সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ
ইমাম হোসাইন (আ.)-এর এ কথা‘ আমি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার জন্য উত্থান করেছি
এই উক্তিটি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের প্রকৃত মর্যাদাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে ।
ইমাম হোসাইন (আ.) এ উক্তির মাধ্যমে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের মৌলিক ভূমিকাকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন । তিনি তাঁর উত্থানের আসল উদ্দেশ্য এ কাজটি সম্পাদনের মধ্যেই নিহিত বলে বিশ্বাস করেন । যদি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের প্রকৃত মর্যাদার প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হয় তাহলেই ইমামের এই উক্তির উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে ।
প্রকৃত অর্থে‘ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ’ সম্পর্কে সকল ঐশী ধর্মেই আলোচনা করা হয়েছে এবং তা সকল নবী ,রাসূল ,নিষ্পাপ ইমাম ও মুমিনের দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত । এই বিষয়টি শুধুই শরীয়তের বিধানগত দায়িত্ব নয় ;বরং প্রকৃত অর্থে এটা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল প্রেরণের মানদণ্ড ,অন্যতম উদ্দেশ্য এবং কারণ । কেননা ,এই বস্তুজগৎ ভালো ও মন্দ ,হক ও বাতিল ,আনন্দদায়ক ও কষ্টদায়ক জীবন ও পরিণতি ,অন্ধকার ও আলো ,মর্যাদাকর ও অমর্যাদাকর গুণাবলির সংমিশ্রণ এবং এগুলো কখনো কখনো এমনভাবে পরস্পর একে অপরের সাথে জড়িয়ে পড়ে যে ,সেগুলো থেকে সঠিক ও সত্যকে শনাক্ত করে তার ওপর আমল করা বা সেগুলোকে মেনে চলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে ।
ঐশী ধর্মগুলো সৎকর্ম ও অসৎকর্মের সাথে মানুষকে পরিচিত করানোর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ভালো ও মন্দ ,সত্য ও মিথ্যা ,অন্ধকার ও আলো ,সৎগুণ ও অসৎগুণের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং সেই সাথে সৎকর্মের প্রতি আদেশ ও অসৎকর্মে নিষেধ করার নির্দেশ দিয়ে ঐশী পথনির্দেশনার শিক্ষা দিয়েছে আর এভাবে তাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেছে ।
রাসূল (সা.) সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন :‘ যে ব্যক্তি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করে সে এই দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং আল্লাহর মহাগ্রন্থ ও তাঁর রাসূলের স্থলাভিষিক্ত ।
হযরত আলী (আ.) বলেছেন :‘ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ হচ্ছে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখার ভিত্তি ।’
কোরআনুল কারীম একজন মুমিনের জন্য সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার বিষয়টিকে নামায আদায় ,যাকাত প্রদান ,আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর আনুগত্যের পূর্বে উল্লেখ করে এর বিশেষ গুরুত্ব তুলে ধরেছে ইমাম বাকের (আ.)ও বলেছেন :‘ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার কাজটি রাসূলগণের কাজ ,সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের অনুসৃত রীতি ;এটি এমনই এক আবশ্যিক দায়িত্ব যার মাধ্যমে অন্যান্য ওয়াজিব তথা অপরিহার্য কর্মগুলো প্রতিষ্ঠা লাভ করে । সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের মাধ্যমেই পথসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় । এর কারণেই ব্যবসা -বাণিজ্য ও উপার্জনের হালাল পথসমূহ উন্মুক্ত হয় (ও হারাম পথগুলো বন্ধ হয়) । সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের দায়িত্ব পালনই শত্রুদেরকে সুবিচার করতে বাধ্য করে.. ,সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মাধ্যমেই বিভিন্ন কর্ম সুশৃঙ্খল হয়ে থাকে । সুতরাং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার দায়িত্বটি ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্যই নির্দিষ্ট বা নির্ধারিত নয় ;বরং এটা সকল নবী-রাসূল ,আল্লাহর মনোনীত ইমাম ,সৎকর্মপরায়ণ ও মুমিন বান্দার ওপর অর্পিত দায়িত্ব । কিন্তু যেহেতু সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের বিষয়টি সাইয়্যেদুশ শুহাদার (ইমাম হোসাইনের) সময়ে চূড়ান্তভাবে অবহেলিত কর্মে পরিণত হয়েছিল এবং সমাজের (রাষ্ট্রের শীর্ষ থেকে সাধারণ) সকল পর্যায়ে অসৎকর্ম ব্যাপকভাবে প্রচলন লাভ করেছিল এবং সৎকর্ম ও অসৎকর্ম পরস্পর মিশ্রিত হয়ে পড়েছিল ,এই অবস্থা দ্বীন ইসলামকে বিলুপ্ত ও রাসূলের সুন্নাতকে বিস্মৃতির সম্মুখীন করেছিল ,তাই বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো এবং রাসূলের সুন্নাত ও দ্বীন ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত ও রক্ষা করার জন্য ইমাম হোসাইন (আ.) সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করাকে একমাত্র পন্থা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন । সে কারণেই তিনি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর সংস্কার সাধনই তাঁর বিপ্লবের উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেছেন : ‘ আমি উন্মাদনা বা অহংকারের বশে অথবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বা জুলুমকারী হিসেবে উত্থান করিনি । আমি কেবল আমার নানার উম্মতের সংশোধন করার জন্য বের হয়েছি । আমি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করতে চাই ।