পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ঘটনার আলোকে ইমামত

  • Posted: 18/05/2021

লেখকঃ মাওলানা শহিদুল হক

আয়াতসমূহঃ

১- ইমামত আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্তঃ
“যখন ইবরাহীমকে তাঁর পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর তিনি তা পূর্ণ করে দিলেন, তখন পালনকর্তা বললেন, আমি তোমাকে মানবজাতির ইমাম বা নেতা করব। তিনি বললেন, আমার বংশধর থেকেও। তিনি বললেন আমার অঙ্গীকার অত্যাচারীদের পর্যন্ত পৌঁছাবে না।” (সূরা বাকারাঃ ১২৪)

২- ইমাম ও আহলে বাইত (আ.)-এর পবিত্রতাঃ
“হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ! আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পুত-পবিত্র রাখতে”। (সূরা আহযাবঃ ৩৩)

৩-আনুগত্য করা অপরিহার্যঃ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের ও তোমাদের মধ্যে যারা নির্দেশের অধিকর্তা, তাদের আনুগত্য কর;” (সূরা নিসাঃ ৫৯)

৪- পরিপূর্ণ দ্বীনঃ
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার নিয়মত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ধর্ম হিসেবে ইসলামের প্রতি সন্তুষ্ট হলাম;”(সূরা মায়েদাহঃ ৩)

৫- পথ প্রদর্শন করাঃ
“আমি তাদেরকে নেতা করলাম। তারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ প্রদর্শন করতেন। আমি তাদের ওহী নাযিল করলাম সৎকর্ম করার, নামায কায়েম করার এবং যাকাত দান করার, তারা আমার এবাদতে ব্যাপৃত ছিল” (সূরা আম্বিয়াঃ ৭৩)

হাদীসসমূহঃ

১- পৃথিবীতে ইমামদের (আ.) থাকা জরুরীঃ
ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেনঃ “যদি যমিনের ওপর শুধু দু’জন ব্যক্তি থেকে থাকে তাহলেও তাদের মধ্যে একজন ইমাম (নেতা) হবে।” (কিতাবুশ শাফি, খন্ড ২, পৃ. ৩২)

২- ইমামের আনুগত্য করাঃ
হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “যে নিজের ইমামের আনুগত্য করল প্রকৃতপক্ষে সে তার প্রতিপালকের আনুগত্য করল।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ১০৭)

৩- ন্যায়বিচারক ইমামঃ
হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “ন্যায়বিচারক ইমাম, ভাল বৃষ্টি থেকে উত্তম”। (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ১০৭)

৪- ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হোসাইন (আ.)
পয়গম্বার আকরাম (স.) বলেছেনঃ “হাসান (আ.) ও হোসাইন (আ.) দু’জন ইমাম, দন্ডায়মান অবস্থায় হোক বা বসা অবস্থায় হোক।” (মানাকিবে আলে আবি তালেব, পৃ. ১৩৭)

৫- ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বংশধর থেকেঃ
পয়গাম্বর আকরাম (স.) বলেছেনঃ “নিস্পাপ ইমামগণ (আ.) ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বংশধর থেকে হবেন। যারা তাদের আনুগত্য করল মূলতঃ তারা আল্লাহর আনুগত্য করল, আর যারা তাদের অবাধ্যতা করল মূলতঃ তারা আল্লাহর অবাধ্যতা করল। তাঁরা হল আল্লাহর দৃঢ় পথ ও আল্লাহর নিকট পৌঁছানোর মাধ্যম।” (তাফসীরে বুরহান, খন্ড ১, পৃ. ২৪৩)

বিশ্লেষণঃ

নবুয়্যত সমাপ্তির পর হেদায়াত অব্যাহত রাখার জন্য ইমামতের ধারা শুরু হয়, আর এই ধারা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এর কারণ হল কিয়ামতের সময় প্রত্যেক দলকে তার ইমাম (আ.)-এর সাথে ডাকা হবে। ইমাম (আ.) আল্লাহর নিয়মানুযায়ী অভিভাবক ও শাসনকর্তা আর নবী করীম (স.)-এর নিয়মানুযায়ী ওসী ও স্থলাভিষিক্ত। ইমাম (আ.) আল্লাহ ও রাসূল (স.)-এর প্রতিনিধি, তাই এই দু‘জন একে অপরের পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হওয়া দরকার। এ কারণে যে, পরোয়ারদেগার হিজরতের সময় ইমাম (আ.)-এর আত্মাকে স্বীয় আত্মা বলে অভিহিত করেছেন আর মুবাহেলার সময় এই আত্মাকে রাসূল (স.)-এর আত্মা বলে অভিহিত করেছেন। ইমাম (আ.) শরীয়তের রক্ষক এবং উম্মতের নেতা। শরীয়ত রক্ষার জন্য জ্ঞানের প্রয়োজন আর উম্মত রক্ষার জন্য শক্তি ও সামর্থের প্রয়োজন। তাই উম্মতের ইমাম তিনিই হবেন যাঁর জ্ঞান সকল উম্মত থেকে শীর্ষে অর্থাৎ জ্ঞান শহরের দরজা হবেন। শক্তিতে সারা বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তিশালী হবেন অর্থাৎ ‘লা ফাতা ইল্লাহ আলী (আ.) তথা আলী ব্যতিত কোন বিজয় নেই’ হবেন।

ইমামিয়া অনুসারীদের পাঁচটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখা জরুরীঃ
১- আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী পথ প্রদর্শন করা।
২- ভাল কাজ করা।
৩- নামায কায়েম করা।
৪- যাকাত আদায় করা।
৫- সর্বাবস্থায় আল্লাহর ইবাদত সম্পাদন করবে ও কোন কাজ তাঁর নির্দেশের বিপরীত করবে না।

এ কারণে কুরআন দুই ইমামের কথা উল্লেখ করেছে। এক ঐ ইমাম যে আমার নির্দেশ মত হেদায়েত করে আর দ্বিতীয় ঐ ইমাম যে লোকদিগকে জাহান্নামের দিকে আহবান করে। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কোন ইমামের আনুগত্য করব এবং কোন ইমামকে আমাদের নেতা বানাবো।

ঘটনাবলী

১- হযরত আলী (আ.) চতুর্থ খলিফাঃ শেখ সাদুক (রহ.) তাঁর ওস্তাদ থেকে, তিনি হযরত ইমাম আলী রেজা (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আলী রেজা (আ.) তাঁর নিঃপাপ পিতা ও পিতামহদের (আ.) দলিলের মাধ্যমে হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ একবার আমি রাসূল করীম (স.)-এর সাথে মদীনার রাস্তায় হাটছিলাম তখন উঁচু দেহ, ঘন দাঁড়ি ও চওড়া কপালধারী এক ব্যক্তি আমাদের নিকটে আসলেন এবং আল্লাহর রাসূল (স.)কে সালাম করে তাঁকে খোশ আমদেদ জানালেন। পরে ঐ বিশিষ্ট ব্যক্তি আমার দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললেনঃ

হে চতুর্থ খলিফা! আপনার ওপর সালাম ও আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
পরে তিনি আল্লাহর রাসূল (স.)কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স.)! তিনি কি চতুর্থ খলিফা নয়?
আল্লাহর রাসূল (স.) বললেনঃ অবশ্যই।
এরপর ঐ বিশিষ্ট ব্যক্তি চলে গেলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমি আল্লাহর রাসূল (স.)কে জিজ্ঞেস করলাম এই বিশিষ্ট ব্যক্তি কি বললেন ও আপনি কোন কথাকে সত্যায়ন করলেন?
আল্লাহর রাসূল (স.) বললেনঃ এটাই সত্য (তুমি চতুর্থ খলিফা) কারণ আল্লাহ তায়ালা স্বীয় গ্রন্থে বলেছেনঃ
“আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি”। (সূরা বাকারাঃ ৩০)
ঐ বাক্যের মাধ্যমে আদম (আ.)-এর খেলাফতের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। সুতরং প্রথম খেলাফত হযরত আদম (আ.)-এর ছিল। এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ
মুসা (আ.) তার ভাই হারুন (আ.)কে বলেছিলেন, “আমার সম্প্রদায়ে তুমি আমার প্রতিনিধি হিসেবে থাক। তাদের সংশোধন করতে থাক”। (সূরা আরাফঃ ১৪২)
দ্বিতীয় খেলাফত হযরত হারুন (আ.)-এর ছিল। আল্লাহ তায়ালা তৃতীয় খলিফার কথা এই বাক্যে উল্লেখ করেনঃ “হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব, তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে রাজত্ব কর”। (সূরা সোয়াদঃ ২৬) তৃতীয় খেলাফত হযরত দাউদ (আ.) ছিল।
ঐ তিন খলিফার পর আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
“আর মহান হজ্বের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা করে দেয়া হচ্ছে যে,... ” (সূরা তওবাহঃ ২)
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স.)-এর পক্ষ থেকে ঘোষণাকারী হলে তুমি, আর তুমি হলে আমার উত্তরসূরী, উজির, স্থলাভিসিক্ত, আমার ঋণ আদায়কারী ও আমার তরফ থেকে দ্বীন পৌঁছানোর দায়িত্ব পালনকারী। তোমার সাথে আমার ঐরূপ সম্পর্ক যেরূপ হারুন (আ.)-এর সাথে মুসা (আ.)-এর সম্পর্ক ছিল কিন্তু তাদের সাথে পার্থক্য এতটুকু যে, আমার পরে আর কোন নবী আসবে না। যেকারণে ঐ বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছিল তুমি চতুর্থ খলিফা। তুমি কি বুঝতে পেরেছ ঐ বিশিষ্ট ব্যক্তি কে ছিলেন?
আমি বললামঃ না, আমি জানি না।
পয়গম্বার (স.) বললেনঃ তাহলে তোমার জানা উচিৎ, তিনি তোমার ভাই হযরত খিজির (আ.) ছিলেন। (মু’জিজাতে আলে মুহাম্মাদ (স.), খন্ড ১, পৃ. ৩৮৭)

২- ইমামতের অলৌকিক ঘটনাঃ
ইবনে শাহরে আশুব জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন তিনি বলেন, আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) ফজর নামায পড়ানোর পর আমাদের দিকে ফিরে বললেনঃ হে লোকজন! আল্লাহ তোমাদেরকে তোমার ভাই সালমান (রা.)-এর মৃত্যুতে ধৈর্যধারণের ক্ষমতা দান করুক এবং তোমাদের প্রতিদান বৃদ্ধি করুক।
এরপর তিনি আল্লাহর রাসূল (স.)-এর পাগড়ী ও চাদর গায়ে জড়ালেন ও আল্লাহর রাসূল (স.)-এর লাঠি ও তরোবারি তুলে নিলেন এবং একটি উঠের ওপর চড়ে কাম্বার (রা.)কে বললেন, তুমি এক থেকে দশ পর্যন্ত গণনা কর।

কাম্বার (রা.) বললেন আমি দশ পযর্ন্ত গণনা করতেই দেখি আমরা সালমান ফারসীর (রা.) বাড়ীর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
জাযন (রা.) বর্ণনা করেন যে যখন সালমান ফারসী (রা.)-এর মৃত্যু ঘনিয়ে আসল তখন আমি তাঁকে বললাম তোমাকে কে গোসল দিবে?
তিনি বললেন, যিনি আল্লাহর রাসূলকে (স.) গোসল দিয়েছিলেন তিনি আমাকে গোসল দিবেন। আমি বললাম আল্লাহর রাসূলকে (স.) হযরত আলী (আ.) গোসল দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি এখন মদীনায় আর আপনি মাদায়েনে।

তিনি বললেন, হে জাযন! যখন তুমি আমার মাথায় পাগড়ী বাঁধবে তখন তুমি পায়ের আওয়াজ শুনতে পাবে।
জাযন (রা.) বললেন, যখন আমি সালমান ফারসীর (রা.) মাথায় পাগড়ী বাঁধ ছিলাম তখন আমি পায়ের শব্দ শুনে দরজার নিকট গিয়ে দেখি আমিরুল মুমিনিন (আ.) উপস্থিত। হযরত আলী (আ.) বললেনঃ জাযন (রা.)! সালমান (রা.) আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হয়েছে।

আমি বললাম, জি হ্যাঁ আমার মাওলা। পরে হযরত আলী (আ.) ভিতরে প্রবেশ করে সালমান (রা.)-এর মুখের ওপর থেকে কাপড় সরালেন সালমান (রা.) মুচকি হাসলেন। হযরত আলী (আ.) বললেনঃ আবু আব্দুল্লাহ! যখন তুমি আল্লাহর রাসূল (স.)-এর নিকটে যাবে তখন তুমি তাঁকে বলবে তাঁর সম্প্রদায় তাঁর ভাইয়ের সাথে কেমন ব্যবহার করেছে।
পরে আমিরুল মুমিনিন (আ.) তাঁর গোসল ও কাফন শেষ করে তাঁর জানাযা পড়ালেন। আমি আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর কন্ঠের সাথে তাকবীরের আওয়াজ শুনতে পেলাম এবং আমি হযরত আলী (আ.)-এর সাথে দুইজন ব্যক্তিকেও দেখলাম। যখন আমি হযরত আলী’র (আ.) কাছে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম তিনি বললেনঃ একজন আমার ভাই জাফর (আ.) আর দ্বিতীয় জন হল হযরত খিজির (আ.)। আর প্রত্যেকের সাথে সত্তর কাতার ফেরেশতা ছিল আর প্রত্যেক কাতারে দশ লক্ষ ফেরেশতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। (মুজিযাতি আলে মুহাম্মাদ (স.), খন্ড ১, পৃ. ৩৮৫)।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি মুহাম্মাদ ও আলে মুহাম্মাদ (স.)-এর অসিলায় আমাদেরকে প্রকৃত ইমামদের (আ.) আনুগত্য করা ও তাদের চিন্তাধারা অনুযায়ী চলার তৌফিক দান করেন। (আমিন)

Share: