আমরা তৃপ্ত তারা ক্ষুধার্ত

মল্লিক শিহাব ইকবাল

দেশে এখন গরীব-দুঃখীদের দুর্দিন। হাজার হাজার মানুষ অর্ধাহারে, অনাহারে কোনো রকম দিন কাটাচ্ছে। অনেকে ভিটা-বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে ফেলছে। ক্ষুধার দুর্বিষহ যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে একই পরিবারের ছয়জন একসাথে আত্মহত্যা করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। অভাবের তাড়নায় নিরুপায় হয়ে গভীর রাতে নিজের তিন সন্তানকে জীবিত কবর দেওয়ার চেষ্টা করার সংবাদও তো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা হল আমাদের অনেকেই বিষয়টা আঁচ করতে পারছেন না বা করছেন না। যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, দুর্ভিক্ষের কথা স্বীকার করতেই চাচ্ছেন না কেউ কেউ। না খেয়ে কিছু মানুষ মারা গেলে না কি দুর্ভিক্ষ হয় না!! দুর্ভিক্ষ হতে হলে অনাহারে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে হয়!! দু-চারজন মারা গেলে দুর্ভিক্ষ হবেই বা কেন? যারা মারা যায় ওরা তো উচুঁশ্রেণির কেউ না। এরা তো সেই দরিদ্র পরিবারের প্রাণী। ওরা মারা গেলে দেশের আর কী আসে যায়। কেউ কেউ আড়তে গিয়ে বস্তা বস্তা চাল দেখে সান্ত¡নার বাণী শুনিয়েছেন যে, ‘দেশে চালের কোনো সংকট নেই!’
অন্য একজন মার্কেটে দামী দামী জিনিসপত্র ও বিলাস সামগ্রী বিক্রি হতে দেখে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, ‘দেশে কেনো অভাব নেই!’
তারা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো বলছেন বা এর পিছনে কোনো রহস্য লুকায়িত আছে কি না তা উদঘাটনের অভিপ্রায় আমার নেই। তবে দেশে চাল নেই, চাল পাওয়া যাচ্ছে না- এমন কথা এ পর্যন্ত কেউ বলেনি। চাল আগে ছিল এখনো আছে। পার্থক্য শুধু আগে যে চাল প্রতি কে.জি. দরে ১৫/২০ টাকায় পাওয়া যেত এখন সেগুলো প্রতি কে.জি. দরে ৪০/৫০ টাকা দিয়ে ক্রয় করতে হচ্ছে। কেউ পারছে কেউ পারছে না। যারা পারছে না তারা সকলে না খেয়ে আছে তা বলছি না। কেউ একবেলা, কেউ আধবেলা, কেউ আধ পেট খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। আবার চাল ক্রয়ের জন্য কেউ ভিটাবাড়ি বিক্রি করে দিচ্ছে।
তেমনিভাবে মার্কেটের দামী দামী পণ্য বিক্রি হয়ে যাচ্ছে একথাও অসত্য নয়। তবে এগুলো যারা ক্রয় করছে তারা দেশের সকল কিংবা অধিকাংশ জনগণ নয়। তারা দেশের একটি শ্রেণি মাত্র। যাদের জন্য চালের দাম ১০০ টাকা হলেও কোনো সমস্যা নেই। এ শ্রেণির লোকদের সংখ্যা অনেক হলেও অন্যদের তুলনায় খুবই কম। দেশে তো কোটি টাকার গাড়ি চড়ার লোকদের সংখ্যাও অনেক। অথচ পেটে ক্ষুধা নিয়ে, প্রখর রোদের মাঝে মাথার ঘাম পায়ে ঝরিয়ে উত্তপ্ত পথ পাড়ি দেওয়া কঙ্কালসার লোকদের সংখ্যাও কম নয়। যে দেশে ফাইভস্টার হোটেল, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, কমিউিনিটি সেন্টার ইত্যাদিতে দামী দামী সুস্বাদু খাবার অর্ধভোজান্তে ফেলে দেওয়ার লোকদের সংখ্যা প্রচুর সে দেশেই একবেলা ডাল-ভাত খেতে পারছে না এমন অসহায়ের পরিমাণও খুব নগণ্য নয়।
ইসলাম এমন দৃশ্য কখনো পছন্দ করেনি। সব সময়ই এমন অবস্থার কঠোর নিন্দা করে আসছে। তবে ধনী-গরীবের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকবে না, সবাই সমান হবে ইসলাম এমন কথা বলেনি বরং জীবিকার ক্ষেত্রে মানুষের পার্থক্যের এ চিরন্তন বিধান দ্ব্যর্থহীনভাবে মেনে নিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমিই তাদের মাঝে তাদের জীবিকা বণ্টন করেছি এবং এক্ষেত্রে একজনকে অন্যজনের উপর প্রাধান্য দিয়েছি।’ -সূরা যুখরুফ ঃ ৩২
ইসলামের নির্দেশনা হল একটা ইনসাফ ভিত্তিক সহানুভূতিশীল সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে কমপক্ষে সমাজের প্রতিটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের ন্যূনতম ব্যবস্থা থাকবে। একজন না খেয়ে থাকলে অন্যজন তার খাবারের ব্যবস্থা করবে। কেউ বিপদে পড়লে অন্যরা সাহায্য করবে।
এ ধরনের চরম অভাব-অনটনের সময় ইসলামের নীতিতে পরিচালিত সরকারের দায়িত্ব হল কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা। প্রয়োজনে অন্নহীনদের জন্য অন্ন, বস্ত্রহীনদের জন্য বস্ত্র ও গৃহহীনদের জন্য গৃহের ব্যবস্থা করা। যাদের যেমন সামর্থ আছে সে অনুপাতে কমমূল্যে এগুলো সরবরাহ করা। যাদের কোনো সামর্থ নেই তাদেরকে এ সমস্ত সুবিধা বিনামূল্যে প্রদান করা।
সরকার ছাড়া আর যাদের উপর এ দায়িত্ব বর্তায় তারা হল সমাজের সকল সামর্থবান ব্যক্তি।
প্রথম নিকটবর্তী সমাজ তথা পাড়াপ্রতিবেশী। তারা এ দায়িত্ব পালন না করলে বা অক্ষম হলে পরবর্তী নিকটবর্তী সমাজের উপর দায়িত্ব আসবে। এমনিভাবে পর্যায়ক্রমে সমাজগুলোর উপর এ দায়িত্ব বর্তাবে। ধনীরা যাকাত-সদকার পাশাপাশি দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী এতীম-অসহায় ও বিধবাদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। যাদের অর্থ নেই তারা শ্রম দিয়ে সংকট দূর করার চেষ্টা করবে। যারা এককভাবে কিছু করার সামর্থ রাখে না তারা সম্মিলিতভাবে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
এ দেশে দরিদ্রের সংখ্যা অনেক হলেও সম্পদশালীদের সংখ্যাও কম নয়। তারা যদি নিজেদের অপচয় কিছুটা কমিয়ে, অনর্থক বিলাসিতার পরিধি কিছুটা সীমিত করে এ অর্থটা দেশের অনাহারক্লিষ্ট গরীব-দুঃখীদেরকে দিয়ে দেয়, তাহলে অনায়েশে এরা খেয়ে পরে বাঁচতে পারবে। অথচ বিত্তবানের বিলাসিতায় তেমন কোনো ঘাটতি দেখা দিবে না। কমপক্ষে ফরয যাকাত-সদকাটাও যদি আদায় করে দেয় তাহলেও দরিদ্রের ক্ষুধা অনেকটা কমে যাবে। বিনিময়ে সম্পদশালীরা কঠিন শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যাবে এবং লাভ করবে অগণিত নেকী ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।
ইসলাম এমন একটা ইনসাফ ভিত্তিক সহানুভূতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য জোর তাগিদ দিয়েছে। কুরআন ও হাদীসে বিভিন্ন ভঙ্গিতে এর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘সৎকর্ম শুধু পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করার নাম নয়; বরং বড় সৎকর্ম হল, আল্লাহ তাআলা, পরকাল, ফেরেশতা, আসমানী কিতাব ও সমস্ত নবী-রাসূলগণের উপর ঈমান আনয়ন করা। আর আল্লাহর মুহাববতে আত্মীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির, ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্য সম্পদ ব্যয় করা।’ -সূরা বাকারা ঃ ১৭৭
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, সে ধর্মের ঘাটিতে প্রবেশ করেনি। আপনি কি জানেন সে ঘাটি কী? তা হচ্ছে, দাসমুক্তি অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে অন্নদান, এতীম আত্মীয়কে কিংবা ধুলি-ধুসরিত মিসকীনকে। -সূরা বালাদ ১১-১৬
আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কসম ঐ ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহর কসম ঐ ব্যক্তি মুমিন হতে পারে না; যে তৃপ্তির সাথে পেট ভরে ভক্ষণ করে অথচ প্রতিবেশী ক্ষুধার কষ্ট ভোগ করে। -তবারানী, কাবীর হাদীসঃ ৭৫১
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আবু যার! যখন তুমি ঝোল-তরকারী রান্না কর তখন কিছুটা পানি বাড়িয়ে দাও। অতঃপর সেখান থেকে কিছু অংশ তোমার প্রতিবেশীদের ঘরে পাঠিয়ে দাও। -সহীহ মুসলিম, হাদীসঃ ২৬২৫
অন্য এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে, এতীম ও বিধবাদেরকে রক্ষণাবেক্ষণকারীরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর মতো। -সহীহ বুখারী হাদীস ৫৩৫৩, সহীহ মুসলিম হাদীস ২৯৮২
এ সমস্ত নির্দেশনার সাথে সাথে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, দেখ দান করে মনে কর না যে, আমরা তাদের উপর অনুগ্রহ করছি; বরং এটা তোমাদের সম্পদে তাদের পাওনা অধিকার, যা আদায় করে দেওয়া তোমাদের কর্তব্য। সুতরাং করুণা নয়, দায়িত্ব পালন মাত্র।
এ ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের অধিকার রয়েছে।’ -সূরা যারিয়াত ঃ ১৯
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ফল (ফসল) কর্তনের সময় তার হক দিয়ে দাও। -সূরা আনআম ঃ ১৪১
এই আয়াতে যাদের জমি নেই বা চাষাবাদ করার ব্যবস্থা নেই ফল-ফসল কাটার সময় তাদেরকে একটা অংশ দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আর রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সম্পদের মধ্যে যাকাত ছাড়া আরো হক রয়েছে। -তিরমিযী হাদীস, ৬৫৯
শুধু হক আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে তাই নয়, বরং এ হক আদায় না করলে আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে এবং কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে সে বিষয়ে কঠিন হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় খরচ না করে ধন-সম্পদ পুঞ্জিভূত করে রাখে তাদেরকে কঠোর শাস্তির কথা শুনিয়ে দিন।’ (সূরা তাওবা ঃ ৩৪)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, যারা আল্লাহর অনুগ্রহে পাওয়া সম্পদের ক্ষেত্রে কৃপণতা করে তারা যেন এই কৃপণতাকে নিজেদের জন্য মঙ্গলজনক মনে না করে। বরং এটা তাদের জন্য নিতান্তই ক্ষতিকর। কিয়ামতের দিনে এ সমস্ত সম্পদকে বেড়ী বানিয়ে তাদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হবে। -সূরা আলে ইমরান ঃ ১৮০
সব শেষে একটি আরয- ভায়েরা! দয়া করে একটি বিষয়ে চিন্তা করে দেখুন। আপনাদের এ সম্পদের পাহাড় কিন্তু এমনি এমনিই গড়ে উঠেনি। এর পেছনে গরীব-অসহায়দের অনেক অবদান রয়েছে। আপনাদের গাড়ি-বাড়ি, কল-কারখানা সবকিছুর পেছনেই তাদের অক্লান্ত শ্রম রয়েছে। আপনারা নিজ হাতে একটা চাকাও কি লাগিয়েছেন? একটা ইটও কি কখনো উঠিয়েছেন? একটা মেশিনও কি কখনো চালিয়েছেন? আপনাদের এ সমস্ত কাজে তারাই বিরামহীনভাবে করে যাচ্ছে। আপনাদের এত ধন-সম্পদ এ গরীব শ্রেণি থাকার কারণেই হয়েছে। রক্ত পানি করে সভ্যতার ঘানি ঘুরিয়ে যারা সভ্যতার এমন উৎকর্ষ সাধন করেছে তাদের পেটে আজ ভাত নেই। তারা ক্ষুধার্ত, আমরা তৃপ্ত! এক লোকমা খাবারের জন্য তারা হাত পেতে রয়েছে। তাদের এ হাতগুলো কি খালি ফিরিয়ে দেওয়া হবে?
ঈমানী দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা যদি আমাদের বিবেককে তাড়া না করে, তাহলে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য হলেও গরীবদের সহযোগিতায় আমাদের এগিয়ে আসা এবং তাদের জন্য অন্ন বস্ত্রের ব্যবস্থা করা উচিত। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন। আমীন।###

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More