ইয়াযীদের দরবারে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)

ইমাম হোসাইন (আ.)-এর পুত্র ইমাম আলী ইবনে হোসাইন ওরফে যায়নুল আবেদীন (আ.) কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর আল্লাহ-ভক্তি, ইবাদাত ও দো’আ প্রবাদতুল্য এবং তাঁর অভিধাসমূহের অন্যতম হচ্ছে ‘সাইয়্যেদুস সাজেদীন’ ও ‘ইমাম সাজ্জাদ’। কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা বিশ্বের সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনা। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে দামেস্কে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর ঐতিহাসিক উক্তি। এ সুযোগটি তিনি পান বন্দি অবস্থায় । একদিন যখন ইয়াযীদের সরকারি প্রচারক মিম্বরে উঠে ইমাম আলী (আ.) ও তাঁর সন্তানদের নিন্দা এবং মু’আবিয়া ও তার বংশধরদের গুণকীর্তন করতে থাকে তখন ইমাম সাজ্জাদ জনগণকে উদ্দেশ করে সেই সত্য উন্মোচন করেন যা তাদের নিকট অবগুণ্ঠিত ছিল।

বলাবাহুল্য যে, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) জনগণকে একথা বলার সুযোগ সহজে পাননি; বহু সমস্যা ও প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেই তিনি তা অর্জন করেন। তাই এটি ছিল একটি মহামূল্যবান সুযোগ । ইমাম সাজ্জাদের জন্য এর চেয়ে আর কী উৎকৃষ্টতর হতে পারতো যে, তিনি সেই মিম্বরেই আরোহণ করেন যেখান থেকে তাঁর মহান পূর্বপুরুষগণকে গালমন্দ করা হতো। তিনি সেখান থেকেই বনি উমাইয়্যার অপপ্রচারণাকে ধূলিসাৎ করে নিজ বক্তব্যে জনগণকে আলোকিত করেন- যারা বহু বছর ধরে সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল।

মহান আল্লাহর ইচ্ছা না হলে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ও তাঁর ফুফু হযরত যায়নাব (আ.)-এর পক্ষে আহলে বাইতের মহত্ত্ব এবং ইসলামে তাঁদের সুমহান অবস্থান সম্পর্কে বলার সুযোগ হতো না ।

মূলত মহানবী (সা.)-এর প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু যার গিফারী (রা.) ইতঃপূর্বেই এ বক্তব্যের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন; তিনি মু’আবিয়ার বিপথগামিতার প্রকাশ্য ও তীব্র বিরোধী ছিলেন । তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে, খেলাফত প্রকৃত পথ থেকে কক্ষচ্যুত হয়েছে তখন তিনি খলিফার উপস্থিতিতে এবং মাঠ-ঘাট ও বাজার-বন্দরেও তার বিরোধিতা ও সমালোচনা করতে শুরু করেন। তাঁকে ইসলামের পুনরুজ্জীবনদানকারী ও বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা বলা যেতে পারে । কারণ, তিনি ছিলেন মহানবী (সা.)-এর একজন সঙ্গী এবং সাহাবীদের তালিকায় তিনি অন্যদের থেকে অগ্রগণ্য ছিলেন। আবু যার নির্বাসিত হন ও সীমাহীন দুর্দশা ভোগ করেন, তথাপি তিনি কখনো চুপ করে বসে থাকেননি। তিনি ‘রাবযা’ নামক স্থানে অসহায় অবস্থায় ইন্তেকাল করেন ভোগ করেন, তথাপি তিনি কখনো চুপ করে বসে থাকেননি। তিনি ‘রাবযা’ নামক স্থানে অসহায় অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।

মু’আবিয়ার ক্ষমতায় আরোহণের পর আরো কিছুসংখ্যক লোক হযরত আবু যার গিফারীদ অনুসারী হয়ে কাজ করেন। আবু যার দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। কিন্তু হযরত ওমর বিন আম কিন্দি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে তা-ই বলতে থাকেন যা ন্যায়সঙ্গত ছিল । তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে মুআবিয়ার বিরোধিতা করেন। এজন্য তাঁকে জীবন দিতে হয়। আবু যার (রা.) এবং তার বি আদী ও তাঁর বন্ধুগণ উমাইয়্যাদের অন্যায় প্রচারণার বিরুদ্ধে যে জবাব দিয়েছিলেন তা যথেষ্ট। ছিল না। তাই আহলে বাইতের সদস্যদের কারো পক্ষ থেকে এ দায়িত্ব পালন জরুরি পড়ে। এ কারণে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) মিম্বরে আরোহণ ও জনসমক্ষে দাঁড়ানোর সুযোগকে মূল্যবান বিবেচনা করলেন ।

সরকার নিযুক্ত এক ফতোয়াবাজ মিম্বরে আরোহণ করে আল্লাহর প্রশংসা করলো, অতঃপর ইমাম আলী (আ.) ও ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর পর উচ্চকণ্ঠে মু’আবিয়া ও ইয়াযীদের গুণকীর্তন করলো। সমস্ত পুণ্যকর্মের সাথে মু’আবিয়া ও ইয়াবীদকে যুক্ত করলো এ বলে যে, এই পুণ্যাত্মা পিতা ও পুত্র সমস্ত উত্তম কর্ম ও নীতি প্রস্রবণধারা এবং জনগণ যা কিছু অর্জন করেছে তার মূলে রয়েছে আবু সুফিয়ানের বংশধর । পৃথিবীতে ও মৃত্যুর পরের জীবনে সফলকাম হওয়ার জন্য জনগণকে তাদের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং তাদেরকে মান্য ও অনুসরণ করাই হচ্ছে স্বর্গীয় সুখ প্রাপ্তির একমাত্র উপায় ।

তখন ইমাম সাজ্জাদ (আ.) কোনো শঙ্কা না করে উচ্চকণ্ঠ বললেন, ‘হে বক্তা! তোমার জন্য দুঃখ হয় । মানুষকে তোষণের জন্য কেনো তুমি আল্লাহর ক্রোধকে নিজের দিকে ডেকে আনছো? তোমার জানা উচিত যে, তোমার গন্তব্য হচ্ছে নরক।’তাঁর এ মন্তব্য ছিল দামেস্কের সেই প্রচারকের বিরুদ্ধে যে ইয়াযীদকে তুষ্ট করতে গিয়ে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করেছিল, আর এভাবে সে তার জাহান্নাম-যাত্রাকেই নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু ইমামের এ বাণী ছিল এমন সকল প্রচারকেরই উদ্দেশে, যারা সৃষ্টিকে খুশি করার উদ্দেশে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে । ইমাম এভাবে সমস্ত মুসলমান বক্তাকেই শিক্ষা দিলেন যে, স্বর্গীয় সুখ প্রাপ্তির উপায় হচ্ছে আল্লাহর বাণীকে কোনো সংযুক্তি বা পরিবর্তন ব্যতীত মানুষের কাছে। পৌঁছানো । মানুষকে তুষ্ট করার জন্য তাদের এমন কিছু বলা উচিত নয় যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে এবং আল্লাহ্ কুরআন মজীদে যা বলেছেন তার ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে :

‘নিশ্চিতভাবেই আমরা সৃষ্টি করেছি মানুষকে এবং আমরা অবগত তাদের নাফস তাদেরকে যে কুমন্ত্রণা দেয় সে সম্পর্কে । আমরা তাদের ঘাড়ের শাহ রগের চেয়ে তাদের নিকটবর্তী । যখন দু’জন ফেরেশতা তার ডানে ও বামে সংলগ্ন হয়ে বসে তখন সে এমন একটি শব্দও উচ্চারণ করে না যা পর্যবেক্ষক লেখকদ্বয় দ্বারা সাথে সাথেই লিপিবদ্ধ। (সূরা ক্বাফ: ১৬-১৮)

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) অজ্ঞ প্রচারকদের এ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং তাদেরকে সাবধান করেন এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যে, মানুষের ভালো-মন্দ সমস্ত কর্মই লিপিবদ্ধ হচ্ছে এবং কোনো মানুষের উচিত নয় আল্লাহর সৃষ্ট জীবের তুষ্টির জন্য তাঁর ক্রোধকে অগ্রাহ্য করা। কারণ, এমন একদিন আসবে, যেদিন সে যাদের ক্ষমতাবান বিবেচনা করতো, তারা তার জন্য কিছুই করতে পারবে না ।

খলিফার প্রচারককে ভর্ৎসনা করে ও তার ধর্মবিরোধী বক্তব্যের নিন্দা জ্ঞাপন করে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ইয়াযীদের দিকে ফিরলেন ও বললেন, তুমি কি আমাকেও এ কাষ্ঠখণ্ডসমূহের ওপর আরোহণের অনুমতি দেবে যাতে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ও শ্রোতাদের আত্মিক পুরস্কারের জন্য কিছু বলতে পারি?’

এ সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর প্রজ্ঞার ইঙ্গিত রয়েছে । কারণ, তিনি মিম্বরে আরোহণের অনুমতি চাননি, বরং কাষ্ঠখণ্ডে আরোহণের অনুমতি চান। তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, কোনো কিছুকে মিম্বরের আকৃতি দিয়ে যে কেউ তাতে বসে কিছু বললেই তাকে মিম্বর বলা যায় না, বরং এরূপ কাষ্ঠখণ্ডসমূহ মিম্বরের জন্য ধ্বংসাত্মক। যে কেউ ধর্মপ্রচারকের ছদ্মবেশ ধারণ করলেই তাকে ধর্মের প্রচারক বলা চলে না । তিনি আরো বুঝাচ্ছিলেন যে, যে প্রচারক নিজেকে বিকিয়ে দিয়ে পার্থিব স্বার্থের আশায় বক্তব্য প্রদান করে এবং মানুষকে খুশি করতে আল্লাহর বিরাগভাজন হয়, তার পরিণতি দোযখ। অন্যদিকে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিছু বলতে চান ।

তিনি যা বোঝাতে চাচ্ছিলেন তা হচ্ছে, প্রচারক যা বলছিল তা আল্লাহ্র ক্রোধকে ডেকে আনবে এবং ইমাম আলী (আ.)-এর মতো মানুষকে গালমন্দ করে ও ইয়াযীদের মতো লোকের প্রশংসা করে কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ সম্ভব নয়। তিনি আরো বোঝাতে চাচ্ছিলেন যে, শ্রোতারা এসব বক্তব্য শ্রবণে কোনো আত্মিক পুরস্কার তো পাবেই না, বরং তা তাদের পাপের বোঝা ভারী করবে এবং তাদেরকে সুপথ থেকে বিপথগামী করবে ।

জনগণ ইমাম সাজ্জাদকে বক্তব্য প্রদানের অনুমতি দেয়ার জন্য ইয়াযীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করলে প্রথমে সে প্রবলভাবে তা অগ্রাহ্য করে এবং বলে, ‘এসব লোক জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আবহে প্রতিপালিত হয়েছে; আমি যদি তাকে কথা বলতে দেই তাহলে সে আমাকে লজ্জায় ফেলবে ।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের আকাঙ্ক্ষারই জয় হলো, ইমাম সাজ্জাদ (আ.) মিম্বরে দাঁড়ালেন। তিনি যেভাবে কথা বললেন তাতে লোকজন আন্দোলিত হলো, তারা কেঁদে ফেললো। ইমাম হোসাইন (আ.)-এর পুত্র ইসলামী সমাজে আহলে বাইতের গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত করলেন, তাঁদের মেধা ও মহত্ত্বের বিষয়ও জনগণকে অবহিত করলেন । তিনি সে সাথে একটি যৌক্তিক মাপকাঠি উপস্থাপন করলেন, যা সকল জ্ঞানীর কাছে গৃহীত। তিনি বললেন, যারা জনগণকে নেতৃত্ব ও পথ দেখাতে চান, তারা অবশ্যই জনগণের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর হবেন এবং এ শ্রেষ্ঠত্বের নিরিখেই তাঁদের নির্বাচিত করা হবে।

পবিত্র কুরআন এ যৌক্তিক মাপকাঠি সম্পর্কে বলছে, ‘সেই ব্যক্তি কি সত্যের দিকে অন্যকে পরিচালিত করতে পারে অন্য কেউ তাকে সুপথ না দেখালে যে নিজেই সত্যপথের সন্ধান পায়। না? তোমাদের কী হলো? তোমরা কেমন ফায়সালা করছো?’ (সূরা ইউনুস : ৩৫)

এ আয়াতটি তর্কের খাতিরে ব্যবহৃত হয়নি, বরং লোকজনের মনোযোগকে এ যৌক্তিক মাপকাঠির দিকে আহ্বান করতে ব্যবহৃত হয়েছে যে, যিনি অধিক জ্ঞানী তিনিই অন্যদের পরিচালিত করতে পারেন, অন্যরা নয় । যদিও মক্কার বহু দেব-দেবীর উপাসকরা মহানবী (সা.)- এর নবুওয়াতের ওপর বিশ্বাস করেনি, তথাপি তারা এ যৌক্তিক মাপকাঠির ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতো যে, যদি তাদের জাতির জন্য আল্লাহকে একজন নবী নিযুক্ত করতে হয়, তাহলে তিনি একজন মহামানবই হবেন, যদিও তারা মহত্ত্বের উপায় ও শ্রেষ্ঠত্বের উৎস সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করছিল । তারা ভাবতো যে, মহত্ত্ব বিপুল পরিমাণ সম্পদ অথবা অনেক পুত্র ও আত্মীয়- স্বজন বা ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। তাই তারা বলতো, আল্লাহ্ যদি আমাদের অর্থাৎ হেজাযবাসীর জন্য একজন নবী নিযুক্ত করতেন তাহলে কেনো তিনি তা মক্কার কোনো মহান ব্যক্তি, যেমন: ওয়ালিদ বিন মুগিরা মাজুসী বা তায়েফের মহান ব্যক্তি উরওয়া ইবনে মাদি সাকাফীকে নিয়োগ দিলেন না?এ প্রসঙ্গে কুরআন মজীদ বলছে, “তারা প্রশ্ন করে কোনো কুরআন এ দুই শহরের দুই মহান ব্যক্তির কোনো একজনের ওপর নাযিল হলো না?” (সূরা যুখরুফ : ৩১)

তাদের এ ভুলের কারণ হচ্ছে তারা সম্পদ ও বাহ্যিক ক্ষমতা এবং খ্যাতিকে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠিরূপে বিবেচনা করতো, জ্ঞান, নৈতিক ও অন্যান্য মানবিক গুণকে নয় । তাই তাদের বিশ্বাস ছিলো না যে, শুধু হেজায নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানব হযরত মুহাম্মাদ (সা.)।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাঁর ঘোষণায় সেসব গুণের কথা উল্লেখ করেছিলেন যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যায় বা এক জাতি ছাড়িয়ে যেতে পারে অপর জাতিকে। তিনি এ বিষয়েও সুস্পষ্টরূপে বলেন যে, নবী (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইত অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় আসীন, অন্যরা তাদের সমমর্যাদার নয়। কারণ, মহান আল্লাহই তাঁদের শ্রেষ্ঠরূপে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁদের মানবতার দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত করেছেন।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) দৃঢ়তার সাথে বললেন, ‘হে লোকসকল! আল্লাহ আমাদের ছয়টি জিনিস দিয়েছেন এবং আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব অন্যদের ওপর সাতটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত । আমাদের জ্ঞান দেয়া হয়েছে যা একজন ব্যক্তির অপর একজনের ওপর বা এক জাতির অপর এক জাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্বের মৌলিক ভিত্তি। আমাদের ধৈর্য দেয়া হয়েছে যা জনগণকে পুনর্গঠন করতে বা হেদায়াত প্রদান করতে জরুরি। উদারতা- যা মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য, তা আমাদের স্বভাবগত। বাগ্মিতাও- যা লোকজনকে পথ দেখাতে এবং তাদের সৎ পথে আনতে ও অসৎ পথ থেকে বিরত রেখে আলোকিত করতে ও জিহাদে উজ্জীবিত করতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় । আত্মোৎসর্গ আমাদের পরিবারের বিশেষত্ব। সাহসিকতা- যার ওপর নেতৃত্ব নির্ভরশীল, তা আমাদের দেয়া হয়েছে। ঈমানদারদের বন্ধুত্ব ও স্নেহশীলতা হচ্ছে পরিচালনা ও প্রজ্ঞার রহস্য, তা আমাদের প্রদান করা হয়েছে; আর বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্য লোকজনের কাছ থেকে জবরদস্তি করে আদায় করা সম্ভব নয়।

এসব বক্তব্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চান, হে ইয়াযীদ! এটি আল্লাহর ইচ্ছা যে, ঈমানদার লোকদের উচিত আমাদের ভালোবাসা এবং তাদের এ থেকে বিরত রাখাও সম্ভব নয়: এও করা সম্ভব নয় যে, তারা অন্যদের প্রতি বন্ধুবৎসল হবে, আর আমাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করবে।

অতঃপর ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বললেন, ‘অন্যদের ওপর সে যে-ই হোক না কেনো, আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব এসব বিশেষত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহ্র রাসূল, তাঁর উত্তরসূরি আলী ইবনে আবি তালিব (আ.), হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব বেহেশতের পথযাত্রী, জা’ফর ইবনে আবি তালিব (আ.), যারা এই কওমের নবীর দৌহিত্র: মাহদী (যিনি নির্যাতিতদের উদ্ধারকর্তা)- দ্বাদশ ইমাম, হাসান ও হোসাইন (আ.) এবং এঁরা সবাই আমাদের অন্তর্ভুক্ত । সম্ভব হলে ইয়াযীদ এই মুহূর্তে এসব বিশেষত্ব নিজের ওপর আরোপ করুক। অন্যকথায়, কেবল ইতিহাসের বিকৃতি সাধন করেই সম্ভব হবে যা আমাদের আছে তা তার পক্ষে অর্জন করা, সেই সাথে তার লজ্জাকর ও অসৎকর্মগুলোকে উপেক্ষা করে তার অবস্থা পুনর্নির্ধারিত করা। অন্যথায় যতদিন ইসলামের বৈশিষ্ট্যসমূহ আমাদের বনী হাশেমের মাঝে বর্তমান, যেমন আবু তালিব, তাঁর ভাই হামযা এবং তাঁর পুত্ররা অর্থাৎ আলী ও জা’ফর এবং ইমাম আলীর পুত্র হাসান ও হোসাইন। (আ.), আর এ ইতিহাস যতদিন সংরক্ষিত আছে যে, তাঁরা আল্লাহর সবচেয়ে অনুগত বান্দা, বিশেষত যখন আল্লাহর নবীও বনী হাশিমের সাথে সংযুক্ত, ততদিন কীভাবে সম্ভব আমাদেরকে অন্ধকারে রেখে বা আমাদের অমর্যাদা করে বা আমাদের অধিকার অন্য কাউকে দিয়ে বা অন্য কারো দিকে ঘুরে গিয়ে আমাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা?’

এসব বলে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) নিজের পরিচয় উন্মোচন করলেন, আর পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে, ইয়াযীদ বাধা দান করতে বাধ্য হলো, হীন উদ্দেশ্যে সে মুয়াজ্জিনকে নামাযের জন্য আযান দিতে বললো । মহান আল্লাহ্র প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক ইমামও সে সময় নিশ্চুপ রইলেন । অতঃপর তিনি যখন আরো একটি সুযোগ পেলেন তার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করলেন। মুয়াজ্জিন বললো : ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল।’ তখন ইমাম সাজ্জাদ (আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানার্থে তাঁর পাগড়ি খুলে ফেললেন এবং বললেন : ‘হে মুয়াজ্জিন! তুমি এইমাত্র যে নবীর নাম উচ্চারণ করলে তার নামে তোমাকে চুপ করতে বলছি ।

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More