ইরানের ইসলামী বিপ্লবঃ হাজার বছরের প্রত্যাশা

লেখকঃ মোঃ সাজ্জাদ হোসেন রাসেল, বি.এ (অনার্স) ২য় বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ, সরকারি হরগঙ্গা কলেজ, মুন্সিগঞ্জ

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ফ্রান্সে সংঘটিত হয় বিশ্বব্যাপী এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিপ্লব যা ফরাসি বিপ্লব নামে পরিচিত। এর দীর্ঘ দিন পর ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লব বা বলশেভিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই দুই বিপ্লবের কোনটাই পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি কল্যাণ বয়ে আনেনি আর আনার কথাও না, তবে দীর্ঘ কয়েক শতক ধরে মুসলিম সম্প্রদায় পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি জনপদে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়ে আসছিলো। ইসলাম ও ইসলামী আদর্শ যেন প্রায় বিলুপ্তির পথে। মুসলমানেরা যেন নিজেদের পরিচয় দিতেও ভূলে গেল। মুসলিম রাষ্ট্রগুলো পরিণত হল সা¤্রাজ্যবাদের নিকৃষ্ট দালাল ও ক্রীতদাস। ইরানও এর বাইরে ছিলো না। ঠিক এমনই এক অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে প্রদীপ হাতে এগিয়ে এলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলাী ব্যক্তিত্ব হযরত আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী রহ.। তাঁর নেতৃত্বে পারস্য উপসাগরের তীরবর্তীদেশ ইরানে সংঘটিত হয় মহান “ইসলামী বিপ্লব”। বিশ্লেষকদের মতে এই বিপ্লব ছিলো মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকট হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বিপ্লব।

ইসলামী বিপ্লবঃ

পটভূমিঃ ইসলামী বিপ্লব হচ্ছে, ১৯৭৯ সালে ঘটা একটি যুগান্তকারী বিপ্লব যা ইরানে সংঘটিত হয়। এই বিপ্লব ইরানকে শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলাভীর একনায়কতন্ত্র থেকে ইমাম খোমেনি’র ইসলামী প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে। এই বিপ্লবকে বলা হয় ফরাসি ও বলশেভিক বিপ্লবের পর ইতিহাসের তৃতীয় মহান বিপ্লব।
ইরানের শেষ স¤্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলাভী। দুনিয়ার সবচেয়ে পুরোনো, ঐতিহ্যবাহী আর প্রভাবশালী শাহী রক্তের ধারক ছিলেন তিনি। তার বংশগত আড়াই হাজার বছর ধরে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো। শুরুটা করেছিলেন তাঁরই পূর্বপুরুষ মহান কুরুশ আজ থেকে আড়াই হাজার বছর পূর্বে। সেই বংশের শেষ স¤্রাট ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি বিপ্লবী দেশবাসীর কাছে পরাজিত হয়ে মিশর পলায়ন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই ইরানে ব্যাপক আকারে তেল ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় যার মালিক ছিলো ব্রিটিশ কোম্পানীগুলো। ঠিক এই সময়টিতে মোসাদ্দেক নামক জনপ্রিয় এক রাজনৈতিক নেতা দেশের সব তেল সম্পদ জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পার্লমেন্টে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। বিট্রেনে তখন উইস্ট চার্চিল এবং যুক্তরাষ্ট্রে হেনরি ট্রুম্যান ক্ষমতায়। জয়লাভের ফলে দুই ক্ষশতাশালীর মাথায় বাজ পড়ল। শুরু হলো মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার নীল নকশা। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ঈ.ও.অ ব্রিটিশ গোয়েন্দা ঝ.ঝ.ও লন্ডনে বসে পরিকল্পনা করলো। সেই পরিকল্পনা মতে ইরানী সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান ঘটানো হল। এভাবে প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক পদচ্যুত হলেন। তার স্থানে আজ্ঞাবহ জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদীকে নিয়োগ দেয়া হল। কিন্তু মূল ক্ষমতা রাখা হল ইঙ্গো মার্কিন সা¤্রাজ্যের অনুগত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলাভীর নিকট।

পতনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের ১৬ই জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের নিরঙ্কুশ সর্বময় ক্ষমতা ছিলো পাহলাভীর হাতে। তার ইঙ্গো মার্কিন মদদদাতারা অনবরত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁকে। ফলে তার পুলিশ ও সেনাবাহিনী প্রতিদিন রাজপথে শত শত মানুষকে গুলি করে মারছিলো।
শাহের কতিপয় ব্যক্তিগত আচরণ, অভ্যাস আর পশ্চিমা সংস্কৃতির অবাধ প্রচলন দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে ধীরে ধীরে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এই বিক্ষোভই অগ্নিগর্ভে রূপ নেয় ১৯৭৭ সালের শেষের দিকে।

তেহরান শহরে কোন পাবলিক বাসে কোন ধর্মীয় লেবাসধারী মানুষ উঠলেই কন্ট্রাক্টর টিটকারী করে বলত “আমরা আলেম ও বেশ্যাদের বাসে চড়াই না।” রাস্তায় গড়ে উঠেছিলো মদের দোকান। শহর ও শহরতলীতে শত শত নাইট ক্লাবে চলত সারা রাত ব্যাপী ডিস্কো পার্টির নামে মদ্যপান, জুয়া আর অবাধ যৌনাচার।
শাহ নিজেও ছিলেন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত। তার স্ত্রী, সন্তানেরাও পশ্চিমা ধাঁচে চলতেন। শাহ এবং তার স্ত্রী সকল রাজকীয় অনুষ্ঠানে পশ্চিমা পোশাক পরতেন। এসব কারণে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ দিন দিন ফুঁসে উঠতে থাকে। এভাবে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে।

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি (রহ) ছিলেন এমন-ই একটি দেশের বিশিষ্ট ইমাম। মুসলমানদের এই মনের কষ্ট তিনি বুঝতে পেরে শিয়াদের ধর্মীয় শহর নাজাফে একটি জনসভা আহ্বান করেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ হয় সেখানে। শাহের সরকার প্রথমে এই বিশাল সমাবেশকে মোটেই গুরুত্ব দিলেন না। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে দ্রুত। তেহরানের রাস্তায় বিক্ষুব্ধ মানুষ নেমে আসলো। সংখ্যায় ছিলো তারা অগণিত। দিনটি ছিলো শুক্রবার। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লক্ষ লোক তেহরানে জমায়েত হয়। তারিখটি ছিলো ১৯৭৮ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর। শাহের বাহিনী বিশাল জনসমাবেশের উপর গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে। আপাততঃ লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় কিন্তু দিবসটিকে ইরানের ইতিহাসে কুখ্যাত “Black Friday” হিসেবে চিহ্ণিত করে।

এঘটনার মাত্র তিন মাসের কিছু সময় পর ১৬ই জানুয়ারি ১৯৭৯ সালে মাত্র একদিনের গণ অভ্যুত্থানে শাহের পতন হয়। পরিবার পরিজন নিয়ে শাহ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তার দীর্ঘদিনের মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে। তিনি প্রথমে ইতালি যান। কিন্তু ইতালি তাকে অসম্মানজনক ভাবে তাড়িয়ে দেয়। এরপর তার বিমান উড়াল দিলো পানামায়। সেখানকার সরকারও তাকে সাদরে গ্রহণ করল না। অনেক দেন-দরবার এবং অনুনয় বিনয় করার পর মিশর তাকে সাময়িকভাবে সেই দেশে ঢুকার অনুমতি দিয়েছিলো।

১৯৮০ সালে ২৭ জুলাই ৬০ বছর বয়সে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে মিশরে বসবাসরত অবস্থায় মারা যান। আর এভাবে শাহ যুগের অবসান ঘটে এবং ইমাম খামেনী (রহ) এর নেতৃত্বে ইরান একটি আধুনিক ইসলামিক শক্তিধর দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবঃ বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে ইরানের ইসলামী বিপ্লব হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বিস্ময় এবং ইসলামী মূল্যবোধ ও আধ্যাতিকতার এক অনন্য বিষ্ফোরণ। এ বিপ্লবের সাফল্যের নানা দিক তুলে ধরা হল।

ইরানে ইসলামী বিপ্লব বদলে দিয়েছে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কথিত পরাশক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামকে তুলে ধরেছে সমসাময়িক যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও চ্যালেঞ্জিং শক্তি হিসেবে। বিশেষ করে মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ.) ও তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর নেতৃত্বে মার্কিন সম্রাজ্জবাদী শক্তির প্রতি ইরানী জাতির প্রবল চপেটাঘাত। একাধিপত্যকে নড়বড়ে করে, বিগত হাজার বছরের ইতিহাসে ইসলামী শক্তির এমন প্রবল উত্থান এবং ইসলামের গৌরবময় পতাকার এত উচ্চতর অবস্থায় আর কখনো ঘটে নি। এই বিপ্লবের বিস্ময়কর সাফল্যগুলোর শীর্ষে রয়েছে আধুনিক যুগে একটি সফল ও গণভিত্তিক ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকে ক্রমেই বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তুলছে যা সাম্রাজ্জবাদী শক্তিগুলোকে আতঙ্কিত করছে।

এছাড়াও ইরানের মহান ইসলামী বিপ্লবের আরো কিছু সাফল্যের মধ্যে রয়েছেঃ নাগরিক সুবিধা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক নিরাপত্তা দান, ইসলামী ও খোদামুখী আধ্যাত্মিক পরিবেশের বিস্তার, বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকট ইসলামের প্রকৃত শত্রুদের সনাক্তকরণ, ইসলামের আলোকে সাংস্কৃতিক বিপ্লব, কুরআনের শিক্ষা বিস্তার, হিজাবের সংস্কৃতি চালু, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের প্রতিরোধ, সুস্থধারার সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রসহ শিল্প মাধ্যমের ইসলামী করণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসামান্য সাফল্য, প্রতিরক্ষায় স্বনির্ভরতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বিশ্বে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত একমেরুকেন্দ্রীক ব্যবস্থা ভেঙ্গে দেয়া, স্বাধীনচেতা ও মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়ন, ইরাক, ফিলিস্তিন, লেবানন ও আফগানিস্তানের শরনার্থীদের আশ্রয় প্রদান, আল কুদস ও ফিলিস্তিনকে মুসলিম বিশ্বের প্রধান ইস্যু হিসেবে এক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি জাতিসহ মুসলিম বিশ্বকে জাগিয়ে তোলার অসামান্য সাফল্য অর্জন, আশুরা, জিহাদ ও পবিত্র হজের মূল চেতনার বিস্তার।####

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More