ঈমানের পরীক্ষা ব্যতিত মুক্তি মিলবে না

  • Posted: 08/12/2021

 লেখকঃ মোঃ সাফিউর রহমান

সমাজের অধিকাংশ মানুষই এক অবিনশ্বর সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস রাখেন অথবা এরূপ বিশ্বাস রাখেন বলে দাবি করেন। এরূপ বিশ্বাস পৃথিবীতে বিদ্যমান প্রায় সকল ধর্মের মূল শর্তগুলোর অন্যতম। একইভাবে এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস এবং তাঁর প্রেরিত রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আনুগত্যকে ইসলামের মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং তাদের সকলেই এই শর্তেই নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে ঘোষণা করে যে, “আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর প্রেরিত রাসুল।” এখন দেখা যায়, অনেকের মধ্যেই এই ধরনের এক বিশ্বাস রয়েছে যে মহান আল্লাহ তায়ালার একত্ব ও সর্বময়তা এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) রিসালাতের স্বীকৃতি দিলেই বোধ হয় কোন না কোন একদিন বেহেশতে যাওয়া যাবে!

আবার মুসলিমদের মধ্যেই একটা দল রয়েছে যারা ইসলামের মূল গ্রন্থ আল-কুরআন এর দালিলিক ভিত্তিতেই এটা দাবি করে যে শুধু আল্লাহ এবং তাঁর প্রেরিত রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর ঈমান আনলেই ধর্ম পরিপূর্ণ হবে না বরং রাসুলে পাক (সাঃ) এর একান্ত রক্তজ বংশধর বা আহলে বাইতগনের প্রতি অপরিসীম ভালবাসারও শপথ নিতে হবে।
“(হে রাসুল) আপনি বলুন যে, আমি তোমাদের কাছে কোন বিনিময় চাই না, শুধুমাত্র আমার একান্ত রক্তজ বংশধরের (আহলে বাইতদের) প্রতি সীমাহীন ভালবাসা ব্যতিত।” (সুরা- শুরাঃ২৩)

তাহলে, নিঃসন্দেহেই দেখা যাচ্ছে যে, এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস, রাসুলে পাক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর একান্ত রক্তজ বংশধরদের প্রতি সীমাহীন ভালবাসা ইসলামের মূল শর্ত। তাহলে কি এসব শর্তের শপথ নিলেই আমাদের ভিতর ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করবে আর আমরা মৃত্যুর পরে বেহেশত লাভ করবো।অনেকে এরূপ বিশ্বাসও রাখেন যে, যেহেতু আমরা আহলে বাইত-এর প্রতি ভালবাসার শপথ নিয়েছি সুতরাং আমাদের মুক্তির জন্য এটাই যথেষ্ট। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, শুধু ঈমানের শপথ নিলেই হবে না বরং সেই ঈমানের পরীক্ষা দিয়ে পাশ করার আগ পর্যন্ত মুক্তি মিলবে না।

আল্লাহ বলেন, “মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’, একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? অথচ আমি তাদের পূর্ববর্তীদের সকলকেই পরীক্ষা করে নিয়েছি। আল্লাহ তা’য়ালা অবশ্যই দেখবেন কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যুক।” (সুরা আনকাবুতঃ২-৩)

সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, শুধু “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” অর্থাৎ, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নাই এবং হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর প্রেরিত রাসুল।” এতটুকু মুখে উচ্চারণ করলেই মুক্তি মিলবে না বরং বিভিন্ন পরিক্ষার মাধ্যমে এই শপথের আন্তরিকতার প্রমাণও দিতে হবে।

একইভাবে মুক্তির জন্য রাসুলে পাক (সাঃ)-এর আহলে বাইত-এর প্রতি সীমাহীন ভালবাসার পরিক্ষাও আল্লাহর দরবারে দিতে হবে এবং অন্যথায় মুক্তি মিলবে না। আল্লাহ তায়ালা এসব পরীক্ষা প্রতিনিয়ত আমাদের দৈনন্দিন জীবনেই নিয়ে থাকেন। “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা, ধন-সম্পদের ক্ষতি ও প্রাণহানি এবং ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” (সুরা বাক্বারাঃ১৫৫)

যখনই আমরা দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে সামান্য কিছু অর্থের লোভে, নারীর লালসায়, অহংকার বা হিংসার বশবর্তী হয়ে, রাগের মাথায় অথবা নিজ দল বা গোত্রের প্রতি অনুরক্ত হয়ে আমাদের ঈমানের শপথকে ভুলে যাই, তখনই আমরা আমাদের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে যাই। কখনো বা সমাজের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে রাসুলে পাক (সাঃ)-এর পবিত্র আহলে বাইত-এর শিক্ষাকে ভুলে যাই, আবার কখনো বা অভাবের ভয়ে অর্থের লোভে আহলে বাইত-এর শিক্ষাকে ভুলে ছলনার আশ্রয় নিই। কখনো বা আমরা সামান্য ক্ষমতার লোভে বা ভালবাসায় অনুরক্ত হয়ে, বা সস্তা তর্কে জেতার তাড়নায় মিথ্যা জেনেও সেই মিথ্যার পক্ষেই রায় দেই।

এভাবেই আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের ঈমানের শপথ ভঙ্গ করি এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা পরীক্ষার মাধ্যমে আমাদের ঈমানের শপথ-এর সত্যতা প্রমাণ করবো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মুক্তি মিলবে না। “লোকেরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলুন, তোমরা ঈমান আনোনি। বরং তোমরা শুধু বলো যে, ‘আমরা আত্মসমর্পণ করেছি।’ প্রকৃতপক্ষে ঈমান তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।’ (সুরা হুজরাতঃ১৪)######

Share: