বিদ্’আত

  • Posted: 08/12/2021

লেখকঃ হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা সইয়েদ ইব্রাহীম খলিল রাজাভী, অধাক্ষ, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা।

শিরক ও বিদ্’আত এ শব্দ দু’টি এমন যা বার বার ওহাবীদের পক্ষ থেকে মানুষের চিন্তা ও মননে প্রবেশ করানো হচ্ছে। এ শব্দগুলোর প্রচার মুসলমানদের মাঝে এত বেশী হয়েছে যে, ওহাবীদের পাশাপাশি সাধারণভাবে এ শব্দগুলোর ভুল প্রয়োগ হচ্ছে। সে কারণে বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ যদিও এখানে নেই তথাপি সংক্ষিপ্তাকারে হলেও বিষয়টির উপর আলোকপাত করা উচিত বলে আমি মনে করি।

বিদ্’আত শব্দটি ইদানিংকালে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে দেখা যায়। মূলতঃ তিনটি অর্থে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এক হচ্ছে ‘উরফী’ অর্থাৎ, পরিভাষাগত অর্থ। শরীয়তের ভিত্তিতে এর কোন গুরুত্ব নেই। কেননা কোন শব্দের অতিরিক্ত ভূল প্রয়োগ কিংবা ব্যবহারও ‘উরফী’ রূপ লাভ করতে পারে। এ মূহুর্তে উক্ত ‘উরফী’ বা পরিভাষাগত অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে বাহাস করার প্রয়োজন মনে করছি না। যেটা আলোচনার বিষয় তাহলো আভিধানিক ও শরীয়ত অনুমোদিত পরিভাষা।

‘বিদ্’আত’ আভিধানিক অর্থেঃ

বিদ্’আত আরবি শব্দ। আরবি ভাষার অভিধানে বিদ্’আত এমন কর্ম সম্পাদন করাকে বুঝায় যার পূর্ববতী কোন দৃষ্টান্ত নেই। পবিত্র কুরআনের আয়াতেও অভিধানের উপরোক্ত অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ ইরশাদ হচ্ছে بدیع السماوات والارض (سوره انعام ایت ১০১) অর্থাৎ “এবং তিনি (আল্লাহ) নভোমন্ডলী ও ভূমন্ডলের স্রষ্টা ”(সূরা আনআমঃ ১০১)।

অত্র সূরায় ‘বদী’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যার উৎপত্তি ‘বিদা’ শব্দ থেকে এবং এর অর্থ হচ্ছে সৃষ্টি, আবিষ্কার ইত্যাদি। এখানে জানা উচিৎ যে, প্রত্যেক সৃষ্টি বা আবিষ্কারকে ‘ইবদা’ বা ‘বিদা’ বলা হয় না। বরং তাকে বলা হয় যা পূর্বে ছিল না। (কামুছে কুরআন খঃ ১, পৃঃ ১৭১)

পবিত্র কুরআন নবী করিম (সাঃ) সম্পর্কে ইরশাদ করছে “ قل ما کنت بدعا من الرسل ( سوره الاحقاف ایت ৯) অর্থাৎ, তুমি বল, আমি তো কোন অভিনব রাসূল নই...” (সূরা আহযাবঃ ৯)।

আলোচ্য আয়াতে ‘বিদ্’আত” শব্দটি যার উপমা নেই এই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। (কুরআনের টিকা পৃঃ ১০৩৮, আল্লামা জাওয়াদী)। এখানে বলা হচ্ছে, তুমি বল,আমি তো কোন অভিনব বা নুতন কোন রাসূল নই, বরং আমার পূর্বেও নবী রাসূলের আগমন হয়েছে। উক্ত দুটি আয়াতে ‘বিদ্’আত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে। অভিধানে যেমন ‘বিদ’আত’ শব্দের অর্থ নুতন কিছুর প্রকাশ বা আবিষ্কার। তাহলে কি কোন রকম বাধ্য-বাধকতা ও শর্ত ব্যতিরেকে আভিধানিক অর্থকে মেনে নেয়া যাবে এবং প্রত্যেক নুতন জিনিস বা আবিষ্কারকে হারাম বলা হবে? মানবজীবন সর্বদা পরিবর্তনশীল ও উন্নতির দিকে ধাবমান এবং তা নুতন আবিষ্কারের সাথে সম্পৃক্ত। তাহলে কি সকল বিষয় যা নুতন আবিষ্কার হিসেবে গণ্য ‘বিদ্’আত’ আখ্যায়িত করে তা প্রতিরোধ করতে হবে ? তাহলে তো বিমানের সাহায্যে হাজী সাহেবদের হজ্ব যাত্রাও হারাম বলে পরিগণিত হবে। কেননা বিমানে ভ্রমণ একটি নুতন আবিষ্কার। নবী (সাঃ)-এর যুগে বিমান ছিল না। সুতরাং যাবতীয় নুতন আবিষ্কারকে ‘বিদ্’আতে’ শারয়ী বলা যাবে না যদিও তা আভিধানিক অর্থে ‘বিদ্’আত’।

শরীয়ত এবং ফেকাহশাস্ত্রের পরিভাষায় ‘বিদ’আত’

কোন কিছু আবিষ্কার করে তা মাযহাবে রূপ দেয়া অথবা মাযহাবে কোন কিছু বৃদ্ধি করা যা বিধানদাতা করেননি অথবা পূর্বে শরীয়তে ছিলনা। ইদ্খালা মা লাইসা ادخال ما لیس من الدین فی الدین অর্থাৎ দ্বীনে অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কিছু দ্বীনের মধ্যে প্রবিষ্ট করা বা মুস্তাহাব নয় তাকে মুস্তাহাব বলা অথবা মুস্তাহাব উলে­খ করে উপস্থাপন করা অথবা ওয়াজিব নয় তা ওয়াজিব বলে চালিয়ে দেয়া। যদি কেউ এমন করে থাকে তা হবে আল্লাহ্‌র ‌প্রতি মিথ্যা আরোপ করার সমতুল্য। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে قل آرءَیتم ما انزل الله لکم من رزق فجعلتم منه حراما وحلالا قل ءَ آلله اذن لکم آم علی الله تفترون ( سوره یونس ایت ৫৯)” অর্থাৎ “তুমি বল, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য যে জীবনোপকরণ অবতীর্ণ করেছেন তোমরা তার কতককে অবৈধ এবং কতককে বৈধ করছ ? বল, আল্লাহ্‌ কি তোমাদের এটার অনুমতি দিয়েছেন না তোমরা আল্লাহ্‌র ওপর মিথ্যা আরোপ করছ (সূরা ইউনুসঃ ৫৯)।

পবিত্র কুরআনে অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে- ومن آظلم ممن افتری علی الله کذبا ( سوره انعام ایت ২১) অর্থাৎ “এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা তাঁর নির্দেশাবলীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তার থেকে বড় অবিচারক আর কে? আর অবিচারকরা কখনই সফল হয় না।” (সূরা আনআমঃ ২১)।

উপরোক্ত আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে যে, যা শরীয়তে নেই তাকে শরীয়তের রূপ দেয়া, আল্লাহ্‌র প্রতি মিথ্যা আরোপ করা এবং আল্লাহ্‌র প্রতি অবিচার করার সমতুল্য হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কোন ‘মুবাহ’ কর্ম যদি সম্পাদন করা হয় এবং ঐ কর্মকে ওয়াজিব, মুস্তাহাব,মাকরূহ এবং হারাম আখ্যায়িত না করা হয় তাহলেও কী ওই কর্ম শরীয়তের দৃষ্টিতে বিদ্’আত বলে গণ্য হবে এবং আল­াহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করা হবে? নিশ্চয় না। যে কর্ম বিদ’আতে শারয়ী ও ফিকাহশাস্ত্রের সজ্ঞায় খারিজ বা নাকচ করা হয়েছে তা যদি সম্পাদন করা হয় তাহলে ওই কর্মটি ‘বিদ্’আত’ বলে গণ্য হবে না। কারণ শরিয়তের বিধানদাতা শরিয়তের বিস্তারিত তালিকা বর্ণনা করেছেন , হারাম ও হালালের মূল নীতিসমূহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন। যদি তালিকায় না-ও থাকে সে ক্ষেত্রে নীতিসমূহের উপর ভিত্তি করে তা পরখ করা যেতে পারে। “লা যারারা,ওয়ালা যারারা ফিল ইসলাম ” لا ضرر و لاضرار فی الاسلام ( کافی جلد ৫ ص ২৯২) অর্থাৎ ক্ষতি বা ক্ষতিসাধন করার কোন অনুমতি নেই। (কাফি খঃ ৫, পৃঃ ২৯২)।

এটি একটি মানদন্ড। শরীয়ত এবং শরীয়তের ফকীহগণ এমন ধরণের অনেক মাপকাঠি বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সাঃ)-এর একটি হাদিস যা বার বার বর্ণনা করা হয়ে থাকে যে, তিনি (সাঃ) ইরশাদ করেন-“কোন কিছু আবিষ্কার করা পাপ এবং নুতন কিছু আবিস্কার ‘বিদ্’আত’ বলে গণ্য আর বিদ’আত হচ্ছে পথভ্রষ্টতা এবং পথভ্রষ্টের ঠিকানা জাহান্নাম”।

আলোচ্য হাদিসে ‘নুতন আবিষ্কার’ বলতে এখানে সকল নুতন আবিষ্কারকে বুঝানো হয়নি বরং ওই সকল আবিষ্কারকে বুঝানো হয়েছে যা দ্বীনের বা শরীয়তের নামে করা হয়। দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত নয় এমন কোন কাজ দ্বীনের নামে যদি করা হয়ে থাকে তাহলে স্পষ্টতই উক্ত কাজ ‘বিদ্’আত’ বলে গণ্য এবং তা হবে পথভ্রষ্টতা। কোন মুস্তাহাব নামাজ যা জামাতের সাথে আদায় করার অনুমতি নেই যদি জামাতে আদায় করা হয় তা হবে ‘বিদ্’আত’। কেননা এ কর্মটিও “ইদখালা মা লাইসা” شرالامور محدثاتها و کل محدثة بدعت و کل بدعت ضلالة و کل ضلالة فی النار. অর্থাৎ দ্বীনে অন্তর্ভূক্ত নয় এমন কিছু দ্বীনের মধ্যে প্রবিষ্ট করার ন্যায়।

‘বিদ্’আত’ কর্মকে যতই বিদ্’আতে হাসনাহ অর্থাৎ উত্তম বিদ’আত বলা হোক না কেন শরীয়তের পরিভাষায় বিদ্’আত বলেই গণ্য হবে। উত্তম বা মন্দ বিদ্’আতের কোন অনুমতি নেই, কিন্তু তা যদি রাসূল (সাঃ)-এর হাদীস (ক্বাত্তল), কর্ম (ফেল) এবং তাক্বরীরে ( আল্লাহ্‌র নবীর (সাঃ) উপস্থিতিতে যে সকল কর্ম সম্পাদন করা হয়েছে) পাওয়া যায় অথবা আমাদের ইমাম (আঃ) গণের ক্বাওল, ফেল ও তাক্বরীরে পাওয়া যায় তাহলে ম্স্তুাহাব কর্মকে মুস্তাহাব হিসেবে, ওয়াজিব কর্মকে ওয়াজিব হিসেবেই সম্পাদন করতে হবে। এখানে পরিবর্তন বা রূপান্তরের কোন অনুমতি নেই। ইজতিহাদের নামে শরীয়তের আহকামসমূহের পরিবর্তনের কোন সুযোগ নেই। কেননা কুরআন ও সুন্নাতের সাহায্যে আহকাম বা বিধি-বিধান সমূহের উন্মোচন করার নাম হচ্ছে ইজতিহাদ, আবিষ্কার করা নয়। ###

Share: