অভিন্ন বিষয়াদি মতপার্থক্য নিরসনের ভিত্তি

বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মো: নূর হোসেন মজিদী

মানব প্রজাতির কাছে কোরআন মজীদের আবেদনের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমুহের অন্যতম হচ্ছে অভিন্ন বিষয়াদির ভিত্তিতে মতপার্থক্য নিরসনের আবেদন। আর এ আবেদন আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের কাছে। ক্ষেত্রবিশেষে দৃশ্যতঃ মনে হতে পারে যে, এতে গোষ্ঠীবিশেষের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানানো হয়েছে, কিন্তু কিছুটা তাদাব্বুর তথা চিন্তা-ভাবনা করলেই সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটা সকল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য।

কোরআন মজীদ হচ্ছে সর্বশেষ নবী ও রাস‚ল হিসেবে রাস‚লে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) কে প্রদত্ত একটি ব্যতিক্রমী মু‘জিযাহ্ -যা এর নাযিল-কাল থেকে শুরু করে ক্বিয়ামত পর্যন্ত স্থান-কাল নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জন্য পথনির্দেশক। এর মু‘জিযাহ্ হওয়ার সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, ফাছাহাত্ ও বালাগাতের (শ্রুতিমধুর ও বাক্যালঙ্কারের) মানদণ্ড এ গ্রন্থের ও এর যে কোনো স‚রাহ’র বক্তব্য শ্রেষ্ঠতম বক্তব্য।

কোরআন মজীদ যে আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত গ্রন্থ তার আরো বিভিন্ন প্রমাণ আছে, যেমন: এর ভবিষ্যদ্বাণীগুলো বাস্তবায়িত হওয়া এবং এতে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্যের সমাহার -যা তৎকালে মানুষের জানা ছিল না। কিন্তু এগুলো হচ্ছে মু‘জিযাহ্ হিসেবে কোরআন মজীদের গৌণ দিক, কারণ, এগুলো প্রমাণিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কোরআন মজীদ যে ফাছাহাত্ ও বালাগাতের মানদণ্ড মু‘জিযাহ্ তা প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন ছিল না। আর ফাছাহাত্ ও বালাগাতের মানদণ্ডর সংজ্ঞা এক বাক্যে: “সর্বোত্তম কথা হচ্ছে তা-ই যা সংক্ষিপ্ত ও তাৎপর্যবহ।” কিন্তু কোরআন মজীদের বক্তব্য কেবল সংক্ষিপ্ত ও তাৎপর্যবহ-ই নয়, বরং এর অনেক বক্তব্যের তাৎপর্যের প্রয়োগক্ষেত্র বিস্ময়করভাবে ব্যাপক -যা কোরআন মজীদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

স্মর্তব্য যে, কোরআন মজীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সমগ্র কোরআন মজীদের যেমন একটি পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য আছে, তেমনি এর প্রতিটি সুরাহ’র একেকটি পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য আছে। আবার এর কতক আয়াত এমন যে, ক্ষেত্রবিশেষে একটি আয়াতের একটি প‚র্ণাঙ্গ তাৎপর্য আছে, কতক ক্ষেত্রে একাধিক বাক্য বিশিষ্ট একটি আয়াতের একটি বাক্যের একটি পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য আছে, এমনকি কতক ক্ষেত্রে একাধিক বাক্যাংশ বিশিষ্ট একটি বাক্যের কোনো বাক্যাংশের একটি পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য আছে। এ ধরনের একটি সংক্ষিপ্ত বাক্যাংশে অভিন্ন বিষয়াদিকে মতপার্থক্যের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে -যার প্রয়োগক্ষেত্র বিস্ময়করভাবে ব্যাপক।

আল্লাহ্ তা‘আলা হযরত রাসুলে আকরাম (সাঃ) কে সম্বোধন করে এরশাদ করেন:
“(হে রাস‚ল!) বলুন: “হে আহলে কিতাব! তোমরা এসো এমন একটি কথার দিকে যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান, (তা হচ্ছে,) এই যে, আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত আর কারো ‘ইবাদত-উপাসনা-দাসত্ব করবো না ও তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবো না এবং আল্লাহ্ ছাড়া আমাদের মধ্যকার কতক অপর কতককে রব্ হিসেবে গ্রহণ করবে না।” অতঃপর তারা যদি (এ আহ্বানে সাড়া দেয়া থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে (হে ঈমানদারগণ!) তোমরা বল: তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমরা (আল্লাহর কাছে) আত্মসমর্পিত (মুসলিম)।” (সুরা আালে ইমরান: ৬৪)

এ আয়াতের শুরুতে আল্লাহ্ তা‘আলা একবচনে রাসুলুল্লাহকে (সাঃ) সম্বোধন করলেও আয়াতের উপসংহারে বহুবচনে সকল ঈমানদারকে সম্বোধন করেছেন। এর মানে হচ্ছে, এ আয়াতের হুকুম কেবল রাসুলুল্লাহর (সাঃ) যুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি স্থান-কাল নির্বিশেষে ঈমানদারদের জন্য অনুসরণীয় একটি স্থায়ী মুলনীতি।

এখানে লক্ষণীয় যে, আহলে কিতাবকে নীতিগতভাবে তাওহীদবাদী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে -যা মুসলমানদের ও তাদের মধ্যে অভিন্ন বৈশিষ্ট্য। অথচ তাদের মধ্যকার সিংহভাগই ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী এবং তারা তাদের ধর্মনেতাদের ও সন্ন্যাসীদের কথা অন্ধভাবে মেনে নেয়, আর এ জন্য আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন; এরশাদ করেছেন:
“তারা আল্লাহ্ ছাড়াও তাদের ধর্মনেতাদেরকে ও সন্ন্যাসীদেরকে রবসম‚হ হিসেবে গ্রহণ করেছে।” (সুরা আত্-তাওবাহ্: ৩১)

তাহলে আলোচ্য আয়াতে (স‚রাহ্ আলে ‘ইমরান্: ৬৪) তাদেরকে সরাসরি মুশরিক হিসেবে গণ্য না করে তাওহীদবাদী হিসেবে গণ্য করে সম্বোধন করার কারণ কী? সুস্পষ্ট যে, তারা ত্রিত্ববাদকে এবং তাদের ধর্মনেতাদের ও সন্ন্যাসীদের অন্ধ অনুসরণকে শিরক্ বলে স্বীকার করে না, বরং আনুষ্ঠানিক ইবাদত-উপাসনা কেবল একজন সৃষ্টিকর্তারই করে থাকে; তারা ত্রিতত্ববাদকে এবং ধর্মনেতাদের ও সন্ন্যাসীদের অন্ধ অনুসরণকে একত্ববাদের আওতায় ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ব্যাখ্যা করে থাকে। অর্থাৎ তারা যে শির্কে নিমজ্জিত সে সম্পর্কে তাদের অনেকেই সচেতন নয়, ঠিক যেভাবে মুসলমানদেরও একটি বিরাট অংশ তাদের পীর ও ধর্মনেতাদের সম্পর্কে এমন সব ধারণা পোষণ করে যা তাওহীদী আক্বীদাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক এবং তারা তাদের পীর ও ধর্মনেতাদের কথা অন্ধভাবে অনুসরণ করে, এমনকি কোরআন মজীদের বক্তব্যের সাথে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক হলেও, কিন্তু তারা আনুষ্ঠানিক ইবাদত্-বন্দেগী কেবল এক আল্লাহরই করে থাকে। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ হতে নির্দেশিত কর্মপন্থা হচ্ছে এই যে, যারা নিজেদেরকে তাওহীদবাদী হিসেবে দাবী করে থাকে তাদেরকে মুশরিক হিসেবে গণ্য না করে তাওহীদবাদী হিসেবে গণ্য করে তার ভিত্তিতে তাওহীদী আক্বীদাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তা ও আচরণ সংশোধনের জন্য আহ্বান জানাতে হবে।
কিন্তু আলোচ্য আয়াতের (স‚রাহ্ আলে ইমরান্: ৬৪) “তোমরা এসো এমন একটি কথার দিকে যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান” বাক্যাংশটির প্রয়োগ বিস্ময়করভাবে ব্যাপক। তা হচ্ছে, যে কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি অভিন্ন বিষয়াদির ভিত্তিতে মতপার্থক্য নিরসনের জন্য আহ্বান জানাতে হবে।

এবার এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা যাক।
প্রথমেই আসে নাস্তিকদের সাথে মতপার্থক্যের কথা। তারা তো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বই স্বীকার করে না। তাহলে কিসের ভিত্তিতে মুসলমানরা তাদের প্রতি মুসলমানদের সাথে মতপার্থক্য নিরসনের আহ্বান জানাবে? নাস্তিক ও মুসলমানদের মধ্যে এমন কোনো অভিন্ন বিষয় আছে কি যা মতপার্থক্য নিরসনের ভিত্তি হতে পারে? অবশ্যই আছে, নচেৎ তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানানো সম্ভব হতে পারে না। কারণ, তারা যদি অন্ধভাবে বিশ্বাস করে যে, সৃষ্টিকর্তা বলতে কেউ নেই এবং মুসলমানরা যদি অন্ধভাবে বিশ্বাস করে যে, একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, তাহলে উভয়ই নিজ নিজ অন্ধ বিশ্বাসের ওপর অটল থাকবে।

আল্লাহ্ তা‘আলা মুসলিম-অমুসলিম এবং আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের মধ্যে সহজাতভাবে একটি অভিন্ন অকাট্য জ্ঞানস‚ত্র প্রদান করেছেন। তা হচ্ছে আক্বল্ বা বিচারবুদ্ধি। যে কোনো মানবসন্তানের মধ্যে যখন এই বিচারবুদ্ধি একটি ন্য‚নতম মাত্রার পরিপক্কতায় উপনীত হয় তখন সে এর সাহায্যে বিভিন্ন বিষয়, বিশেষতঃ মতপার্থক্যের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে সক্ষম হয়। হ্যাঁ, ক্ষেত্রবিশেষে কারো বিচারবুদ্ধি কোনো ভুল উপসংহারে উপনীত হতে পারে, কিন্তু বিচারবুদ্ধির বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে, সে নিজেই নিজের ভুল চিহ্নিত ও সংশোধন করতে সক্ষম। বিশেষ করে একই বিষয়ে যখন একাধিক মত পাওয়া যায় তখন সে পর্যালোচনা করে সঠিক মতটি চিহ্নিত ও গ্রহণ করতে সক্ষম। অবশ্য বিচারবুদ্ধির সুনির্দিষ্ট প্রয়োগক্ষেত্র আছে, তবে এর সবচেয়ে বড় প্রয়োগক্ষেত্র হচ্ছে জীবন ও জগতের পিছনে নিহিত মহাসত্য উদ্ঘাটন।

কোরআন মজীদে আক্বল্-এর ব্যবহারের ওপর এতোই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যে, অন্ততঃ তেরোটি আয়াতে বলা হয়েছে: “তাহলে/ অতঃপর কি তোমরা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করবে না?” শুধু তা-ই নয়, যারা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে না তাদের কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে; এরশাদ হয়েছে:
“নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম জন্তু হচ্ছে সেই বধির-বোবা’র দল যারা বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করে না।” (সুরা আল্-আনফাল্: ২২)

কোরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে বিচারবুদ্ধির আলোকে অর্থাৎ যুক্তি উপস্থাপন করে তাওহীদ, আখেরাত ও নবুওয়াতে মুহাম্মাদী (ছাঃ)র সত্যতা প্রমাণ করা হয়েছে। যেমন: বলা হয়েছে: তারা কি কোনো সৃষ্টি-উৎস ছাড়াই সৃষ্ট হয়েছে, না-কি তারা নিজেরাই নিজেদেরকে সৃষ্টি করেছে?

সুতরাং নাস্তিকদের সাথে অভিন্ন মানদণ্ড বিচারবুদ্ধির আলোকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে। এতে বিচারবুদ্ধির রায় অকাট্যভাবেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে। এরপর বিচারবুদ্ধির আলোকে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে যে, সৃষ্টিকর্তা একজন হওয়া অপরিহার্য, না-কি একাধিক হওয়া সম্ভব। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই বিচারবুদ্ধি সৃষ্টিকর্তা একজন হওয়া অপরিহার্য বলে রায় দেবে। এরপর বিচারবুদ্ধির সাহায্যে সৃষ্টিকর্তার জন্য অপরিহার্য গুণাবলী ও যে সব বৈশিষ্ট্য তাঁর জন্য মানানসই নয় সেগুলো প্রমাণ করতে হবে। মুশরিকরা যেহেতু নীতিগতভাবে একজন আদি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার করে সেহেতু আহলে কিতাবের ন্যায় তাদের প্রতিও বিচারবুদ্ধির দলীলের ভিত্তিতে তাওহীদের সত্যতা গ্রহণ ও অংশীবাদের ভ্রান্তি পরিহারের জন্য আহ্বান জানাতে হবে। স্বয়ং কোরআন মজীদও তা-ই করেছে, যেমন, এরশাদ হয়েছে: “আসমানসমুহে ও যমীনে আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো ইলাহ্ থাকলে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেতো।”

তাওহীদের পরে বিচারবুদ্ধি আখেরাতের সত্যতা প্রমাণ করে। বস্তুতঃ আখেরাতের অস্তিত্ব না থাকলে সহজাত জ্ঞান বা বিচারবুদ্ধি যা কিছুকে করণীয় বলে তা করার জন্য এবং যা কিছুকে বর্জনীয় বলে তা বর্জন করার পিছনে কোনো চালিকাশক্তিই থাকে না; সে ক্ষেত্রে সুবিধাবাদের নীতি অনুসরণ থেকে কোনো কিছু¦ই মানুষকে বিরত রাখতে পারে না। তাই কোরআন মজীদও আখেরাতের সত্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে বিচারবুদ্ধির দলীল পেশ করেছে, এরশাদ হয়েছে: “তিনিই পুনঃসৃষ্টি করবেন যিনি প্রথম বার সৃষ্টি করেছেন।”

বস্তুতঃ তাওহীদ ও আখেরাতে ঈমান এবং তার ভিত্তিতে যথাযথ কর্ম সম্পাদনই হচ্ছে পরকালীন নাজাতের ন্য‚নতম শর্ত (স‚রাহ্ আল্-বাক্বারাহ্: ২-৪ ও ৬২)। অবশ্য বিচারবুদ্ধি যে সব ক্ষেত্রে অকাট্য জ্ঞানে উপনীত হতে সক্ষম নয় মানুষ সে সব ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ পথনির্দেশ কামনা করে, কিন্তু এ ধরনের বিশেষ পথনির্দেশের অধিকারী বলে যারা দাবী করেন বা যাদের কথা উল্লেখ করা হয় তাঁদের ভুল পরিচয় উপস্থাপন, তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার ও আরো কতক কারণে তাঁরা সত্যি সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পথনির্দেশক (নবী-রাস‚ল) কি-না সে সম্পর্কে অনেকের জন্য ইতমামে হুজ্জাত তথা অকাট্য প্রমাণ না-ও হতে পারে। তাই নবুওয়াতে ঈমানকে পরকালীন নাজাতের জন্য ন্য‚নতম শর্তের অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। (কিন্তু ইতমামে হুজ্জাত্ হওয়া সত্তে¡ও নবুওয়াতে ঈমান না আনলে তা হবে নেফাক্বের পরিচায়ক। ) আর বলা বাহুল্য যে, বিচারবুদ্ধির রায় মেনে নেয়া ব্যতীত তাওহীদ ও আখেরাতে ঈমান এবং তার ভিত্তিতে যথাযথ কর্ম সম্পাদন সম্ভব নয়।

আল্লাহ্ তা‘আলা রাস‚লে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নবুওয়াতের সপক্ষেও বিচারবুদ্ধির দলীল উপস্থাপন করেছেন। তা হচ্ছে, তিনি নবুওয়াত দাবীর আগে তাঁর গোটা জীবনই মক্কার মুশরিকদের মধ্যে অতিবাহিত করেন এবং তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে, ফাছাহাত্ ও বালাগাতের মানদণ্ড সমুন্নততম গ্রন্থ কোরআন মজীদ রচনা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

বস্তুতঃ বিচারবুদ্ধি (আক্বল্) হচ্ছে ইসলাম-গৃহের প্রবেশদ্বার। তাই বিচারবুদ্ধি বর্জন করে বা বিচারবুদ্ধির বিরোধিতা করে কারো পক্ষে মুসলমান হওয়া বা থাকা সম্ভব নয়।
এবার আসে তাওহীদ, আখেরাত ও নবুওয়াতে মুহাম্মাদীর (ছাঃ) প্রতি ঈমান পোষণকারীদের মধ্যকার মতপার্থক্য নিরসনের প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য নিরসনের একমাত্র পন্থা হচ্ছে অভিন্ন বিষয়াদিকে মানদণ্ড হিসেবে মেনে নেয়া।

ইসলামের অকাট্য জ্ঞানস‚ত্র ও মতপার্থক্য নিরসনের অভিন্ন মানদণ্ড চারটি। প্রথম বিচারবুদ্ধি (আক্বল্) -যা ইসলাম-গৃহের প্রবেশদ্বার। দ্বিতীয় কোরআন মজীদ -বিচারবুদ্ধির রায়ের ভিত্তিতে যার প্রতি তারা ঈমান এনেছে। সুতরাং কোরআন মজীদ থেকে তাৎপর্য গ্রহণের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য হলে অবশ্যই সেই মতটিই গ্রহণযোগ্য যেটি বিচারবুদ্ধি দ্বারা সমর্থিত। উদাহরণস্বরূপ, নবী-রাস‚লগণ (আঃ) নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন শুরু করার আগে বা পরে গুনাহ্ করতে বা তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে ভুল করতে পারেন কি-না। যেহেতু যে ব্যক্তি কখনো না কখনো গুনাহ্ করেছে বা ভুল তথ্য প্রদান করেছে তার নবুওয়াত দাবীর প্রতি বিচারবুদ্ধি (আক্বল্) সন্দেহ পোষণ করে সেহেতু বিচারবুদ্ধির দাবী হচ্ছে এই যে, আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য তাঁর নবীকে গুনাহ্ ও ভুল তথ্য প্রদান থেকে বিরত রাখা অপরিহার্য, নচেৎ তাঁর নবুওয়াতের ব্যাপারে বান্দাহদের জন্য ইতমামে হুজ্জাত্ হবে না। সুতরাং কোরআন মজীদ থেকে এর সাথে সাংঘর্ষিক কোনো তাৎপর্য গ্রহণ করা যাবে না, কারণ, তা কোরআন মজীদের ভিত্তি নবুওয়াতে ঈমানকে ধ্বসিয়ে দেয়।

তৃতীয় অকাট্য জ্ঞানস‚ত্র ও মানদণ্ড হচ্ছে মুতাওয়াতির হাদীছ। মুতাওয়াতির বর্ণনা বলা হয় এমন বর্ণনাকে যা সর্বোচ্চ স্তর থেকে শুরু করে সর্বশেষ শ্রোতা পর্যন্ত প্রতিটি বর্ণনাস্তরে এতো বেশী লোক কর্তৃক বর্ণিত যার সত্যতায় সর্বজনীন সুস্থ বিচারবুদ্ধি সন্দেহ পোষণ করতে পারে না। আর কোরআন মজীদ থেকে প্রমাণিত যে, আল্লাহ্ তা‘আলা রাস‚লুল্লাহকে (ছাঃ) কতক মৌলিক বিধানের উপবিধি প্রণয়নের ও প্রায়োগিক বিধি-বিধান প্রণয়নের এখতিয়ার প্রদান করেন। সেহেতু চৈন্তিক বা বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে যা কিছু তাঁর মত ও আচরণ বলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত তা মুসলমানদের জন্য অবশ্য গ্রহণযোগ্য। আর সর্বজনীন সুস্থ বিচারবুদ্ধি মুতাওয়াতির স‚ত্রে বর্ণিত তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে। সুতরাং বিচারবুদ্ধি ও কোরআন মজীদের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া সাপেক্ষে রাস‚লুল্লাহর (ছাঃ) নামে বর্ণিত যে কোনো মুতাওয়াতির হাদীছ অবশ্য গ্রহণযোগ্য।

চতুর্থ অকাট্য জ্ঞানস‚ত্র ও মানদণ্ড হচ্ছে ইজমা’ এ উম্মাহ্ অর্থাৎ শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে মুসলমানদের মধ্যে শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা অভিন্ন মত ও আচরণসমুহ। বিচারবুদ্ধি ও কোরআন মজীদের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া সাপেক্ষে ইজমা’ এ উম্মাহ্ অবশ্য অনুসরণীয়। কারণ, তা রাস‚লুল্লাহর (ছাঃ) মত ও আচরণ উদ্ঘাটনকারী। মুসলমানদের মধ্যে বহু গুরুত্বপ‚র্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য সত্তে¡ও যে সব বিষয়ে তাদের মত ও আচরণ শুরু থেকেই অভিন্ন, মুতাওয়াতির হাদীছ ভিত্তিক না হওয়া সত্তে¡ও তা যে রাস‚লুল্লাহ্ (ছাঃ) থেকে আগত তাতে সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই -তা তার পিছনে কোনো খাবারে ওয়াহেদ হাদীছ থাক বা আদৌ কোনো হাদীছ না থাক। উদাহরণস্বরূপ, যৌনসংসর্গের পর গোসল ফরয হওয়া, নামাযে আলে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ প্রেরণ, নামাযে রাস‚লুল্লাহকে (ছাঃ) সম্বোধন করে সালাম প্রদান এবং এ ধরনের আরো অনেক বিষয়।

সুতরাং মুসলমানদের জন্য পারস্পরিক মতপার্থক্য নিরসনের ক্ষেত্রে এ চার অকাট্য দলীলকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে নেয়া তথা এর যে কোনোটি দ্বারা প্রমাণিত মত ও আচরণ গ্রহণ করে নেয়া ও এর যে কোনোটির সাথে সাংঘর্ষিক মত ও আচরণ পরিহার করা অপরিহার্য। অতএব, খাবারে ওয়াহেদ হাদীছ ও ইসলামী মনীষীদের মতামতকে এ চার অকাট্য দলীলের মানদণ্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্রহণ-বর্জন করতে হবে।###

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More