ইমাম হোসেন (আঃ) এর শাহাদাত ও ইসলামী আদর্শের পূনর্জাগরণ

ডাঃ মোঃ আজিজুল হক (আব্দুল্লাহ)
চিন্তাবিদ, লেখক ও বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

ইমাম হোসেনের বংশ পরিচয় :

ইমাম হোসেন (রাঃ) ছিলেন হযরত আলী (রাঃ) এর দ্বিতীয় পুত্র। বিবি ফাতেমা (রাঃ) এর মত উচ্চমাত্রার দ্বীনি, আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও আমল সম্পন্ন মহিলা ছিলেন তাঁর মাতা। তাঁর পিতা ছিলেন ইসলামের প্রথম দার্শনিক এবং ইলম ও আমলে সেকালের সর্বজনবিদিত অনুসরনীয় নেতা ও ইমাম। আজও ইসলামে ‘মারেফাত’ বলতে যা বোঝায় তিনি হচ্ছেন তার অগ্রপথিক। ইমাম হোসেনের নানার কথা তো বলার প্রয়োজন পড়ে না। যিনি ছিলেন নবীকুল শিরোমণি, মহানবী, আল্লাহর সৃষ্টিকুলের রহমত, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানব ও আবেদ আমাদের নবী করীম (সাঃ)। বিশ্ব বিখ্যাত পারস্যের কবি শেখ সা’দি (রহ:) এর ভাষায়,
বালাগাল উলাবে কামালেহি
কাসাফাদ্দোজা বে জামালেহি
হাসুনাত জামিও খেসালেহী
সাল্লু আলাইহে ওয়া আলিহী
অর্থাৎ –
তার পরিপূর্ণ চরিত্রের কারনে উচ্চ মর্যাদার স্থানে সমাসীন হয়েছেন।
দূর করেছেন অন্ধকার তার সৌন্দর্যের দ্বারা।
তার আচার-আচরণ, কার্যাবলী উত্তম ও সৌন্দর্যমন্ডিত হয়েছে।
তার ও তার পরিবার-পরিজনের উপর দরূদ।
নবীকরীম (সাঃ) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, কামেল দ্বীনদ্বার, জীবন ছিল তার সব সৌন্দর্যের আরক। এ জন্য তার উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ইমাম হোসেনের দাদা আবু তালেব পৌত্তলিক বা কাফের ছিলেন না। প্রকাশ্যে ইসলামের পতাকাতলে সামিল না হলেও পুরো জীবদ্দশায় তিনি নবীকরীম (সাঃ) কে নিজের প্রাণ দিয়ে আগলে রেখেছিলেন এবং নবুওয়্যাতের দাবীতে বাধা দেওয়া তো দূরের কথা কখনও তাকে এব্যাপারে কোন প্রশ্ন করেননি বরং তা প্রচারে পরোক্ষ উৎসাহ জুগিয়েছেন। তার জীবনে কোন অন্যায় আচরণ, নীতিভ্রষ্টতা, খুন-খারাবী, অধিকারহরন কোন কিছুই পাওয়া যায় না। তিনি আল্লাহর ঘরের বা পবিত্র কাবা শরীফের রক্ষনাবেক্ষণকারী ছিলেন এবং আল্লাহভীরু ছিলেন।
কাজেই দেখা যাচ্ছে ইমাম হোসেনের রক্তে এবং তার পারিপার্শ্বকতার সম্পূর্ন চিত্রটি প্রথম থেকে এমন যে দ্বীন ইসলামের সমূহ শিক্ষা ও খুঁটি-নাটি বিষয়ে জ্ঞাত হওয়া ও আমল করার সুযোগ তার জীবনে হয়েছিল।

ইমাম হোসেনের জীবন :

ইমাম হোসেন তার নানার কোলেপিঠে, ভালবাসায়, শিক্ষা-দীক্ষায় বেড়ে উঠেছেন। এমনকি নবীকরীম (সাঃ) তার নাতীদের নিজ সন্তানের মত মনে করতেন এবং ভালবাসতেন। কাজেই পরবর্তীতে ঈমান আমল, চারিত্রিক দৃঢ়তা, বলিষ্ঠতা, সত্যবাদীতা ও পূর্নাঙ্গ ইসলামের ছাঁচে নিজের জীবনকে ঢালাই করা ও ইসলামের শত্রু-মিত্র চিনতে পারা ও জিহাদের মনোবাঞ্ছা পোষণ করা, আধ্যাত্মিক জীবনে ইবাদত ও তার তাৎপর্য অনুধাবন, আল্লাহর ধ্যান ও সান্নিধ্য লাভের প্রশিক্ষণ সবকিছুই পূর্ণভাবে তার জীবনে প্রস্ফুটিত হয়েছিল।

মুসলিম জাতির নৈতিক অধঃপতন :

কিন্তু অতিপরিতাপের বিষয় যে, নবীকরীম (সাঃ) এর ওফাতের মাত্র তিনদশক পরেই তৎকালীন নয়া মুসলিম রাষ্ট্রটি প্রাক-ইসলামী যুগে প্রত্যাবর্তিত হতে শুরু করে। অর্থাৎ শয়তানের প্ররোচনায় নয়া আধুনিক মুসলিমগণ তাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও নৈতিকতা অনেকাংশে হারিয়ে ফেলে। বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠান ইসলামী কায়দায় চললেও ভেতরটা অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে। অর্থাৎ ভোগবাদ, সত্যলংঘন, সম্পদ স্তুপীকরণ, অন্যায় প্রভাববিস্তার, মানুষের উপর প্রভুত্ব বিস্তার ও শাসন-শোষণ, আত্মকেন্দ্রীকতা, গোত্রপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি, রূঢ়তা, অভদ্রতা, অশালীনতা ইত্যাদির মধ্যে ক্রমে ক্রমে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ন্যায়-নীতির পরিবর্তে দমননীতি, স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রে রূপলাভ করতে শুরু করে। অনেক নিবেদিতপ্রাণ রাসূলের সাহাবীর এ সময় বিভিন্ন যুদ্ধে অথবা স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু ঘটেছে। যারা অবশিষ্ট ছিলেন তারা অনেক বেশী বৃদ্ধ ও দূর্বলচেতা যারা যুদ্ধ করার বা এহেন বিরূপ পরিস্থিতির সরাসরি মোকাবেলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। সেই সময়ে যুবসমাজে ব্যাপক ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছিল। এদের অনেকেই ছিলেন সত্যপন্থি আবার অনেকে হয়ে পড়েছিল অর্থশালী ও বিশাল ব্যবসা বিত্তের মালিক। কাজেই এই ভোগ-বিলাস ছেড়ে শুধু মাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে ত্যাগ স্বীকারে তাদের তৎপরতা তেমন ছিল না। আর একদল হয়ে পড়েছিল অতিমাত্রায় তাত্ত্বিক যারা আত্মিক পরিশুদ্ধির পাশাপাশি ইসলামী জিহাদে অংশগ্রহণ করাকে ভ্রাতৃঘাতি মনে করে রাজনীতির পথ থেকে দূরে থাকতো। একটা গ্রুপ ছিল ক্ষমতালোভী যারা ক্ষমতালাভের মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় অপেক্ষমান ছিল। এসবের মাঝেও কিছুসংখ্যক খাঁটি মুসলমান সেখানে ছিল যারা মূলতঃ নবী বংশীয় ও তাদের সঙ্গীসাথী যারা ইসলামী সমাজের এই অধঃপতন দেখে খুবই ব্যথিত ছিলেন এবং কোনভাবে এটা থেকে পরিত্রাণ পাবার রাস্তা খুঁজছিলেন। মানুষ ইসলাম বিস্মৃতির যে ঘোরের মধ্যে ডুবে গেছে ন্যায়-অন্যায়, সত্যপথ থেকে ছিঁটকে যাচ্ছে সেটা থেকে প্রত্যাবর্তন কিভাবে করা যায় তাই ভাবছিলেন।

খলীফা পদে ইয়াজিদ :

এমতাবস্থায় খলীফা মুয়াবিয়া জীবন সায়াহ্নে এসে তার দুশ্চরিত্র পুত্র ইয়াজিদকে মুসলিম জাহানের পরবর্তী খলীফা মনোনীত করার ফলে বিপর্যস্ত মুসলিম সমাজ একটা বিরাট ধাক্কা খেল। অনেকেই মনে করেছিল কোন দ্বীনদ্বার ব্যক্তি খলীফা হলে সুন্দরভাবে ইসলামী শাসনের পূনঃপ্রতিষ্ঠা হবে যা ইতিঃপূর্বে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের সে আশা তো পূরণ হলই না বরং মুয়াবিয়ার চাইতে আরও অত্যাচারী, নির্যাতনকারী, হৃদয়হীন একটা অমানুষ দেশের প্রধান হল এবং সবাই তখন ভয়ে আতংকে আঁতকে উঠলো। এবারতো রাতের ঘুম হারাম করে দিয়ে এই নীতিহীন কুশাসক খুনখারাবী ও রক্তগঙ্গা বইয়ে দিবে।

বায়াত গ্রহণের চেষ্টা :

শাসনক্ষমতা গ্রহণের পর তা পাকাপোক্ত করার জন্য ইয়াজিদের প্রয়োজন ছিল জনসমর্থন আদায়ের। সাধারন জনতা তো তার ধর্তব্যের মধ্যে ছিল না। সেগুলোর কোন মূল্যও তার কাছে ছিল না। সে মদ্যপ হলেও তার এতটুকু বুদ্ধি ছিল যে, ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে ও নিষ্কন্টক করতে হলে তার পিতা (মুয়াবিয়া) ও দাদা (আবু সুফিয়ান) যারা মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত ছিল একনিষ্ঠ পৌত্তলিক ও কাফের নেতা তাদের চির প্রতিদ্বন্দ্বী নবীকরীম (সাঃ), হযরত আলী (রাঃ) ও তার সন্তানদের অর্থাৎ দ্বীন ইসলামের মূল উত্তরসূরীদের সমর্থন আদায় করা প্রয়োজন অথবা তাদের নির্মূল করার প্রয়োজন।
এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মুয়াবিয়া ইমাম হোসেনের বড় ভাই ইমাম হাসানকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। তারপর ইয়াজিদ অগ্রসর হয় ইমাম হোসেনের দিকে তার আনুগত্য আদায়ের জন্য।

ইমাম হোসেনের চারিত্রিক দৃঢ়তা :

ইমাম হোসেন (রাঃ) ইয়াজিদের ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরেছিলেন এবং আরও বুঝতে পেরেছিলেন যে একদিকে মুসলিম সমাজের পদস্খলণ অপরদিকে বিপুল বিত্তবৈভবের অধিকারী শাসক মাঝপথে সামান্য কিছু সংখ্যক দৃঢ়চেতা অর্থশূন্য মুমিন মুজাহিদ। এই মুমীন মুজাহিদদের ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ এই পাপাচারী শয়তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে আসবে না। তাই বলে এই অত্যাচারী, পাপিষ্ঠ, নরাধমের নিকট আত্মসমর্থনের চাইতে মৃত্যুও হাজারগুণে শ্রেয়। তিনি ছিলেন নবীজীর দৌহিত্র, ইমাম আলী (রাঃ) ও বিবি ফাতিমার (রাঃ) সন্তান কাজেই ঐশ্বরিক একটা ইঙ্গিত তিনি ঠিক টের পেয়েছিলেন। সত্যপথ কোনটা তার বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তিনি যদি এখানে আপোষ করতেন তবে নবীজীর ইসলামী আদর্শের ঐ দিন থেকেই ইতি রচনা হতো অর্থাৎ কোন আদর্শের আদর্শিক বিচ্যুতিই সেই আদর্শের মৃত্যু হিসাবে ধরা হয় সেটাই সেদিন ঘটত। তার কাছে এই জিনিসটা এত স্পষ্ট ছিল যে তিনি নিজের ব্যাপারে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এর পরিণতি সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হবার পরই।
কুফাবাসী কর্তৃক তাঁকে আমন্ত্রণ ও বারবার সাহায্যের চিঠি পাঠানো যা-ই ইতিহাসে লেখা থাকুক না কেন সে সবই গৌণ ব্যাপার ছিল।

ইতিহাসবিদদের ভুল ধারনা :

অনেক ঐতিহাসিক তাঁকে দূরদর্শিতাহীন নেতা বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন যে তার বুঝা উচিত ছিল যে চারিদিকে এজিদ বাহিনী ও গুপ্তচরের মধ্য দিয়ে কিভাবে তিনি এই ছোট লোকবহর নিয়ে প্রাণ নিয়ে কুফাতে সাহায্যের জন্য পৌঁছাতে পারবেন? ইতিহাসবিদগণ তাকে বুঝতে ভুল করেছেন। তিনি যুদ্ধ করার জন্য যাত্রা করেননি। তিনি জানতেন যুদ্ধের জন্য যাত্রা করি আর না করি পরিণতি একই হবে। অর্থাৎ ইয়াজিদের বশ্যতা স্বীকার না করার আগে সে তাকে ছাড়বে না এবং তিনিও তা করবেন না ফলে কি পরিণতি হতে পারে তা তাঁর কাছে খুবই সুস্পষ্ট ছিল।
কুফা ছিল তাঁর পিতার শাসনকালে মুসলিম খেলাফতের রাজধানী তাই সেটা ছিল হযরত আলীর (রাঃ) ঘাঁটি। কাজেই সেখানে যাওয়ার একটা চিন্তা তার মনে কাজ করে থাকতে পারে তদুপরি আমন্ত্রণের চিঠিসমূহ।

মর্দে মুমীন ইমাম :
তিনি জানতেন যে যেখানে যে কোন অবস্থায় তাকে ইয়াজিদের শিকার হতে হবে। তবে কি তিনি প্রাণভয়ে পালিয়ে যাবেন? গা ঢাকা দিবেন? আপোষ রফা করবেন? দ্বীনের ঝান্ডা যার হাতে রাসূলের পর এসে গেছে তিনি কি নিজ আদর্শ তথা ইসলামী আদর্শকে ভুলুন্ঠিত করবেন? এটা কি তার মত ‘রূহ’ সম্পন্ন একজন আল্লাহর ওলীর পক্ষে করা সম্ভব? এরূপ করলে কি হবে তাও তিনি জানতেন। এরূপ করলে তিনি যে শুধু পাপিষ্ঠ জাহান্নামী হতেন তা নয় ‘উম্মতে মোহাম্মাদী’ সেদিন থেকে পুরোপুরি পাপপঙ্কিলতায় নিমজ্জিত হয়ে যেত এমনভাবে যে কিয়ামত পর্যন্ত এর থেকে উদ্ধারের কোন রাস্তা থাকত না।
তাই অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে ভেবে চিন্তে তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সৈন্যদল গঠন করতে কত সংখ্যকইবা তিনি সে সময়কার ভীতিবিহ্বল মুসলিম সমাজ থেকে সংগ্রহ করতে পারতেন যারা রুটি-রুজীর চিন্তা না করে জিহাদে অবতীর্ণ হতে প্রস্তুত হতো? নিয়মিত সেনাবাহিনী গঠনের মত অর্থসম্পদ সে সময় তার ছিল না এমনকি জোগাড় করার মত সময়ও ছিল না। কেননা ইয়াজিদের দল তাকে সে সময়ও দিবে না।
কাজেই তিনি অত্যাচারী শাসককে সমুচিতভাবে শিক্ষা দেওয়ার জন্য আত্মিকভাবে পরাভূত করে ইসলামী আদর্শের ঝান্ডাকে বুলন্দ করার জন্যই এই অসম সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

ইমামের দিব্যজ্ঞান :

তিনি জানতেন যে ৪০/৫০হাজার ইয়াজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে তার সঙ্গীসাথীর সংখ্যা বৃদ্ধি করার অর্থ লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। তাই তিনি একাকী যেতে চেয়েছিলেন। সবাইকে তিনি বারবার ছলে বলে কৌশলে বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে নিবৃত করেছেন এবং ফিরিয়ে দিয়েছেন। যেমন, কাউকে বলেছেন ‘বাবা মা-র সেবা কর, তারা অসুস্থ্য’, কেউ সঙ্গে যেতে চাইলে বলেছেন ‘পিতা মাতা ও পরিবারের অনুমতি নিয়ে এসো’ ইত্যাদি। তার অনেক সঙ্গীসাথী ইমামের এরূপ নিবৃত করার অনুরোধে বিস্মিত হয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ফিরেও গিয়েছিল। কিন্তু ফিরে যায়নি তার নিকট আত্মীয়-স্বজন বিশেষতঃ রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারবর্গ। তাদের মোট সংখ্যা ৭০জনের মত।
আসলে এরূপ দ্বীনদ্বার মানুষ ভবিষ্যতকে আয়নার মত সামনে দেখতে পান ও অনুভব করতে পারেন। তিনি এও জানতেন যে, তিনি যদি পরিবারবর্গকে পেছনে ফেলে একাকীও ইয়াজিদের কাছে যান তবে ইয়াজিদ তাকে হত্যা করবে এবং এখানেই চুপচাপ বসে থাকবে না। তার পরিবারের অন্ততঃ পুরুষ সদস্যদের খুঁজে বের করে নৃশংসভাবে একের পর এক হত্যা করবে। তখন প্রাণভয়ে কোন সদস্য পলায়ন করলে সেটাও হবে এই আদর্শের বিচ্যুতি যে নবীর আহেল প্রাণভয়ে মিথ্যার আক্রমনে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলো। তাই তিনি পরিবারবর্গের সদস্যদের ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যপারে এতটা কঠোর হননি। তাদের পরিণতি সম্পর্কেও তার সুস্পষ্ট স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব ছিল।

সর্বশ্রেষ্ঠ শাহাদাত :

ইমাম হোসেন (রাঃ) এর শাহাদাতই পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ শাহাদাত। জেনে বুঝে এরূপ শাহাদাতের মৃত্যু আর দেখা যায় না। বিভিন্ন জিহাদে অংশগ্রহনকারী মুসলিমগণ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন সেই শহীদ আর এই শহীদের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে গুরুত্বের অনেক কম-বেশী। সবাই ফার্স্ট ক্লাস পেলেও কেউ স্টার পাই কেউবা স্ট্যান্ড করে। তদ্রুপ শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদার কথা এখানে বলা হচ্ছে, অন্যকে খাটো করা হচ্ছে না।
কারন এই যে, কোন মুজাহিদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সময় বা যুদ্ধ করার সময় একটা আশা থাকে যে ‘ মরলে শহীদ হব, জিতলে গাজী হব ’ উভয়ই মর্যাদাসম্পন্ন। কাজেই জীবনের ঝুঁকি থাকলেও বাঁচারও একটা সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ইমাম হোসেনের এই লড়াইয়ে বিন্দু পরিমাণ বাঁচার সম্ভাবনা ছিল না। মৃত্যুকে একশতভাগ মেনে নিয়েই তিনি শাহাদতের পেয়ালা পান করেছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, এই মৃত্যুতে আমার কোন আফসোস নেই। তোমার সিদ্ধান্ত আমি সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছি। আমি তোমার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট’। আল্লাহতায়ালা কোরআন শরীফে বলেছেন ‘এরূপ বান্দার প্রতি শুধু আল্লাহই সন্তুষ্ট নয়, তারাও আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট’ (রাদি আল্লাহুতায়ালা আনহু ওয়া রাদুআনহু)।
শ্রেষ্ঠত্বের আরও একটি কারন এই যে, সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনা আমরা ইতিহাসে মাঝে মধ্যে পেয়ে থাকি কিন্তু তার সবগুলোই ক্ষমতার মসনদে থাকা অবস্থায় পতনের সময়ের ঘটনা। কিন্তু ইমাম হোসেনের সপরিবারে নিহত হওয়াটা এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি তো ক্ষমতায় ছিলেন না। শুধুমাত্র ক্ষমতার জন্য হুমকি মনে করে তার শত্রুরা এই করুন, কুখ্যাত, নির্মম হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছিল। ক্ষমতায় না যেয়েও এরূপ পরিণতিবরণ ইতিহাসে দেখা যায় না।

চিরঞ্জীব ইমাম :

আসলে ইমাম হোসেনের মুত্যু প্রকৃত মৃত্যু নয়। প্রকৃতপক্ষে তিনি আমাদের মাঝে জীবিত। একটা প্রজ¦লিত আলোর প্রদীপ। যে প্রদীপের আলোতে আমরা উদ্ভাসিত। এটা ইসলামী আদর্শের বিজয়। নির্জীব, দূর্বল হওয়া আদর্শকে পূণর্জীবন দানের জন্য এই আত্মত্যাগ। এটা ইসলামী আদর্শের নবীজির পর প্রথম পূণর্জাগরণ। সেজন্যই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ শহীদ। এই কারনে শব-ই-মেরাজে আল্লাহর দীদার লাভের সময় আরশে আযীমের পাশে ইমাম হোসেনের নাম লেখা নবীজি দেখতে পেয়েছিলেন বলে জানা যায়।
এই শাহাদাতের ফলাফল ইসলামী আদের্শর পূণর্জাগরণ। কবির ভাষায় – ‘ ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায়, হার কারবালা কে বাদ ’।
ইসলামী আদর্শের তাই কোন মৃত্যু নেই। যতদিন পৃথিবীতে আকাশ বাতাস, গ্রহ, তারা, প্রকৃতি ও মানুষ থাকবে ততদিন এই আদর্শ অবিকৃতভাবে টিকে থাকবে। এর পদস্খলন সম্ভব হবে না। আমরা ইমাম হোসেনের আত্মার সাথী। তার সাথে আমাদের আত্মাকে আমরা মিলিয়ে ফেলেছি। আমরাও তার রাস্তায় চলার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ।
অন্য শহীদগণ ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য কিংবা বিজয় ধরে রাখার জন্য শহীদ হয়েছেন কিন্তু ইমাম হোসেন তার ঐশীজ্ঞানের মাধ্যমে এক অকুতোভয় শহীদ যিনি নিজের আত্মবলীদানের মাধ্যমে ইসলামী আদর্শকে তার মূল বৈশিষ্ট্য ও মেজাজে প্রতিস্থাপন করে গেছেন।
ইসলামে মারেফাতের অগ্রপথিক প্রথম দার্শনিক হযরত আলী (রাঃ) বরাবর বীর ও গাজী ছিলেন কিন্তু ‘ রূহহীন আকীদা-বিশ্বাসের অধিকারী ’ খারিজিদের গুপ্তঘাতকের দ্বারা শহীদ হন। অপরপক্ষে তার পুত্র ইমাম হোসেন দূর্বল হওয়া ইসলামী আদর্শকে জয়ী করার ও অবক্ষয়প্রাপ্ত মুসলিম সমাজ মানসে একটা বিরাট ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তোলার জন্য প্রকাশ্যে নির্দ্বিধায় অকাতরে জীবন দান করে শহীদ হয়েছেন। তাই কেন আমরা বলব না, বা বললে নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না যে ‘ইমাম হোসেনের শাহাদতই ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ শাহাদাত’।

সূত্রঃ 
১. History of the Saraceens – Justice Amir Ali
২. ইসলামের ইতিহাস – কে, আলী।
৩. ইমাম হোসেনের কালজয়ী আদর্শ – শহীদ আয়াতুল্লাহ মর্ত্তুজা মোতাহারী।

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More