আমরা সচরাচর ঐক্য ও সম্প্রীতির কথা বলে মাঠ-ময়দান উত্তপ্ত করে রাখতে পছন্দ করি। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দল, মত ও গোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত প্রতিযোগিতাও চোখে পড়ে। ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রয়োজনীয়তা বিশেষ করে মুসলিম জাহানে ইসলামী ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের অপরিসীম গুরুত্ব ও তাৎপর্যের উপর নানাবিধ সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, সভা-সমাবেশেরও কোন কমতি নাই। আর এসব অনুষ্ঠানাদিতে বক্তারা ঐক্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের উপর গুরুত্বারোপ করে ঘন্টার পর ঘন্টা চমকপ্রদ ও হৃদয়গ্রাহী আলোচনা রাখেন।
কিন্তু এত হৈচৈ আর দৌড়ঝাঁপ সত্তে¡ও কেন আজ মুসলিম জাহান নানামুখী ভেদাভেদ ও বিভক্তিতে জর্জরিত? কেন মুসলিম জাতি এক খোদা, এক কা’বা, এক ধর্ম, এক কুরআন এবং এক রাসূলের (সা.) প্রতি আকিদাপোষণ সত্তে¡ও নিজেদের মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে? কেন মুসলিম জাহান ইসলাম ও মুসলমানদের প্রকাশ্য শত্রু সাম্রজ্যবাদী অপশক্তি তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নিতে পারছে না? কেন আমরা মুসলিম উম্মাহর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলিতে এক কাতারে সামিল হতে সক্ষম হচ্ছি না? কেন প্রায় অর্ধ শতাধিক মুসলিম দেশ থাকা সত্তে¡ও মুসলিম জাহান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে অভিন্ন অবস্থান গ্রহণে সক্ষম হচ্ছে না? এক কথায় এসব প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে সুদৃঢ় ও সামগ্রিক ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর শীর্ষ পর্যায়ে তেমন কোন কার্যকরী ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেয়া হয় নি। অবশ্য বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ্যে এ সম্পর্কে কিছু আলোচনা, মতবিনিময়, শ্লোগান আর আংশিক কর্মচঞ্চলতা পরিলক্ষিত হলেও সামগ্রিকভাবে কর্মতৎপরতার প্রচন্ড অভাব। পরিণতিতে মুসলিম জাহান অনৈক্য আর ভেদাভেদের কালিমা থেকে মুক্ত হতে পারছে না।
প্রকৃতপক্ষে, আমরা যদি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে আজকের মুসলিম সমাজের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে সহজেই প্রতীয়মান হবে- গোত্রগত, মাযহাবগত ও চিন্তাগত গোঁড়ামি মানসিকতা বৃহত্তর ও সামগ্রিক ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। কেননা, আমরা অনেকেই বৃহত্তর পরিসরে ঐক্য ও সম্প্রীতির কথা বললেও নিজস্ব গন্ডি ও পরিসরে এসে সেগুলো বেমালুম ভুলে যাই। এক্ষেত্রে কেউ কেউ বাহ্যিক দিক থেকে ঐক্যের শ্লোগান দিলেও বাস্তবিক অর্থে মাযহাবগত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মতপার্থক্যের উর্দ্ধে এসে সামগ্রিক পরিসরে বৃহত্তর ঐক্য ও সম্প্রীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে না।
আবার কেউ কেউ নিজস্ব পরিমন্ডলে এসে বলে যে, আমাদের আকিদা-বিশ্বাসই সঠিক; অন্য মাযহাবগুলো ভুল পথে রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে অবস্থা আরও শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়; এক মাযহাব নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসকে অন্য মাযহাবের উপর চাপিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে কিংবা অন্য মাযহাবের অনুসারীদের বিভ্রান্ত এমনকি কাফির হিসেবে ফতোয়া দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। নিঃসন্দেহে এমন সংকীর্ণতা ও রেষারেষিপূর্ণ মানসিকতা মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
পক্ষান্তরে, একশ্রেণীর লোক সমাজে ভেদাভেদ ও মতপার্থক্য হ্রাসের ক্ষেত্রে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা তো দূরের কথা; বরং তারা মাযহাবগত ও গোষ্ঠীগত বিভেদকে আরও উস্কে দিতেই সিদ্ধহস্ত। তারা অত্যন্ত উগ্র ও ধর্মান্ধ প্রকৃতির। এ ধরনের লোকেরা নিজেদের আকিদার বাইরে কোন কিছুকেই মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। এমনকি অকাট্য দলিল-প্রমাণসহ কোন সত্যকে তাদের সম্মুখে তুলে ধরলেও তারা তা আদৌ গ্রহণ করতে চায় না। তারা জাহেলী যুগের লোকদের ন্যায় নিজেদের পূর্বপুরুষদের মতাদর্শের বাইরে আসতে মোটেও সম্মত নয়। পবিত্র কুরআনে এমন সংকীর্ণমনা ও গোঁড়ামি মানসিকতাসম্পন্ন লোকদের সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে,
“(তারা বলে) আমরা আমাদের পিতৃ পুরুষদের এ রীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণকারী।”( সূরা যুখ্রুফ : ২৩ ) অর্থাৎ, ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসূলূল্লাহ (সা.) ও তাঁর একনিষ্ঠ সাহাবিরা যখন আরবের মুশরিকদের প্রতি তওহীদ ও ন্যায়ের প্রতি আহব্বান জানাতেন, তখন তারা নিজেদের অজ্ঞতা ও গোঁড়ামি মানসিকতার বশবর্তী হয়ে ইসলামের উক্ত আহব্বানকে উপেক্ষা করত। শুধু তাই নয়, বরং তারা রাসূলের (সা.) দাওয়াতের প্রতি উত্তরে বলত যে, আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে বহুখোদা ও মূর্তিপূজারী হিসেবে পেয়েছি; কাজেই আমরা তাদের অনুসৃত পথেই বহাল থাকব এবং এক ও অদ্বিতীয় খোদার প্রতি ঈমান আনব না!!
দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিম সমাজের একশ্রেণীর লোক রয়েছে যারা এতই ধর্মান্ধ ও সংকীর্ণতায় নিমজ্জিত যে, যখন তাদের সম্মুখে কুরআন ও ঐতিহাসিক সূত্রের ভিত্তিতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত কোন বিষয় তুলে ধরা হয়, তখন যদি উক্ত বিষয় তাদের আকিদা ও ধ্যান-ধারণার পরিপন্থী হয়; সেক্ষেত্রে তারা এমন বিষয়কেও মানতে নারাজ। অবশ্য এ অবস্থা শুধুমাত্র আন্তঃমাযহাবগত বিষয়াবলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মাযহাবসমূহের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন দল ও মতের মধ্যেও পরিলক্ষিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা নিজেদেরকে সত্য ও ন্যায়পন্থী দাবি করে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদেরকে বাতিলপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করতে আদৌ দ্বিধাবোধ করে না। অর্থাৎ, নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মতভেদকে যেখানে উপক্ষো করে বৃহত্তর ঐক্য ও সম্প্রীতির পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে তারা এসব মতভেদকে আরও উস্কে দিয়ে মুসলিম সমাজে শতধা বিভক্তি সৃষ্টি করছে; এমনটি সত্যিই অতীব দুঃখজনক ও অনাকাংখিত।
নেপথ্য কারণসমূহ
নিঃসন্দেহে আমরা বিদ্যমান অবস্থাকে জটিল করে প্রকাশ করতে মোটেও আগ্রহী নই, বরং প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সমাজের মানুষকে সচেতন করা এবং নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের মূখ্য উদ্দেশ্য। আমরা যদি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার সাথে মুসলিম সমাজে বিদ্যমান অনৈক্য, ভেদাভেদ, সংঘাত এবং পরস্পর বিরোধী অবস্থানের নেপথ্য কারণ অনুসন্ধান করি, তাহলে এ বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আমরা পবিত্র ইসলাম ও আল কুরআনের মৌলিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছি। আমরা মুখে মুখে ইসলামের কথা বলি কিন্তু আমাদের বাস্তব ও ব্যবহারিক জীবনে এর কোন প্রভাব চোখে পড়ে না। আমরা অত্যন্ত যতœসহকারে কুরআন সংরক্ষণ করি আবার খুব সুমিষ্ট স্বরে কুরআন তেলাওয়াত করি। কিন্তু দুঃখনজক হলেও সত্য কুরআনের বাণীসমূহের মর্মার্থ অনুধাবন করি না। কারণ আমরা আল কুরআনের আয়াতসমূহকে বাহ্যিক তেলাওয়াত ও শ্রবণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছি; কিন্তু এসব আয়াতের আলোকিত শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করছি।
আমরা ইসলামের স্বকীয়তা ও প্রকৃত শিক্ষার প্রতি কোনরূপ গুরুত্বারোপ না করে, ইসলামকে প্রত্যেক মাযহাব ও মতাদর্শের লোকেরা নিজেদের মনঃপুত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে চলেছি। ইসলামের সামগ্রিক ও সার্বজনীন বাণীকে উপেক্ষা করে এ বিশ্বজনীন ধর্মকে নিজেদের মাযহাবগত আকিদার মধ্যে বন্দি করে ফেলেছি। যেহেতু আমরা কখনও সাম্প্রদায়িক, কখনও গোত্রজ, কখনও বংশীয় আবার কখনও আকিদাগত গোঁড়ামি মানসিকতার শিকার এবং এমন সংকীর্ণ মনোভাব নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ ও চিন্তাভাবনায় মগ্ন রয়েছি; সেহেতু আমরা বৃহত্তর ও সামগ্রিক ঐক্য-সংহতিতে পৌঁছাতে পারছি না।
কাজেই মুসলিম সমাজে শক্তিশালী ও বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে হলে সর্বপ্রথম ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি মানসিকতা ও সংকীর্ণমনতা পরিহার করে পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনায় ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষার আলোকে পরস্পরের মধ্যে সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক কলেমাধারী মুসলমানকে সক্রিয় ও আন্তরিক হওয়ার পাশাপাশি সবধরনের শঠতা ও কপটতা মুক্ত হয়ে একমাত্র আল কুরআনকে মানদন্ড হিসেবে গ্রহণ করার কোন বিকল্প নেই।
অবশ্য এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মুসলিম নেতৃবৃন্দ, উলামা, মাশায়েখ, ফিকাহবিদ ও ইসলামি চিন্তাবিদদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। কারণ তাঁরাই মুসলিম উম্মাহর সকল দল, মত ও মাযহাবের লোকদের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতভিন্নতাই মুসলিম সমাজে বিদ্যমান মতভেদের ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ি। দুঃখজনক হলেও সত্য অনেক ক্ষেত্রে তাদের অদূরদর্শী ও দায়িত্বহীন বক্তব্য-বিবৃতি মুসলিম মাযহাবসমূহের মধ্যে দূরত্ব ও বিভেদকে উস্কে দেয়। সুতরাং, শক্তিশালী ইসলামী ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তাদের দায়িত্ববোধ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপসমূহ সর্বাপেক্ষা কার্যকরী ভূমিকা গড়ে তুলতে পারে।
আমরা কখনও এমন আকিদায় বিশ্বাসী নই যে, মুসলিম উম্মাহর সমস্ত মাযহাব ও মতাদর্শের লোকেরা নিজ নিজ মাযহাবগত আকিদা ও মতাদর্শকে ত্যাগ করে একীভূত হয়ে যাবে। বরং ইসলামী ঐক্য ও সংহতি বলতে বুঝায় মুসলিম বিশ্বের প্রধান মাযহাবসমূহ ঐচ্ছিক বিষয়াবলিতে মতভিন্নতা থাকা সত্তে ও মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষায় ও সামগ্রিক অক্ষুন্নতা বজায় রাখার লক্ষ্যে মৌলিক বিষয়াবলিতে ঐকমত্যপোষণ করা, যাতে একদিকে মুসলিম জাহান বিভক্তির ছোবল থেকে রক্ষা পায় এবং অপরদিকে ইসলামের শত্রুদের নানামুখী চক্রান্ত থেকে নিরাপদ থাকতে পারে।