পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ঘটনার আলোকে অসুস্থতা

মাওলানা মোঃ শহিদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা

আয়াতসমূহঃ
১- অসুস্থতা অজুহাত স্বরূপঃ
“যারা দুর্বল ও রুগ্ন এবং যাদের (আল্লাহর পথে) ব্যয়ভার বহনে অসমর্থ, তাদের কোন অপরাধ নেই যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শুভাকাক্সক্ষী হয়। নেককারদের ওপর অভিযোগের কোন পথ নেই এবং আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, অনন্ত করুণাময়।” (সূরা আত্-তাওবাহঃ ৯১)

২- অন্তরের রোগের প্রতি মনোযোগ দেয়াঃ
“হে মানবকুল, তোমাদের কাছে উপদেশবাণী এসেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে এবং অন্তরের রোগের নিরাময়, হেদায়েত ও রহমত মুসলমানদের জন্য ” (সূরা ইউনুসঃ ৫৭)

৩- ঈমান রোগমুক্তি ও রহমত স্বরূপঃ
“আমি কোরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনদের জন্য রহমত। গোনাহগারদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।”(সূরা আসরাঃ ৮২)

৪- রোগ মুক্তিদাতা আল্লাহঃ
“যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আরোগ্য দান করেন।” (সূরা আশ-শোআরাঃ ৮০)

৫- অসুস্থতা ও রোযাঃ
“রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে, সে অন্য দিনে গণনা পুরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না-যাতে তোমরা গণনা পুরণ কর এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তাআলার মহত্ত¡ বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।” (সূরা আল বাকারাঃ ১৮৫)

হাদীসসমূহঃ
১- অসুস্থতার কষ্টঃ
হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “অসুস্থতা শরীরের জন্য কারাগার স্বরূপ।” (গুরারুল হিকাম খন্ড ১, পৃ. ৫৩৭)

২- অসুস্থ ব্যক্তিঃ
হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “অনেক অসুস্থ ব্যক্তি মুক্তি পায় এবং অনেক অসুস্থ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ৪৬২)

৩- অসুস্থতা গোনাহের কাফফারাঃ
আল্লাহর রাসূল (স.) বলেছেনঃ “অসুস্থতার কারণে গোনাহ এমনভাবে ঝরে যায় যেভাবে (হেমন্তকালে) গাছের পাতা ঝরে যায়।” (মিযানুল হিকমাহ, খন্ড ৪, পৃ. ২৮৮৫)

৪- চিকিৎসার গুরুত্বঃ
হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নিজের অসুস্থতার কথা ডাক্তারের কাছে গোপন করলো, সে নিজের শরীরের ওপর খিয়ানত করলো।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ২, পৃ. ৫৩৭)

৫- জ্বরঃ
ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) বলেছেনঃ “এক রাতের জ্বর এক বছরের গোনাহের কাফফারা স্বরূপ।” (আমালুল অয়েজিন, খন্ড ১, পৃ. ৫১৭)

বিশ্লেষণঃ অসুস্থতাও একটি নেয়ামত। অসুস্থতা বান্দাদের দুর্বলতা আর আরোগ্য দেয়া পরোয়ারদেগারের করুণা, অসুস্থতার উত্তম চিকিৎসা হলো সংযম করা। অসুস্থতা অবস্থায়ও মানুষের আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ, মুখে এমন বাক্য না আনা যা থেকে শিরকের গন্ধ আসবে। যেভাবে রেওয়ায়েতে উল্লেখ রয়েছে যে, এক রাতের জ্বর এক বছর গোনাহের কাফফারার সমান। কখনো এই অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য পরীক্ষা স্বরূপ, আবার কখনো অসুস্থতা খারাপ কর্মের জন্য হয়ে থাকে। এ জন্য মানুষের উচিৎ নিজের চিকিৎসা করা এবং যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে মানুষের উচিৎ তাকে দেখতে যাওয়া। যে ব্যক্তি অসুস্থকে দেখতে যায় তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা তার সঙ্গী হয় ও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজ ঘরে ফিরে না আসে।

ঘটনাবলীঃ
১- পয়গম্বার (স.)-এর মুচকি হাসিঃ
একদিন পয়গম্বার (স.) আসমানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিলেন। এক ব্যক্তি হযরত (স.)কে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (স.)! আমি দেখলাম আপনি আসমানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছেন, এর কারণ কি?
আল্লাহর রাসূল (স.) বললেনঃ নিঃসন্দেহে যখন আমি আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলাম তখন দেখলাম দু’জন ফেরেশতা যমিনের দিকে আসছেন একজন নেক বান্দার দিন-রাতের ইবাদতের সওয়াব লেখার জন্য যেখানে সে নামায ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন। কিন্তু ঐ ফেরেশতারা তাকে সেখানে পেলেন না কারণ ঐ ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে ছিল।
ফেরেশতারা আসমানে গিয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বললেনঃ আমরা নিয়মানুযায়ী ঐ নেক বান্দার ইবাদতের সওয়াব লেখার জন্য তার ইবাদত খানায় গিয়েছিলাম কিন্তু আমরা তাকে সেখানে পেলাম না কারণ সে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে।
আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের বললেনঃ হে ফেশেতারা! যতক্ষণ পযর্ন্ত আমার বান্দা অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকবে, আমার উচিৎ তাকে অসুস্থ অবস্থায় ততটুকু সওয়াব প্রদান করা যতটুকু তাকে সুস্থ অবস্থায় ইবাদতের জন্য প্রদান করা হত। (কারণ সে আমার বান্দা, অসুস্থতার জন্য ইবাদত করতে অপারগ)। (গাঞ্জিনে মায়ারেফ, খন্ড ২, পৃ. ১২৯, আমালুল অয়েজিন, খন্ড ১, পৃ. ৫১৭)

২- অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করার গুরুত্বঃ
দু‘জন বন্ধু দূর থেকে হজ্ব পালনের জন্য মক্কার দিকে রওনা হলো, যখন তারা মদীনায় রাসূল করীম (স.)-এর রওজা পাক জিয়ারতের জন্য গিয়েছিল তখন তাদের এক বন্ধু মদীনার একটি হোটেলে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লো আর অন্য বন্ধু তার সেবা করায় ব্যস্ত হল।
একদিন সুস্থ বন্ধু অসুস্থ বন্ধুকে বললোঃ আমার অনেক ইচ্ছা আল্লাহর রাসূল (স.)-এর রওজা পাক জিয়ারাত করবো, তুমি অনুমতি দিলে আমি জিয়ারাতের জন্য যেতে পারি।
অসুস্থ বন্ধু বললোঃ তুমি আমার বন্ধু ও সাহায্যকারী, আমাকে একা ছেড়ে যেও না, আমার অবস্থা খুব খারাপ, আমার থেকে দূরে যেও না।
সুস্থ বন্ধু বললোঃ হে আমার ভাই! আমরা বহু দূর থেকে এসেছি, আমার মন জিয়ারাতের জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে, তুমি অনুমতি দাও আমি জিয়ারত করে দ্রুত ফিরে আসবো, যদিও অসুস্থ বন্ধুর সেবা করা খুবই জরুরী ছিল আর সে চাচ্ছিল না তার বন্ধু জিয়ারতের জন্য যাক।
তারপরও সুস্থ বন্ধুটি তাকে ছেড়ে রাসূল করীম (স.)-এর রওজা পাক জিয়ারত করতে চলে গেল এবং জিয়ারতের পর সে ইমাম সাদেক (আ.)-এর বাড়ীতে উপস্থিত হলো এবং হযরতের সাথে সাক্ষাৎ করে নিজ ও নিজের বন্ধুর ঘটনা ইমামকে বললো।
ইমাম সাদেক (আ.) বললেনঃ তুমি যদি তোমার বন্ধুর কাছে থাকতে ও তার সেবা করতে তাহলে তোমার পুরস্কার মহান আল্লাহর দরবারে রাসূল করীম (স.)-এর রওজা পাক জিয়ারতের চেয়ে অধিক হত। (গাঞ্জিনে মায়ারেফ, খন্ড ২, পৃ. ১৩০)#######

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More