লেখকঃ সাইয়েদ মঈনুল ইসলাম কাজেমী
আহলে বাইত দুটি আরবী শব্দ। আল্লাহ তায়ালা এর দ্বারা নবী পরিবারকে সম্বোধন করেছেন। আল্লাহর বাণী, “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ চান হে নবী পরিবার তোমাদের থেকে সব ধরণের পাপ পঙ্কিলতা দূর করে তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” (৩৩ঃ ৩৩)
এই আয়াতটি যে বিশেষ করে পাক-পাঞ্জাতন হযরত মুহাম্মদ (সা.), হযরত আলী (আ.), হযরত ফাতেমা (আ.), হযরত হাসান (আ.) ও হযরত হোসাইন (আ.) এর শানে অবতীর্ণ হয়েছে এবং ‘আহলুল বাইত’ পরিভাষাটি যে একমাত্র তাঁদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য সে সম্পর্কে বেশীরভাগ কুরআনের তাফসীর ও মহানবী (সা.) থেকে বর্ণিত বহু হাদিস শিয়া-সুন্নী মাযহাবের অগণিত গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এদের কয়েকটির নাম উল্লেখ করা হলোঃ
- তাফসীর গ্রন্থঃ আত-তাবারী প্রণীত ‘জামে উল বয়ান’, জাসসাস প্রণীত ‘আহকামুল কোরআন, ইবনে কাসির প্রণীত ‘তাফসীরে ইবনে কাসির, আল্লামা সুয়ুতী প্রণীত ‘আল দূর আল মানসুর’, আল-কুরতুবী প্রণীত ইত্যাদি।
- হাদিস গ্রন্থঃ ‘সহীহ মুসলিম’, ‘মুসনাদে আহমাদ’, ‘সুনানে আত তিরমিজী’, ‘ফাতহুল বারী’, ‘শারহ সহীহ আল বোখারী’, ‘উসুলুল কাফী’, ‘আল মোস্তাদারাক আলাস সহীহাইন’, ‘দা আইমুল ইসলাম’, ‘আল বোরহান’ ইত্যাদি।
উপরোক্ত আয়াত নাজিলের পর পরই হযরত রাসুল (সা.) একটি চাদরের মধ্যে হযরত আলী (আ.), হযরত ফাতেমা (আ.), হযরত হাসান (আ.) ও হযরত হোসাইন (আ.)কে এক সাথে জড়িয়ে বললেন, “এ-ই আমার পরিবার।” প্রকাশ থাকে যে, হযরত রসুল (সা.) এর একজন স্ত্রী (উম্মে সালমা রা.) ঐ চাদরের মধ্যে আসতে চাইলে তিনি (সা.) নিষেধ করেন এবং বলেন যে, “তুমি আমার স্ত্রী হিসেবে ঠিক আছ।”
হযরত রসুল (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায়ের প্রাক্কালে ঐ আয়াতের ভিত্তিতে যে নির্দেশনা দেন তা হচ্ছে, “আমি তোমাদের মাঝে অতি ভারী ও মূল্যবান দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি। আল্লাহর কিতাব (কোরআন) ও আমার আহলে বাইত (রক্তজ সম্পর্কীয় অতি নিকট আত্মীয়)। তোমরা যদি এ দুটিকে আকঁড়ে ধর তবে কখনই বিপথগামী হবে না। এ দু’টি আমার সংগে (কিয়ামতে) হাউজে কাওসারে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হবে না।” এ নির্দেশনা একটি বড় হাদিসের (হাদিসে গাদির) অংশ বিশেষ মাত্র। তাই ‘হাদিসে গাদির’ এর প্রেক্ষাপট ও মূল বক্তব্যের কিছুটা আলোচনা করলে বিষয়টি পরিস্কার হবে।
হজ্জ থেকে ফেরার পথে মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী গাদির-এ খোম নামক একটি প্রান্তরে ১৮ই জিলহজ্জ তারিখে তাঁর (সা.) সঙ্গী-সাথীদের (প্রায় দেড় লক্ষ) সকলকে থামিয়ে একটি যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ভাষণ দান করলেন। এ ভাষণের মধ্যে তিনি (সা.) হযরত আলী (আ.) এর হাত উচুঁ করে ধরে সকলের সামনে বললেন, “আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা।” তারপর আকাশের দেিক মাথা তুলে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে ভালবাসুন যারা তাঁকে (আলীকে) ভালবাসে এবং তাদেরকে ঘৃণা করুন যারা তাঁকে ঘৃণা করে।”
আবার অন্যত্র (সা.) তিনি বলেছেন, “আমার পরে বার জন আমীর হবেন (যারা সমগ্র মুসলিম বিশ্ব শাসন করবে)।” অর্থাৎ ইসলামের নবুয়তী ধারাকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও চালু রাখতে তাঁর পরিবার থেকে ১২জন ইমাম (নেতা) হবে। আজ ঐতিহাসিক গাদিরের এই হাদিসে প্রথম ইমাম হিসেবে হযরত আলী (আ.) এর নাম ঘোষণা দিলেন। এ ইমামতি ধারার ১১জন গত হয়েছেন। এখন ১২তম ইমাম “ইমাম মাহদী” (আ.) এর আবির্ভাব অত্যাসন্ন। বিগত ইমামগণ সীমাহীন জুলুম ও অত্যাচারের মধ্যেও তাদের দায়িত্ব পালনে তথা ইসলামকে সঠিকভাবে পরিচালনা ও সংরক্ষণে প্রাণ দিতে দ্বিধাবোধ করেন নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় হযরত ইমাম আলী (আ.) কে খুন, হযরত ইমাম হাসান (আ.) কে বিষ প্রয়োগে হত্যা এবং হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)কে কাববালায় সঙ্গী সাথীসহ সপরিবারে হত্যা। এভাবে বিগত ১১ জন ইমাম (আ.) এর সকলেই শাহাদাত বরণ করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, আহলে বাইত হচ্ছেন আল্লাহপাক কর্তৃক ঘোষণাকৃত নিস্পাপ ইমামগণ যাদের অনুকরণ ও অনুসরণ ঈমানদারদের নাজাত ও মুক্তির দিশা রয়েছে। রাসুল (সা.) নিজেকে জ্ঞানের শহর বলেছেন এবং হযরত আলী (আ.)কে সেই শহরের দরজা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি (সা.) আহলে বাইতকে হযরত নুহ (আ.)-এর তরীর মত নাজাতের তরী হিসেবে এবং বেহেশতের সর্দার ও চাবির বাহক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। রাসুল (সা.) এর হাদিস অনুসারে তাঁর উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। তার মধ্যে একটি দলই বেহেশতি এবং ৭২ দল হবে দোজখী। আর পবিত্র কোরআন ও হাদিস অনুসারে এই বেহেশতী দলটি হচ্ছে আহলে বাইত এর অনুসারী দল। অর্থাৎ, এ দলটিই হচ্ছে পরকালে নাজাত তথা মুক্তির সনদ প্রাপ্ত দল।
আহলে বাইত এর অনুসরণ অপরিহার্য কেন?
মহান সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আল্লাহ রব্বুল আলামীন জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ বিশ্ব জগত একদিন ধ্বংস হবে। কিন্তু কখন কিভাবে হবে তা রাব্বুল আলামীনের জ্ঞানে রয়েছে। আমরা হযরত রসুল (সা.) এর বাণী ও ঘটনার বাস্তবতা দেখে মহান আল্লাহর নিয়ম কানুন কিছুটা আঁচ করতে পারি। কারণ দেখা গেল আল্লাহ শেষ নবী (সা.)কে নিয়ে গেলেন কিন্তু ইসলামকে আরও কিছুকাল জারি রাখতে চান। এটা মানুষের জন্যে বিরাট পরীক্ষা। এটা আবার সাথে সাথে বিরাট অনুগ্রহও বটে। যেমন ওহুদ যুদ্ধে নবী (সা.) নিহত হয়েছে বলে মিথ্যা রটনা সাহাবীদেরকে বিচলিত করেছিল এবং তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিলে মহান আল্লাহ আয়াত নাজিল করেন যে, রসুল (সা.) মরণশীল-তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন বা তাঁকে হত্যা করা হয় তাহলে কি মুসলমানরা পিছনে ফিরে যাবে? কিন্তু আল্লাহ তো চিরঞ্জীব। নবী (সা.) এর ওফাতের পর আল্লাহর ইবাদত বান্দাদের উপর অপরিহার্য কি-না? নিশ্চিতভাবে সকল জীবিত মানুষের জন্যে সর্বাবস্থায় আল্লাহর ইবাদত করা অপরিহার্য। তাই আল্লাহ তায়ালা হযরত রাসুল (সা.) এর ওফাতের পরে ইসলামকে জারি রাখার ব্যবস্থা করেছেন। বিদায় হজ্জের পরে ১৮ জিলহজ্জ তারিখে নবীর (সা.) ওফাতের অল্প কিছুদিন আগে গাদির-এ খোম নামক স্থানে আল্লাহ পাক তাঁর (সা.) মাধ্যমে ইমামতের (নেতৃত্বের) ব্যবস্থা করে দিলেন। ইসলামকে পুর্ণাঙ্গকরণ ও রোজা কিয়ামত পর্যন্ত জারি করণের নিমিত্তে আল্লাহ তায়ালা পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে হযরত রসুল (সা.) এর পর দায়িত্ব গ্রহণের জন্যে ইমাম (আ.)গণকে জ্ঞান-বুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠ ও নিষ্পাপ হিসেবে পবিত্রকরণ করলেন। তাই গাদীরের মহা সভায় হযরত রসুল (সা.) এর দ্বারা উক্ত ঘোষণা দেওয়ালেন। অতঃপর আল্লাহ ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ হিসেবে ঘোষণা দিলেন। শয়তান কর্তৃক ইসলাম ধ্বংসকরী নানা প্রজেক্ট থেকে রসুল (সা.) এর ইসলামকে সংরক্ষণের দায়িত্ব রসুল (সা.) এর ওয়াসি ইমাম (আ.)গণের উপর অর্পিত হয়। এভাবে নবুয়তী শেষ হবার পর মানুষ নিজের স্বাধীনতায় দ্বীন পালন করতে সক্ষম হয়।
পরিশেষে দেখা যায়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর দ্বীন ইসলামকে নবী (সা.) দ্বারা ঘোষণা দিলেন। কারণ নবী (সা.) এর অবর্তমানে মনগড়া কোন কিছুই যেন ইসলামে অনুপ্রবেশ করতে না পারে এবং ইসলাম পালনে ইচ্ছুক ব্যক্তিগণ সঠিক রাস্তা খুঁজে পায় তথা পরকালের নাজাতের রাস্তার দিশা পায়। নবী (সা.) এর ওফাতের পর থেকেই বর্তমান পর্যন্ত অনেকেই এ ধারাটি উপলব্ধি করছে না বা তা অস্বীকার করে চলেছে। তারা আল্লাহ প্রদত্ত এ ব্যবস্থাকে চেপে রেখে শয়তান প্রভাবিত মনগড়া রাস্তায় চলছে। কিন্তু প্রকৃত ঈমানদারগণ সংখ্যায় কম হলেও সত্যকে অনুসরণ করে চলেছেন। ফলে আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থাটিকে বাতিলের ধারক ও বাহকের শত চেষ্টা করেও মানুষের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।
মহান আল্লাহ তায়ালা নবী (সা.) এর ওফাতের পর রোজ কিয়ামত পর্যন্ত দ্বীনকে এ পন্থায় স্থায়ী ও সঠিকভাবে পরিচালনা করবেন। কেন তিনি এমন করলেন তা আল্লাহই ভালো জানেন। আর তা আকল বা ফিতরত বিরোধীও নয় যে আমরা আল্লাহর এ কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারি।
মহান আল্লাহতায়ালা নানাভাবে আহলে বাইতের মর্যাদা এবং তাদের অনুসরণের বিষয়টি পবিত্র কোরআনুল কারিমে তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলেন, “এটা তাই যার সুসংবাদ আল্লাহ তার বান্দাদেরকে দেন-যারা ঈমান আনে ও সৎ কর্ম করে। (হে রাসুল) বলুন, আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে আমার নিকট আত্মীয়দের আনুগত্যপূর্ণ সৌহার্দ্য ব্যতিত অন্য কোন প্রতিদান চাই না। যে উত্তম কাজ করে আমি তার জন্য কল্যাণ বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল গুণগ্রাহী।” (পবিত্র আল-কোরআন-৮২ঃ ২৩)
গাদীর-এ-খোম প্রান্তরে ইসলামের নেতা নির্ধারণ বিষয়ে ভাষণের নেপথ্যে মহান আল্লাহর একটি নির্দেশনা ছিল। তিনি রাসুল (সা.)কে নির্দেশ দিলেন, “হে রাসুল! আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার নিকট যা নাজিল করা হয়েছে তা পৌঁছে দিন। আর যদি আপনি তা না করেন তা হলে আপনি তাঁর রিসালাত পৌঁছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষ হতে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।” (পবিত্র কোরআন ৫ঃ ৬৭)
এ প্রেক্ষিতে হযরত রাসুল (সা.) গাদীর-এ-খোম নামক প্রান্তরে প্রায় দেড় লক্ষ সঙ্গী-সাথীকে থামিয়ে জড় করে ইমামত ধারার প্রথম ইমাম হযরত আলী (আ.) এর বেলায়েত ঘোষণা করেন। অতঃপর হযরত রসুল (সা.) আল্লাহর কাছে মোনাজাত করেন। এরপরই আল্লাহ ঘোষণা করলেন, “…আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম।” (৫ঃ ৩)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সৃষ্টি ও রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বদা একটি নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা বজায় রাখেন। তাই ইসলামের কাজ শেষ পর্যায়ে আসলে আল্লাহ তায়ালা হযরত রাসুল (সা.)কে নিয়ে গেলেও মানুষ তথা ঈমানদারদের জন্যে পরীক্ষা নেবার জন্যে আরও একটু অবকাশ দিয়েছেন ইমাম নির্ধারণের মাধ্যমে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ব্যবস্থা করেছেন যাতে তাঁর নির্দেশিত ও তাঁর রসুলের (সা.) রেখে যাওয়া দ্বীনকে তার ধারক বাহকদের ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত পূর্ণ করে, তাঁর সন্তুষ্টি হাসিল করে ঈমানদারগণ নাজাত পেতে পারে। বর্তমানে পৃথিবী দ্বীন বিরোধী ও শয়তানী কার্যকলাপের কারণে অত্যাচার জুলুম নিপীড়নসহ নানা বিশৃংখলায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছে।
আহলে বাইত এর শেষ প্রতিনিধি হযরত ইমাম মাহদী (আ.) এ অবস্থা থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করবেন। দ্বীনের আলেমগণ আশা করছেন যে, আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর আগমন অত্যাসন্ন। যারা ঈমান সঠিক রেখে আহলে বাইত এর উপর পরিপূর্ণ আকীদাকে ওয়াছিলা করে নাজাতের পথ পরিস্কার করতে চায় তাদের জন্যে চিন্তা ভাবনা করার এখনও সময় আছে। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।###