মদিনার সাহাবিগণ কোথায়!

  • Posted: 26/12/2021

মোঃ সাফিউর রহমান

পৃথিবীর সকল মুসলমান, অর্থাৎ যারা নিজেকে রাসুলে পাক হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর অনুসারী বা উম্মত হিসেবে পরিচয় দেন, তাদের সবাই জানেন যে, রাসুলে পাক (সাঃ)-এর জীবন মূলতঃ দুই ভাগে বিভক্ত।

  • প্রথমতঃ হচ্ছে তাঁর জন্মস্থান মক্কার জীবন, অধিকাংশ ঐতিহাসিকগণের মতে যেখানে তিনি জীবনের প্রথম ৫২ বা ৫৩ বছর অতিবাহিত করেন।
  • দ্বিতীয়তঃ তাঁর মদিনার জীবন, যেখানে তিনি জীবনের শেষ দশ বছর অতিবাহিত করেন এবং এখনো তিনি মদিনা শহরেই সমাহিত রয়েছেন।

ইসলামের মূল গ্রন্থ পবিত্র কুরআন শরিফের সুরাসমূহকেও রাসুলে পাক (সাঃ)-এর জীবনানুসারে দুই ভাগে: মাক্কি ও মাদানি সুরা হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়েছে। অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের যে ৮৬ টি সুরা রাসুলে পাক (সাঃ) মক্কায় অবস্থানকালে নাজিল হয়, সেগুলোকে মাক্কি সুরা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং যে ২৮ টি সুরা তিনি মদিনায় হিজরত করার পরে নাজিল হয়েছে সেগুলোকে মাদানি সুরা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।এখন এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন যে, মক্কা আল্লাহর পবিত্র ঘর খানায়ে কাবার শহর, রাসুলে পাক (সাঃ) এর জন্মস্থান এবং তাঁর সকল পুর্বপুরুষের আদি বাসস্থান হওয়া সত্তেও কেন তাঁকে মক্কা ছাড়তে হলো?

যে কোন মুসলমান ভাই এই প্রশ্নের উত্তরও অনেক সহজভাবেই দিয়ে দিবেন এবং বলবেন যে, “মক্কার অধিকাংশ মানুষের চরম অসহোযোগিতা, শত্রুভাবাপন্ন আচরণ, প্রকাশ্য এবং গোপন শত্রুতা রাসুলে পাক (সাঃ)-এর জন্য ইসলাম প্রচারের কাজকে শুধু অসম্ভবই করে তোলেনি বরং তাঁর পরিবারের জন্য মক্কায় বসবাসকে করে তুলেছিল চরম অনিরাপদ।” সেই তুলনায় মদিনা ছিল ইসলাম এবং ইসলামের সবচেয়ে সম্মানিত পয়গম্বর রাসুলে পাক হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর জন্যে নিরাপদ এবং উর্বরভূমি।

কিন্তু মদিনা শহর তো আর এমনি এমনিই ইসলামের মূল উর্বরভূমি হয়ে উঠেনি বরং সেখানকার বাসিন্দাদের বন্ধুভাবাপন্ন, অতিথিপরায়ন, ত্যাগি ও আল্লাহভীরু আচরণই মদিনাকে ইসলামের জন্য আদর্শ শহর হিসেবে গড়ে তুলেছে। কিন্তু বর্তমানে অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করা যায় যে, সাম্প্রতিক সময়ে বেশিরভাগ ইসলামিক আলোচনাতেই যখন সাহাবিদের অবদানের কথা উঠে আসে, তখন কেন যেন মদিনার সাহাবিদের কথা আসে না।

যে কোন মুসলমানকে যখন কোন সাহাবির নাম জিজ্ঞেস করা হয় তারা শুধু মক্কার নির্দিষ্ট কিছু সাহাবির নামই বলতে পারেন। এমনকি একজন সচেতন মুসলমান বা একজন ইসলামিক স্কলার যদি ১০ জন বা ২০ জন সাহাবির নামও আলোচনা করেন তবুও তার মধ্যে একজন মদিনার সাহাবির নাম আসে না।

যে মদিনার মানুষ রাসুলে পাক (সাঃ) তথা ইসলামকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলো, যে মদিনাবাসি আমাদের রাসুলকে তাদের বিচারক ও অভিভাবক মেনে নিলো, যে মদিনাবাসি রাসুলে পাক (সাঃ) ও তাঁর সাহাবিদের জন্য তাদের বাসস্থান, চাষযোগ্য জমি, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থান ছেড়ে দিলো, ইসলামের ইতিহাস সেই মদিনাবাসিকে এতো সহজে ভুলে গেলো কেন?
ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিন যুদ্ধ: বদরের যুদ্ধ, উহুদের যুদ্ধ এবং খন্দকের যুদ্ধে মক্কার লোকেরা বার বার সুসজ্জিত হয়ে মদিনা আক্রমণ করতে গিয়েছে।মদিনাবাসি তাদের জীবন দিয়ে, তাদের সকল জীবনচাহিদা জলাঞ্জলি দিয়ে হাসিমুখে সেসব আক্রমণ প্রতিহত করেছে। কখনো কোন বিরক্তি প্রকাশ করেনি। অথচ তাদের আজ কেউ মনে করে না।

কারও মনে কি এই প্রশ্ন জাগে না, যে রাসুলে পাক (সাঃ)-এর দেহত্যাগের পরে বার বার কেন মুসলিম শাসক শুধু মক্কা থেকেই আসলো। আর মদিনাবাসি-ই বা কেন চুপচাপ মক্কাবাসির শাসন মেনে নিলো। আমার মনে হয় কারণ ছিল একটাই, মদিনাবাসি রাসুলে পাক (সাঃ) এর গাদিরে খুমে দেয়া শেষ নির্দেশ, “আমি যার অভিভাবক, আলীও তার অভিভাবক” এ কথাটি মেনে নিয়ে হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) এর আনুগত্য করে গেছেন শেষ পর্যন্ত।

তাই তারা কখনোই নিজেরা ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করেন নি। মাওলা আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ)-এর নির্দেশের অপেক্ষায় থেকেছেন সব সময়। আর এজন্য তাদেরকে নির্যাতনও সইতে হয়েছে অনেক। উদাহরণস্বরূপ, রাসুলে পাক (সাঃ)-এর এক অন্যতম সাহাবি হযরত মালিক বিন নুয়াইরাহ (রাঃ) কে হত্যা করে মক্কার এক শাসক।

তার একমাত্র অপরাধ ছিল তিনি তৎকালীন শাসককে নিজের অভিভাবক না মেনে রাসুলে পাক (সাঃ) তথা আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত শাসক হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ)কে অভিভাবক মেনে নেন এবং নিজ অংশের যাকাতের টাকা তৎকালীন শাসকের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এভাবে মদিনার সাহাবিরা রাসুলে পাক (সাঃ)-এর সময় এবং তাঁর পরবর্তী সময়ে ইসলামের প্রতি অনুগত থেকে নিজেদের ঈমানের প্রমাণ রেখে গেছেন।

তাই এটাও আমাদের ঈমানি দায়িত্ব যে, আমরা যুক্তি দিয়ে বিচার করে, ইতিহাস পর্যালোচনা করে তাদেরকে চেনার চেষ্টা করবো যারা আসলেই আল্লাহর এবং আল্লাহর রাসুল (সাঃ)-এর প্রিয়জন। কারণ আমরা প্রার্থনা করি যে, (হে আল্লাহ) আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করুন, সে সমস্ত লোকের পথ, যারা আপনার প্রিয়জন। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি আপনার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। [সুরা ফাতিহা - ১:৬-৭]###

Share: