(প্রতিপালন) মুমিনদের খুশি করার বিভিন্ন পন্থাগুলোর মধ্য হতে একটি অন্যতম পন্থা হয় ইয়াতিম ও গরীব শিশুদের অভিভাকত্ব ও প্রতিপালন করা। পবিত্র ইসলাম ধর্ম হয় প্রেমপ্রীতি ভালবাসা পর্ণ ধর্ম। এই ধর্ম ঐ সমস্ত শিশুদের মাথার উপর স্নেহ ও দয়াব হাত প্রসারিত করেছে, যাদের পিতামাতা উভয়েই বা যেকোন একজন দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে এবং যাদের কোন অভিভাবক থাকে না। পবিত্র ইসলাম ধর্ম এই সবৎ শিশুদের আরাম আয়েশের ব্যবস্থার খাতিরে একটা বিশেষ স্পর্শকাতরতার বাহি কাকলী। ঘটিয়েছে এবং ইয়াতিম ও দরিদ্র শিশুদের অভিভাকত্ব ও প্রতিপালনকে সকল মুমিনিনদের সম্মিলিত দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যেমনটা আয়ার রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে হযরত রাসূল (সাঃ) কে সম্বোধন করে বলেছেন: . “অর্থাৎ তিনি কি ইয়াতীম রূপে আপনাকে পাননি? অতঃপর তিনি আশ্রয়। দিয়েছেন।” [সূরা দোহা আয়াত-৬] তারপর হযরত রাসূল (সাঃ) কে তাকিদ করেছেন: “সুতরাং আপনি ইয়াতিমের প্রতি কঠোর হবেন না।” [সূরা দোহা, আয়াত-৯]
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) শৈশব কাল থেকে পিতার স্নেহের ছায়া হতে বঞ্চিত ছিলেন এবং শিশুকালেই স্নেহময়ী মায়ের আদর ও মমতা থেকে বঞ্চিত হন। তিনি ইয়াতিমের সমস্যাবলী ও কষ্টের তিক্ততার স্বাদ ভালভাবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনিও ইয়াতীমদের প্রতি খুবই দয়ালু ছিলেন এবং আন্তরিকতার সহিত তাদের সাথে ব্যবহার করতেন। অন্যদেরকেও তাদের প্রতি খেয়াল রাখার সর্বদা তাকিদ করতেন।। তাঁর নিম্নলিখিত বাণীগুলো দ্বারা ইয়াতীমদের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যবহার সুন্দররূপে অনুমেয় হয়। “আল্লাহর নিকটে সবচেয়ে পছন্দনীয় ঘর হলো সেটি যেখানে কোন ইয়াতিম সম্মানের সহিত বসবাস করে।” [আলজাদারিয়ত পৃ: ১৬৭]
ইয়াতিমদের জন্য মেহেরবান পিতা স্বরূপ থেকো আর স্মরণ রেখো তুমি যেমন বপণ করবে তেমন শস্য কর্তন করবে। [বিঃআঃখ:-৭৭, অধ্যায়-১৮, হাদীস-২৩। “জান্নাতে একটি ঘর রয়েছে যার নাম হল দারুল ফারাহ (খুশি ও আনন্দের ঘর) সেই ঘরে কেবল মাত্র কোন ইয়াতিমকে খুশিকারী ব্যক্তিরা প্রবেশ করতে পারবে।” [কানজুল উম্মাল খ-৩, পৃ: ১৭০, হাদীস-৬০০৮।
“যে ব্যক্তি তিনজন ইয়াতিমের অভিভাকত্ব করবে তার মর্যাদা ঐ ব্যক্তির ন্যায় হবে, যে সারারাত নামাজ পড়ে এবং দিনে রোজা রাখে এবং সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আল্লাহর পথে তার তরবারীর আঘাত হানতে থাকে। সে ব্যক্তি কেয়ামতের দিন দুই ভাইয়ের ন্যায় এই আঙ্গুলগুলোর মত থাকবে (অতঃপর হযরত রাসূল (সাঃ) তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল একত্রিত করে ইশারা করলেন)”। এটা স্পষ্ট থাকে যেন ইয়াতীমদের অভিভাকত্ব ও প্রতিপালনের গুরুত্বের পরিপ্রেক্ষিতে পবিত্র ইসলাম ধর্মে যাকাতের ব্যবহারের এক অংশ ইয়াতীমদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজের আত্মীয় স্বজন ও ইয়াতীমদের প্রতিপালন এবং তাদের উপর সম্পদ ব্যয় করাকে নেক কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অবশ্য সেটা যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয়। যেমনটি তিনি এরশাদ করেছেন:-“আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁর মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম মিসকিনদের জন্য।” [সূরা বাকারাহ-আয়াত-১৭৭]
হযরত আলী (আঃ) এবং তাঁর ঘরের সদস্য সবাই যখন পরপর তিনদিন ইফতারের সময় নিজের খাবার মিসকিন, ইয়াতীম ও কয়েদীদের দান করে দিলেন। তখন পবিত্র কুরআন নিম্নোক্ত ভাষার মাধ্যমে তাদের প্রশংসা করে : “তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্থ ইয়াতীম এবং বন্দিকে আহার্য দান করে। তারা বলে কেবল আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি এবং তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।” [সূরা দাহার আয়াত-৮-৯]
সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মুমিনিনদের সামাজিক দায়িত্ব হল যে, মিসকীনদের প্রতিপালন করা এবং তাদেরকে কোন প্রকার কষ্টে নিপতিত হতে না দেয়া।। এ দিকটার প্রতিও খেয়াল রাখা উচিত যে, ইয়াতীমদের প্রয়োজনীয়তা শুধুমাত্র তাদের ভাত কাপড়, লেখা পড়া প্রভৃতি খরচাবলীর যোগাড় করাই নয় বরং আমাদের মহব্বত ও ভালবাসারও তাদের প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং তাদের এই ফিতরী (স্বভাবগত) প্রয়োজনীয়তাকেও আমাদের ভূলা উচিৎ নয়। কেননা এটাও মুমিনিনদের একটি দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। যা প্রসঙ্গে বিভিন্ন আয়াত ও রেওয়ায়েত তাকিদ বিদ্যমান। রয়েছে। যেমনটি পূর্বেই এই আয়াতটি বর্ণনা করা হয়েছে: অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর রাসূলকে হুকুম দিয়েছেন যে, ইয়াতিমদের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করেন না, তাদেরকে নিজের নিকট থেকে দুরে সরিয়ে না দেন, তাদের সাথে ক্রোধান্বিত হয়ে কথা না বলেন, এর অর্থ এই নয় যে, শুধুমাত্র তাদের ভাতকাপড় প্রভৃতির ব্যবস্থা করা বরং তাদের মাথায় স্নেহেরহাত বুলিয়ে দেয়া এবং নিজের সন্তানদের অত তাদের সাথে ব্যবহার করাও এর অন্তর্গত। পবিত্র কুরআনের অন্য আরেকটি স্থানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন:”এটা অমূলক বরং তোমরা ইয়াতিমদের সম্মান কর না এবং মিসকিনদের অন্নদানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।” (সূরা হাশর আয়াত-১৭-৮৮।
উল্লেখিত আয়াতে স্পষ্টভাবে ইয়াতীমদের প্রতি দয়া ও সম্মান প্রদর্শন করার কথা বর্ণিত হয়েছে। কেননা তাকে সম্মান প্রদর্শন করার মর্যাদা তাকে অন্ন দান করার চাইতেও মর্যাদাপূর্ণ। কেননা এটা সম্ভব যে অনেক ইয়াতীমের ক্ষেত্রে কোন ধরণের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা নাও থাকতে পারে তথাপিও সে অন্যের আদর স্নেহ ও ভালবাসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে এবং অন্যদের ন্যায় তার অন্তরেও আশা জাগবে যে, তাকে যেন সম্মান করা হোক। তাকে যেন কোন প্রেক্ষাপটে বা ক্ষেত্রে ভূলা না হয়। কিন্তু আমরা যে আয়াতটি উপস্থাপন করেছি তাতে যখন মিসকিনদের কথা বলা হয়েছে। তখন তাকে অন্নদানের ও উদর পূর্তির কথা বলা হয়েছে। কেননা সে হয় অভাবগ্রস্ত। সুতরাং তার এক্ষেত্রে মৌখিক প্রেমপ্রীতি ও ভালবাসায় কিছুই অর্জিত হবে না। উক্ত কথাকে পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে .” “আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে বিচার দিবসকে মিথ্যা বলে? সে সেই ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে গলা ধাক্কা দেয় এবং মিসকিনকে অন্নদিতে উৎসাহিত করে না।” (সূরা মাউন আয়াত-১-৩]
উল্লেখিত আয়াতগুলোতে ইয়াতীমদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন ও তাদেরকে কটাক্ষ করার সাথে সাথে মিসকিনের অর্থনৈতিক সাহায্য সহযোগিতার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। যাতে করে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইয়াতীমকে ধিক্কার দেয়া এবং মিসকিনদের সাহায্য না করাটা হল দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং নাস্তিকতার সমতুল্য।
মুমিনিনদের খুশি করার একটি পন্থা হল ইয়াতীম ও গরীব দুঃখীদের সাহায্য সহযোগিতা করা। হইয়াতীমদের অভিভাকত্ব এবং তাদের অর্থনৈতিক, আত্মীক এবং যে কোন ধরলে প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা সকল মুসলমানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
অর্থনৈতিক সহায়তার অর্থ হল তাদের (ইয়াতীম ও গরবি দুঃখীদের) ভাত কাপড়, বাসস্থান ও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা। আত্মিক প্রয়োজনীয়তা পূরণের অবযবন্ধ, তাদের সাথে স্নেহ ও ও ভালবাসাপূর্ণ ব্যবহার করা এবং তাদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা। অবশ্য মুখাপেক্ষী লোকদের সাধারণত কেবল আর্থিক সহযোগিতারই প্রয়োজন হয়। কেননা উল্লেখিত অধিকার বা হক আদায় করা হল মুমিনিনদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। সুতরাং তা আদায় কল্পে মুমিনদের কোন প্রকার অনুগ্রহ প্রদর্শনের হক বা অধিকার নেই।
ফজর/ ইয়াসিন