কুরআন, হাদিস ও বিভিন্ন ঘটনার আলোকে ব্যয় বা দান

  • Posted: 01/05/2021

অনুবাদ: মাওলানা শহিদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা

আয়াতসমূহঃ

১- ব্যয় করার নির্দেশঃ “আর ব্যয় কর আল্লাহ পথে, তবে নিজের জীবনকে ধ্বংসের সম্মুখীন করো না। আর মানুষের প্রতি অনুগ্রহ কর। আল্লাহ অনুগ্রহকারীদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা বাকারাঃ ১৯৫)

২- উৎকৃষ্ট বস্তু থেকে ব্যয় করাঃ “হে মু’মিনগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছ এবং আমি যা তোমাদের জন্য ভূমি হতে উৎপন্ন করেছি, তা হতে উৎকৃষ্ট বস্তু খরচ কর এবং তা হতে এরূপ নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করতে মনস্থ করনা যা তোমরা মুদিত চক্ষু ব্যতীত গ্রহণ কর না; এবং তোমরা জেনে রেখ, আল্লাহ মহা সম্পদশালী, প্রশংসিত।” (সূরা বাকারাঃ ২৬৭)
৩- পরহেযগার হল প্রকৃত ব্যয়কারীঃ “পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য, যারা অদেখা বিষয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুজি দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।” (সূরা বাকারাঃ ২,৩)

৪- অনুশোচনা করাঃ “আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবেঃ হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদ্্কা তথা দান করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” (সূরা আল-মুনাফিকুনঃ ১০)
৫- প্রিয়বস্তু থেকে ব্যয় করাঃ “কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে আল্লাহ তা জানেন।” (সূরা আল-ইমরানঃ ৯২)

হাদীসসমূহঃ

১- ব্যয় করার গুরুত্বঃ পয়গাম্বর (সা.) এরশাদ করেনঃ “যে আল্লাহর রাস্তায় এক দিরহাম ব্যয় করবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সাতটি নেকী (সাওয়াব) তার আমলনামায় লিখবেন।” (মিজানুল হিকমাহ, খন্ড ৪, পৃ. ৩৩৫০)

২- স্বীয় সম্পদ থেকে ব্যয় করাঃ মাওলায়ে মুত্তাকিয়ান আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) বলেছেনঃ “তুমি নিজ উপার্জন থেকে জমা করার চেয়ে ব্যয় করাকে অধিক প্রয়োজন মনে কর।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৭৬৮)

৩- ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ব্যয় করাঃ ইমাম মোহাম্মাদ বাকের (আ.) বলেছেনঃ “ইমাম জয়নুল আবেদীন সাজ্জাদ (আ.) নিজের সম্পদকে দুইবার আল্লাহর পথে ব্যয় করেছিলেন।” (বিহারুল আনোয়ার, খন্ড ৪৬, পৃ. ৯০)

৪- পরকালের প্রতিদানের প্রতি বিশ্বাসঃ ইমাম আলী (আ.) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি পরকালের প্রতিদানের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে স্বীয় সম্পদ আল্লাহর পথে দান ও ব্যয় করে।” (আমালী, ৫৩২)

৫- ব্যয় করা শ্রেষ্ঠ নেয়ামতঃ ইমাম আলী (আ.) বলেছেনঃ “নিঃসন্দেহে আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে সম্পদ ব্যয় করা শ্রেষ্ঠ নেয়ামত আর গোনাহের পথে সম্পদ ব্যয় করা চরম ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া।” (জামে আহাদীসে শিয়া খন্ড ১৭, পৃ. ৮২)

বিশ্লেষণঃ
যখন কোন অভাবী তোমার কাছে আসবে যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার কথা সমাপ্ত না করবে তার কথায় বাঁধা দিবে না। যখন সে তার কথা বা বাক্য সমাপ্ত করবে তখন তাকে নরম স্বভাবে ও ভদ্রতার সাথে উত্তর দিবে। যদি তোমার কাছে ও তোমার সাধ্যের মধ্যে কিছু থাকে তাহলে তাকে প্রদান করবে অথবা বিনয়ের সাথে না বলবে, কেননা সম্ভাবতঃ ঐ অভাবী ফেরেশতা হতে পারে যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাকে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করার জন্য এসেছে, যাতে তোমাকে দেখবে আল্লাহর নেয়ামতের বিনিময় তুমি কেমন আমল কর। ব্যয় বা দান নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু থেকে করা উচিত। কারণ ব্যয় বা দান করা পরহেজগারের চি‎হ্ন, কুরআনের নির্দেশ, আম্বিয়া (আ.) ও পবিত্র ইমামগণের (আ.) আদর্শ।
এটা মানবিক বিবেকের সংশোধন যে, মানুষ ব্যয় করে যেন অহংকারী না হয়, আমি কিছু একটা করেছি। সে ঐ সম্পদ থেকে ব্যয় করছে, যা আল্লাহ তায়ালা প্রথমে তাকে রিজিক হিসেবে দিয়েছেন। পরে ব্যয় করার সময় রিজিক ও ব্যয়ের সাদৃশ্যের প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে কতটুকু রিজিক দিয়েছেন ও সে তাঁর পথে কতটুকু ব্যয় করেছে। মানুষ উত্তম কাজ করার সময় এই বিষয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অমনোযোগী হয়ে যায় এবং নিজের আমলের পরিমাণ দেখতে থাকে যে আমি সবচেয়ে বেশী ব্যয় করেছি। সে এটা ভুলে যায় যে আল্লাহও তাকে অধিক রিজিক দিয়েছেন এবং আল্লাহর প্রদানের তুলনায় তার আমল মূল্যহীন।

এটা সত্য যে যখন মানুষ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তখন সম্পদ বলে যে, আমি ধ্বংসশীল ছিলাম আমাকে স্থায়িত্ব দিয়েছে, আমি তুচ্ছ ছিলাম আমাকে মহত্ত¡ দিয়েছে, আমি শত্রু ছিলাম আমাকে বন্ধু বানিয়েছে, তুমি আমার রক্ষক ও পাহারাদার ছিলে এখন আমি তোমার পাহারাদার হয়েছি।

ঘটনাবলী

১- বিস্ময়কর ব্যয় করাঃ পয়গাম্বার (সা.) এর সাহাবীদের মধ্যে এক সাহাবীর নাম আবু তালহা আনসারী। মদীনায় তাঁর সবুজ-শ্যামল, তরুতাজা, সুন্দর ও মনোরম একটি বাগান ছিল এবং মদীনায় কারো এত সুন্দর বাগান ছিল না। মদীনার সব জায়গায় মানুষ তার বাগান সম্পর্কে একে অপরে বলাবলি ও প্রশংসা করত। ঐ বাগানে একটি স্বচ্ছ ও পরিস্কার ঝর্ণাও ছিল, যখন পয়গম্বার (সা.) ঐ বাগানে প্রবেশ করতেন তখন ঐ ঝর্ণার পানি পান করতেন এবং ঐ পানি দ্বারা ওজু করতেন। এছাড়াও ঐ বাগানের আয়-উপার্জনও আবু তালহা আনসারীর জন্য যথেষ্ট প্রয়োজন ছিল। যখন এই আয়াত “কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না কর। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে আল্লাহ তা জানেন।” (সূরা আল-ইমরানঃ ৯২) অবতীর্ণ হল তখন আবু তালহা আনসারী রাসূল (সা.)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর বন্ধু (সা.)! আপনি কি জানেন আমার সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ হল ঐ বাগান?

পয়গম্বার (সা.) বললেন, জানি।
আবু তালহা আনসারী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আমি চাই ঐ বাগানটি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে যাতে পরকালের জন্য সঞ্চয় হয়।
পয়গম্বার (সা.) বললেন, “কল্যাণ হোক, কল্যাণ হোক এই সম্পদ তোমার জন্য লাভজনক হবে।”
এরপর বললেন, হে আবু তালহা! আমি তোমার জন্য এ ব্যাপারে একটি সুন্দর পথ বলে দিচ্ছি তা হল, তুমি এই বাগানটি তোমার আত্মীয়-স্বজন ও নিকটবর্তী অভাবী ও অসহায়দের মাঝে ব্যয় কর। আবু তালহা আনসারী পয়গম্বার (সা.)-এর নির্দেশ মত আমল করলেন এবং ঐ বাগানটি তাঁর আত্মীয়দের মাঝে বন্টন করে দিলেন। (গাঞ্জহয়ী বেহেশতী, পৃ. ৩৩৬)

২- ইমাম মোহাম্মাদ তাক্বী (আ.)-এর উদ্দেশ্যে ইমাম রেজা (আ.)-এর মূল্যবান চিঠিঃ

শিয়া মনীষী, হাদীস বর্ণনাকারী ও ইমাম আলী রেজা (আ.)-এর বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য এক সাহাবী, তিনি বলেছেন, আমি ঐ চিঠিটি পড়েছি যে চিঠিটি ইমাম রেজা (আ.) খোরাসান থেকে হযরত ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর উদ্দেশ্যে মদীনায় পাঠিয়েছিলেন, সেখানে লেখা ছিলঃ

‘আমি জানতে পেরেছি যখন তুমি ‘বাইতুশ শারফ’ থেকে বাইরে আস তখন খাদেমরা তোমাকে ছোট দরজা দ্বারা বাইরে নিয়ে আসে এবং কোন বাহনে চড়িয়ে দেয়। এটা তাদের কৃপণতা যাতে তোমার দান অন্য কারও কাছে না পৌঁছায়। আমি ইমাম ও বাবা হিসেবে তোমার কাছে এটাই আসা করব যে বড় দরজা দ্বারা যাওয়া-আসা করবে, আর যাওয়া-আসার সময় নিজের কাছে দেরহাম ও দিনার রাখবে যাতে কেউ তোমার কাছে কিছু চাইলে তাকে দিতে পার। যদি তোমার চাচা তোমার কাছে চায় তাহলে তাকে পঞ্চাশ দিনারের কম দিবে না তবে বেশী দেয়ার ক্ষেত্রে তোমার ইচ্ছা। যদি তোমার ফুফু তোমার কাছে চায় তাহলে পঁচিশ দেরহামের কম দিবে না, যদি বেশী দিতে চাও তোমার ইচ্ছা।
আমি আশা করি আল্লাহ তায়ালা তোমাকে উচ্চ পর্যায়ে আশিন করুন, সুতরাং আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দারিদ্রতার ভয় কর না। (তাওবাহ অগুশে রাহমত উর্দূ ভাষায়, পৃ. ৩২৫)

আল্লাহর কাছে দোয়া করি পবিত্র পাঞ্জাতানের অসিলায় আমাদেরকে আল্লাহর পথে ব্যয় করার তৌফিক দান করেন। (আমিন)###

Share: