আশুরার দিনে কারবালার মরুপ্রান্তরে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদতবরণ করার পর থেকেই আহলে বাইত (আ.)-এর অনুসারীরা তাঁর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে কারবালার পানে ছুটে চলেছেন। বাহন কিংবা পায়ে হেঁটে এমনকি ত্যাগের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে খালি পায়ে হেঁটেও চেহেলুমের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ কারবালার পথে রওনা হন। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবর মোবারক যিয়ারতের ফজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন ইমাম (আ.) থেকে বহু রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে পায়ে হেঁটে যিয়ারত করার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আরবাইনে হাঁটার প্রচলন: যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন আলেম ও আউলিয়া পায়ে হেঁটে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারত করার বিষয়ে গভীর গুরুত্ব দিতেন এবং নিজেরাও নাজাফ থেকে কারবালা পর্যন্ত হেঁটে যেতেন। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারি (রা.) ছিলেন কারবালার প্রথম যিয়ারতকারী, যিনি ৬১ হিজরিতে বনি উমাইয়ার হুকুমতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও ভয়ের পরিবেশেও স্বয়ং কারবালায় উপস্থিত হয়ে কবর যিয়ারত করেছিলেন।
আরবাইনে পদযাত্রার সূচনা: ইতিহাসে এসেছে যে, শাইখ আনসারি (রহ.)-এর যুগ থেকেই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর চেহেলুম উপলক্ষ্যে পদযাত্রার এই সুমহান প্রথার সূচনা হয়। পরবর্তীতে নানামুখী বাধার কারণে তা কিছুকাল স্তিমিত থাকলেও মির্যা হুসাইন নূরী (রহ.)-এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তা পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। তিনি প্রথমবারের মতো ঈদুল আজহার দিন প্রায় ৩০ জন ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে নাজাফ থেকে কারবালার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং তিন দিনে পায়ে হেঁটে কারবালায় পৌঁছান। এরপর থেকে তিনি প্রতিবছর নিজ পায়ে হেঁটে নাজাফ থেকে কারবালা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ১৩১৯ হিজরিতে জীবনের শেষবারের মতো পায়ে হেঁটে কারবালা ভ্রমণ করেন এবং মাজার যিয়ারত সম্পন্ন করেন।
আয়াতুল্লাহ মালেকি তাবরিযি (রহ.)-এর দৃষ্টিতে আরবাইনের পদযাত্রা: মির্যা জাওয়াদ মালেকি তাবরিযি (রহ.) ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে একাধিকবার কারবালার পথে পদযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। আরবাইন সম্পর্কে তাঁর মূল্যবান অভিমত হলো প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, চল্লিশার দিনে নিজেকে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর দুঃখে সমব্যথী করে তোলা এবং মাতম ও আহাজারিতে নিমগ্ন হওয়া। সম্ভব হলে কারবালায় গিয়ে এবং জীবনে অন্তত একবার হলেও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারত করা উচিত। কেননা, হাদিসে মুমিনের পাঁচটি বিশেষ লক্ষণের কথা বলা হয়েছে: প্রতিদিন ৫১ রাকাত নামাজ পড়া, আরবাইনের যিয়ারত পাঠ করা, ডান হাতে আংটি পরিধান করা, মাটিতে সিজদা করা এবং বিসমিল্লাহ উচ্চস্বরে উচ্চারণ করা (আল মুরাকেবাত, পৃষ্ঠা ৮৫)।
আয়াতুল্লাহ মাকারিম শিরাজি (দা.বা.) এবং পদযাত্রা: আয়াতুল্লাহ মাকারিম শিরাযি (দা.বা.) ১৩৬৯ থেকে ১৩৭০ হিজরি পর্যন্ত নাজাফে বসবাসকালে দুইবার খালি পায়ে তিন দিনে নাজাফ থেকে কারবালা পর্যন্ত হেঁটে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবর যিয়ারতের সৌভাগ্য অর্জন করেন। এই মহামূল্যবান সুযোগটিকে তিনি কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চাননি।
আরবাইনের পদযাত্রা সম্পর্কিত রেওয়ায়েতসমূহ: ইমাম জাফর সাদিক (আ.) পায়ে হেঁটে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারত প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন-“যে ব্যক্তি পদব্রজে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে সওয়াব দান করবেন, তার গুনাহসমূহ মুছে দেবেন এবং তার পদমর্যাদা উন্নীত করবেন। যখন সে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, তখন আল্লাহ দুজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন এবং নির্দেশ দেনÑসে ফিরে না আসা পর্যন্ত যেন তার মুখনিঃসৃত প্রতিটি ভালো কথা লেখা হয় এবং মন্দ কথাগুলো পরিহার করা হয়। যিয়ারত শেষে যখন সে নিজ গৃহে ফিরে আসে, তখন ফেরেশতারা তাকে বলে: ‘হে ব্যক্তি! তোমার পেছনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। আজ থেকে তুমি আল্লাহ, তাঁর রাসুল (সা.) এবং আহলে বাইত (আ.)-এর কাফেলার অন্তর্ভুক্ত হলে। মহান আল্লাহর শপথ, তুমি কখনো জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে না এবং আগুনও তোমাকে স্পর্শ করবে না।'” (কামেলুয যিয়ারত, পৃষ্ঠা ১৩৪)
আবু সাঈদ কাযি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “একদা আমি ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বলেন: ‘কেউ যদি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে, তবে সে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধরদের মধ্য থেকে দাসত্বে নিপতিত ব্যক্তিদের মুক্ত করার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।'”
জাবের মাকফুফ আবি সামেত সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-কে বলতে শুনেছেন: “যে ব্যক্তি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারতে বের হয়, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি ১০০০ ধাপের জন্য ১০০০ সওয়াব দান করেন, ১০০০ গুনাহ ক্ষমা করেন এবং ১০০০ গুণ পদমর্যাদা বৃদ্ধি করেন।”
আলী বিন মায়মুন সায়েগ বলেন, ইমাম জাফর সাদিক (আ.) আমাকে বলেছেন:
“হে সায়েগ! তুমি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারতের সুযোগ কখনো হাতছাড়া কোরো না।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, এর সওয়াব কত?
তিনি বললেন: “যে ব্যক্তি পায়ে হেঁটে যিয়ারতে যায়, আল্লাহ তার প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য সওয়াব লেখেন, গুনাহ মাফ করেন এবং মর্যাদা বাড়ান। দুজন ফেরেশতা তার সফরসঙ্গী হন এবং যিয়ারত শেষ করে ঘরে ফেরা পর্যন্ত কেবল তার সৎ আমলগুলো লিপিবদ্ধ করতে থাকেন। ঘরে ফেরার পর ফেরেশতারা তাকে সুসংবাদ দিয়ে বলে: ‘তোমার সব গুনাহ মাফ হয়ে গেছে; আজ থেকে তুমি আল্লাহ ও রাসুলের দলের একজন সাথী। আল্লাহর শপথ, জাহান্নাম তোমাকে স্পর্শ করবে না।'”
যিয়ারতের ব্যাকুলতা ছিল নবীদের অন্তরেও: ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে-“কেউ যদি এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবীর সাথে মুসাফাহা (করমর্দন) করতে চায়, তবে সে যেন ১৫ই শাবানের রাতে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবর যিয়ারত করে।”
কেবল সাধারণ মানুষই নন, বরং ফেরেশতাকুল ও নবীদের রূহসমূহও এই পবিত্র যিয়ারতের অনুমতি লাভের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে আকুতি জানান।
কেয়ামতে যিয়ারতকারীদের নূর ও আলোকচ্ছটা: ‘নূরুল আয়ন’ গ্রন্থে ইমাম মোহাম্মদ বাকের (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতে যিয়ারতের সওয়াব সম্পর্কে তিনি বলেছেন-“যে ব্যক্তি পূর্ণ আগ্রহ ও উদ্দীপনা নিয়ে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে কারবালার পথে পা বাড়ায়, আল্লাহ তাআলা তাকে এক বিশেষ নূর দান করবেন। হাশরের ময়দানে সেই নূরে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিক আলোকিত হয়ে উঠবে। তখন ঘোষণা দেওয়া হবে: ‘কোথায় সেই সৌভাগ্যবান যিয়ারতকারীরা, যারা পরম আগ্রহে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারত করতে গিয়েছিলে?’ এই দৃশ্য দেখে সেদিন উপস্থিত সকলেই যিয়ারতকারী হওয়ার বাসনা পোষণ করবে।”
সমস্যা ও সংকট থেকে মুক্তির উপায়: ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ইরশাদ করেছেন-“কোনো ব্যক্তি যদি চরম বিপদ-আপদ ও সংকটে জর্জরিত থাকে এবং সে অবস্থায় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারত সম্পন্ন করে, তবে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তার সব সমস্যার জট খুলে দেবেন ও সংকট দূর করে দেবেন।”
যিয়ারতের নানামুখী বরকত ও পুরস্কার: ইমাম মোহাম্মদ বাকের (আ.) আরও বর্ণনা করেছেন- “আল্লাহর পথে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদতের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে চারটি অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করেছেনÑ প্রথমত, ইমামতধারা তাঁর বংশধরদের মধ্যে অবধারিত করেছেন; দ্বিতীয়ত, তাঁর পবিত্র মাজারের মাটিতে শেফা (রোগমুক্তি) রেখেছেন; তৃতীয়ত, তাঁর কবরের সান্নিধ্যে করা দোয়া কবুল হয়; এবং চতুর্থত, তাঁর যিয়ারতকারী যিয়ারতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত তার জীবনের আয়ুর কোনো হিসাব নেওয়া হয় না।”
৫০ বছরের গুনাহ মার্জিত হওয়ার সুসংবাদ: ‘নূরুল আয়ন’ গ্রন্থে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) আরও বলেছেন: “যে ব্যক্তি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাজার যিয়ারত করবে, আল্লাহ তার মনের নেক মাকসাদ পূরণ করবেন, পার্থিব নেয়ামত দিয়ে তাকে সমৃদ্ধ করবেন, যিয়ারতের পথে ব্যয়িত অর্থের বহুগুণ বরকত দান করবেন এবং তার জীবনের ৫০ বছরের গুনাহ আমলনামা থেকে মুছে দেবেন।”
যিয়ারত-এ আরবাইন পাঠের বিশেষ সওয়াব: ইমাম হাসান আসকারি (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রতি ২০শে সফর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ‘যিয়ারত-এ আরবাইন’ পাঠ করা অত্যন্ত মুস্তাহাব। তিনি উল্লেখ করেছেন:
“মুমিনের বিশেষ লক্ষণ পাঁচটি: প্রতিদিন ৫১ রাকাত নামাজ আদায় করা, আরবাইনের যিয়ারত পাঠ করা, ডান হাতে আংটি পরা, মাটিতে সিজদা করা এবং বিসমিল্লাহ উচ্চস্বরে উচ্চারণ করা।”
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল মুমিন ভাইবোনকে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারতের তাওফিক দান করুন এবং আরবাইনের দিনে কারবালার পবিত্র মাটিতে হাজির হয়ে যিয়ারত-এ আরবাইন পাঠ করার সৌভাগ্য নসিব করুন আমীন।