃ) এর নিকটে থেকে যুদ্ধ করেছেন কে কে করেননি।
  • কে কে শুধু নবী (সঃ) কে দেখেছেন কিন্ত তার সাথে মজলিসে বসেননি।

(ইবনে হাজার আল আসকালানী আল ইসাবাহ ফি তামিজা আল সাহাবা (বইরুত প্রথম খন্ড) পৃঃ ১০)

সকল সাহাবী কি সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন?

আহলুস সুন্নত ওয়াল জামাতের সবাই একমত এই বিষয়ে যে, প্রত্যেক সাহাবীই ন্যায়বান ও সত্যবাদী এবং উম্মতদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ উম্মত। অনেক সুন্নী মুসলমান এরকম বিশ্বাস করতেন। (ইবনে হাজার আল আসকালানী, আল ইসাবাহ ফি তামিজ আল সাহাবা (মিশর), খঃ ১, পৃঃ ১৭ থেকে ২২। ইবনে অবি হাতিম আলরাজী আলজর ওয়া আল তাদিল (হায়াদারাবাদ), খঃ ১, পৃঃ ৭ থেকে ৯। ইবনুল আছির, ইউজত আল যাবা ফি মারিফাত আল সাহাবা, খঃ ১, পৃঃ ২ থেকে ৩।)

বিপক্ষে সর্বসম্মত প্রমাণ থাকার কারণে এই মতামত গ্রহণ করা কষ্টকর। নিুলিখিত উদাহরণ বিবেচনা করুনঃ

আল জুবাইর আমাকে বলেছেন যে, তিনি একজন আনসারী ব্যক্তির সাথে ঝগড়া করেছিলেন একটা ঝর্না নিয়ে যা উভয়ই সেচ কাজে ব্যবহার করতেন এবং যিনি বদর যুদ্ধে আল্লাহর বার্তাবাহকের সামনে যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহর বার্তাবাহক যুবাইরকে বলেছেন, হে যুবাইর তোমার বাগানে প্রথমে সেচ কাজ কর। তারপর জলধারা তোমার প্রতিবেশীর নিকট যেতে দাও। আনসারী ক্রুদ্ধ হলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর বার্তাবাহক, এ কারণে যে তিনি আপনার জ্ঞাতি ভাই?” তখন আল্লাহর নবীর চেহারা মোবারক পরিবর্তন হয়ে গেল (রাগে) এবং বললেন (যুবাইরকে) তোমার বাগানে জল দাও এবং তারপর ইহা দেওয়াল অবধি গেলে ধরে রাখ (চারপাশে উচু আল্ দিয়ে)। সুতরাং আল্লাহর নবী যুবাইরকে তার পুর্ণ অধিকার দান করলেন। কিন্তু তার আগে যুবাইর ও আনসারী উভয়ের পারস্পারিক উপকার হয় এমন উদার বিচার করেছিলেন। কিন্তু আনসারী যখন আল্লাহর নবীকে বিরক্ত করলেন তখন সুষ্পষ্ট বিধানের আলোকে যুবাইরকে পুর্ণ অধিকার দিলেন। যুবাইর বললেন, আল্লাহর শপথ! আমার মনে হয় উক্ত বিষয়ে নিুলিখিত আয়াত নাযিল হয়েছে, ”অতএব তোমার পালানকর্তার শপথ, সে লোক ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না তাদের মাধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায় বিচারক বলে মনে না করে।” (৪ঃ৬৫) (সহীহ আল বুখারী (ইংরেজী অনুবাদ) খঃ ৩, অধ্যায় ৪৯, সংখ্যা ৮৭১)

সুন্নী মতবাদ অনুসারে নবী (সঃ) এর এই সাহাবীকেও নিন্দা করা যাবে না এবং তাকেও সুন্নাহর বর্ণনাকারী বা অনুসরণকারী মানতে হবে এবং তার কাজকর্ম আদর্শ হিসাবে আমাদেরও অনুসরণ করতে হবে। আসল সত্য এই যে, এই সাহাবী শুধু নবী (সঃ) এর বিচারকে গ্রহণ করতেই অস্বীকার করেননি বরং তাঁকে দুঃখও দিয়েছেন যে জন্য আল্লাহ কুরাআনের আয়াত নাযিল করেছেন।

দূর্ভাগ্য যে, ইসলামের ইতিহাসে এমন বহুলোকদের উদাহরণ আছে যারা সুন্নী মতবাদ অনুসারে সাহাবী কিন্তু তাঁদের আচরণ ছিল অনৈসলামিক। তাঁরা এই আচরণ দেখিয়েছে রাসুল (সঃ) এর ইন্তেকালের পর এমনকি জীবদ্দাশায়, এমনকি উভয় সময়কালেই।

আল ওয়ালিদ বিন উক্বাহঃ

ফাসিক ও ঈমানদার এক হতে পারে? তারা সমান নয় (কুরআন সুরাহ আল সাজাদাহ আয়াত ১৮)

নেতৃস্থানীয় সুন্নী ভাষ্যকারগণ বলেন যে, এই আয়াত নাযিল হওযার কারণ হচ্ছে, একটা বিশেষ ঘটনা যেখানে এই শব্দ “বিশ্বাসী” বলতে ইমাম আলী বিন আবু তালিব এবং ফাসিক বলতে নবী (সঃ) এর একজন তথাকথিত সাহাবী আল ওয়ালিদ বিন উকবাহ বিন আবু মুয়িতকে বুঝানো হয়েছে। (আল কুরতুবী তাফসীর (মিশর, ১৯৪৭), খঃ ১৪, পৃঃ ১০৫। আলতাবরী, তাফসীর জামি, আলবায়ান এই আয়াতের টীকা প্রসঙ্গে।)

আমরা ইতোমধ্যে কুরআনের আয়াতে দেখেছি যে ফাসিক কিছু বললে তা নির্বিচারে বিশ্বাস করতে নিষেধ করেছেন।
“হে বিশ্বাসীগণ! যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোন সংবাদ নিয়ে আসে, সত্য বলে নিশ্চয়তা দেয়, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে যাতে অজ্ঞানতাবশতঃ অন্যের ক্ষতি সাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকার্যের জন্য অনুতপ্ত না হও।” (সুরা আল-হুজুরাত আয়াত ৬)

খুবই মজার ব্যাপার যে, এই আয়াতের ব্যাখ্যা অন্য একটি ঘটনার ইঙ্গিত দেয় যেখানে ঠিক এই ওয়ালিদ একটি বিষয় সম্পর্কে অসত্য কথা বলেছিলেন, যে ঘটনার প্রেক্ষিতে এই আয়াতে তাকে ফাসিক আখ্যায়িত করা হয় ও এই আয়াত নাযিল হয়। (ইবনে কাছির, তাফসীর কুরআন আল আজিম (বইরুত ১৯৮৭), খঃ ৪, পৃঃ ২২৪। আল কুরতুবী, তাফসরী (মিশর, ১৯৪৭), খঃ ১৬, পৃঃ ৩১১। আল সুউতি এবং আল মাহালী, তাফসীর আল জালালাইন (মিশর, ১৯৪২), খঃ ১, পৃঃ ১৮৫। আবু আমিনা বিলাল ফিলিপস, তাফসীর সুরা আল হুজুরাত (রিয়াদ) পৃঃ ৬২ থেকে ৬৩।)

আমিনা বিলাল ফিলিপস বলেন, “সন্দেহজনক চরিত্রের লোকজন যখন কোন তথ্য নিয়ে আসে তখন তাদের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যাদের সত্যতা এখনও প্রমাণিত হয়নি বা যারা পাপী হিসাবে পরিচিত।” তবুও আমরা সুন্নি হাদীসে দেখতে পাই আল ওয়ালিদের বর্ণনায় বহু হাদীস রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ দেখুনঃ 

  • আবু দাউদ সুনান (১৯৭৩), কিতাব আল তারাজ্জুল বাব ফিল খুলুক লির রিজাল, খঃ ৪, পৃঃ ৪০৪, হাদীস নম্বর ৪১৮১।
  • আহমদ বিন হাম্বল, আল মসনদ, আউয়াল মসনদ আল মাদানিয়্যান আজমাইন, হাদীস ১৫৭৮৪।

আল ওয়ালিদের ধূর্ততা মহানবী (সঃ) এর সময়ই শেষ হয়নি। তিনি উসমান কর্তৃক কুফার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। সেখানেও তার ফাসেকী চলছিল, একবার তিনি ফজরের নামাজ মদ্যপান অবস্থায় পড়িয়েছিলেন এবং দু’ রাকাতের পরিবর্তে চার রাকাত পড়িয়েছিলেন। ফলে উসমানের নির্দেশে তাঁকে শাস্তি পেতে হয়।

এই ঘটনা বহু উৎস থেকে বহুবার বর্ণিত হয়েছে ।

নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলোঃ

  • সহীহ আল বুখারী (ইংরেজী ভার্সন), খঃ ৫, আধ্যায় ৫৭, সংখ্যা ৪৫। সুন্নি আইন বিশেষজ্ঞগণ সাহাবী আল ওয়ালিদের এই উদাহরণ তুলে ধরে এই পাপীর পেছনে নামাজ পড়াকে বৈধতা দিয়েছেন।
  • আলী আল কারী আল হারাযী আল হানাফী, শারহে ফিরুহ আল আকবার, ভাল না ফাসিক লোকের পেছনে নামাজ পড়া বৈধ, এই অধ্যায়ে পৃষ্ঠা ৯০।
  • ইবনে তাইমিয়াহ মাজমুহ ফতোয়া (রিয়াদ ১৩৮১), খঃ ৩, পৃঃ ২৮১।

আমরা আল ওয়ালিদের মত ব্যক্তিদের যে দোষত্রুটি তুলে ধরছি তা পেছন থেকে আক্রমণের কোন বিকৃত চিন্তা থেকে নয়। বরং মুসলমানদেরকে সতর্ক করার জন্য যে, কোন উৎস থেকে তারা ইসলামী মতবাদ ও নবীর সুন্নাত পাচ্ছে? আর এই সতর্কতা এভাবে অর্জিত হতে পারে যে, নবী (সঃ) এর সাহবীদের জীবনের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে এবং তাদের চারিত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নির্ণীত হবে তাদের কাজ দ্বারা। তারপরও নবী (সঃ) ইতোমধ্যেই আমাদের সর্তক করেছেন।

আমি নহরের নিকট তোমাদের সামনে দাঁড়াবো, এবং যে আমার পাশ দিয়ে যাবে তাকে পান করাবো এবং যে এই নহর থেকে পান করবে সে আর কখনও তৃষ্ণার্ত হবে না। এমন লোক আমার কাছে আনবে যারা আমাকে চিনবে আমিও তাদেরকে চিনব। কিন্তু তারা আমার থেকে দূরে থাকবে। তখন আমি বলব, তারা আমার সাহাবী এবং উত্তর আসবে আপনি জানেন না তারা আপনার পরে কি করেছে। তারপর আমি বলব যারা আমার পরে পরিবর্তিত হয়েছে তারা দূর হও। (সহীহ আল বুখারী (ইংরেজী অনুবাদ), খঃ ৮, অধ্যায় ৭৬ সংখ্যা ৫৮৫।)

এই প্রশংসা অবশ্যই আল ওযালিদ বিন উকবাহর জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না । যদিও সুন্নী মুসলমাদের মতে, তিনিও একজন সাহাবী এবং এমন সাহাবীগণ সুন্নাহ অনুসরনের জন্য মডেল হতে পারেন না। তাই শিয়াগণ সকল সাহাবীর সত্যতা ও ন্যায়পরায়নাতায় বিশ্বাস করেন না। বরং প্রত্যেক সাহাবীর ইতিহাস অনুসন্ধান করে রাসুলের বাণীর সাথে তার সংশ্লিষ্টতা ও রাসুলের হুকুমের প্রতি তার অবিচল নিষ্ঠা যাচাই করে দেখেন। অবশ্য এমন বহু সাহাবী ছিলেন যাদের মধ্যে আছেন আম্মার, মিকদাদ, আবুজার, সালমান, জাবির এবং ইবনে আব্বাস। অবশ্য এদের সংখ্যা এ কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

শিয়াদের চতুর্থ ইমাম হযরত জয়নুল আবেদীন (আঃ) এর বিনীত প্রার্থানার অংশ বিশেষ তুলে ধরে শেষ করব যেখানে তিনি ঐ মহৎ সাহাবী যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট তাদের প্রশংসা করে প্রার্থনা করেছেন, “হে আল্লাহ, মুহাম্মদ (সঃ) এর সাহাবী বিশেষতঃ যাঁরা সাহাবী হিসেবে সদাচরণ করেছেন, যাঁরা তাঁকে সাহায্য করেছেন, যখন তিনি তার বাণী শুনিয়েছেন তাতে যথাযথ সাড়া দিয়েছেন, তার বাণীর সত্যতা প্রমাণ করার জন্য বন্ধু থেকে, সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, তাঁর নবুওয়াতী দাওয়াতকে মজবুত করার জন্য তাঁরা পিতা, মাতা ও পুত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এবং যাঁরা তাঁর বিজয়ে সাহায্য করেছেন, যাঁরা তাঁর জন্য মায়া মমতা পোষণ করেছেন। যাঁরা তাঁকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবেসেছেন, যাঁরা আল্লাহর রাসুলের জাতকে দৃঢ করে রাখার কারণে তাঁদের আত্মীয় স্বজনরা তাঁদেরকে ত্যাগ করেছে। আর যাঁরা তাঁর সাথে আত্মীয়তা করায় অন্যান্য আত্মীয়রা তাদের ত্যাগ করেছে, তারপরও তাঁরা তাঁকে ভুলেনি। হে আল্লাহ যারা তোমার জন্য শুধু তোমার জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছে, হে আল্লাহ তুমি তাঁদেরকে তোমার উত্তম নিয়ামত দ্বারা সন্তুষ্ট কর, তাঁরা তোমার নবীর সাথে থেকে তোমার নবীর পাশে থেকে যত প্রাণীকে তোমার দিকে ফিরিয়েছে তাদের জন্য হলেও সকলের প্রতি উত্তম নিয়ামত বর্ষণ কর। (ইমান জয়নাল আবেদীন সহিফা আল কামিলাহ, ইংলিশ অনুবাদ লন্ডন ১৯৮৮ পৃঃ ২৭)

Share: