ইমাম হোসাইন (আ.)-এর চেহলাম: শোক থেকে জাগরণের পথে

ইসলামের ইতিহাসে কারবালার প্রান্তরে সাইয়্যেদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাত কেবল একটি বিয়োগান্তক ঘটনা নয়, এটি মানব ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। মহরমের সেই রক্তঝরা দিনগুলোর অবসান ঘটে আশুরার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে, কিন্তু ইমাম (আ.)-এর রেখে যাওয়া আদর্শের সংগ্রাম সেখানে শেষ হয়নি। হিজরি ৬১ সনের ১০ মহরম কারবালার তৃষ্ণার্ত প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের আত্মত্যাগের ঠিক চল্লিশ দিন পর, অর্থাৎ ২০ সফর পালিত হয় ‘চেহলাম’ বা ‘আরবাঈন’। এই দিনটি শোক, স্মৃতিচারণ এবং নবজাগরণের এক অনন্য মিলনমেলা।
আরবাঈনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আহলে বাইতের ভূমিকা
আরবাঈনের তাৎপর্য নিহিত রয়েছে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর পরিবারের ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষার মধ্যে। কারবালায় শাহাদাতের পর ইমাম হোসাইন (আ.)-এর পবিত্র মস্তক যখন দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ইমামের বোন হযরত যয়নব (সা.) এবং ইমাম সাজ্জাদ (আ.) চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্যের বার্তা ছড়িয়ে দেন। তাঁদের বাগ্মিতা ও সাহসিকতা ইয়াজিদের অপপ্রচারের জাল ছিন্ন করে দেয়। হিজরি ৬১ সনের ২০ সফর, ইমাম পরিবারের শোকসন্তপ্ত সদস্যরা কারবালার প্রান্তরে ফিরে আসেন। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী (রা.)-এর উপস্থিতিতে ইমাম (আ.)-এর স্মরণে প্রথম আরবাঈন অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল সেই দিন, যেদিন অত্যাচারী শাসকদের ভীত কাঁপিয়ে দিয়ে সত্যের কণ্ঠস্বর পুনরায় জেগে ওঠে।
আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
আরবাঈন কেবল কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হলো কারবালার বিপ্লবের একটি রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিফলন। ইমাম জাফর সাদেক (আ.)-এর বর্ণনামতে, যারা ইমাম হোসাইন (আ.)-এর চেহলামে অংশগ্রহণ করেন, তাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয়। আরবাঈনের দর্শন হলো ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাত ছিল মিথ্যার বিলুপ্তি ও সত্যের প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত প্রমাণ। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, পৃথিবী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, চূড়ান্ত জয় সবসময় ন্যায়ের পথেই থাকে। ইমামের পরিবার যখন কারবালায় ফিরে এসেছিল, তখন তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন যে, জুলুম দিয়ে সত্যকে চেপে রাখা যায় না; বরং জুলুমই মিথ্যার বিনাশ ডেকে আনে।
বিশ্বের বৃহত্তম পদযাত্রা: মানবতার মিলনমেলা
বর্তমান বিশ্বে আরবাঈন কেবল একটি দিন নয়, এটি বিশ্বের বৃহত্তম বাৎসরিক জনসমাগম। প্রতিবছর ইরাকের নাজাফ থেকে কারবালা পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ পায়ে হেঁটে যাত্রা করেন। এই যাত্রাপথ কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম নয়, এটি মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধির পথ। এই আয়োজনে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত থেকে ধনী-দরিদ্র, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একই কাতারে সমবেত হন। পথিমধ্যে সেবাধর্মী কাজ, খাবার পরিবেশন এবং ক্লান্ত পথিককে আশ্রয় দেওয়ার যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই পদযাত্রা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রতীক।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শিক্ষা
আজকের অস্থির বিশ্বে যেখানে অন্যায়, শোষণ ও নৈতিক অবক্ষয় প্রবল, সেখানে আরবাঈন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ইমাম হোসাইন (আ.)-এর সেই অমর বাণীর কথা: ‘আমি কোনো ধন-সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিদ্রোহ করছি না; আমি আমার নানাজানের উম্মতের মধ্যে সংস্কার করতে চাই, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে চাই।’
আরবাঈনের দিনে আমাদের করণীয় হলো:
১. আদর্শের অনুশীলন: ইমাম (আ.)-এর জীবনের শিক্ষা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ন্যায়ের চর্চা করা।
২. অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া: বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে যারা শোষিত ও নির্যাতিত, তাদের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস সঞ্চয় করা।
৩. মানবিক ভ্রাতৃত্বের প্রসার: জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করা, যা আরবাঈনের পদযাত্রায় ফুটে ওঠে।
ইমাম হোসাইন (আ.)-এর চেহলাম বা আরবাঈন আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, রক্ত দিয়ে লেখা সত্যের ইতিহাস কখনো মুছে যায় না। কারবালার সেই তপ্ত বালুচরে ইমাম (আ.) যে জীবনদর্শন দিয়ে গেছেন, তা প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য পাথেয়। আরবাঈন মানেই পুনরায় সেই অঙ্গীকার নবায়ন করা ‘হায়, আমিও যদি তাদের সাথে থাকতাম, তাহলে আমিও সেই মহাবিজয়ের অংশীদার হতে পারতাম!’
আজকের দিনে আমাদের শপথ হোক, আমরা কোনো অবস্থাতেই মিথ্যার কাছে মাথা নত করব না। ইমাম হোসাইন (আ.)-এর ত্যাগের আলোকবর্তিকা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব এক সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক পৃথিবীর সন্ধানে। আরবাঈনের চেতনা বেঁচে থাকুক প্রতিটি সত্যপরায়ণ মানুষের হৃদয়ে।

Related posts

হযরত যায়নাব (সা.আ.): কারবালার বার্তাবাহক ও সত্যের অবিনাশী কণ্ঠস্বর

কুরআন তিলাওয়াত: ঈমানের আলো ও আত্মার প্রশান্তির উৎস

ইমাম সাজ্জাদ (আ.): ইবাদত, ধৈর্য ও মানবতার অনন্য আদর্শ

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More