পশ্চিমা বিশ্ব স্বাধীনতায় সহযোগিতা, রেনেসাঁ, নারীর বিভিন্ন অধিকার রক্ষা, উদারদৃষ্টি এবং বিভিন্ন প্রতারণামূলক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের আধ্যাত্মিকতা, ধার্মিকতা ও বেলায়াতের প্রতি আক্রমণ করছে। ওরা ঝঞ্ছা-বিক্ষুব্ধ বিলিয়নাধিক মানবসমাজে দলে দলে ইসলামের প্রতি মানুষকে আসতে দেখে এবং ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের দিকে প্রত্যাবর্তনের নিমিত্তে মুসলমানদের কোলাহল দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে এবং ইসলামী মহান বিপ্লবের বিপরীতে এমন কোনো ষড়যন্ত্র নেই যা তারা করেনা! আমাদের তরুণ সমাজের উচিৎ স্বীয় আক্বিদা বিশ্বাস ও নীতি-পদ্ধতির পথে স্থির ও সুদৃঢ় থেকে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করা যাতে স্বীয় মাওলা ও অভিভাবককে (যুগের ইমাম) খুশি ও সন্তুষ্ট করতে পারে। এসব হিংসা-বিদ্বেষ, ধোঁকা, প্রতারণামূলক বিভিন্ন রাজনীতি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, নাস্তিক্য ও ইসলাম বিদ্বেষী চিন্তাভাবনা, অলক্ষুণে প্রচারণাসমূহ ও মজদুরদের হাতের কলমের বিপরীতে এই মুসলিম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তরুণদেরই দ্বীন ইসলাম এবং এর বিভিন্ন মূল্যমান ও লক্ষ্য- উদ্দেশ্যের প্রতিরক্ষা করতে হবে এবং ষড়যন্ত্রসমূহকে ব্যর্থ করে দিতে হবে! অপেক্ষাকারী সকল ব্যক্তিকেই ইসলামের বিভিন্ন পরীক্ষা এবং ইসলামের চিন্তাগত ও আক্বিদা-বিশ্বাসগত সীমানাসমূহের সংরক্ষণ করতে হবে! যদি “জিহাদে আকবার” ও “জিহাদে কাবীর” গায়বাতকালের অপেক্ষাকারী ব্যক্তিগণের দায়িত্ব-কর্তব্যের অংশ হয়ে থাকে তাহলে অনেক সমস্যার সৃষ্টি করবে। জিহাদে আকবারেরও এই সমস্যা রয়েছে এবং জিহাদে কাবীরেরও রয়েছে। যিনি নিজেকে গঠন করতে চান তাকে এসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে এবং যিনি অন্যদেরকে গঠন করতে চান তাকেও এসব সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে হবে! অবশ্য প্রকৃত অপেক্ষাকারী ব্যক্তিগণ স্বীয় কর্তব্য পালনের পথে দৃঢ়তা দেখাবেন ও রুখে দাঁড়াবেন। যেসব দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রতি বিশেষ নজর দিলে ইসলামী সমাজের উন্নতি, মহত্ত¡ ও অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ প্রভাব রাখতে পারে তার কতক হচ্ছে নিম্নরূপ:
১। আল্লাহর হুজ্জাত ও যুগের ইমামের (আ.ফা.) পরিচয় অর্জন: অপেক্ষাকারী প্রত্যেক শিয়ারই কাঁধে সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে দায়িত্ব রয়েছে তা হচ্ছে স্বীয় যুগের ইমাম ও হুজ্জাতের পবিত্র অস্তিত্বের পরিচয় অর্জন করা। এ বিষয়টি এতটাই গুরুত্ব রাখে যে, হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَعْرِفْ إِمَامَ زَمَانِهِ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةٌ . অর্থাৎ কেউ যদি স্বীয় যুগের ইমামের পরিচয় অর্জন ব্যতীত মারা যায় তাহলে সে এক প্রকারের জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল!’ অবশ্য বিভিন্ন হাদীসে “ইমামের পরিচয় অর্জন” করার প্রতি যে ইঙ্গিত করা হয়েছে তার উদ্দেশ্যকে নিম্নরূপে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে: নিঃসন্দেহে ইমামে যামান (আ.ফা.) সম্পর্কে যে পরিচয় অর্জনের ব্যাপারে আমাদের ইমামগণ (আ.) নির্দেশ দিয়েছেন তা হচ্ছে এই যে, আমরা এমনভাবে তাঁর পরিচয় অর্জন করব যাতে এই পরিচয় অর্জনের কারণে নাস্তিক্যবাদীদের সৃষ্ট বিভিন্ন সন্দেহ থেকে আমরা নিরাপদ থাকতে পারি এবং মিথ্যা দাবীদারদের বিভ্রান্তকারী বিভিন্ন কার্য থেকে আমাদের নাজাতের উপকরণ হয়। আর এ ধরনের পরিচয় অর্জন, দু’টি বিষয় ব্যতীত সম্ভব নয়; যার প্রথমটি হচ্ছে, ইমামে যামানের (আ.ফা.) নাম ও বংশ সম্পর্কে সঠিক পরিচয় অর্জন করা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাঁর গুণ-বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে পরিচয় অর্জন করা। এই দুই প্রকারের পরিচয় অর্জন করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব কাজ।’ অবশ্য দ্বিতীয় বিষয়ে পরিচয় অর্জন করার ফলে অপেক্ষাকারী ব্যক্তিগণের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে পরিবর্তন সাধন হতে পারে। কেননা, কেউ যদি সঠিকভাবে যুগের ইমামের (আ.ফা.) গুণ-বৈশিষ্ট্যাবলী এবং সৃষ্টিজগতে তাঁর ভূমিকা ও মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারে এবং তাঁর (আ.ফা.) নিকট তার নিজের দৈন্যতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবগত হতে পারে তাহলে সে আদৌ তাঁর (আ.ফা.) নামকরণ ও স্মরণ থেকে উদাসীন হবে না। অবশ্য মহান আল্লাহর অনুকম্পা ব্যতীত তাঁর প্রকৃত পরিচয় অর্জন করা সম্ভব নয়। কাজেই মহান আল্লাহর হুজ্জাতের পরিচয় অর্জনের নিমিত্তে তারই দরগাহে তওফিক বা সামর্থ্য প্রার্থনা করা উচিৎ।
২। আত্মার পরিশুদ্ধি ও চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন : অপেক্ষাকারী শিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জন করা ও সচ্চরিত্রে সজ্জিত হওয়া। হযরত ইমাম সাদিক (আ.) হতে বর্ণিত এক হাদীসে উল্লেখ হয়েছে: “যেকেউ হযরত ক্বায়েমের (আ.ফা.) সহযোগীদের অন্তর্ভুক্ত হতে চাইলে তাকে অবশ্যই অপেক্ষা করতে হবে এবং এ অবস্থায় তাকে পরহেযগারিতা অবলম্বন ও সদাচার করতে হবে! আর এ অবস্থায় তিনি মারা গেলে এবং তার মৃত্যুর পর হযরত ক্বায়েমের (আ.ফা.) আত্মপ্রকাশ ঘটলে তিনিও সেসব লোকের ন্যায়ই নেকি লাভ করবেন যারা তাঁর (আ.ফা.) দিদার লাভ করবেন। তাহলে আপনারা চেষ্টা চালিয়ে যান এবং অপেক্ষায় থাকেন! হে আল্লাহর করুণাপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত লোকেরা, আপনাদের জন্যে সুসংবাদ!” “বিহারুল আনওয়ার, ৫৩তম খন্ড, পৃ. ১৭৭। হযরত ইমামে যামানের (আ.ফা.) পক্ষ থেকে শেখ মুফিদের জন্যে এক সম্মানিত স্বাক্ষর সম্বলিত যে অনুমোদনপত্র আসে তাতে উল্লেখ ছিল যে, তাঁর (আ.ফা.) গায়বাত দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে তাঁর অনুসারীদের তরফ হতে বিভিন্ন অশ্লীল কার্য ও পাপকার্য সংঘটিত হওয়া এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা থেকে তাদের দূরে সরে যাওয়া।
৩। বেলায়াতের মর্যাদার সঙ্গে সম্পৃক্ততা: যুগের ইমামের (আ.ফা.) সঙ্গে আন্তরিক সম্পৃক্ততা সংরক্ষণ ও সুদৃঢ় করা এবং সর্বদা তাঁর সঙ্গে প্রতিশ্রুতি নবায়ন করাটা অপেক্ষাকারী শিয়াদের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন প্রকৃত শিয়া ও অপেক্ষাকারী ব্যক্তি, মহান আল্লাহর সেই হুজ্জাতের বাহ্যিক গায়বাত ব্যতীত আদৌ যেন অনুভব না করেন যে, তিনি সমাজে মুক্ত ও দায়িত্বহীন রয়েছেন এবং স্বীয় নেতা ও অনুসৃত ব্যক্তি সম্পর্কে তার কোনো দায়িত্ব নেই। শিয়াদের নিকট চাওয়া হয়েছে যে, তারা যেন প্রত্যেক দিবসের শুরুতে এমনকি প্রত্যেক ওয়াজিব নামাযের পর “দোয়ায়ে আহাদ” পাঠ করেন যা বেলায়াতের মহান পদমর্যাদার সঙ্গে শিয়াদের সার্বক্ষণিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব নির্দেশ করে। একজন শিয়া যদি দিবসের শুরুতেই জাগ্রত হৃদয় ও মনোনিবেশ সহকারে ইমামের (আ.ফা.) সঙ্গে এরূপ এক প্রতিশ্রুতি নবায়ন করেন তাহলে আদৌ তিনি কোনো স্থবিরতা, লাঞ্ছনা, অপদস্থতা এবং অত্যাচার ও অবিচারকে মেনে নেবেন না। আদৌ তিনি কোনো সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হবেন না এবং কোনো বিচ্ছিন্নতাবোধ, হতাশা, নিরাশা ও অবক্ষয়ের মুখোমুখি হবেন না। দোয়ায়ে আহাদের গুরুত্ব ও মূল্যমানের কারণে আমরা তার অংশবিশেষ উল্লেখ করছি: “হে আল্লাহ! আমি আজ প্রত্যুষে এবং আমার জীবনকালের পুরো সময়ে যুগের ইমামের (আ.ফা.) যে প্রতিশ্রুতি, বন্ধন ও বাইয়াত আমার কাঁধে রয়েছে সেসবের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে এমর্মে প্রতিশ্রুতি নবায়ন করছি যে, আমি আদৌ সেই প্রতিশ্রুতি ও বাইয়াত থেকে প্রত্যাবর্তন করব না এবং তার উপর সুদৃঢ় থাকব। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তাঁর সাহায্যকারী, তাঁর পবিত্র সীমারেখার প্রতিরক্ষাকারী, তাঁর বিভিন্ন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দ্রুতকারী, তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনকারী, তাঁর সম্মানিত সত্তার সহযোগিতাকারী, তাঁর চাহিদা পূরণের পানে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী এবং তাঁর দলে ও তাঁর সম্মুখে শাহাদত লাভকারীগণের অন্তর্ভুক্ত করে দাও!”
৪। আল্লাহর হুজ্জাতের আত্মপ্রকাশের নিমিত্তে প্রস্তুতি গ্রহণ এই যুগে শিয়াদের আবশ্যক হচ্ছে, সামরিক অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার মাধ্যমে হযরত ক্বায়েমের (আ.ফা.) শত্রæদের সঙ্গে মোকাবেলা করার জন্যে নিজেদের দিবসকে প্রস্তুত করতে হবে। অবশ্য বর্তমানে শিয়াদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ইসলামী অঞ্চলে পরিপূর্ণ যোগ্যতার অধিকারী এক ফকিহর শাসনব্যবস্থা বজায় থাকায় সবার আগে এই দায়িত্বটি ইসলামী সরকারের কাঁধেই বর্তায়। এই সরকার তার দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতি দিয়ে রাখবে যাতে মহান আল্লাহ যখনই স্বীয় অনুগ্রহে মানববিশ্বের ত্রাতার আবির্ভাবের ইচ্ছা করবেন তখনই যেন তারা সর্বোত্তম পন্থায় তাঁর সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারেন। এই দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে হযরত ইমাম সাদিক (আ.) হতে নিম্নরূপ এক হাদীস বর্ণিত হয়েছে: “তোমাদের প্রত্যেকেই যেন হযরত ক্বায়েমের (আ.ফা.) আবির্ভাবের জন্যে একটি করে অস্ত্র প্রস্তুত করো, যদিও তা একখানা তীর হোক না কেন! কেননা, মহান আল্লাহ যখনই কারও এরূপ নিয়াতের বিষয় জানতে পারবেন তখন আশা করা যায় যে, তিনি এমনভাবে তার আয়ু বাড়িয়ে দেবেন যাতে সেই ব্যক্তি তাঁর (আ.ফা.) সাক্ষাৎ পেতে পারে (তাঁর সঙ্গী ও সহযোগী হতে পারে)!”বিহারুল আনওয়ার, ৫৩তম খন্ড, পৃ. ১৭৭।