অনুবাদকঃ মাওলানা মোঃ শহিদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা।
আয়াতসমূহ:
- ১- সৎকাজের দাওয়াত দাওঃ “হে বৎস, নামায কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর।” (সূরা লোকমানঃ ১৭)
- ২- সর্বোত্তম উম্মতঃ “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালকাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।” (সূরা আল-ইমরানঃ ১০৪)
- ৩- সৎকাজের প্রতি আহবান করা রাসূল (স.)-এর বিশেষ গুণঃ “যারা উম্মী রাসূলের আনুগত্য করে, যাঁর সম্পর্কে তার নিকটে অবস্থিত তওরাত ও ইঞ্জিল গ্রন্থে লেখা দেখতে পাবে সে ভালকাজের নির্দেশ দিবে এবং মন্দকাজ করতে বারণ করবে।” (সূরা আল-আ’রাফঃ ১৫৭)
- ৪- মু’মিনদের গুণাবলীঃ “আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আত্্-তাওবাহঃ ৭১)
- ৫- মুনাফেকদের গুণঃ “মুনাফিক নর ও নারী একে অপরের অনুরূপ, উহারা অসৎকর্মের নির্দেশ দেয় এবং সৎকর্ম নিষেধ করে।” (সূরা আত্্-তাওবাহঃ ৬৭)
হাদীসসমূহঃ
- ১- উত্তম কাজঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “ভালকাজের নির্দেশ দেয়া সৃষ্টিজীবের জন্য সর্বোত্তম কাজ।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৮৭)
- ২- মু’মিনদের সাহায্যকারীঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি ভালকাজ করে অথবা তা করার নির্দেশ দেয় সে মু’মিনদের পিঠকে মজবুত করে।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৯১)
- ৩- সৎকাজের হুকুমদাতা হওঃ মাওলা আলী (আ.) বলেছেনঃ “সৎকাজের নির্দেশদাতা ও মন্দকাজের নিষেধকারী হও।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৯১)
- ৪- সৎকাজের নির্দেশ না দেয়ার শাস্তিঃ “সৎকাজের উপদেশ দেয়া ও মন্দকাজে বারণ করার কাজ ত্যাগ কর না, তা নাহলে তোমার ওপর দুষ্টু লোকেরা প্রভাব বিস্তার করবে, পরে তুমি দোয়া করবে কিন্তু তা কবুল হবে না।” (নাহজুল বালাগাহ, খুতবা নং ৪৭)
- ৫- আল্লাহর প্রতিনিধিঃ রাসূল করীম (সা.) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সৎকাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দকাজে নিষেধ করে, সে যমিনে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং তাঁর রাসূল (সা.) ও তাঁর গ্রন্থের প্রতিনিধি।” (মাজমাউল বায়ান, খন্ড ২, পৃ. ৩৫৯, মুসতাদরাকুল অসায়েল, খন্ড ১২, পৃ. ১৭৯)
বিশ্লেষণঃ
ভালকাজের নির্দেশ দেয়া ও মন্দকাজের নিষেধ করা প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব তবে ‘ফুরুয়ে দ্বীন’ অর্থাৎ যৌগিক বিষয়ের ওপর আমল করার পূর্বে জরুরী হল যেভাবে নামাযের মাসলা-মাসায়েল শিখতে হয় সেভাবে ভালকাজের নির্দেশ দেয়া ও মন্দকাজের নিষেধ করার মাসলা-মাসায়েল শিখবে যে, কোথায় ভালকাজের নির্দেশ দিবে ও কোথায় মন্দকাজের নিষেধ করবে, কেননা ভালকাজ ও মন্দকাজের সীমানা অত্যাধিক বিস্তৃত। প্রত্যেক ভালকাজ পছন্দনীয় ও প্রত্যেক মন্দকাজ অপছন্দনীয়। এ কাজ সেই করতে পারে যে নিজে প্রথমে ভালকাজ করে ও মন্দকাজ থেকে বিরত থাকে। আর মু’মিনদের চিহ্ন হল ভালকাজের নির্দেশ দেয়া ও মন্দকাজের নিষেধ করা, নামায কায়েম করা, যাকাত আদায় করা ও আল্লাহর রাসূল (স.)-এর আনুগত্য করা। যে ব্যক্তি এই কাজ করে সে মু’মিন, তা নাহলে সে ফাসেক ও মুনাফিকদের অর্ন্তভূক্ত হবে।
শয়তানকে পরাজিত করার পদ্ধতিঃ এক যাযাবর পয়গাম্বর (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, আমাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিবেন যার মাধ্যমে আমি বেহেশত অর্জন করতে পারব। পয়গম্বার (সা.) তাকে পাঁচটি নৈতিক বিষয়ের নির্দেশনা শিক্ষা দিলেনঃ
- ১- ক্ষুধার্তকে খাদ্য খাওয়াবে।
- ২- পিপাসার্তকে পানি পান করাবে।
- ৩- ভালকাজের আদেশ করবে।
- ৪- মন্দকাজের নিষেধ করবে।
- ৫- যদি ঐসমস্ত কাজ করার ক্ষমতা না থাকে তাহলে নিজ কথার ওপর দৃঢ় থাকবে যে, সৎ ও ভালকাজ ব্যতীত কোন কাজ করবে না। এ পদ্ধতিতে তুমি শয়তানকে পরাজিত করতে পারবে এবং সফলকাম হবে। (গাঞ্জিনেয়ে মায়ারেফ, খন্ড ১, পৃ. ১২৪)
ঘটনাবলীঃ
১- ইমাম সাদেক (আ.)-এর মন্দকাজে নিষেধ করার পদ্ধতিঃ
হযরত রাসূল করীম (সা.) তাঁর নিজের কয়েকজন গোলামকে মুক্ত করে ছিলেন। ঐ মুক্ত গোলামদের মধ্যে এক গোলামের এক ছেলে ছিল যার নাম ছিল শুকরানী।
সিবতে ইবনে যৌজী তাযকেরাতুল খাওয়াসে লিখেছেন, শুকরানী বলেন একদিন মনসুর দাওয়ানিকী লোকজনের মধ্যে ভাতা বন্টন করছিল কিন্তু আমার নিকট কোন ব্যক্তির সুপারিশনামা ছিল না যার সুপারিশ কার্যকর হবে। আমি মনসুরের প্রাসাদের সামনে দিশেহারা ও নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, এমন সময় হযরত ইমাম জাফর সাদেক (আ.) আগমন করলেন, আমি ইমাম (আ.)-এর সামনে গিয়ে আমার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলাম। ইমাম (আ.) মনসুরের নিকট গিয়ে কিছু সময় পর ফিরে আসলেন আর আমার ভাতাও সঙ্গে আনলেন এবং আমাকে বললেন, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ভালকাজ করা উত্তম কিন্তু তোমার জন্য অতি উত্তম ও প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য মন্দকাজ করা নিন্দনীয় কিন্তু তোমার জন্য অতি নিন্দনীয় কারণ তোমার সাথে আমাদের সম্পর্ক রয়েছে। (কারণ তুমি আমাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং রাসূল (স.)-এর নিকট থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত এক গোলামের সন্তান, এ কারণে ভালকাজের সাথে সম্পর্ক রাখা তোমার জন্য অতি জরুরী ও তোমার জন্য মন্দকাজ করা অতি লজ্জাজনক)
সম্মানিত ইমাম (আ.) শুকরানীকে একারণে উপদেশ দিয়েছিলেন যে, ইমাম (আ.) তার মদ পান করার সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং তিনি একটি সুন্দর ইঙ্গিতের মাধ্যমে তাকে উপদেশ দিয়ে ছিলেন। (পান্দে তরিখ, খন্ড ৫, পৃ. ১৭)
২- ভালকাজের আদেশ ও মন্দকাজে নিষেধ করার পূর্বে করণীয়ঃ
এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.)কে বলল, আমি চাই লোকজনকে ভালকাজের আদেশ ও মন্দকাজে নিষেধ করব এবং লোকজনের সামনে ওয়াজ ও নসিয়ত করব।
ইবনে আব্বাস (রা.) প্রশ্ন করলেন, শুরু করেছ কি-না?
ঐ ব্যক্তি বলল, সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, কোন সমস্যা নেই তবে সাবধান থাকবে কখনো এ তিনটি আয়াত তোমাকে অপমানিত না করে।
ঐ ব্যক্তি বলল, কোন তিনটি আয়াত?
ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, প্রথম এই আয়াত।
“তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং নিজেরা নিজেদেরকে ভুলে যাও?” (সূরা বাকারাঃ ৪৪)
তুমি কি নিশ্চিত যে, এ আয়াতের যথার্থ বাস্তবায়ন করতে পেরেছ?
ঐ ব্যক্তি বলল, না, দ্বিতীয় আয়াতটি বলুন?
ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, দ্বিতীয় আয়াত হল এইঃ
“মুমিনগণ! তোমরা যা কর না, তা কেন বল? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক।” (সূরা আছছফ্ঃ ২, ৩)
এই আয়াত সম্পর্কে কি মনে কর, তুমি কি নিশ্চিত যে, এই আয়াতের যথার্থ বাস্তবায়ন করতে পেরেছ?
বলল, না, তৃতীয় আয়াতটি বলুন।
ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, “এ আয়াতটি হযরত শোয়ায়েব (আ.) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, যখন তিনি স্বীয় সম্প্রদায়দের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “আমি চাই না যে তোমাদেরকে যা ছাড়াতে চাই পরে নিজেই সে কাজে লিপ্ত হব”। (সূরা হুদঃ ৮৮) ।
তুমি কি এই আয়াতের আমলকারী?
বলল, না
ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, তুমি সর্বপ্রথম নিজের থেকে শুরু কর। (কুরআনী লাতিফে, পৃ. ৮৮, গাঞ্জিনেয়ে মায়ারেফ, খন্ড ১, পৃ. ১২১)
আল্লাহর কাছে দোয়া করি মোহাম্মাদ (সা.) ও আলে মোহাম্মাদ (আ.)-এর অসিলায় আমাদের সবাইকে ভালকাজের নির্দেশ দেয়া ও মন্দকাজে নিষেধ করার তৌফিক দান করেন। (আমিন)########