কুরআন, হাদিস ও ঘটনার আলোকে অজ্ঞতা ও মূর্খতা

মাওলানা মোঃ শহীদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা

আয়াতসমূহঃ

  • ১- অধিকাংশই জানে নাঃ “কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।” (সূরা আ’রাফঃ ১৩১)
  • ২- জুলুম অজ্ঞতার উপাদান থেকে সৃষ্টিঃ “সে (ইউসূফ) বলল, তোমরা কি অবগত আছ যে, তোমরা ইউসূফ ও তার সহোদরের প্রতি কীরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা অজ্ঞ (অসচেতন) ছিলে?” (সূরা ইউসূফঃ ৮৯)
  • ৩- অজ্ঞতার কারণসমূহঃ “যদি তাদের কোন কল্যাণ স্পর্শ করে তখন বলে, ‘এ তো আল্লাহর পক্ষ হতে’, আর যখন কোন অমঙ্গল স্পর্শ করে তখন বলে, ‘এ তোমার (রাসূলের) পক্ষ হতে।’ তুমি বল, ‘সবই আল্লাহর পক্ষ হতে।’ বস্তুতঃ এ সম্প্রদায়ের কী হয়েছে যে, তারা কোন কথা গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করে না।” (সূরা নিসাঃ ৭৮)
  • ৪- অধিকাংশই মুর্খঃ “কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুর্খ।” (সূরা আল-আন’আমঃ ১১১)
  • ৫- অযথার্থ আশা মুর্খতার কারণে হয়ে থাকেঃ “যারা কিছু জানে না, তারা বলে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে কেন কথা বলেছেন না? অথবা আমাদের কাছে কোন নিদর্শন কেন আসে না? এমনিভাবে তাদের পূর্বে যারা ছিল তারাও তাদেরই অনুরূপ কথা বলেছে। তাদের অন্তর একই রকম। নিশ্চয়ই আমি উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেছি তাদের জন্যে যারা প্রত্যয়শীল।” (সূরা আল-বাকারাহঃ ১১৮)

হাদীসসমূহঃ

  • ১- প্রত্যেক ব্যক্তির শত্রুঃ ইমাম রেজা (আ.) বলেছেন, “প্রত্যেক ব্যক্তির বন্ধু তার বিবেক আর তার শত্রু হল তার অজ্ঞতা।” (কিতাবুশ শাফী, খন্ড ১, পৃ. ৩৭)
  • ২- অজ্ঞদের উদাহরণঃ আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) বলেছেন, “অজ্ঞদের অন্তর ঐ শিকারী পশুদের মত যে তাদের লোভ-লালসা নিজেদের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে এবং সে শয়তানের প্রতারণার জালে আটকা পড়ে।” (কিতাবুশ শাফী, খন্ড ১, পৃ. ৫৭)
  • ৩- দারিদ্র্যঃ আল্লাহর রাসূল (স.) বলেছেন, “হে আলী (আ.) অজ্ঞতা থেকে অধিক কোন দারিদ্রতা নেই।” (কিতাবুশ শাফী, খন্ড ১, পৃ. ৬২)
  • ৪- প্রত্যেক জিনিস ধ্বংসের কারণঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেন, “অজ্ঞতা প্রত্যেক জিনিসের ধ্বংসের কারণ।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ২১৩)
  • ৫- সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেন, “অজ্ঞতা সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ২১২)

বিশ্লেষণঃ মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে জ্ঞান নামক একটি নেয়ামত দান করেছেন যাতে মানুষ এই জ্ঞানের মাধ্যমে অজ্ঞতা ও মূর্খতার পর্দা ছিঁড়ে ফেলে নাজাতের পথ খুঁজে পায়। কুরআন এবং রেওয়ায়েতের আলোকে অজ্ঞ, জ্ঞানহীনকে বলা হয় নির্বোধকে বলা হয় না, সুতরাং অজ্ঞতা শব্দটি জ্ঞানের বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হয়, ইলমের বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হয় না। অজ্ঞতা এমন একটি বিশেষণ যে সম্পর্কে আল্লাহর অলিরাও আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। আপনি ইতিহাস অধ্যায়ন করলে বুঝতে পারবেন যে সম্মানিত নবী (আ.), রাসূল (আ.), আম্বিয়া (আ.), আয়েম্মাহ (আ.), আউলিয়া (রহ.) ও প্রমুখের যত শত্রু ছিল তার মধ্যে অজ্ঞ ও মূর্খ ছিল প্রধান। আর এই অজ্ঞতার ভিত্তির উপর আপনি নিজেকে জ্ঞানী মনে করেন এবং আল্লাহর পথ প্রদর্শকদেরকে মূর্খ মনে করেন আর এই মূর্খতার ভিত্তির উপর তাদের সাথে শত্রুতা করেন। অবশেষে ফলাফলে পাওয়া গেল যে, মূর্খ ও অজ্ঞ ব্যক্তিরা অপমান ও অপদস্থের সম্মুখীন হবে আর এটা হল আল্লাহর সবচেয়ে জঘন্যতম আযাবে পতিত হওয়া। আর এই অজ্ঞতাই হল মানুষের ধ্বংসের কারণ।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি জ্ঞানের দরজার মিম্বারে সালুনির খতীব (আ.)-এর অসিলায় আমাদের সবাইকে সবচেয়ে খারাপ গুণ অজ্ঞতা থেকে রক্ষা করুন এবং জ্ঞানের মত সম্পদ প্রদান করুন। (আমিন)

ঘটনাবলীঃ
১- মূর্খ ব্যক্তি গাধার ভাইঃ কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, এক অজ্ঞ ও মূর্খ ব্যক্তি মরহুম শেখ আনসারী (রহ.) (যিনি রাসায়েল ও মাকাসেব পুস্তকের লেখক) এর খেদমতে উপস্থিত হল এবং বলল: আমি গাধা ক্রয় করতে চাই, দয়া করে এস্তেখারা করে দেখুন। মরহুম শেখ আনসারী (রহ.) কুরআন থেকে এস্তেখারা করলে এই আয়াতটি দেখা গেল অর্থাৎ “আমি তোমার বাহু শক্তিশালী করব তোমার ভাই দ্বারা” (সূরা কেসাসঃ ৩৫)। শেখ আনসারী (রহ.) বললেনঃ ঠিক আছে গাধা ক্রয় করতে পার। কয়েকজন ব্যক্তি শেখ এর নিকট বসে ছিল তারা শেখ আনসারী (রহ.)কে বললেন, আপনি কোন কারণে তাকে গাধা ক্রয় করতে বললেন? মরহুম আনসারী (রহ.) বললেনঃ সে মূর্খ ও অজ্ঞ মানুষ এবং কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে, না তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং আরও পথভ্রান্ত।” (সূরা ফুরকানঃ ৪৪) সুতরাং মুর্খ ও অজ্ঞ ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে গাধার ভাই। (গাঞ্জিনে মায়ারেফ, খন্ড ১, পৃ. ৪২৩)

২- মূর্খের শিক্ষা নেয়া উচিতঃ এক বিজ্ঞ ব্যক্তি এক মূর্খ ও অজ্ঞ ব্যক্তির বাড়িতে আসল। বিজ্ঞ ব্যক্তি দেখল তার বাড়িটি খুবই সুন্দর ও পরিপাটি, মেঝেতে মূল্যবান কার্পেট বিছানো রয়েছে কিন্তু ঘরের মালিক একজন মূর্খ ও অজ্ঞ এমনকি অ, আ, ক, খ পর্যন্ত জানে না। বিজ্ঞ ব্যক্তি তার মুখের ওপর থুথু মারল।

বাড়ির মালিক আপত্তি করে বললঃ হুজুর আপনি আমার সাথে কত খারাপ ব্যবহার করলেন।

বিজ্ঞ ব্যক্তি বললঃ আমার এই কাজটি হিকমতের (প্রজ্ঞার) সাথে হয়েছে, কারণ মুখের থুথু ঘরের সবচেয়ে নোংরা জায়গায় ফেলা হয় আর আমি তোমার ঘরে তোমার চেয়ে নিচু কাউকে দেখতে পাইনি।

মূর্খ ব্যক্তি বিজ্ঞ ব্যক্তির কর্মকান্ড ও কথাবার্তায় শিক্ষা নিল এবং বুঝতে পারল মূর্খতা ও নিরক্ষতা ঘরে রং ও তেল পালিশের দ্বারা দূর হয় না বরং জ্ঞান দ্বারা দূর হয়। (গাঞ্জিনে মায়ারেফ, খন্ড ১, পৃ. ৪২২)###

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More