ইবাদত-বন্দেগীর অবদান ও বরকতসমূহ

১. গর্ব ও গৌরব অনুভব
ইমাম যয়নুল আবেদ্বীন (আ.) স্বীয় প্রার্থনায় বলেন: “ইলাহী কাফা বী ইয্যান্ আন্ আকুনা লাকা ’আব্দা।”( বিহার, ৭৭তম খন্ড, পৃ. ৪০২)

“আমার শুধু এ গৌরবই যথেষ্ট যে, আমি যেন তোমার বান্দা ও দাস হতে পারি।”
এর চেয়ে অধিক গৌরবের বিষয় আর কি হতে পারে যে, মানুষ তার স্বীয় স্রষ্টার সঙ্গে কথা বলবেন আর তিনি মানুষের কথা শ্রবণ করবেন এবং তা গ্রহণ করবেন!
এ নগণ্য পৃথিবীতে মানুষের শ্রোতা যদি একজন মহৎ ও জ্ঞানী ব্যক্তি হন তবে মানুষ তাঁর উপস্থিতির কারণে গৌরব ও তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের জন্যে গর্ব অনুভব করেন এবং কিছুদিন অমুক উস্তাদের শিষ্য ছিলেন বলে নিজেকে ধন্য মনে করেন।
২. শক্তি অনুভব
একজন শিশুর হাত যতক্ষণ পর্যন্ত একজন শক্তিশালী ও দয়ালু পিতার হাতে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সে শক্তি অনুভব করে। কিন্তু যদি একাকী থাকে তবে প্রতিটি মুহূর্তে ভয় ও উৎকণ্ঠায় থাকে যে, অন্যরা তাকে কষ্ট দেবে।
যে মানুষ আল্লাহর সঙ্গে স¤পৃক্ত, তিনি বিশাল শক্তিধর, খোদাদ্রোহী ও আত্মঅহংকারী লোকদের সম্মুখে শক্তি অনুভব করেন।
৩. সম্মান অনুভব
“সম্মান” অর্থ প্রভাব ও প্রতিপত্তি গ্রহণ না করা। নবীগণের মতাদর্শে সমস্ত প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক হচ্ছেন আল্লাহ্, যেমনভাবে সমস্ত শক্তির মালিকও তিনি। এ জন্যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারও সমীপে যায়, কুরআন তার সমালোচনা করে যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কি অন্য কারও নিকট সম্মান কামনা কর?”( সূরা: নিসা, ১৩৯তম আয়াত )
এটিই স্বাভাবিক যে, সর্বশক্তিমান ও অসীম ক্ষমতার সঙ্গে সংযুক্তি, মানুষকে সম্মান প্রদান করে; যদ্রুপভাবে “আল্লাহু আকবারে’র” ন্যায় শব্দগুলি মানুষের নিকট তাগুতকে (খোদাদ্রোহী) তুচ্ছ করে দেয় এবং তাঁকে তাদের প্রতিপক্ষে শক্তিশালী করে দেয়। আর তাই কুরআন আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছে যে, বিপদাপদে নামায ও ইবাদত দ্বারা যেন আমরা শক্তি-সামর্থ্য অর্জন করি; (ওয়াস্তায়ী’নূ বিস্ সাবরি  ওয়াস্ সালাহ্। ) {সূরা: বাকারাহ, ৪৫তম আয়াত।}

আল্লাহর ওয়ালীগণও স্পর্শকাতর স্থানে নামায দ্বারা নিজেদেরকে বলিয়ান করতেন। কারবালায় মুর্হারমের ৯ম তারিখের আসরের সময়, ইয়াযীদ বাহিনী ইমাম হোসাইনের (আ.) তাঁবু সীমানায় আক্রমণ করে। ইমাম বলেন: যুদ্ধ-বিগ্রহকে এক রাত্রি বিলম¡ কর! কারণ আমি নামায ভালবাসি এবং আমি সকাল পর্যন্ত আজকের রাত্রিটি ইবাদতে কাটাতে চাই।( মাকতালুশ্ শাম্স, পৃ. ১৭৯)
আল্লাহর সৎ বান্দাগণ শুধুমাত্র ওয়াজিব নামাযগুলিই নয় বরং মুস্তাহাব নামাযগুলিও ভালবাসেন। নফল নামাযগুলি হচ্ছে নামাযের প্রতি প্রেমের নিদর্শন। ওয়াজিব নামাযগুলি হয়তোবা আল্লাহর ক্রোধের আশংকায় মানুষ আদায় করে থাকেন; কিন্তু মুস্তাহাব নামাযগুলিতে ভীতির প্রশ্ন নেই, বরং প্রেমের প্রশ্ন রয়েছে।
হ্যাঁ, কেউ কাউকে ভালবাসলে তার সঙ্গে বেশী বেশী কথা বলতে আশাপোষণ করে ও তাকে যেতে দিতে চায় না। এটা কিভাবে সম্ভব হতে পারে যে, মানুষ আল্লাহকে ভালবাসার দাবি করবে অথচ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইবে না?!
অবশ্য নফল ও নামাযের প্রতি এ অনিহা অকারণে নয়। বরং হাদীসের বর্ণনানুসারে, দিবসের পাপ নৈশ নামায ও সুবহে সাদিকের নফলের সামর্থ্য নষ্ট করে দেয়। ( বিহার, ৮৩তম খন্ড, পৃ. ১২৭ )
যাই হোক, যে ব্যক্তি নফল নামায আদায় করে না সে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট হতে অনুগ্রহ পাওয়ার আশা রাখে না। যেমনভাবে, কোনো ব্যক্তি সংস্কারকের জন্যে অপেক্ষা করলে, তার নিজেকে সংস্কার করতে হবে।
নফল নামাযগুলি ওয়াজিব নামাযগুলির ঘাটতি পূরণ করে।  ( তাফসীরে আত্ইয়াবুল বায়ান, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬১ ) জনৈক ব্যক্তি ইমামকে জিজ্ঞাসা করলেন: নামাযে আমার মনোযোগ থাকে না এবং নামাযের বরকতসমূহ হতে আমি বঞ্চিত, কি করব? তিনি উত্তর দিলেন: ওয়াজিব নামাযসমূহের পরে নফল নামাযসমূহ আদায় কর, সেগুলি তোমার নামাযের ঘাটতির পরিপূরক ও তোমার ওয়াজিব নামাযগুলি গ্রহণের কারণ হবে।
এ অবদান ও বরকতের কারণেই আল্লাহর ওয়ালীগণ শুধু ওয়াজিব নামাযসমূহের প্রতিই নন বরং মুস্তাহাব নামাযসমূহের প্রতিও অধিক গুরুত্বারোপ করতেন এবং যা কিছু এ আধ্যাত্মিক সফর ও আত্মার উৎকর্ষে বিঘ্ন ও প্রতিবন্ধক, যেমন: অতিভোজন, বাচালতা, অতিনিদ্রা, হারাম আহার্য, ক্রীড়াকৌতুক এবং দুনিয়ার প্রতি মত্ততা যা মানুষকে ইবাদত হতে দূরে সরিয়ে দেয় এবং নামাযকে তার উপর বোঝা করে দেয়, এসব হতে বিরত থাকতেন; “ওয়া ইন্নাহা লাকাবীরাতুন্ ইল্লা ’আলাল খাশিয়ী’ন।” সূরা: বাকারাহ, ৪৫তম আয়াত )  নিশ্চয় বিনয়ী লোক ব্যতীত অন্যদের নিকট নামায কঠিন কাজ। ( সূত্র :  তাফসীরে নামায গ্রন্থ থেকে)

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More