ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এবং ফকিরদের সাহায্য-সহযোগিতা

ফকির-মিসকিনদের সাথে ইমাম সাজ্জাদের (আ.) আচরণ মানবতার জন্য আদর্শ ছিল। ইমাম বিভিন্নভাবে ফকির-মিসকিন ও গরিব-অসহায়দের সাহায্য করতেন, যার কিছু দৃষ্টান্ত নিম্নে তুলে ধরা হল:

১। ফকিরদের সাথে সদাচার : ক) ফকিরদের সম্মান করা ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ফকিরদের সাথে নমনীয় আচরণ করতেন এবং তাদের আবেগ অনুভূতির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতেন। ইমাম যখন ফকিরকে সাহায্য দিতেন তখন তার হাতে চুমু খেতেন যাতে সে লজ্জিত না হয় এবং নিজেকে ছোট মনে না করে। নিজেই তাদেরকে স্বাগত জানাতেন এবং তাদেরকে বলতেন: হে আমার আখিরাতের সঞ্চয়! তোমাদেরকে স্বাগতম।

খ) গরিবদের সাথে নমনীয় আচরণ ইমাম সাজ্জাদ (আ.) গরিব ও ফকিরদেরকে অধিক ভালবাসতেন। তিনি ফকির-মিসকিন ও অসহায়দের সাথে একসাথে বসে খাবার খেতেন। তিনি এ কাজে অত্যন্ত আনন্দ অনুভব করতেন। তিনি নিজের হাতে ইয়াতিমদেরকে খাইয়ে দিতেন। তিনি এমনকি তাদের বাড়িতেও খাদ্য-খাবার পৌছে দিতেন। তিনি ফকির-মিসকিনদেরকে এতই ভালবাসতেন যে নিজের গাছের পাকা খেজুর না পেড়ে ওই সকল গরীবদের জন্য রেখে দিতেন যাতে তারা রাতের আঁধারে সেগুলো কুড়িয়ে নিতে পারে। একদা ইমামের এক দাস রাতের বেলা খেজুর পেড়ে আনলে ইমাম তাকে বলেন: তুমি কি জান না যে রাসূল (সা.) বলেছেন, রাতের বেলা ফল এবং খেজুর পাড়তে হয় না। তিনি আরও বলেন: ফসল তোলার সময় অবশ্যই গরিবদেরকে দিবে। কেননা ওই ফসলে তাদের হক (অধিকার) রয়েছে। ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর দস্তরখানায় যখন ফকির, মিসকিন এবং অসহায় লোকরা বসত ইমাম অত্যন্ত খুশি হতেন। ইমাম নিজের হাতে তাদেরকে খাবার তুলে দিতেন এবং তাদের বাড়ির সবার জন্যও খাবার দিয়ে দিতেন। তিনি সর্বদা খাওয়ার পূর্বে সদকা দিতেন। আল-তাকি বলেন: ইমাম আলী ইবনিল হুসাইন যাইনুল আবেদিন সদকা দেয়ার পূর্বে তাতে চুমু খেতেন।

গ) সাহায্যপ্রার্থিকে (ভিক্ষুক) কখনোই তাড়িয়ে দিতেন না :  ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ভিক্ষুককে তাড়িয়ে দিতে নিষেধ করতেন। কেননা এর পরিণাম কখনোই ভাল হয় না। ভিক্ষুককে তাড়িয়ে দিলে মানুষের নেয়ামত ও বরকত দূর হয়ে যায়, আকস্মিক সমস্যা ও মুসিবতের সম্মুখীন হতে হয়। সাইদ বিন মুসাইয়্যেব বলেন: আমি একদা ইমামের কাছে ছিলাম, ইমাম যোহরের নামাজ পড়ছিলেন এমন সময় এক ফকির তাঁর বাড়িতে ভিক্ষা চাইতে আসল। ইমাম বললেন: তার চাহিদা পূরণ কর এবং কখনোই ভিক্ষুককে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিবে না।’ ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বহু রেওয়ায়েতে এ বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন। কোন সাহায্য প্রার্থিকে তার প্রয়োজন না মিটিয়ে তাড়িয়ে দিলে তার নেয়ামত দূর হয়ে যায় এবং তার উপর আল্লাহর গজব নাজিল হয়। ইমামগণ থেকে বর্ণিত বহু হাদিস থেকে ফকিরদের সাহায্য করার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং যারা চায় তাদের উপর আল্লাহর নেয়ামত অব্যাহতভাবে আসতে থাকুক সে যেন কোন ফকিরকে তাড়িয়ে না দেয় এবং আল্লাহর দেয়া নেয়ামত থেকে তাকে বঞ্চিত না করে।

২। দেনাদারের দেনা পরিশোধ করা

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। তিনি দেনাদারদের দেনা পরিশোধ করে দিতেন। চাই সে দেনার পরিমাণ যতই বেশী হোক না কেন। ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে যা থেকে এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) মুহাম্মাদ বিন ওসামা বিন যাইদের সাক্ষাতে গেলেন। সে ইমামকে দেখে ক্রন্দন করতে শুরু করল, ইমাম তার কাছে কারণ জানতে চাইলেন। তখন সে বলল, আমি মানুষের কাছে অনেক ঋণী। ইমাম বললেন: তোমার ঋণের পরিমাণ কত? সে বলল: ১৫ হাজার দেরহাম। ইমাম বললেন: তোমার দেনা আমি পরিশোধ করে দেব। এভাবে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) মুহাম্মাদ বিন ওসামার সমস্যার সমাধান করলেন এবং তার বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগেই তার দেনা পরিশোধ করে দিলেন।

৩। গরিবদের গণহারে খাওয়াতেন

ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর দানশীলতার আরেকটি নমুনা হচ্ছে তিনি মদিনায় প্রতিদিন দুপুরে মানুষকে গণহারে খাওয়াতেন।’

৪। গরিবদের দায়িত্ব নিতেন

ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর মহানুভবতার আরেকটি নমুনা হচ্ছে তিনি মদিনার ১০০ পরিবারকে দেখাশুনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং তাদের প্রত্যেক পরিবারের লোকসংখ্যাও অনেক ছিল।

৫। গোপনে সাহায্য করা

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) মদিনার যে সকল গরিব অসহায়দের সাহায্য করতেন তারা নিজেও জানত না যে ইমাম তাদের সাহায্য করছেন। ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর শাহাদাতের পর তারা বুঝতে পেরেছিল যে, রাতের আঁধারে যিনি আমাদের জন্য সাহায্য নিয়ে আসতেন তিনিই হলেন ইমাম সাজ্জাদ (আ.)। আহমাদ বিন হাম্বাল মোয়াম্মার বিন শাইবা বিন নোয়ামা থেকে বর্ণনা করেন যে, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ১০০টি পরিবারকে সাহায্য করতেন এবং প্রতিটি পরিবারের সদস্যও অনেক ছিল। হিলিয়াতুল আউলিয়া গ্রন্থের লেখক আয়েশা থেকে বর্ণনা করেন যে, গোপনে দান করা কাকে বলে তা মদিনাবাসীরা জানত না। ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর শাহাদাতের পর তারা বুঝতে পেরেছিল যে, গোপনে সদকা দান কাকে বলে।” মুহাম্মাদ বিন ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, মদিনা মুনাওয়ারায় এমনকিছু ঘর ছিল যাদের নিকট নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস প্রতি রাতে পৌঁছে যেত। কিন্তু তারা জানত না যে তা কোথা থেকে আসে বা কে দেয়। ইমাম সাজ্জাদের (আ.) শাহাদাতের পর যখন তারা জানতে পারল তখন তারা আছাড় খেয়ে কাঁদতে শুরু করল। ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) রাতের আঁধারে গরিবদের জন্য বস্তাভরা খাবার নিজের কাঁধে নিয়ে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসতেন।

যারা ইমামের বাড়িতে সাহায্য নিতে আসত, ইমাম তাদেরকেও সাহায্য দিতেন এবং দেওয়ার সময় ইমাম রুমাল দিয়ে নিজে মুখ ঢেকে নিতেন যাতে ফকির ইমামকে চিনতে না পারে। অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত আছে যে, রাতের বেলা যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত তখন ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বস্তার মধ্যে খাবার নিয়ে অসহায়দের সাহায্য করার জন্য বের হতেন। তিনি বস্তা কাঁধে নিয়ে লোকদের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দিতেন। এসময়ে ইমাম রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতেন। ইমাম যেহেতু প্রতি রাতে গরিবদের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতেন তাই অনেকেই রাতের বেলায় ইমামের আসার অপেক্ষায় থাকত। আর ইমামকে দেখেই আনন্দে বলে উঠত বস্তা ওয়ালা এসে গেছে।১ আবি আইনা আবি হামজা ছুমালি থেকে বর্ণনা করেন যে, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) রাতের আঁধারে খাবার নিয়ে গরিব-দুঃখিদের মাঝে বিলাতেন এবং বলতেন: রাতের আঁধারে সদকা দিলে আল্লাহর গজব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আবু নাইম ইস্পাহানি বলেন: গোপনে সদকা দান করা আল্লাহর গজবকে (ক্রোধকে) দূর করে।” মুহাম্মাদ বিন ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, মদিনার গরিব-দুঃখিদের বাড়িতে রাতের আঁধারে খাবার পৌঁছে যেত, কিন্তু তারা জানত না যে এই খাদ্য কোথা থেকে আসে। ইমামের শাহাদাতের পর তারা বুঝতে পেরেছিল যে, রাতের আঁধারে তাদের বাড়িতে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) খাদ্য ও পানি পৌছে দিতেন। জাহরি বলেন, ইমাম সাজ্জাদের শাহাদাতের পর তাকে যখন গোসল দেয়া হয় তখন তার পিঠে কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায়, তখন আমরা বুঝতে পারি ইমাম। সাজ্জাদ প্রতি রাতে যে বস্তা পিঠে নিয়ে গরিবদের সাহায্য করতেন এটা হচ্ছে সেই বোঝার দাগ। উমার বিন ছাবেত বলেন: যখন ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-কে গোসল দেয়া হয়, তখন তাঁর পিঠে কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায়, সবাই জিজ্ঞাস করল, এটা কিসের দাগ, পরিবারের লোকেরা বললেন, এটা হচ্ছে সেই বোঝার দাগ যা তিনি প্রতিরাতে গরিবদের জন্য বহন করে নিয়ে যেতেন।

আরও শিয়া সুত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমামকে গোসল দেয়ার সময় তার পিঠে দাগ এবং উঁচু মাংস দেখা যায়, যা ছিল ফকিরদের জন্য রাতের আঁধারে বস্তাভর্তি খাবারের দাগ। গরিবদের সাথে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর আচরণ এতটাই ভাল ও মধুর ছিল যে, তিনি কখনোই তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন নি। ইমামের এ আচরণ আমাদের সবার জন্য একটি বড় শিক্ষা যে, কিভাবে গরীব এবং অসহায়দের সাহায্য করা উচিত। যার ফলে সমাজ উন্নত হতে পারে।

Related posts

২৮শে সফর হযরত ইমাম হাসান (আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকী

সবর: মুমিনের শক্তি, সফলতার চাবিকাঠি

কারবালা ইতিহাস: সত্য-মিথ্যার বিভেদ প্রাচীর

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More