সংকলনেঃ মনি বিন হোসেন
ইসলামী বিপ্লবের পথিকৃত ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আয়তুল্লাহ রুহুল্লাহ মুসাভী আল উজমা আল খোমেইনী (রহঃ) ২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯০২ খৃষ্টাব্দে, ২০শে জমাদিউস সানি, ১৩২০ হিজরী সনে, হযরত ফাতিমা (সালামুল্লাহ আলাইহা) এর জন্ম দিনে ইরানের খোমেইন শহরে এক প্রসিদ্ধ ধর্মীয় পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। হযরত ইমামের আসল নাম ‘রুহুল্লাহ’ এবং পারিবারিক উপাধী ছিল ‘মোস্তফাভী’। কিন্তু তিনি ধর্মীয় নেতা হিসাবে খ্যাতিলাভের সাথে সাথে তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী খোমেন শহরের অধিবাসী হিসাবে তিনি খোমেইনী নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করেন। এছাড়া তাঁর নামের দ্বিতীয় অংশ ‘মুসাভী’ একথাই নির্দেশ করে যে তিনি আহলে বাইতের সপ্তম ইমাম হযরত মুসা কাজিম (আঃ) এর বংশধর ছিলেন। ইমাম খোমেইনী (রহঃ) এর পিতা আয়াতুল্লাহ সায়েদ মোস্তফা মুসাভী ছিলেন একজন ধর্মীয় নেতা। তাঁর মাতা হাজেরা খানম ছিলেন খোমেইন অধিবাসী খোনসারের প্রখ্যাত আলেম এবং ধর্মীয় নেতা মীর্জা আহমদ খোনসারীর মেয়ে। শৈশবকালেই ইমামের (রহঃ) পিতা দুস্কৃতিকারীদের হাতে শাহাদতবরণ করেন (১৩২০হিজরী, ২৮ শে অক্টোবর, ১৯০২ খৃঃ)। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তিনি শাহাদতবরণ করেন। এই সময় ইমাম খোমেইনী (রঃ) এর বয়স ছিল মাত্র ৫ মাস। ইমামের পনের বছর বয়সে ১৯১৮ খৃস্টাব্দে তাঁর মাতাও তাঁকে রেখে ইন্তেকাল করেন। ইমাম খোমেইনী (রহঃ) এর তিন ভাই ও তিন বোন ছিলেন। তাঁর বড় ভাই আয়াতুল্লাহ পাছান্দিদেহ ছিলেন একজন মুজতাহিদ। তাঁর ছোট ভাই আয়াতুল্লাহ হিন্দীও একজন মুজতাহিদ ও ফকীহ ছিলেন। উল্লেখ্য যে, ইমাম খোমেইনী (রহঃ) এর পূর্ব পুরুষগণ কাশ্মীরের অধিবাসী ছিলেন। হযরত ইমাম খোমেইনী (রহঃ) তাঁর বড় ভাইয়ের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি আরাক শহরের দ্বীনি শিক্ষা কেন্দ্রে ভর্তি হন। তারপর ধর্মীয় নগরী কোম এ এসে তিনি জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি স্বীকৃত মুজতাহিদ পর্যায়ে উন্নীত হতে সক্ষম হন। অতঃপর তিনি কোমের দ্বীনি শিক্ষা কেন্দ্রে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৬৪ইং সনে দেশ থেকে নির্বাসিত হবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানে অধ্যাপনা অব্যাহত রেখেছিলেন।
হযরত ইমাম খোমেনী (রহঃ) ২৭ বছর বয়সে বিবাহ করেন। তাঁর স্ত্রী বেগম বায়তুল সাকাফীও এক ধর্মীয় পরিবারের কন্যা। তাঁরা দুই পুত্র এবং তিন কন্যা মোট পাঁচ সন্তানের জনক জননী। ইমামের প্রথম পুত্র আয়াতুল্লাহ মোস্তফা খোমেনী বিপ্লবের প্রায় দেড় বছর পূর্বে সাভাক এজেন্টদের হাতে ইরাকে শহীদ হন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়েদ আহমদ খোমেনী ইরান এবং বিশ্বের একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ইমামের প্রথমা কন্যা বেগম জাহরা মোস্তাফাভী ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মহিলা সমিতির সভানেত্রী।
আন্দোলন ও নেতৃত্বে ইমাম খোমেনী (রহঃ) সর্বদা সংগ্রামমুখর ছিলেন। তিনি নিজেও জ্ঞান চর্চা ও জ্ঞান সাধনার পাশাপাশি দেশের সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর দৃষ্টি রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতেন। বিশেষ করে ইরানে দ্বীনি শিক্ষা কেন্দ্রগুলো সর্বদা সরকারী নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকায় এবং ইসলাম সম্পর্কে ওলামাদের ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান থাকায় আলেম সমাজের এক বিরাট অংশ সব সময়েই স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মুখর ছিলেন। ইরানে বৃটিশ এজেন্ট রেজা খান দেশ থেকে ইসলামী মূল্যবোধ অপসারণ করতে এবং পশ্চিমা ভাবধারা চালু করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। তার একাজে একদল পশ্চিমা এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরা এগিয়ে আসে। তারা ওহাবী চিন্তাধারার আশ্রয় নিয়ে ইসলামের বহু মৌলিক বিষয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে থাকে। ইসলামের বিরুদ্ধে এরূপ আদর্শিক আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে ইমাম খোমেনী (রহঃ) এ সময় (১৯৪১ইং সনে) ‘কাশফুল আসরার বা গোপন রহস্যের ফাঁস’ নামে একখানি গ্রন্থ রচনা করেন। এই বই প্রকাশের ফলে পাশ্চাত্যপন্থী বুদ্ধিজীবিদের আদর্শিক, সাংস্কৃতিক আক্রমণ সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়ে যায়। জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করে এবং তারা জনগণের কাছে ইসলাম ও দেশের দুশমন এবং বহিঃশক্তির তাবেদাররূপে চিহ্নিত হয়ে যায়। ১৯৬২ইং সালে কোমের জ্ঞান চর্চা কেন্দ্রের প্রধান এবং তখনকার সারা ইরানের ওলামায়ে কেরামগণের নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ বুরুজেরদী (রহঃ) ইন্তেকাল করলে ওলামায়ে কেরামগণ হযরত ইমাম খোমেইনী (রহঃ)কে তাঁর স্থলাভিষিক্তরূপে বরণ করে নেন। তখন থেকেই ইমাম খোমেনী (রহঃ) জাতীয় দ্বীনী নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। জনগণের বিক্ষোভের মুখে শাহ রেজা ১৬ই জানুয়ারী, ১৯৭৯ইং সালে দেশ ত্যাগ করেন। ১লা ফের্রুয়ারী ১৯৭৯ সালে ইমাম ফ্রান্সের নির্বাসন থেকে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রায় পঞ্চাশ লাখ নারী পুরুষ বিমান বন্দরে ইমাম খোমেনী (রঃ)কে অভ্যর্থনা জানায়। ইসলামী বিল্পবের প্রায় দশ বছর পর ৩রা জুন ১৯৮৯ সালে রাত দশটা বিশ মিনিটের সময় তিনি ইন্তেকাল করেন। তেহরানে এক কোটি মানুষ ইমামের নামাজে জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করেন। ইমামের মৃত্যুতে যত মানুষ অশ্র“ ঝরিয়েছে বিশ্বের ইতিহাসে কোন দিন কোন ব্যক্তির ইন্তেকালে এত মানুষের অশ্র“ ঝরেনি। মহান আরেফ হযরত ইমাম খোমেইনী (রঃ) মাজার এখন দেশ, বিদেশের মুসলমানদের পবিত্র জিয়ারতগাহ।
ইমাম খোমেইনী (রহঃ) ২৮শে মে ১৯৬৯ খৃষ্টাব্দে ইরাকের নাজাফে নির্বাসনে থাকাকালীন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “বিলায়াত এ ফকীহ” (ফকিহদের শাসন) অর্থাৎ, “ইসলামী আইনজ্ঞ খাঁটি আলেম দ্বারা পরিচালিত সরকার” রচনা করেন। এই বইটি আমাদের দেশে “ইসলামী বিপ্লব কি ও কেন” বা “বিলায়েতে ফকীহ বা ইসলামী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ও বৈশিষ্ট্য” নামে প্রকাশিত হয়েছে। এই বইটি ইরানের ইসলামী বিপ্লবের তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করে। কারণ বিলায়াতে ফকীহ বা মুজতাহিদ ফকীহর শাসনের অপরিহার্যতার অর্থই হচ্ছে অ ফকিহর শাসন অবৈধ এবং অগ্রহণযোগ্য, তা রাজতন্ত্র হোক অথবা অন্য যে কোন ধরণের সরকারই হোক। প্রথমে আমাদের জানা দরকার ‘বেলায়াত’ কি? পারিভাষিক অর্থে ‘বেলায়াত’ অর্থ কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ওপর কারো অভিভাবকত্ব বা শাসন কর্তৃত্ব। প্রকৃত পক্ষে, ‘বেলায়াত’ হচ্ছে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের কোনো ব্যপারে অন্য কারো হস্তক্ষেপ বা তার মতামত বাস্তবায়ন। ‘বেলায়াত’ হচ্ছে বিচারবুদ্ধি বা শরীয়তের রায়ের ভিত্তিতে অন্যের শরীর, সম্পদ বা উভয়ের ওপর কারো আধিপত্য ও কর্তৃত্ব। দ্বীনী জ্ঞানের পরিভাষায় ‘ফকীহ’ বা মুজতাহিদ হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি দ্বীন সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন এবং ইসলামী হুকুমাতের দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে পরিপূর্ণরুপে অবহিত। তিনি ইসলাম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ এবং আত্মিক, নৈতিক ও মানসিক দিক থেকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য উন্নত অবস্থানের অধিকারী। তাঁর সত্তায় এমন কতক ও মানসিক দিক থেকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য উন্নত অবস্থানের অধিকারী। তাঁর সত্তায় এমন কতক গুণাবলী স্থায়ীভাবে নিহিত যা তাঁকে গুনাহ ও নাফরমানী থেকে ফিরিয়ে রাখে এবং এর ফলে তিনি প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকেন। এ ধরনের উন্নত ও লক্ষণীয় গুণাবলী ও বেশিষ্ট্য সমূহকে সমন্বিতভাবে ‘ইদালাত’ বা ভারসাম্যতা, নীতিনিষ্ঠতা, ন্যায়ানুগতা বলা হয়। কোনো ব্যক্তির মধ্যে যখন ফুক্বাহাত বা দ্বীনি জ্ঞানের বিশেষজ্ঞত্ব ও তা দ্বীনি যুগ জিজ্ঞাসার জবাব দানের যোগ্যতা এবং ‘ইদালাত’ থাকে অর্থাৎ একই সাথে দ্বীনি জ্ঞানের বিশেষজ্ঞত্ব ও তা অনুসরণের ক্ষেত্রে ঐকান্তিকতা ও নিষ্ঠা ব্যাপক ও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় তৈরী হয়ে যায় এবং সেই সাথে তাঁর মধ্যে সমাজ পরিচালনার জন্যেও যথেষ্ট যোগ্যতা তৈরী হয়ে যায়, তখন তিনি বেলায়াতের অধিকারী হন। আর ‘বেলায়াত’ পরিভাষাটি যখন ‘ফাক্বীহ’ পরিভাষার সাথে যুক্ত করে ব্যবহার করা হয় অর্থাৎ পরিভাষা হিসেবে ‘বেলায়াতে ফাক্বীহ’ বলা হয়, তখন তার মানে হয় সমাজ বা রাষ্ট্রের ওপর মুজতাহিদের শাসন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব।
হযরত ইমাম খোমেইনী (রঃ) তাঁর ‘বেলায়াতে ফকীহ’ গ্রন্থের ৪০নং পৃষ্ঠায় বলেনঃ “হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) এর হুকুমাতী এখতিয়ার আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আঃ) এর হুকুমাতী এখতিয়ারের চেয়ে বেশী ছিলো বা হযরত আলী (আঃ) এর হুকুমাতী এখতিয়ার ফকীহর (মুজতাহিদের) হুকুমাতী এখতিয়ারের চেয়ে বেশী ছিলো, এরুপ ধারণা পুরোপুরি ভ্রান্ত ও পরিত্যাজ্য।” হযরত ইমাম খোমেইনী (রঃ) তাঁর “আল বাই বা বেচাকিনা” গ্রন্থে বেলায়াতে ফকীহ সংক্রান্ত আলোচনায় বলেছেনঃ “রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারণ সংক্রান্ত যে সব বিষয়ের এখতিয়ার হযরত রাসূল (সাঃ) ও ইমামগণের (আঃ) জন্য প্রযোজ্য, তার সবই ‘আদেল বা ন্যায়বান ও ভারসাম্যের অধিকারী ফকীহর জন্যও প্রযোজ্য।” ইমাম(রঃ) তাঁর ‘ছাহীফায়ে নূর’ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খন্ডের ২৩৭নং পৃষ্ঠায় বলেন, “পরিপূর্ণ শর্তাবলীর অধিকারী ফকীহগণ মা’ছুমগণের (আঃ) পক্ষ থেকে শরয়ী, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের সকল বিষয়ে প্রতিনিধিত্বের অধিকারী এবং হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) এর অন্তর্ধান অবস্থায় থাকার যুগে সকল বিষয়ই তাঁদের ওপর অর্পিত।” ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানের ৫৭নং ধারায় বলা হয়েছে, মুজতাহিদ শাসকের শাসন কর্তৃত্ব হচ্ছে ‘নিরঙ্কুশ কর্মদায়িত্ব’। তাই নবী ও ইমামগণের (আঃ) জন্য যত রকমের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক দায়িত্ব নির্ধারিত আছে তার সবই ‘আদেল ফকীহর জন্য নির্ধারিত। হযরত ইমাম খোমেইনী (রঃ) তাঁর ‘ছাহীফায়ে নূর” গ্রন্থে বলেন, “কোনো রাষ্ট্রব্যবন্থা ও সরকার যদি মুজতাহিদ শাসকের অনুমতিক্রমে প্রতিষ্ঠিত না হয় বা মুজতাহিদ শাসকের দ্বারা মনোনীত না হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বা ক্ষমতা আরোহণ করে, তাহলে তা তাগুত।” আর মুসলিম জনগণের দায়িত্ব হচ্ছে হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) এর অদৃশ্য থাকার যুগে মুজতাহিদগণের হুকুমাত ও শাসন কর্তৃত্ব বাস্তবায়নের জন্যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। বস্তুতঃ নবী, রাসূলগণ (আঃ) ও মা’ছুম ইমামগণের (আঃ) বেলায় যেমনটি ঘটেছে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণ না চাইবে ততক্ষণ পর্যন্ত মুজতাহিদ স্বীয় হুকুমাত ও শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তি প্রয়োগের আশ্রয় গ্রহণ করবেন না। জনগণ যদি সমর্থন করে ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে কেবল তখনই দ্বীনের ও মুজতাহিদগণের হুকুমাত প্রতিষ্ঠিত হবে। হযরত ইমাম খোমেইনী (রঃ) তাঁর ‘বেলায়াতে ফকীহ’ গ্রন্থেও ১৪৯ নং পৃষ্ঠায় বলেন, “বেলায়াতে ফকীহ’ বিষয়টি আমাদের উদ্ভাবিত কোনো নতুন বিষয় নয় বরং এ বিষয়টি শুরু থেকেই একটি আলোচ্য বিষয় ছিলো।” বস্তুতঃ ইসলামী বিপ্লবের পথিকৃৎ হযরত ইমাম খোমেইনী (রঃ) যে কাজটি আঞ্জাম দেন তা হচ্ছে, তিনি বেলায়াতে ফকীহ তত্ত্বকে বিকশিত করেন এবং ফিকাহ শাস্ত্রের সকল বিভাগে এর ছায়া বিস্তার করে দেন। এরপর তিনি আলোচ্য বিষয়টিকে বাস্তবে রূপায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং সমাজের বুকে মুজতাহিদ শাসকের নেতৃত্বাধীন দ্বীনি হুকুমাত প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত ইমাম খোমেইনী (রঃ) বলেন, বিশ্বের সকল মুসলমান ও নির্যাতিত জনগণের প্রতি আমার অসিয়তঃ আপনাদের স্ব স্ব দেশের শাসকবর্গ ও কর্তাব্যক্তিরা বা বিদেশী শক্তিবর্গ নিজেরা এসে আপনাদেরকে মুক্তি ও স্বাধীনতা উপহার দেবে এ আশায় বসে থাকবেন না। অপরাধী শাসকগোষ্ঠী আপনাদের কষ্টার্জিত সম্পদকে আপনাদের ও ইসলামের দুশমনদের হাতে তুলে দেয়ার কারণে তাদেরকে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করুন। আপনারা নিজেরাই এবং জনসেবকগণ দেশের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করুন। (আলোর পথে, পৃঃ ৭৮)
ইমাম বলেন, “ফিকাহবিদরাই ইসলামেরর দুর্গ। তাদেরই কর্তব্য জনগণের সম্মুখে প্রকৃত সত্য আকীদার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা, ইসলামের সাংগঠনিকতাকে রূপায়িত করা। দ্বন্দ্ব ও জিহাদের পথকে উন্মুক্ত ও উদ্ভাসিত করা, এক কথায় জনগণকে নেতৃত্বদান। কেননা, জনগণ যখন তাঁদের মধ্যে ঐকান্তিকতা, স্বার্থহীনতা, যোগ্যতা ও আত্মত্যাগ প্রত্যক্ষ করবে, তখন তারা স্বতঃস্ফুর্তভাবেই তাঁদের নেতৃত্ব ও আনুগত্য স্বীকার করে নিবে।” (ইসলামী বিপ্লব কি ও কেন, পৃঃ ১৩০), লোকদের হুকুমাত কায়েম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর করার লক্ষ্যে একজন ‘উলিল আমর’ দায়িত্বশীল প্রশাসকের অপরিহার্যতা প্রমাণের জন্যে ইমাম (রঃ) অনেক কারণের কথা উল্লেখ্য করেছেন। তার মধ্যে একটি কারণ হলো, “আল্লাহ যদি মানুষের ওপর একজন সক্ষম, বিশ্বস্ত, সংরক্ষক আমানতদার নিযুক্ত না করতেন তাহলে উম্মার পতন ঘটতো, দ্বীন বিলীন হয়ে যেত, নাজেলকৃত হুকুম আহকামের বিকৃতি ঘটতো। বিদয়াতকারদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেত এবং ফাসেকরা মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন সন্দেহের বীজ ঢুকিয়ে দ্বীনের মহা ক্ষতি সাধন করতো। যদি নবী (সাঃ) এর উপর যা নাযিল হয়েছে তা সংরক্ষণের জন্য একজন আমানতদার নিয়োগ করে দেয়া না হতো তাহলে বিশৃঙ্খলা আর বিপর্যয় দেখা দিতে থাকতো পূর্বোক্ত পথগুলো ধরে। নাযিলকৃত আইন, বিধান, রীতি নীতি তথা আকীদা বিশ্বাসের আমূল বিকৃতি ঘটতো এবং সমগ্র মানবজাতির জন্যে চরম দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই থাকতো না।” (ইসলামী বিপ্লব কি ও কেন, পৃঃ ৪৬), ইমাম খোমেইনী (রহঃ) বলেন,“ফিকাহ শাস্ত্রে পারদর্শীরাই হচ্ছেন সকল দেশের উপযুক্ত শাসক। রাজা, বাদশাহ বা কর্তৃত্বসম্পন্ন শাসকগণ যদি দ্বীনদার হয়, তা হলে তাদের কার্যাবলীতে ফিকাহবিদদের নিকট থেকেই প্রয়োজনীয় আইন জেনে নিতে হবে। এরূপ অবস্থায়ও প্রকৃত শাসক হচ্ছেন ফিকাহবিদগণ। আর রাজা বাদশাহ বা কর্তৃত্বসম্পন্ন শাসকগণ নিছক কর্মচারী মাত্র। তারা ফিকাহবিদদের নিকট থেকে আইন গ্রহণ করে তদনুযায়ী কাজগুলো সুসম্পন্ন করে যাবে।”(ইসলামী বিপ্লব কি ও কেন, পৃঃ ৫৪)
তবে ইমাম খোমেইনী (রহঃ) আলেমদের উদ্দেশ্যে তাঁর অসিয়ত নামায় বলেন, “সেই সকল আলেম ও আলেম বেশধারী যারা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও এর প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরোধিতা করছে, এর উৎখাতে নিজেদের সময় ও শ্রম ব্যয় করছে, সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্রকারী ও রাজনৈতিক চালবাজদের সাহায্য করছে, এমনকি যেরূপ বলতে শোনা যায় একাজে তারা খোদাবিমুখ পুঁজিপতিদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ গ্রহণ করছে এবং তার বিনিময়ে তাদেরকে ব্যাপক সহযোগিতা প্রদান করছে, তাদের প্রতি আমার অসিয়ত, আপনারা এই ভ্রান্ত কর্মকান্ডগুলো পরিত্যাগ করুন যা এখনও পরিত্যাগ করেননি এবং এরপরও ত্যাগ করবেন বলে মনে হয়না। আপনারা যদি পার্থিব স্বার্থে এ কাজে হাত বাড়িয়ে থাকেন তাহলে আল্লাহতায়ালা আপনাদেরকে এ ঘৃণ্য লক্ষ্যে উপনীত হবার কোন সুযোগই যেন না দেন। এটাই উত্তম যে তওবার দুয়ার খোলা থাকতেই তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন।” (আলোর পথে, ৭৬ পৃঃ)।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি মহান নেতা ইমাম খোমেইনী (রঃ) এই “বেলায়াতে ফকীহর” ধারনাকে নতুন মাত্রায় উজ্জীবিত করে নবচেতনার সৃষ্টি করেন বিশ্বের নির্যাতিত জনগণের মধ্যে।###