ইমাম রেযা (আ.)-এর দূরদর্শিতা বনাম রাজনৈতিক অঙ্গন

ইমাম আলী ইবনে মূসা রেযা (আ.) তাঁর যুগে বনু হাশিম গোত্রের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত, জ্ঞানী ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আহলে সুন্নাত ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি ছিলেন সেই সময়ের প্রকৃত ও যোগ্য খলিফা। (মুরুজুয যাহাব, খন্ড ৯, পৃষ্ঠা ৩৯২)
তবে খেলাফতের প্রতি ইমাম রেযা (আ.)-এর কোনো আগ্রহ ছিল না। বরং তিনি জনগণের মাঝে ধর্মীয় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া, মানুষকে ইসলামের মৌলিক বিষয়ে সচেতন করা এবং সমাজের সমস্যাগুলো দূরীকরণকে অগ্রাধিকার দিতেন। (আল-ইমামা ওয়াত-তাবসেরা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭৭)
এই মনোভাবের জন্য যায়দি মতবাদ অনুসারীরা তাঁর বিরোধিতা করত। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদতের পর আহলে বাইতের (আ.) অনুসারীদের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। (আল-খারায়েজ ওয়াল-জারায়েহ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪১-৩৬৫)
শাহাদতের পর অনেকেই যায়দিদের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং ইমামদের অনুমতি ছাড়া বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়ে। তবে ইমাম সাজ্জাদ, বাকির, সাদিক এবং কাযিম (আ.) এসব আন্দোলন থেকে দূরে ছিলেন এবং এগুলোকে ফলহীন মনে করে সমর্থন করেননি। (তারিখে ইয়াকুবি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৯; কাফি, খন্ড১, পৃষ্ঠা ৩৬৬; খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪২-২৪৩; মুরুজুয যাহাব, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৭২-২৭৩)
ইমাম সাদিক (আ.)-এর চাচা যায়দ, মক্কায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে খলিফার মতো বাইয়াত নেন। ইমাম রেযা (আ.) তাঁকে পরামর্শ দেন তাঁর পিতা ও ভাইদের পথে ফিরে যেতে। পরে এই আন্দোলন মামুন দ্বারা দমন করা হয় এবং ইমাম রেযা (আ.) বলেন, “আমি কখনো তাঁকে সমর্থন করিনি এবং করব না।” (আল-ইরশাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২১১; আল-ইমামা ওয়াত-তাবসেরা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২২১-২২৪)
১৯৯ হিজরিতে তাঁর ভাই যায়দ বিন মূসা ‘যায়দুন নার’ বাসরায় বিদ্রোহ করে, পরে মামুনের হাতে গ্রেফতার হয়। এরপর ইমাম রেযা (আ.) তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেন। কারণ এই বিদ্রোহের ফলে অনেক নিরপরাধ আহলে বাইত অনুসারী সরকারি নির্যাতনের শিকার হন।
তাঁর মতোই ইমাম হাসান (আ.)-এর নাতি মুহাম্মাদ বিন সুলায়মান আলাভি মদিনায় বিদ্রোহ করেন। অনেকে ইমাম রেযা (আ.)-কে এই আন্দোলনে আহŸান জানায়, কিন্তু তিনি ভবিষ্যৎ জেনে ২০ দিন পর সাক্ষাৎ স্থির করেন। এরই মধ্যে ১৮ দিনের মাথায় আন্দোলন দমন করা হয়। (আল-ইমামা ওয়াত-তাবসেরা,খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২২৪-২২৫)
এই সমস্ত ঘটনার পর ইমাম রেযা (আ.) মুসলিমদের ঈমান ও চিন্তাচেতনা গঠনে মনোনিবেশ করেন এবং স্পষ্টভাবে অবৈধ সরকারকে মেনে নেননি। বরং অনুসারীদেরকে সরকারি কাজে অংশ নিতে নিষেধ করতেন।
হাসান বিন হাসান আম্বারি ১৪ বছর ইমামের সঙ্গে পত্রালাপ করেন এবং একাধিকবার সরকারের কাজে যুক্ত হতে চাইলে ইমাম (আ.) বারবার নিষেধ করেন। এমনকি বিপদের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করলেও ইমাম (আ.) উত্তরে বলেন, “যদি তুমি রাসুল (সা.)-এর মতো চরিত্রে চলতে পারো এবং সম্পদ দান করো, তাহলে অংশগ্রহণ করো, নইলে নয়।”
ইমাম রেযা (আ.) তাঁর অনুসারীদের সরকারি রোষানল থেকে বাঁচাতে সচেষ্ট ছিলেন। একবার হাসান বিন সাযান অভিযোগ করেন যে, সরকার অত্যাচার করছে। ইমাম (আ.) উত্তরে ধৈর্যের নির্দেশ দেন। (কাফি, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৪৭)
খলিফা মামুন যখন ‘বেলায়াতে আহদ’ (উত্তরাধিকার মনোনয়ন)-এর প্রস্তাব দেন, ইমাম রেযা (আ.) বারবার প্রত্যাখ্যান করেন। পরে অতিরিক্ত চাপের মুখে মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে এই পদ মেনে নেন, তবে কঠিন শর্ত আরোপ করেন, যা রাজনীতিতে মামুনের ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (আল-ইমামা ওয়াত-তাবসেরা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৫৭, ২৬৫)
ইমাম (আ.) কখনো হত্যা বা সন্ত্রাসকে সমর্থন করেননি এবং তাঁর অনুসারীরা বিনা পরামর্শে কিছু করতেন না। বরং তিনি তাঁর বাবার মতো উকিল সংস্থা গড়ে তুলে বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয়-রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। (মোদাররেস তাবাতাবায়ি, পৃষ্ঠা ১৫-২১)
ইমামের উকিলগণ ছিলেন: ১. আবদুল আজিজ বিন মোহতাদি,২. আবদুল্লাহ বিন জুন্দাব, ৩. ইব্রাহিম বিন সালাম নিশাবুরি, ৪. ইব্রাহিম বিন মুহাম্মদ হামেদানি, ৫. আইয়ুব বিন নুহ নাখয়ি (কুফা), ৬. ফাযল বিন সেনান নিশাবুরি (এখতিয়ারুল মারিফাতুর রিজাল, পৃষ্ঠা ৩৫২-৩৫৩), ৭. ইউনুস বিন আব্দুর রহমান কুম্মি, ৮. সাফওয়ান বিন ইয়াহিয়া বাজালি (রিজালে নাজ্জাশি, পৃষ্ঠা ১০২, ১৭, ৩৪৪-৪৪৭)
উকিলদের মধ্যে কেউ কেউ তাকিয়া করতেন, আবার কেউ করতেন না। (আল-ইমামা ওয়াত-তাবসেরা, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৯৬, ২৩১)
শেষপর্যন্ত যখন খলিফা মামুন বুঝতে পারেন যে, ইমামের কার্যক্রম রোধ করা যাচ্ছে না, তখন তিনি ইমাম রেযা (আ.)-কে বিষপ্রয়োগ করে শহীদ করেন। এভাবেই রাসুল (সা.) মনোনীত অষ্টম ইমাম শাহাদতের অমৃত সুধা পান করেন।

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More