কোনটি উত্তম? মোমিন ব্যক্তির চাহিদা পূরণ না-কি কাবা ঘর তাওয়াফ

  • Posted: 18/05/2021

হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ আব্দুল লতিফ

ইসহাক ইবনে আম্মার, ইমাম জাফর সাদিক (আ.) হতে বর্ণনা করে বলেছেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করবে, আল্লাহ তার জন্য হাজার নেকী লিপিবদ্ধ করবেন এবং তার সমস্ত কৃতআমলনামা হতে হাজার গোনাহ্ মুছে দিবেন এবং তার পদমর্যদা হাজার স্তর বাড়িয়ে দিবেন এবং তার জন্য জান্নাতে হাজার বৃক্ষ রোপণ করবেন, আর এক হাজার গোলাম মুক্ত করার সওয়াব দান করবেন। আর যখন হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে, তখন মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের আটটি প্রবেশ দ্বার খুলে দিবেন এবং তাকে উদ্দেশ্য করে বলবেন, তুমি যে কোন দ্বার দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারো।

ইসহাক ইবনে আম্মার বলেনঃ হে, রাসূলের সন্তান! আমি আপরনার উপর উৎসর্গ হই। হে ইমাম! এই সকল সওয়াব কি শুধুমাত্র একবার কাবা ঘর তাওয়াফের জন্য? ইমাম তার জবাবে বললেন হ্যাঁ, কিন্তু তুমি কি চাও, তোমাকে এমন একটি আমল সম্পর্কে অবগত করি, যার সওয়াব কাবা ঘর তাওয়াফ এর চেয়েও অনেক বেশি? ইসহাক ইবনে আম্মার বলেন, জ্বী; হে, রাসূলের সন্তান। ইমাম বললেনঃ
“যে, ব্যক্তি তার মোমিন ভাইয়ের চাহিদা পূরণ করে, মহান আল্লাহ তার জন্য দশটি (কাবা ঘরের) তাওয়াফ এর ন্যায় সওয়াব লিখেন।” (১০৬)

আল্লাহর রসুলও (সা.) বলেছেনঃ
“যে ব্যক্তি, তার দ্বীনি ভাইয়ের চাহিদা পূরণ করে, আমি রাসূল (সা.) হাশরের দিন (মিজানের নিকট) পাপ-পূণ্যের হিসাবের সময় সেখানে উপস্থিত থাকবো। যদি তার নেক আমল ভারী হয় কোনো সমস্যা নেই, অন্যথায় আমি তার জন্য শাফায়াত করবো।”(১০৭)
হযরত আলী (আ.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেনঃ
“যে ব্যক্তি, কোন মোমিন ভাইয়ের সমস্যা দূর করে ও চাহিদা পূরণ করে, সে সেই ব্যক্তির ন্যায় যে, সমস্ত দিন ইবাদাতে অতিবাহিত করে।”(১০৮)
“অন্য একটি রেওয়াতে বর্ণিত হয়েছেঃ এই যথাযোগ্য আমলটি, মসজিদুল হারামে এতেকাফ করার সাথে তুলনা করা হয়েছে।”(১০৯)

(উপরিক্ত আলোচনায়) রেওয়ায়েতগুলিতে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সেগুলি ছিল মোমিনের চাহিদা ও তার হাজাত পূরণের গুরুত্ব ও সওয়াবের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসাবে বর্ণিত হয়েছে।

দূর্ভাগ্যক্রমে: বর্তমান সময় আল্লাহর এই সন্তোষজনক, মানবিক ও নৈতিক আমলটি মানুষের মাঝে গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। অর্থাৎ দ্বীনি ভাইয়ের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক ও আন্তরিকতা হ্রাস পেয়েছে যেটি ইসলামী সমাজের জন্য একটি অপ্রীতিকর ও বিপদজনক অধ্যায়।

অবশ্য, এরও কিছু কারণ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে এই যে, কিছু সংখ্যক মোমিন ভাই, যাদের দ্বারা উপকৃত হয়, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা জ্ঞাপন না করে বরং তার পরিবর্তে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে থাকে। এমনকি নিজের অঙ্গিকারের উপর অটল থাকে না বা আমল করে না। উদাহরণস্বরূপ, ঋণ গ্রহণের জন্য ঋণ গ্রহিতা অন্য কোন ব্যক্তিকে জামিন রাখে; কিন্তু ঋণ গ্রহণের পর কিস্তি প্রদানে অবহেলা করে, অথবা ঋণ পরিশোধ করে না। যে কারণে কখনও কখনও জামিনদারের সম্মান ক্ষুন্ন হয়। এ ধরণের কাজের জন্য জামিনদার আর কখনও অন্য কারোর জন্য জামানত হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে না বরং এর বিপরীত সব ধরনের নেক ও ভাল কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে দূরে সরে যায়।

আর এই কারণে ঐ ব্যক্তিটি কল্যাণমূলক কাজের প্রতিবন্ধক হয়ে পবিত্র কোরআনের এ আয়াতের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়:
“...তোমরা উভয়কেই নিক্ষেপ করো জাহান্নামে প্রত্যেক উদ্ধ্যত কাফিরকে আর ঐ ব্যক্তিকে যে কল্যাণকর কাজে প্রবল বাধাদানকারী ও সন্দেহ পোষণকারী।” (আর অন্যজনকে সন্দেহে ফেলে।) (১১০)

পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি এইভাবে তফসীর করছে:
“যে ব্যক্তি, মানুষের সৎকাজের বাধা হয় যেমনঃ ঈমান, দানশীলতা, নেক ও সৎকর্ম হতে।”(১১১)
অপরকে সাহায্য করা এবং দ্বীনি বন্ধু ভাইয়ের হাজাতকে পূরণ করার বিষয়টি এতো গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলাম-ধর্মে বিশেষভাবে সুপারিশ করা হয়েছে। এমনকি তোমার দ্বীনি ভাইকে তার সমস্যা ও প্রয়োজনের কথা তোমার কাছে প্রকাশ করার সুযোগ দিও না।

অর্থাৎ, যদি তুমি তার অসুবিধা ও প্রয়োজন সম্পর্কে জেনে থাকো, তাহলে তার সমস্যা ও প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশ করার পূর্বে তুমি তার চাহিদাকে পূরণ ও সমস্যা সমাধানের জন্য এগিয়ে যাও।

কারণ এ কাজটি প্রকৃত ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও মোমিনের পরিচয় বহন করে থাকে এবং অধিকাংশ মানুষের ব্যক্তিত্ব ও সম্মানের ক্ষতিগ্রস্থ হতে সংরক্ষণ করে থাকে।
আমীরুল মোমেনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “তোমরা নিজের ভাইদেরকে কষ্টের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে লজ্জায় ফেলো না, যখন তাদের কষ্টের বিষয়ে অবগত হবে, তখন তাদের প্রয়োজন ও চাহিদার বিষয় প্রকাশের আগে, তাদের প্রয়োজন ও চাহিদাকে পূরণ করো।”(১১২)

এ বিষয়ে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) খুব সুন্দর একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেনঃ
“যে মোমিন কোনও দূর্দশাগ্রস্ত মোমিনের দুঃখ-কষ্টকে দূর করেন, মহান আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখিরাতের সকল চাহিদাকে সহজ করবেন এবং যে ব্যক্তি তার দ্বীনি-মোমিন ভাইয়ের দোষ-ক্রটিকে লুকিয়ে রাখবেন মহান আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখিরাতের ৭০টি দোষ-ক্রটিকে লুকিয়ে রাখবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত মোমিনগণ, একে অপরের প্রতি সাহায্যে নিয়োজিত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মহান আল্লাহ মোমিনের সাহায্যকারী। অতএব, জ্ঞানীদের উপদেশ গ্রহণ করে উপকৃত হও এবং সৎকর্মে আত্মনিবেদিত হও। ”(১১৩)
আলোচ্য রেওয়ায়েতগুলি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে: মোমিনদের উচিত, তার দ্বীনি ভাইয়ের চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রে সর্বোপরি চেষ্টা করা এবং এ বিষয়ে কোন প্রকার অবহেলা না করা।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) হতে আবু বাসির বর্ণনা করে বলেন, তিনি বলেছেন:
“আমাদের (শিয়াদের) সাহাবিদের মাঝ হতে যদি কেউ তার ভাইয়ের নিকট সাহায্যের জন্য আসে, আর সে যদি তার ভাইয়ের জন্য সাহায্যের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা না করে, তাহলে সে আল্লাহ এবং তার রাসূল ও মোমিনদের সাথে খেয়ানত করেছে। আবু বাসির ইমামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে রাসূলের সন্তান! মোমিনীন বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? ইমাম বলেন, হযরত আমিরুল মোমিনিন আলী (আ.) হতে শেষ অবদি।”(১১৪)

অনুরূপভাবে, ইমাম অন্য আর একটি রেওয়ায়েতে বলেছেনঃ
“যেসমস্ত মোমিনের ক্ষমতা থাকা সত্তে¡ও, অপর মোমিনের যে সমস্ত বিষয় প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলি পূরণ করতে আত্মনিবেদিত না হয় এবং নিষেধ করে, মহান আল্লাহ তাদেরকে কিয়ামত দিবসে কালো চেহারা, অশ্রুসিক্ত চোখ ও হাত তার গরদানে বাধা অবস্থায় পুনরুত্থিত করবেন আর বলবেন যে, এই ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের (সা.) সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অতঃপর তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করার আদেশ দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।”(১১৫)

এ সমস্ত গুরুত্বারোপ ও সুপারিশ এটাই প্রমাণ করে যে, ইসলাম ধর্মে মোমিনের সাহায্য করার বিষয়টিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিশেষ করে দ্বীনি ভাইয়ের চাহিদাকে পূরণ করা অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।###

 
Share: