প্রখ্যাত ইরানি মনীষী মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি

  • Posted: 06/08/2020

হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, আলেম, চিন্তাবিদ, বক্তা ও লেখক মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি সম্পর্কে আলোচনা করব।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির মূল নাম কামাল উদ্দিন হোসাইন বিন আলী সাবজাওয়ারি। তৈমুরি যুগের শেষের দিকের নিরলস লেখক, কবি ও ধর্মীয় নানা বিষয়ে পন্ডিত এই ব্যক্তিত্ব ছিলেন পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যাকারী বা মুফাসসির। এ ছাড়াও তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী বক্তা, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ। কাশেফি ছিল কবিতা লেখার ক্ষেত্রে তাঁর ছদ্মনাম। কিন্তু একজন প্রখ্যাত বক্তা ও নসিহতকারী হওয়াতে তিনি ওয়ায়েজ হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন। ধারণা করা হয় হিজরি ৮৩৫ থেকে ৮৪০ সনের মধ্যে কোনো এক বছরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন সাবজাওয়ার শহরে। সে যুগে সাবজাওয়ার ছিল ইসলাম ও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এই অঞ্চলে ছিল অনেক সুদৃশ্য মসজিদ ও মাদ্রাসা। এ অঞ্চলের আলেম সমাজ সুদূর অতীত থেকেই ছিলেন শরীয়তপন্থী এবং ওয়াজ-নসিহতের ক্ষেত্রে খ্যাতিমান।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি ছিলেন সুলতান হোসাইন বয়কারো ও তার খ্যাতিমান মন্ত্রী আমির আলীশির নাওয়ায়ির সমসাময়িক। তিনি যৌবনে ধর্মীয় নানা বিদ্যা, গণিত ও সুলেখন শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেন এবং এরপর এরফান বা মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনে মনোনিবেশ করেন। হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি হাদিস, তাফসির, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যাসহ তার যুগে প্রচলিত সব বিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তিনি বহু বছর ধরে সাবজাওয়ার, নিশাপুর, মাশহাদ ও বিশেষ করে হেরাত শহরে ধর্ম এবং নৈতিকতার বিষয়ে ওয়াজ-নসিহত করেছিলেন। তার ওয়াজের ভাষা ছিল মধুর ও আকর্ষণীয়। অত্যন্ত মানানসই বাক্য ও শব্দ ব্যবহার করতেন হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি। পবিত্র কুরআনের জটিল অর্থবোধক নানা বাক্য ও মহানবীর হাদিসের মর্মার্থ সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা ছিল তার ওয়াজ-নসিহতের আরেকটি বড় আকর্ষণ।
হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি সাবজাওয়ারের উঁচু স্তরের আলেমদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের পর স্বপ্নে-পাওয়া নির্দেশনার আলোকে নিশাপুর ও মাশহাদে যান মাওলানা সা'দ উদ্দিন কাশগরির সাক্ষাত লাভের আশায়। কিন্তু এ অঞ্চলে এসে তিনি জানতে পারেন যে এই মহান ব্যক্তিত্ব ইন্তেকাল করেছেন। তাই কাশেফি এই মহান ব্যক্তিত্বের মাজার জিয়ারতের জন্য হেরাতে আসেন। মাওলানা সা'দ উদ্দিন কাশগরির মাজারে এসে তিনি প্রখ্যাত কবি জামির সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি কাশেফিকে নকশবন্দিয়া তরিকা নামের সুফি মতবাদের দীক্ষা দেন এবং তাকে এই মতবাদের অনুসারী করেন।
হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি ধর্মীয় জ্ঞান রপ্ত করার পর জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছেন ওয়াজ-নসিহত বা ধর্ম প্রচারের কাজে। তাকে মনে করা হত সে যুগের শ্রেষ্ঠ বক্তা। তার বক্তৃতা বা ওয়াজ-নসিহতের সভায় বিপুল মানুষের সমাবেশ ঘটত। তার আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি ও মিষ্টি সুর দর্শক-শ্রোতাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করত। বিশেষ করে হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি যখন কুরআনের আয়াত ও হাদিসকে মানানসই বাগধারা ও শব্দ দিয়ে মিষ্টি সুরে বর্ণনা করতেন তখন তা উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করত।
৮৭৩ হিজরিতে সুলতান হুসাইন মির্যা বয়কারো যখন হেরাতের শাসক হন তখন কাশেফির জনপ্রিয়তা ও সম্মান অনেক বেড়ে যায়। এই সুলতানের সুযোগ্য মন্ত্রী আমির আলীশির নাওয়ায়ি বরাবরের মতই গুনিদের প্রতিভার বিকাশে উৎসাহ যোগাতেন ও তাদেরকে সব ধরনের সহায়তা দিতেন। তিনি হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফিকে ফার্সি ভাষায় বই লিখতে উৎসাহ দেন। ফলে কাশেফির বেশিরভাগ বইই লেখা হয়েছে সুলতান বয়কারো ও আলীশির নাওয়ায়িকে উৎসর্গ করে। সে যুগের ধর্ম বিষয়ের বক্তাদের খুব সম্মান করা হত এবং তারা গড়ে উঠতেন মুহাদ্দিস ও আলেমদের মধ্য থেকে। এরই আলোকে হেরাতে বড় মুহাদ্দিস ও আলেম হিসেবে বিশিষ্ট বা অনন্য বক্তা হওয়ার সম্মান পান কাশেফি। তার বক্তৃতা বা ওয়াজ-নসিহতের আসরে যোগ দিতেন সুলতান বয়কারো এবং তার দরবারের ব্যক্তিবর্গ।
আলীশির নাওয়ায়ি তার মাজালিসুন্নাফায়িস শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, 'মানবজাতির মধ্যে হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির মত বক্তা কখনও ছিল না ও এখনও নেই। তার ওয়াজের মজলিশে এত বেশি মানুষের সমাবেশ ঘটত যে ভিড়ের চাপে মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হত। বিশুদ্ধ ভাষা ও সুমিষ্ট সুর ছিল এত ব্যাপক আকর্ষণের অন্যতম রহস্য। আসলে তার কণ্ঠে যেন হযরত দাউদ নবীর সুমিষ্ট সুরের ছাপ ছিল। মুসলমানদের মধ্যে অন্য কোনো ব্যক্তি এক্ষেত্রে তার মত নন। তার ওয়াজের মজলিশেই কেউ কেউ তার ভাষণকে কবিতার মত ছন্দবদ্ধ করে তা মানুষকে শোনাতেন।'
হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি ছিলেন একজন বড় জ্যোতির্বিদ। খ'ন্দ মির তাকে সে যুগের শ্রেষ্ঠ বা অনন্য জ্যোতির্বিদ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে অন্যান্য জ্ঞানেও তিনি ছিলেন একই রকম উচ্চ পর্যায়ের। 'আসারে সাব্আ' জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে কাশেফির একটি বইয়ের নাম। পবিত্র কুরআনের তাফসিরেও তিনি ছিলেন সুদক্ষ। এ ছাড়াও সাহিত্য ও ইতিহাস বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল প্রশংসনীয়।
বেশিরভাগ লেখক ও ইতিহাসবিদের মতে কাশেফি মারা যান ৯১০ হিজরিতে। হেরাতে তার মৃত্যু ঘটেছিল। তার ছেলে ফখরুদ্দিন সাফি আলীও বিখ্যাত ওয়ায়েজ বা ধর্ম-প্রচার বিষয়ে বক্তা হয়েছিলেন। সাফি আলীরও কয়েকটি বই রয়েছে। তিনিও ছিলেন নকশবন্দিয়া তরিকার অনুসারী। সাফি আলী মারা যান ৯৩৯ হিজরিতে।
কাশেফির ওয়াজ-নসিহতের সভায় বিপুল জন-সমাবেশ হত এবং স্বয়ং সুলতান, মন্ত্রী-সভা ও দরবারের লোকজন এ ধরনের সভায় উপস্থিত হতেন।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফিকে অনেকেই মরমি কবি জামির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব বা সাহচর্যের আলোকে তাকে নকশবন্দিয়া সুফি তরিকার অনুসারী বলে মনে করেন। কিন্তু অন্য একদল গবেষক মনে করেন এর অর্থ এ নয় যে তিনি মরমি কবি জামির মুরিদ বা খাজা আবদুল্লাহ আহরারের মুরিদ ছিলেন। বরং কাশেফি ইরফানি দিক থেকে এই তরিকার প্রতি কিছুটা ঝুঁকে ছিলেন। ইরফানের দিকে তার ঝোঁক-প্রবণতার প্রতিফলন ঘটেছে তারই কোনো কোনো রচনায়। আর এ বিষয়টিকে কাশেফির ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় দিক বলে উল্লেখ করা যায়।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির অনেক রচনার কথা জানা যায়। তার অবস্থা সম্পর্কে নানা বর্ণনা দেখা গেলেও অসাধারণ বাগ্মী এই মনীষীর ধর্ম-বিশ্বাস ও মাজহাব সম্পর্কে অনেক অস্পষ্টতা রয়েই গেছে। কেউ কেউ তাকে সুন্নি মাজহাবের অনুসারী বলে মনে করেন। আবার অনেকেই তাকে শিয়া মুসলিম মাজহাবের অনুসারী বলে উল্লেখ করেছেন। এ অস্পষ্টতার কারণ হল সাবজাওয়ার ও হেরাত শহরে কাশেফির বসবাস। সাবজাওয়ার শহরে কাশেফির জন্ম হয়েছিল। তিনি এখানে বহু বছর ছিলেন এবং এখানেই বড় হন। শিয়া অধ্যুষিত এই শহর ও বাইহাক শহরের প্রধান কাজি বা বিচারপতিও ছিলেন কাশেফি। অন্যদিকে তিনি হেরাত শহরে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছিলেন। আর এ শহরের বেশিরভাগ অধিবাসীই হলেন সুন্নি মুসলমান।
তবে এটা স্পষ্ট মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি ছিলেন বিশ্বনবীর (সা) পবিত্র আহলে বাইত ও এই ধারায় জন্ম নেয়া ইমামদের অনুরাগী। তিনি সর্বত্র ও সব সময়ই এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। সমসাময়িক যুগের ইতিহাসবিদ রাসুল জাফারিয়ান এ বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছেন যে, সে যুগে পূর্ব ইরানে সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি গোষ্ঠীর কথা জানা যায় যারা বারো ইমামি সুন্নি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল।
রাসুল জাফারিয়ান লিখেছেন, হিজরি সপ্তম ও অষ্টম শতকে বারো ইমামী সুন্নিদের মধ্যে দেখা যেতো যে তারা ভাষণের শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসুলের (সা)'ওপর দরুদ পাঠের পর প্রথমে চার খলিফা এবং তারপর মহানবীর আহলে বাইতের ১২ জন ইমামের নাম স্মরণ করত শ্রদ্ধার সঙ্গে। মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি তার 'ফতুউয়াত নামেহ সুলতানি' তথা 'রাজকীয় ভদ্রতা ও শিষ্টাচার' ও 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইয়েও এই বিশেষ পদ্ধতি বা রীতির অনুসরণ করেছেন।
'ফতুউয়াত নামেহ সুলতানি' শীর্ষক বইয়ে কাশেফি ১২ ইমামের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করাকে শিষ্টাচারের অপরিহার্য অংশ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এ বইয়ের কেবল ভূমিকার অংশে প্রথম তিন খলিফার নাম উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে এ বইয়ে অনেক বার ১২ ইমামের নাম উল্লেখ করেছেন কাশেফি। এ বইয়ের নবম অধ্যায়ে অনুষ্ঠান বা কোনো আসরের সমাপ্তি টানার শিষ্টাচার সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে দু'টি বক্তৃতা তুলে ধরা হয়েছে। এ দুটি বক্তৃতা থেকে মনে করা হয় যে কাশেফি বারো ইমামি শিয়া ছিলেন।
হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, বক্তা ও লেখক মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির একটি বিখ্যাত বই হল রওজাতুশ শুহাদা। তার এ বইটিতে শিয়া মাজহাবের সবচেয়ে বেশি লক্ষণ দেখা যায়। বইটিতে অতীতের নবী-রাসুলদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরার পর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র জীবনী ও ইমামদের জীবনী তুলে ধরা হয়েছে। এ বইয়ের কারবালা বিষয়ক অংশে সবচেয়ে বেশি বিস্তারিত আলোচনা দেখা যায়। আসলে কারবালার ঘটনা তুলে ধরাই ছিল এ বই লেখার প্রধান উদ্দেশ্য।
নিরলস ও অক্লান্ত ধর্ম প্রচারক কাশেফির গদ্য ও পদ্য রচনার সংখ্যা অনেক। প্রাঞ্জল ফার্সি ও আরবি ভাষায় লেখা তার বইগুলো বিচিত্রময়, মনোমুগ্ধকর ও জনপ্রিয়। তার জীবদ্দশাতেই এসব বই জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। তুর্কি ওসমানী খেলাফতের যুগে কাশেফির লেখা অনেক বই তুর্কি ভাষায়ও হয়েছে অনূদিত। এসব বই তুর্কীভাষীদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ইসলামের নেতৃত্ব তথা ইমামত ও বেলায়াত সম্পর্কিত আলোচনার প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও এসব বই ফার্সি-ভাষাভাষী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
বিশিষ্ট গবেষক সায়িদ নাফিসি ইরানি মনীষী, আলেম, চিন্তাবিদ, বক্তা ও লেখক মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির ৩৭টি বইয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ডক্টর গোলাম হুসাইন ইউসেফি ইসলামী বিশ্ব-কোষে উল্লেখ করেছেন যে কাশেফির ৪০টি বই তুর্কি অথবা ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে।
'ফতুউয়াত নামেহ সুলতানি' ও রওজাতুশ শুহাদা শীর্ষক দুটি বই ছাড়াও কাশেফির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বইয়ের নাম হল: আখলাকে মোহসেনি, আসরারই কাসেমি, তাফসিরই কুরআন মাজিদ ও জাওয়াহিরুত তাফসির। তার বইগুলোর বিষয়বস্তু ধর্ম, ইরফান বা ইসলামী আধ্যাত্মিক রহস্যময় জ্ঞান ও দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, ইতিহাস, তাফসির ও নৈতিকতা এবং সাহিত্য। ফার্সি গদ্য ও পদ্য এবং অলঙ্কার শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন কাশেফি। চিঠি-পত্র লেখার বিষয়ে তিনি একটি বই লিখেছিলেন যার নাম মাখজানুল ইনশা। কাশেফির গদ্যকে সমসাময়িক যুগের আদর্শ গদ্য বলা যায়। অন্য অনেক কবি-সাহিত্যিক ও পন্ডিতদের সান্নিধ্য তার লেখার ওপর প্রভাব ফেলেছিল এবং তিনি পেশাগত প্রয়োজনে ব্যাপক পড়াশুনা করতেন।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির সবচেয়ে জনপ্রিয় বইয়ের নাম হল রওজাতুশ শুহাদা। কারবালার শহীদদের শোকাবহ ঘটনা ও মহররম মাসের শোক সম্পর্কিত বর্ণনা এবং এ সংক্রান্ত কবিতা বা শোক-গাঁথা এ বইয়ের প্রধান বিষয়বস্তু। হযরত ইমাম হুসাইনের (আ) মর্সিয়া বা শোক-গাঁথা বর্ণনাকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে বিবেচিত হয় কাশেফির এ বইটি। তাদের মধ্যে এ বইটি বহুল প্রচলিত হওয়ায় বইটির হাজার হাজার কপি করা হয়েছিল। রওজাতুশ শুহাদা বইয়ের শোক-গাঁথা আয়ত্তকারী ব্যক্তিরা সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তার অধিকারী হতেন। ইরানের সাহিত্য-অঙ্গনে এ বইটিকে একটি অমূল্য সম্পদ হিসেবে ধরা হয়। অনেকেই মনে করেন যে ইরান অঞ্চলে আশুরার মর্সিয়া বা শোক-গাঁথার মাধ্যমে শোক-প্রকাশ 'রওজে বা রওজেখ'নি' হিসেবে খ্যাত হয়েছে 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটির এই বিশেষ নামের কারণেই।
ইরান অঞ্চলে তৈমুরি শাসনামল ছিল শিয়া মুসলিম মাজহাব বিকাশের যুগ। অন্য কথায় তৈমুরি বংশ ক্ষমতায় আসার পর ইরান অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতি শিয়াদের জন্য বেশি অনুকূল হতে থাকে। আর তৈমুরি শাসকরাও এই মাজহাবের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখতে পেয়ে নিজ স্বার্থেই শিয়া মুসলমানদের মন জয় করা বা তাদের সন্তুষ্ট রাখাকে গুরুত্ব দিতেন এবং মাজহাবি সংঘাত দেখা দেয়ার মত কোনো কাজ করতেন না। অনেক গবেষক ও ইতিহাসবিদের মতে তৈমুরি শাসকরা যে ইরানের শিয়া মুসলমানদের আন্তরিকভাবে পছন্দ করতেন তা নয়। কিন্তু শিয়াদের মধ্যে জুলুম-বিরোধী লড়াকু মনোভাবের কারণে তাদেরকে সমীহ করতেন তৈমুরি শাসকরা। তৈমুরি বংশ যখন প্রথমবারের মত ইরানে আসে তখন স্থানীয় শিয়া মুসলমানরা বিশেষ করে গিলান ও ম'জান্দারান অঞ্চলের লোকজন তাদের শাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তৈমুরি শাসকরা ইরানে তাদের শাসন সংহত করার পর এ বিষয়ে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করেননি। বরং তারা শিয়া মুসলমানদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তৈমুরি শাসকরা শিয়া মুসলমানদের মধ্যে সাইয়্যেদদেরকে তথা নবী বংশের সদস্যদেরকে বিশেষভাবে সমাদর করতেন। অন্যদিকে শিয়া মাজহাবের গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান ধরে রাখতে ও শিয়া মুসলমানদের শক্তি জোরদার করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন। তৈমুরি যুগে শিয়া চিন্তা-চেতনার প্রভাব এতটাই বেড়ে যায় যে মুদ্রার ওপর নবী বংশের মাসুম ইমামদের নাম লেখা হত। এ যুগে শিয়া মুসলিম পন্ডিতরা সুলতানের দরবারের সদস্য হতেন এবং এমনকি তাদের কেউ কেউ মন্ত্রীও হতেন।
তৎকালীন পূর্ব ইরান বা বৃহত্তর খোরাসানের অন্যতম প্রধান শহর ছিল হেরাত। এ শহরটি ছিল তৈমুর-বংশের শক্তি-কেন্দ্র বা রাজধানী। কিন্তু সে যুগের শিয়া মুসলমানরা হেরাতকে তাদের কর্তৃত্বাধীনে আনেন। তাদের প্রভাব এতটাই জোরালো হয়ে ওঠে যে তৈমুরি শাসক সুলতান হুসাইন বয়কারো একবার শিয়া মাজহাবকে ইরানের রাষ্ট্রীয় মাজহাব হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু একদল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের প্রতিবাদের মুখে তিনি ওই পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। শিয়া মুসলমানদের এমন প্রভাবের যুগে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্প-অঙ্গনে এবং ঐতিহাসিক ক্ষেত্রেও শিয়া চিন্তা-চেতনার ছাপ জোরদার হতে থাকে।
যাই হোক মাওলানা হুসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটি শিয়া মুসলিম সংস্কৃতি ও চিন্তা-চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ায় দীর্ঘকাল ধরে ইরানের জনগণের মধ্যে বহুল প্রচলিত বা জনপ্রিয় বই হিসেবে খ্যাত ছিল। এ বইটি পরবর্তী যুগের লেখক সমাজের ওপর বিশেষ করে সাফাভি যুগ থেকে শুরু করে কাজারদের শাসনামল পর্যন্ত ব্হু লেখকের ওপর প্রভাব রেখেছে।
মাওলানা কাশেফি 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটি রচনা করেছিলেন বৃদ্ধ বয়সে। দশ অধ্যায়ের এ বইয়ের শুরুতে নবী-রাসুলদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনার পর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা)'র জীবনীর বর্ণনা রয়েছে। এরপর বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে ইমামদের জীবনী। তবে 'রওজাতুশ শুহাদা'য় কারবালার ঘটনা সম্পর্কেই সবচেয়ে বিস্তারিত ও বেশি বর্ণনা রয়েছে। আর এ থেকে বোঝা যায় মহররম ও কারবালার ঘটনা তুলে ধরাই ছিল এ বই রচনার প্রদান উদ্দেশ্য।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির সবচেয়ে বিখ্যাত বই 'রওজাতুশ শুহাদা'র পরিচিতি এবং এ বইটি লেখার সমসাময়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এ প্রসঙ্গে আরও কিছু তথ্য তুলে ধরব।
ধর্ম বিষয়ক বক্তাকে কার্যকর ওয়াজ-নসিহতের স্বার্থে ইতিহাসসহ অনেক বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হয়। মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফিও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। নবী-রাসুল, সাহাবি ও ইমামদের ইতিহাসসহ অনেক ধরনের জ্ঞানে তার পান্ডিত্য ছিল। সে যুগে হেরাত ও সাবজাওয়ার অঞ্চলেও মহররমের শোক ও মাতমের অনুষ্ঠান হত। শোকের যেসব কবিতা বা মর্সিয়া পড়া হত মজলিসে সেসব আগেই রেডি করা থাকত। কাশেফি দৃশ্যত মহানবীর (সা) এক বংশধর তথা সাইয়্যেদ বংশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের অনুরোধে 'রওজাতুশ শুহাদা' বইটি লিখেছিলেন। এই বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম মুর্শিদ আদদৌলা। তিনি সাইয়্যেদ মির্যা নামে খ্যাত ছিলেন। তারই অনুরোধে কাশেফি মহররম মাসের শোকানুষ্ঠানে ব্যবহারযোগ্য একটি বই লেখার সিদ্ধান্ত নেন।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি তার লেখা 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটিতে হযরত ইমাম হুসাইন (আ)'র জন্য কান্নাকাটির গুরুত্ব তুলে ধরে লিখেছেন, মহানবীর আহলে বাইতের অনুরাগীরা প্রতি বছর মহররম মাসে শহীদদের সেই দুঃখ-মুসিবতের স্মৃতিকে স্মরণ করেন এবং মহানবীর বংশধরদের জন্য কান্নাকাটি করে শোক প্রকাশ করেন। কারবালা ও আশুরার ঘটনা আহলে বাইতের অনুরাগীদের হৃদয়ে দুঃখের আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং চোখে নামায় অশ্রুর বন্যা। কাশেফি লিখেছেন: মর্সিয়াগুলো সংক্ষিপ্ত হওয়াতেই সাইয়্যেদ মির্যা আমাকে এমন একটি পরিপূর্ণ বই লিখতে বলেছেন যাতে নবী-রাসুল, শহীদ ও আল্লাহ নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দুঃখ-মুসিবত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা যায়। কাশেফি কারবালার ৭২ জন বীর শহিদদের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তার মতে অতীতে আশুরার শহীদদের সম্পর্কে যেসব বই লেখা হয়েছে সেসবের বেশিরভাগেই এই মহামানবদের সংগ্রাম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি। কেবল কিছু কবিতার মধ্যেই বর্ণনা সীমিত করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির লেখা 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটি শিয়া মুসলমানরা ছাড়াও আহলে-বাইতের অনুরাগী সুন্নি মুসলমানদের মধ্যেও বিস্ময়কর সাড়া জাগিয়েছিল। আর এর কারণ ছিল বইটির প্রাঞ্জল, ছন্দময় ও সহজবোধ্য ভাষা। এমনিতেই কারবালা ও মহররমের কাহিনী মুসলমানদের মধ্যে খুবই গুরুত্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু কাহিনীর ভাষা যখন শৈল্পিক সাহিত্যিক সৌন্দর্যে ভাস্বর হয় তখন তার আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়। আসলে কাশেফি ছিলেন হিজরি দশম শতকের শীর্ষস্থানীয় গদ্য-লেখক।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির লেখা 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটির খ্যাতি অর্জনের মূল কারণ হল বর্ণনার অভিনবত্ব ও সৌন্দর্য। বৃদ্ধ বয়সে এ বই লিখতে গিয়ে তিনি সুন্দর সুন্দর শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার পান্ডিত্য ও অভিজ্ঞতার ভান্ডার যেন উজাড় করে দিয়েছিলেন। অধ্যাপক রাসুল জাফারিয়ান এ প্রসঙ্গে লিখেছেন: এ বইটি থেকে সুন্দর সুন্দর বাক্য নির্বাচন করা বেশ কঠিন। আপনি এ বইয়ের কোনো একটি বাক্য দেখে মুগ্ধ হলে দেখবেন যে বইটির অন্যত্রও এর চেয়েও সুন্দর ও বেশি কার্যকর বাক্য রয়েছে। সবচেয়ে কার্যকর ও হৃদয়-পোড়ানো কবিতাগুলো বইটিকে করেছে অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী।
'রওজাতুশ শুহাদা' বইটি লেখার ক্ষেত্রে মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি শেখ সাদির গোলেস্তান বইটির স্টাইল মাথায় রেখেছেন বলে মনে হয়। সুললিত ও সুরেলা বাক্যগুলো তার এ রচনাকে করেছে সংগীতময়। 'রওজাতুশ শুহাদা' বইটির ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রধান রহস্য মূলত এটাই। বইটিতে কাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রেও অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন কাশেফি। কাহিনীগুলোকে আকর্ষণীয় করতে লেখক কিছু কিংবদন্তীও জুড়ে দিয়েছেন যা বাস্তব নয়। বীরত্বপূর্ণ লড়াই ও শাহাদতের ঘটনাগুলো তুলে ধরার সময় তিনি শাহাদাতের মাহাত্ম্যকে এমন সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন যে সে সময়কাল পর্যন্ত ফার্সি সাহিত্যে তা ছিল বিরল। কিন্তু কিছু কিছু কল্প-কাহিনী স্থান পাওয়ায় কাশেফির এ বইটি একটি নির্ভরযোগ্য ইতিহাস-নির্ভর বই হয়ে ওঠেনি যদিও ইতিহাস তুলে ধরা ছিল তার উদ্দেশ্য। সম্ভবত কাশেফি এ বইটি লেখার সময় নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়াও অনির্ভরযোগ্য উৎসও ব্যবহার করেছেন।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইয়ে কারবালায় হাশেম বিন উরয়ার শাহাদাতের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। অথচ তিনি সিফফিনের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। এসব ভুলের কারণে কাশেফির বইটি ঐতিহাসিক বইয়ের মূল্য না পেয়ে পেয়েছে সাহিত্য, শিল্প নির্ভর উপন্যাস টাইপের বইয়ের মূল্য। ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে লেখকরা কল্পনা নির্ভর কোনো কোনো ঘটনা জুড়ে দিয়ে থাকেন। আর এটা একটি প্রচলিত স্টাইল।
গবেষকরা মনে করেন কাশেফি আশুরার ঘটনাবলীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য প্রচারে সহায়তা করেছেন। ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে তিনি একজন সুফিবাদীর চশমাই ব্যবহার করেছেন। কাশেফির ওপর নাক্শবান্দি সুফি তরিকার প্রভাব ছিল। অন্যদিকে তিনি ছিলেন মহানবীর আহলে বাইতের অনুরাগী। কারবালা ও আশুরার ঘটনাকে তিনি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেননি। আর এসব দিকের পাশাপাশি তার শৈল্পিক ও কাব্য-রসিক মন 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটিকে করেছে এক অনন্য সৃষ্টি।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইয়ের সূচনায় বলেছেন, সুফিদের জন্য দুনিয়া একটি কঠিন স্থান। তারা এ দুনিয়ায় কষ্টকর সাধনা করে উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্যাদা অর্জন করেন। মহান আল্লাহও নবী-রাসুল এবং আওলিয়ায়ে কেরামকে বেশি বিপদে-আপদে ফেলে তাদেরকে বেশি ঘনিষ্ঠ করেন। কাশেফির মতে কারবালার শহীদরা জীবিত অবস্থায় দুনিয়ায় যথাযথ মর্যাদা পাননি, কিন্তু তাঁরা শাহাদতের মাধ্যমে উচ্চতর মর্যাদা পেয়েছেন। কাশেফির মতে মহানবীর আহলে বাইতের অনুরাগীদের জন্য সর্বোত্তম বিষয় হল তাঁদের জন্য কান্নাকাটি করা যা তাদের জন্য মুক্তির তথা বিচার-দিবসে ওই মহামানবদের সুপারিশ পাওয়ার মাধ্যম।
তার আরও কয়েকটি বিখ্যাত বই হল ফুতুওয়াতনামেহ সুলতানি, আখলাকে মুহ্সিনি, তাফসিরে হুসাইনি বা মাওয়াহিবুল আলিয়্যাহ ও আনওয়ারে সুহাইলি।
'ফুতুওয়াতনামেহ সুলতানি' শীর্ষক বইটির ফুতুওয়াত শব্দের অর্থ হচ্ছে দয়া, মহানুভবতা বা পৌরুষত্য ইত্যাদি। আদিতে এটি একটি ব্যক্তিগত গুণ হলেও সুফিবাদের মাধ্যমে তা সামাজিক রংও ধারণ করেছে। তাই এর সঙ্গে মিশে আছে ধর্মীয় আদব-কায়দাও এবং ফুতুওয়াতনামা লিখতে গিয়ে ধর্মীয় সাহিত্যের একটি বিশেষ স্বতন্ত্র ধারাও সৃষ্টি হয়েছে। ফুতুওয়াতনামাগুলোকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস বা দলিল হিসেবে ধরা হয়। ইরানে সাফাভি শাসনামল ও তার পরের যুগ থেকে যেসব ফুতুওয়াতনামা লেখা হয়েছে সেসবের বেশিরভাগই অতি সাধারণ মানের লেখকদের হাতে লেখা হয়েছে বলে সেগুলো ব্যাপক ভুল-ভ্রান্তি ও জড়তায় পরিপূর্ণ গদ্য সাহিত্যের দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
যাই হোক ফুতুওয়াতনামাগুলোর ইতিহাসে মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির লেখা 'ফুতুওয়াতনামেহ সুলতানি'কে এ ধারার বইগুলোর মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের বা শ্রেষ্ঠ বই বলা যায়। বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সম্পর্ক ও নৈতিকতা নিয়ে এ বইয়ের তথ্যগুলো খুবই দুর্লভ। এ বইয়ের নবম অধ্যায়ে অনুষ্ঠান বা কোনো আসরের সমাপ্তি টানার শিষ্টাচার সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে দু'টি বক্তৃতা তুলে ধরা হয়েছে। এ দুটি বক্তৃতা থেকে মনে হয় কাশেফি বারো ইমামি শিয়া মুসলমান ছিলেন।
অধ্যাপক মুহাম্মাদ জাফর মাহজুব 'ফুতুওয়াতনামেহ সুলতানি' শীর্ষক বইটির সম্পাদনা করেছেন আধুনিক যুগে। তার মতে ফুতুউয়াত তথা মহানুভবতার বিষয়ে কাশেফির এ বইটি ছাড়া আরবি বা ফার্সি অন্য কোনো বইয়ে এত বিস্তারিত, নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও ব্যাখ্যা দেখা যায় না। এ যেন মহতী নানা গুণ বর্ণনার একটি পরিপূর্ণ বিশ্বকোষ। নিজের নানা অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা ছাড়াও এ বই লিখতে গিয়ে তিনি অনেক বিখ্যাত বইকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যেমন, ইমাম গাজ্জালির এহই্য়ায়ে উলুমে দীন ও কামালউদ্দিন আবদুর রাজ্জাক কাশির ফুতুউয়াতনামেহ।
কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি এবং হযরত আলীসহ মহানবীর (সা) আহলে বাইতের বারো ইমামের বাণীর ব্যবহার কাশেফির 'ফুতুওয়াতনামেহ সুলতানি' শীর্ষক বইটিকে করেছে সমৃদ্ধ। সুন্দর ও প্রাঞ্জল ভাষা এবং নানা পরিভাষার ব্যাখ্যা, পটভূমি ও দর্শনের বিশ্লেষণ থাকায় বইটি ফুতুউয়াত সংক্রান্ত বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির আরেকটি বিখ্যাত বইয়ের নাম হল আখলাকে মুহসিনি বা উন্নত নৈতিক চরিত্র। বইটির আরেকটি নাম হল জাওয়াহিরুল আসরার বা রহস্যের মুনি-মুক্তা। ব্যবহারিক কর্মকান্ড ও রাজনীতি বিষয়ে লেখা হয়েছে এ বই। কাশেফি বইটি লিখেছিলেন হিজরি ৯০০ সালে। খন্দমিরের মতে আখলাকে মুহসিনি কাশেফির সাতটি বিখ্যাত বইয়ের অন্যতম। ফার্সি ভাষায় এর আগে লেখা দুটি বিখ্যাত বইয়ের নাম নাসিরুদ্দিন তুসির আখলাকে নাসিরি ও জালালউদ্দিন মুহাম্মাদ দাওয়ানির আখলাকে জ্বালালি। এ দু'জন ব্যক্তিত্ব দার্শনিক হওয়ায় নৈতিকতা সংক্রান্ত তাদের বইয়ে দর্শনের প্রভাব দেখা যায়। কিন্তু কাশেফি দার্শনিক ছিলেন না বলে তার বইটি সাধারণ জনগণের মধ্যে বেশি প্রচলিত হয়েছে।
কাশেফির আখলাকে মুহসিনি বইটিতে রাজনৈতিক নৈতিকতা ও শরিয়ত বা ধর্মীয় বিধি-বিধান সংক্রান্ত নৈতিকতার আদর্শও তুলে ধরা হয়েছে। রাজনীতি ও শরিয়ত বিষয়ে শাসকদের জন্য নানা ধরনের উপদেশ-সমৃদ্ধ এ বইয়ে রাজা-বাদশাহদেরকে মহানবীর স্থলাভিষিক্ত বলে ধরা হয়েছে এবং ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করাকে তাদের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদের ওপর ইসলামী আইন বাস্তবায়নের আগে রাজা-বাদশাহকে এই আইনের অনুসারী হতে হবে বলে কাশেফি উল্লেখ করেছেন। তিনি শাসকদের জন্য ৪০টি গুণ থাকা দরকার বলে উল্লেখ করে সেসবের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এসব গুণের মধ্যে রয়েছে আন্তরিকতা, ইবাদত, ধৈর্য, পরামর্শ, সাহসিকতা, সুযোগের ব্যবহার, আল্লাহর ওপর নির্ভরতাসহ আরও কিছু জরুরি গুণ।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির আরেকটি বিখ্যাত বইয়ের নাম হল 'মাওয়াহিবুল আলিয়্যাহ' বা তাফসিরে হুসাইনি। এটি তাফসিরে মোল্লা নামেও পরিচিত। হাতে-লেখা এ বইটির শত শত কপি ইরান, মধ্য এশিয়া ও পাক-ভারত উপমহাদেশের নানা লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তাফসির বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও কাশেফি অন্যান্য তাফসির গ্রন্থের বক্তব্য ও সুফিবাদী তরিকতপন্থীদের ব্যাখ্যাকেই তার এ বইয়ে সহজ ফার্সি ভাষায় সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি 'মাওয়াহিবুল আলিয়্যাহ' বা তাফসিরে হুসাইনি লিখেছিলেন খ্রিস্টীয় ১৪৯১ থেকে ১৪৯৪ সনে তথা হিজরি ৮৯৭ থেকে ৮৯৯ সনে। তিনি এই তাফসির আমির আলীশির নাওয়ায়ির নামে উৎসর্গ করেন। কাশেফি তার এই তাফসিরে ইবনে আরাবি ও আবদুররাজ্জাক কাশানিসহ অনেক প্রখ্যাত সুফিবাদী ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়াও তিনি খাজা আবদুল্লাহ আনসারি, রুমি, আত্তার, সানায়ি ও জামির মত প্রখ্যাত সুফিবাদী কবিদের কবিতাও ব্যবহার করেছেন 'মাওয়াহিবুল আলিয়্যাহ' বা তাফসিরে হুসাইনিতে। কাশেফির কাব্যময় এই তাফসির পরবর্তী যুগের আরবি ও ফার্সি তাফসির গ্রন্থগুলোতেও ব্যবহৃত হয়েছে। নানা ধরনের শিক্ষণীয় কাহিনী তার এই তাফসিরের বাড়তি আকর্ষণ। ফার্সি ভাষার এই তাফসিরে আরবি উদ্ধৃতি বা বাক্যের ব্যবহার নেই বললেই চলে। এই তাফসিরে শিয়া ও সুন্নির প্রসঙ্গ না থাকায় সুফিবাদী শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা কাশেফিকে তাদের আপনজন বলেই ধারণা করে থাকেন।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির আরেকটি খুবই জনপ্রিয় ও বিখ্যাত বই হল আনোয়ারে সুহাইলি। এ বইটিকে বিখ্যাত আরবি গল্প-গ্রন্থ কালিলা ও দিমনারই নতুন ও সহজ-সরল সংস্করণ বলা যায়। তার এ বই আফগানিস্তান ও ভারত উপমহাদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। বইটি ছিল ভারতে ও ব্রিটেনে ফার্সি ভাষা শিক্ষার অন্যতম বড় মাধ্যম। ভারত ও তেহরানের নানা ধরনের ছাপাখানা থেকে এ বই মুদ্রণ করা হয়েছে ত্রিশ বারেরও বেশি। ভারত ও ইউরোপের নানা ভাষায় এ বইয়ের অনুবাদ দেখা যায়। কালিলা ও দিমনার গল্পগুলো ছাড়াও কাশেফি আনোয়ারে সুহাইলি শীর্ষক তার এ বইয়ে ৬০ টি রূপকথা যোগ করেছেন। এ বইয়ে শেখ সাদির গুলিস্তান ও বোস্তানের কিছু গল্পও তিনি ব্যবহার করেছেন। পশু-পাখীর গল্পের মাধ্যমে নানা ধরনের নৈতিক শিক্ষণীয় বিষয় এ বইয়ে তুলে ধরেছেন কাশেফি। পরবর্তীকালে কাশেফির এই বই অনুসরণ করে ভারতে অনেক গল্পের বই লেখা হয়েছে।#####

Share: