(৪ শাবান) পবিত্র মদীনায় জন্ম নিয়েছিলেন মহান কারবালা বিপ্লবের শীর্ষস্থানীয় সেনাপতি ও পতাকাবাহী নেতা হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.)।
হযরত আবুল ফজল আব্বাস ছিলেন হযরত আলী (আ.)’র পুত্র ও ইমাম হাসান (আ .) ও ইমাম হুসাইন (আ.)’র ভাই। তাঁর মাতা ছিলেন হযরত উম্মুল বানিন (সালামুল্লাহি আলাইহা)। নবী-নন্দিনী হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.)’র মৃত্যুর পর এই মহীয়সী নারীকে বিয়ে করেছিলেন আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)। হযরত আবুল ফজল (আ.)’র মা উম্মুল বানিন ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের জন্য উৎসর্গকৃত-প্রাণ। অন্যদিকে মহানবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতও এই মহীয়সী নারীকে অত্যন্ত উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী বলে মনে করতেন ।
হযরত আবুল ফজল আব্বাস বিন আলী (আলাইহিসসালাম) ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে অশ্রু-ভেজা ও রক্তমাখা নামগুলোর মধ্যে অন্যতম। অতি উচ্চ পর্যায়ের পৌরুষত্ব, মহানুভবতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি চরম বা একনিষ্ঠ নিরঙ্কুশ আনুগত্যের জন্য ইতিহাসে তাঁর নাম প্রোজ্জ্বল হয়ে থাকবে চিরকাল। কারবালায় তাঁর অশেষ ত্যাগ-তিতিক্ষা, ধৈর্য, বীরত্ব ও মহত্ত্ব হযরত আবুল ফজল আব্বাস ইবনে আলী (আ.)-কে পরিণত করেছে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান প্রবাদ-পুরুষে। এই মহামানবের শুভ জন্মদিন উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি প্রাণঢালা মুবারকবাদ ও তার মহান সত্তার শানে পেশ করছি অশেষ দরুদ ও সালাম ।
হযরত আবুল ফজল জীবনের প্রথম ১৪ বছর আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)’র সান্নিধ্য লাভ করেছেন। নবজাতক আবুল ফজলের কানে আযান দিয়েছিলেন তাঁর মহান পিতা আলী (আ.)। তিনি জানতেন এই শিশু ভবিষ্যতে অনন্য বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য খ্যাত হবেন। আর তাই তিনি নবজাতকের নাম রাখেন আব্বাস। এর অর্থ সাহসী ও বীর। অনেক মহৎ গুণের অধিকারী ছিলেন বলে তাঁকে বলা হত আবুল ফজল তথা গুণের আধার।
মদিনায় হযরত আলী (আ.)’র স্ত্রী উম্মুল বানিনের গর্ভে জন্ম নেয়া এই মহাপুরুষ যে একদিন জগতের আলোয় পরিণত হবেন তার পূর্বাভাস পাওয়া যায় পিতার একটি বক্তব্যে। ওই বক্তব্যে এসেছে: “আমার সন্তান আব্বাস শিশু থাকা অবস্থায়ই জ্ঞান রপ্ত করত। কবুতরের ছানা যেভাবে মায়ের কাছ থেকে পানি ও খাদ্য নেয়, তেমনি আব্বাসও আমার কাছ থেকে জ্ঞান রপ্ত করত।
সৌন্দর্য ও বীরত্বের জন্য খ্যাত হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.) ছিলেন তাঁর বড় দুই ভাইয়ের চেয়ে বয়সে ছোট। তাঁকে বলা হত বনি হাশিমের চাঁদ। তিনি ইমাম হাসান ও হুসাইন (আ.)-কে শ্রদ্ধার কারণে কখনও ভাই বলে সম্বোধন করতেন না, বরং বড় ভাইকে বলতেন- সাইয়্যিদি বা আমার কর্তা ও ছোট ভাইকে বলতেন ‘মৌলায়ি’ বা ‘আমার নেতা’।
মহাকালের পাখায় চির-অম্লান নাম শহীদদের নেতা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)’র সেনাদলের পতাকাধারী সেনাপতি হিসেবে ইতিহাসে অমর ও অম্লান হয়ে আছেন তাঁরই ভাই হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.)। মুক্তি ও স্বাধীনতাকামীদের আদর্শ নেতার পবিত্র মাজারের পাশেই রয়েছে এই মহান বীরের মাজার। ইমামের প্রতি আনুগত্যের আদর্শ হযরত আব্বাস (আ.) বাবুল মুরাদ বা বাবুল হাওয়ায়েজ তথা মানুষের মুশকিল আসানের দরজা নামেও খ্যাত। বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম তার অমর কবিতা‘মহররম’-এ এই মহান বীরকে উল্লেখ করেছেন এভাবে:
দুই হাত কাটা তবু শেরনর আব্বাস
পানি আনে মুখে হাঁকে দুশমনও ‘সাব্বাস’!!
বলা হয় হযরত আবুল ফজল আব্বাস ঐতিহাসিক সিফফিন যুদ্ধেও কিছুক্ষণের জন্য অংশ নিয়েছিলেন। সে সময় যদিও তিনি একজন কিশোর ছিলেন কিন্তু তাকে দেখতে মনে হত দীর্ঘদেহী ও শক্তিমান এক যুবক। তিনি আলী (আ.)’ র নির্দেশে অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে মুয়াবিয়ার বাহিনীর একদল সেনার এক শক্তিশালী হামলাকে তুলো-ধুনো করার মত উড়িয়ে দেন।
স্বয়ং হযরত আলী (আ.) নিজের শাহাদতের সময় প্রিয় পুত্র আব্বাসকে কাছে ডেকে এনে তাঁকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নেন এবং তাঁর মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেছেন, ” শিগগিরই কিয়ামত বা পুনরুত্থানের দিনে আমার চোখ তোমার মাধ্যমে উজ্জ্বল হবে।”
ইমাম হুসাইন (আ.)’র প্রতি আবুল ফজল আব্বাস (আ.)’র ভালবাসা ছিল সুউচ্চ ও সুবিস্তৃত পর্বতমালার মতই অবিচল এবং সাগরের মতই কুল-কিনারাহীন। হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)’র মহাবরকতময় সান্নিধ্যও ভাই আবুল ফজলকে উন্নত আত্মার ও মহান চরিত্রের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল।
ভদ্রতা ও আদব-কায়দা রক্ষার দিকেও খুবই সচেতন ছিলেন আবুল ফজল(আ.)। তিনি ইমাম ভ্রাতৃদ্বয়ের সামনে পরিপূর্ণ আদব রক্ষা করে চলতেন। কখনও অনুমতি ছাড়া তাঁদের পাশে বসতেন না।
মহান আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ যিনি মানবজাতিকে উপহার দিয়েছেন এমন এক মহাবীর।অশেষ সালাম ও দরুদ পেশ করছি এই মহাবীরের শানে এবং সবাইকে জানাচ্ছি মুবারকবাদ।