ইসলামী ইতিহাসের আকাশমন্ডলে যে কজন মহাপুরুষ নিজেদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং আধ্যাত্মিকতা দিয়ে মানবজাতিকে সত্যের পথ দেখিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে পঞ্চম ইমাম হযরত মুহাম্মদ আল-বাকির (আ.) অন্যতম। উমাইয়া শাসকদের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি অস্ত্রের বদলে জ্ঞানের আলো দিয়ে এক অভূতপূর্ব নীরব বিপ্লব সাধন করেছিলেন। তাঁর শাহাদাত বার্ষিকীর এই শোকাবহ মুহূর্তে তাঁর পবিত্র জীবন, ইসলামে তাঁর অবদান এবং তাঁর শাহাদাতের ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্মরণ করা প্রতিটি সত্যসন্ধানী মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
পরিচিতি ও গৌরবময় বংশমর্যাদা
হযরত ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকির (আ.) ৫৭ হিজরির ১লা রজব পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এক অনন্য বংশীয় মর্যাদার অধিকারী। তাঁর পিতা ছিলেন চতুর্থ ইমাম হযরত আলী ইবনুল হুসাইন জাইনুল আবেদিন (আ.) এবং মাতা ছিলেন ইমাম হাসান (আ.)-এর কন্যা ফাতেমা। ফলে, তিনি পিতৃপক্ষ এবং মাতৃপক্ষ—উভয় দিক থেকেই আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) এবং খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা জাহরা (সা.)-এর পবিত্র রক্ত বহন করছিলেন। ইতিহাসে তিনিই প্রথম ইমাম যিনি ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হুসাইন (আ.)—উভয়েরই বংশধর।
আল-বাকির’ উপাধির তাৎপর্য
তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপাধি হলো ‘আল-বাকির’ (Al-Baqir), যার পূর্ণ রূপ হলো ‘বাকিরুল উলুম’ । এর অর্থ হলো “যিনি জ্ঞানকে উন্মোচিত করেন” বা “জ্ঞানের অতল গহ্বরের উম্মোচনকারী”।
পবিত্র রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর মহান সাহাবী হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী (রা.)-কে ভবিষ্যৎবাণী করে বলেছিলেন:
“হে জাবের! তুমি ততদিন বেঁচে থাকবে যতদিন না আমার বংশধরের এক সন্তানের সাথে তোমার সাক্ষাৎ ঘটে, যার নাম হবে আমারই নামে (মুহাম্মদ) এবং সে জ্ঞানকে সম্পূর্ণ উন্মোচিত করবে (বাকিরুল উলুম)। যখন তাঁর সাথে তোমার দেখা হবে, তাঁকে আমার সালাম পৌঁছে দিও।”
ইতিহাস সাক্ষী, হযরত জাবের (রা.) বৃদ্ধ বয়সে মদিনার অলিতে-গলিতে সেই নূরানী শিশুকে খুঁজতেন এবং সাক্ষাৎ পাওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সালাম পৌঁছে দিয়েছিলেন।
কারবালার প্রত্যক্ষদর্শী ও শোকের স্মৃতি
ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকির (আ.) মাত্র ৪ বছর বয়সে কারবালার সেই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি তাঁর প্রিয় দাদা ইমাম হুসাইন (আ.) এবং আহলে বাইতের অন্যান্য সদস্যদের নির্মম শাহাদাত নিজের চোখে দেখেছিলেন। কারবালার পর দামেস্কের দরবারে বন্দিত্বের যে অমানুষিক কষ্ট ও নির্যাতন, তারও সাক্ষী ছিলেন এই শিশু ইমাম। এই গভীর শোক ও স্মৃতি তাঁর পরবর্তী জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে উমাইয়া কুশাসনের বিরুদ্ধে আত্মিক শক্তি জুগিয়েছিল।
সমকালীন শাসক ও শাহাদাতের পটভূমি
ইমামের ক্রমবর্ধমান আধ্যাত্মিক প্রভাব, জনপ্রিয়তা এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব তৎকালীন উমাইয়া খলিফাদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে নিষ্ঠুর উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিক ইমামের এই জনসমর্থনকে নিজের সিংহাসনের জন্য হুমকি মনে করত।
খলিফা হিশাম ইমামকে অপমান করার জন্য একাধিকবার মদিনা থেকে দামেস্কে তলব করে। কিন্তু প্রতিবারই ইমামের প্রজ্ঞা, অলৌকিক ক্ষমতা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তার সামনে খলিফা পরাস্ত ও লজ্জিত হয়। দামেস্কের দরবারে ইমামকে লক্ষ্য করে ধনুর্বিদ্যা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলে, বৃদ্ধ বয়সেও ইমামের নিখুঁত নিশানা দেখে দরবারের সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ইমামের প্রতি মানুষের এই অগাধ ভালোবাসা ও ভক্তি সহ্য করতে না পেরে হিশাম ইবনে আবদুল মালিক তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করে।
ইমাম বাকির (আ.)-এর কয়েকটি মূল্যবান বাণী
ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকির (আ.) মানবজাতির আত্মশুদ্ধির জন্য বহু অমূল্য বাণী রেখে গেছেন:
১. “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা অবাধ্য ও অশ্লীলভাষী মানুষকে ঘৃণা করেন।”
২. “সবচেয়ে বড় অলসতা ও ক্ষতি হলো—কোনো মানুষের দ্বীনের ব্যাপারে অলসতা করা এবং দুনিয়ার বিষয়েও অলস বসে থাকা।”
৩. “ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ প্রকৃত আলেম হতে পারে না, যতক্ষণ না সে তার ওপরের স্তরের মানুষের প্রতি হিংসা এবং নিচের স্তরের মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা বন্ধ করে।”
ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকির (আ.)-এর শাহাদাত কেবল একজন ব্যক্তির চলে যাওয়া নয়, বরং তা ছিল জ্ঞানের এক বিশাল সমুদ্রের সাময়িক নীরবতা। তবে তিনি যে মশাল জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, তা আজও বিশ্বজুড়ে সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখাচ্ছে।
ফজর/ ইয়াসিন