লেখকঃ আবু সালেহ, শিক্ষার্থী, ডিপার্টমেন্ট অব ইসলামিক থিওলজি
আল-মোস্তফা সা. ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মাশহাদ, ইরান।
কোরআনের বহু আয়াত হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর পক্ষে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লামও তাঁর বহু হাদীসে হযরত আলীর ফজিলত-মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর পবিত্রতার বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আহলে বাইত আলাইহিমুস সালামের কিছু শত্রু বিশেষ করে খারেজী ও নাপাক বনী উমাইয়া রাজবংশ হযরত আলীর উপর এমনই অপবাদ দিয়েছে যা বা তার ব্যাখ্যা বা তার ইতিহাস কোন সুস্থ মানুষের আকল তথা বিবেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আর সেই অপবাদ হলো, হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালামের বিষয়ে মদপানের আয়াত নাজিল হওয়া। আমরা আজকের আলোচনায় এ বিষয়টি স্পষ্ট করবো যে, মদের আয়াত হযরত আলী আলাইহিস সালামের কারণে নাজিল হয়নি। আর মদপান বিষয়ে উল্লেখিত হাদীসসমূহ উল্লেখ এবং তা যাচাইসহ আহলে সুন্নাহর আলেমদের মতামত উল্লেখ করা হবে।
হযরত আলী আলাইহিস সালামের উপর এ অপবাদ নতুন কিছু নয়। বরং ইতিহাসে আহলে বাইতের শত্রুরা বিশেষ করে ইবনে তাইমিয়া হাররানি, যে আহলে বাইত শত্রু হিসেবে সকলের নিকট পরিচিত, সে এই অপবাদ দিয়েছে। সে তার বই মিনহাজুস সুন্নাহতে লিখেছে:
وقد انزل الله تعالی فی علی: “یا ایها الذین ءامنوا لا تقربوا الصلاة وانتم سکاری حتی تعلموا ما تقولون” لما صلی فقرا وخلط”.
আল্লাহ তায়ালা আলীর সম্পর্কে নাজিল করেছে যে, “হে মুমিনগণ, তোমরা মাতাল অবস্থায় নামাজের কাছে যেও না, যে পর্যন্ত তোমরা যা বল ,তা বুঝতে না পার৷”কারণ, যখন তিনি নামায আদায় করছিলেন তখন তিনি ভুল করেছিলেন!!!
মিনহাজুস সুন্নাহ, খন্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ২৩৭
মদ সম্পর্কে যে আয়াত নাজিল হয়েছে তা হযরত আলী আলাইহিস সালাম সম্পর্কে নাজিল হয়নি। এ অপবাদ দ্বারা প্রকৃত মদ পানকারীদের দোষ ঢেকে দেয়া এবং হযরত আলী আলাইহিস সালামের সম্মানহানিই একমাত্র উদ্দেশ্য। হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু মদ্যপানের সাথে জড়িত ছিলেন না। যারা মদ্যপানের সাথে জড়িত ছিলো, আল্লামা ইবনে হাজার আস্কালানী ফতহুল বারীর দশম খন্ডের ৩৭ পৃষ্ঠায় মদ হারাম হওয়া সংক্রান্ত আলোচনার অধ্যায়ে তাদের নাম উল্লেখ করেছেন কিন্তু সেখানে হযরত আলীর নাম পাওয়া যায়নি।
সিহাহ সিত্তার বর্ণনা :
এ বিষয়ে সিহাহ সিত্তায় দুটি হাদীস পাওয়া যায়। তিরমিজিতে এসেছে:
۳۳۰۰، حَدَّثَنَا عَبْدُ بْنُ حُمَیْدٍ حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ سَعْدٍ عَنْ اَبِی جَعْفَرٍ الرَّازِیِّ عَنْ عَطَاءِ بْنِ السَّائِبِ عَنْ اَبِی عَبْدِ الرَّحْمَنِ السُّلَمِیِّ عَنْ عَلِیِّ بْنِ اَبِی طَالِبٍ قَالَ صَنَعَ لَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ طَعَامًا فَدَعَانَا وَسَقَانَا مِنَ الْخَمْرِ فَاَخَذَتِ الْخَمْرُ مِنَّا وَحَضَرَتِ الصَّلاَةُ فَقَدَّمُونِی فَقَرَاْتُ (قُلْ یَا اَیُّهَا الْکَافِرُونَ) لاَ اَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ وَنَحْنُ نَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ. قَالَ فَاَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَی (یَا اَیُّهَا الَّذِینَ آمَنُوا لاَ تَقْرَبُوا الصَّلاَةَ وَاَنْتُمْ سُکَارَی حَتَّی تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ).
ইবনে হুমাইদ থেকে যিনি আব্দুর রহমান বিন সাদ যিনি আবী জাফর রাজী যিনি আতা বিন সায়েব যিনি আবী আব্দির রহমান সুলামী যিনি আলী ইবনু আবী তালিব হতে বর্ণনা করেন : তিনি বলেন, “আব্দুর রাহমান ইবনু আওফ আমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করলেন এবং আমাদেরকে দাওয়াত করে শরাব পান করান। আমাদেরকে এই শরাবের নেশায় ধরে। ইতোমধ্যে নামাযের ওয়াক্ত হয়ে যায়। লোকজন আমাকেই ইমামতি করতে এগিয়ে দেয়। আমি পাঠ করলাম: “কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন। লা আ’বূদু মা তা’বুদূন। ওয়া নাহনু নাবুদু মা তাবুদুন।” অর্থাৎ “ওয়ালা নাবুদু” (তোমরা যাদের ইবাদাত কর আমরা তাদের ইবাদাত করি না)-এর স্থলে আমি “ওয়া নাহনু নাবুদু মা তাবুদূন” (তোমরা যাদের ইবাদাত কর, আমরাও তাদের ইবাদাত করি) পড়ে ফেললাম। তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযের নিকটেও যেয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বল তা বুঝতে পার”(সূরা আন-নিসা ৪৩)। তিরমিজি শরীফ, খন্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২৩৭
(বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রকাশিত তিরমিজি শরীফের কোথাও হাদীস নং ৩৩০০ আবার কোথাও ৩০২৬ নং)
ইমাম আবু দাউদ তার সুনানে লিখেছেন :
۳۶۷۳، حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ حَدَّثَنَا یَحْیَی عَنْ سُفْیَانَ حَدَّثَنَا عَطَاءُ بْنُ السَّائِبِ عَنْ اَبِی عَبْدِ الرَّحْمَنِ السُّلَمِیِّ عَنْ عَلِیِّ بْنِ اَبِی طَالِبٍ عَلَیْهِ السَّلاَمُ اَنَّ رَجُلاً مِنَ الاَنْصَارِ دَعَاهُ وَعَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ فَسَقَاهُمَا قَبْلَ اَنْ تُحَرَّمَ الْخَمْرُ فَاَمَّهُمْ عَلِیٌّ فِی الْمَغْرِبِ فَقَرَاَ (قُلْ یَا اَیُّهَا الْکَافِرُونَ) فَخَلَطَ فِیهَا فَنَزَلَتْ (لاَ تَقْرَبُوا الصَّلاَةَ وَاَنْتُمْ سُکَارَی حَتَّی تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ).
মুসাদ্দাদ থেকে যিনি ইহইয়া থেকে যিনি সুফিয়ান থেকে যিনি আতা বিন সায়েব যিনি আবী আব্দির রহমান সুলামী যিনি আলী ইবনু আবূ ত্বালিব আলাইহিস সালাম থেকে বর্ণিত : “একদা আনসার গোত্রের এক লোক তাকে ও ‘আবদুর রহমান ইবনু ‘আওফ রা.-কে দাওয়াত করে উভয়কে মদ পান করালেন তা হারাম হওয়ার পূর্বে। অতঃপর মাগরিবের সলাতে ‘আলী আলাইহিস সালাম তাদের ইমামতি করলেন। তিনি সূরাহ “ক্বুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন” পাঠ করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। অতঃপর এ আয়াত অবতীর্ণ হলোঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন মাতাল অবস্থায় থাকো তখন সলাতের কাছেও যেও না। সলাত তখনই পড়বে, যখন তোমরা কি বলছো তা সঠিকরূপে বুঝতে পারো” (সূরাহ আন-নিসাঃ ৪৩)। সুনানে আবু দাউদ, খন্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩২৫
বর্ণনার সত্যাত্য যাচাই :
এই দুটি বর্ণনায় পারস্পারিক বৈপরিত্য লক্ষ করা যায় কেননা একটি বর্ণনায় আব্দুর রহমান বিন আউফকে মেজবান এবং অপর বর্ণনায় এক আনসার ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। মুহাদ্দিসদের দৃষ্টিতে একই মূল বর্ণনা দুটি ভিন্ন ভিন্ন হাদীসে মিথ্যা বা এক বা দুইই হাদীসের বর্ণনাকারীর স্মৃতি শক্তির দূর্বলতা প্রমাণ করে।
সনদের সত্যতা যাচাই :
সনদে এমন ব্যক্তিদের উপস্থিতি রয়েছে যে, তাদের উপর আস্থা রাখা যায় না।
হযরত আলীর সাথে সুলামীর শত্রুতা :
দুটি বর্ণনায়ই হযরত আলী আলাইহিস সালাম হতে বর্ণনাকারী হিসেবে সুলামীর নাম উল্লেখ রয়েছে। যে কোন এক সময় হযরত আলীর সৈন্যদলে ছিলো কিন্তু সে বাহ্যিকভাবে হযরত আলীর সাথে থাকলেও অন্তরে তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতো। যা তার নিজ স্বীকারোক্তিতে পাওয়া যায়। আল্লামা তাবারী তার আল-মুন্তাখাবু মিন জাইলিল মুজিল কিতাবে তার নিজ বর্ণনা উল্লেখ করেন যে, সে আমিরুল মুমেনীনের সাথে শত্রুতা পোষণ করতো :
وابو عبد الرحمن السلمی واسمه عبدالله بن حبیب… قال رجل لابی عبد الرحمن انشدک الله متی ابغضت علیا (علیهالسّلام) الیس حین قسم قسما بالکوفة فلم یعطک ولا اهل قال اما اذ نشدتنی الله فنعم.
আবু আব্দুর রহমান সুলেমী যার প্রকৃত নাম আব্দুল্লাহ বিন হাবীব…এক ব্যক্তি আবু আব্দুর রহমানকে বললো : তোমার প্রতি আল্লাহর কসম! কখন থেকে আলীর (আলাইহিস সালাম) শত্রু হয়ে গেলে? সেই সময় থেকে নয় কি যখন কূফায় সম্পদ বন্টন হচ্ছিলো কিন্তু তোমাকে ও তোমার পরিবারকে কিছুই দেয়া হলো না? উত্তর দিলো, তুমি যেহেতু আমার থেকে আল্লাহর কসম নিয়েছো, হ্যাঁ।
(তাবারী, আল-মুন্তাখাবু মিন জাইলিল মুজিল, পৃষ্ঠা: ১৪৭)
ইবরাহীম সাকাফীও তার আল-গারাত কিতাবে ঐ সকল বড় ফকীহদের নামের সাথে তার নাম উল্লেখ করেছে, যারা হযরত আলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করতো :
ومنهم (ای المنحرفین عن علی) ابو عبد الرحمن السلمی (القاری):
عن عطاء بن السائب قال: قال رجل لابی عبد الرحمن السلمی انشدک بالله تخبرنی فلما اکد علیه قال: بالله هل ابغضت علیا الا یوم قسم المال فی اهل الکوفة فلم یصبک ولا اهل بیتک منه شئ؟، قال: اما اذا انشدتنی بالله فلقد کان ذلک.
তাদের থেকে(যারা পথভ্রষ্ট হয়ে হযরত আলীকে ত্যাগ করেছিলো) আবু আব্দুর রহমান সুলামী (আল-কারী) :
আতা বিন সায়েব থেকে বর্ণিত, সে বলেছে : তোমাকে আল্লাহর কসম করে সত্য বলতে বলতেছি, যখন তাকে চাপাচাপি করা হলো তখন সে তা বলার জন্য সম্মত হলো, অতঃপর বললো, শুধু এ কারণেই আলীর শত্রু হয়েছো যে, যেদিন কূফাবাসীর মাঝে বাইতুল মাল বন্টন করা হচ্ছিলো কিন্তু তুমি ও তোমার পরিবার কিছু পায়নি? উত্তর দিলো : কসম দেয়ায় তোমাকে বলছি, হ্যাঁ, এরকমই।
উল্লেখিত হাদীস সম্পর্কে আহলে সুন্নাহর আলেমদের মতামত :
আল্লামা মুহাম্মদ আলী আশ-শাওকানী বলেছেন :
وفی اسناده عطاء بن السائب لا یعرف الا من حدیثه، وقد قال یحیی بن معین لا یحتج بحدیثه.
“এই বর্ণনার সনদে আতা ইবনে সায়েব রয়েছে, সে ছাড়া অন্য কেউ এই হাদীস বর্ণনা করেনি। ইহইয়া বিন মুঈন বলেছেন, তার বর্ণানাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
নাইলুল আওতার, খন্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ১৯৬
ইমাম হাকেম নিশাপুরী উক্ত হাদীস উল্লেখ করে বলেন :
وفی هذا الحدیث فائدة کثیرة وهی ان الخوارج تنسب هذا السکر وهذه القراءة الی امیرالمؤمنین علی بن ابی طالب دون غیره وقد براه الله منها فانه راوی هذا الحدیث.
এই হাদীসে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে, আর তা হলো খারেজীরা এই মাতলামী ও নামাযে ভুল পাঠকে আমিরুল মুমেনীন আলী ইবনে আবী তালিব (আলাইহিস সালাম) এর প্রতি সম্পৃক্ত করেছে। তাকে ছাড়া অন্য কারো প্রতি বিষয়টি সম্পৃক্ত করা হয়নি কিন্তু আল্লাহ তায়ালা চক্রান্তটাকে প্রতিরোধ করেছেন কেনন এই হাদীসের বর্ণনা কারী তিনিই (হযরত আলী)(এটা যোক্তিক নয় যে, হযরত আলী কোন খারাপ কাজ করার পরে তিনি নিজেই তা অন্যকে জানানোর জন্য বর্ণনা করবেন)। মুস্তাদরাক আলাস সাহীহাইন, খন্ড: ২, পৃষ্ঠা ৩৩৬
আজকে যারা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর প্রতি মিথ্যা অপবাদগুলোর প্রচার করছে, তাদের প্রশ্ন করছি, এরকম ব্যক্তির বর্ণিত হাদীস কী বিশ্বাস করা যায়? মুসলমানরা এ বিষয়ে একমত যে, যে হযরত আলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে সে মুনাফিক। একজন মুনাফিকের বর্ণনায় উপরে কি বিশ্বাস এবং তার কথার ভিত্তিতে হযরত আলীর উপর অপবাদ দেয়া যায়? অতএব উভয় বর্ণনা, যা সিহাহ সিত্তায় এসেছে, সনদের ধারাবাহিকতার এই ব্যক্তি থাকার কারণে হাদীস দুটি অকার্যকর-অগ্রহণযোগ্য।###